ঢাকা মেডিকেলের উল্টো দিকে বুয়েটের টিচার্স কোয়ার্টার অবস্থিত। এই
কোয়ার্টার সংলগ্ন মসজিদে দীর্ঘদিন যাবত একটি মক্তব চালু আছে। যেখানে
বাচ্চাদের সহীহ ভাবে কুরআন ও মাসআলা
মাসায়েল শেখানো হয়। ছোটবেলায় স্কুল থেকে ফিরে দুপুরে এই মক্তবে পড়তে যেতাম।
আমার সমবয়সী আরো অনেকেরই কুরআন শেখার হাতেখড়ি এই মক্তবেই হয়েছে। বুয়েটের
স্বনামধন্য ও সুপরিচিত শিক্ষক প্রফেসর হামিদুর রহমান সাহেব, যাকে আমরা বড়
হুজুর হিসেবে চিনতাম, তিনি এই মক্তবের প্রতিষ্ঠাতা। তার মুখেই একবার এই
মক্তব শুরু করার কাহিনী শুনতে পাই।
উনার বড় ছেলের বয়স যখন ৬/৭ বছর, তখন তিনি তার ছেলেকে কুরআন শেখানোর জন্য
একজন হুজুরের খোজ করছিলেন, যিনি বাসায় এসে তার ছেলেকে কুরআন পড়িয়ে যাবেন।
এজন্য তিনি তার পূর্বপরিচিত মাওলানা আব্দুল্লাহ সাহেবের কাছে গেলেন, যিনি
আজিমপুর কবরস্থান মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল ছিলেন। তার সাথে সেদিনের কথাবার্তা
অনেকটা এরকম ছিল,
- হুজুর! আমাকে একটা হুজুর দেন। আমার ছেলেকে বাসায় এসে কুরআন পড়াবে।
- আপনাকে আমি কোন হুজুর দিব না। আপনি বরং মক্তবে আপনার ছেলেকে পাঠান।
- আমাদের এখানে তো কোন মক্তব নেই !
- মক্তব নেই তো কি হয়েছে, আপনি মক্তব চালু করেন!
আব্দুল্লাহ সাহেবের সাথে এই সংক্ষিপ্ত কথাবার্তার প্রেক্ষিতে তিনি
কোয়ার্টারের প্রতিটি বাসায় মসজিদে মক্তব চালু করার কথা জানিয়ে ও সবাইকে
তাদের বাচ্চা মক্তবে পাঠানোর অনুরোধ করে একটি চিঠি লিখেন। কিন্তু সে সময়
কেউ তার বাচ্চাকে মক্তবে পাঠাতে রাজি হল না।
ব্যাপারটি তিনি
আব্দুল্লাহ সাহেবকে পুনরায় জানালে তিনি তার ছেলেকে দিয়ে একাই মক্তব চালু
করার কথা বলেন। মসজিদের ইমাম সাহেব (যিনি এখনও আছেন), তাকে দিয়ে তখন এই
মক্তব শুরু করা হয়। একজন ছাত্র একজন শিক্ষক, এভাবেই বেশ কিছুদিন চলার পর
বুয়েটের অন্যান্য শিক্ষকরাও তাদের বাচ্চাদের পাঠাতে শুরু করেন। আর এভাবেই
মাস চারেক এর মাথায় মক্তবটি পুরোপুরি চালু হয়ে যায়।
মক্তব চালুর
কিছুদিন পর, প্রফেসর হামিদুর রহমান সাহেব একবার আব্দুল্লাহ সাহেবের সাথে
দেখা করতে গেলে, তিনি মক্তব প্রসঙ্গে একটি কথা বলেন, যা আমার এত কিছু লেখার
মূল উদ্দেশ্য,
"আপনারা ইংরেজি শিক্ষিতরা আপনাদের ছেলে মেয়েদের
পার্থিব শিক্ষার ক্ষেত্রে সমাজ ও পরিবেশ খুব ভাল বোঝেন। তাদের স্কুল কলেজে
না পাঠিয়ে বাসায় টিউটর রেখেও তো পড়ানো যেত। কিন্তু আপনারা তা করেন না।
কেননা আপনারা জানেন, কেবল শিক্ষা দেয়াই যথেষ্ট না, বরং শিক্ষার পাশাপাশি
তাকে একটি পরিবেশের মধ্যে থেকে বেড়ে উঠতে হবে। যেটা তার সঠিক বিকাশে
গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখবে। অথচ এ বিষয়গুলো কিন্তু আল্লাহ্র কালাম শিক্ষা
দেয়ার ব্যাপারে আপনারা অনুভব করেন না। তখন বলেন,
হুজুর! একটা হুজুর দেন। বাসায় এসে পড়িয়ে যাবে।
-----------------------------
আজ এই দুইজন মানুষের কারণে আমার মত আরও শত শত ছেলে মেয়ে সহীহ ভাবে কুরআন
পড়তে পারছে। মক্তব চালু না করে অন্যান্যদের মত যদি "একটা হুজুর দিয়ে কুরআন
পড়ানোর" রেওয়াজের উপর জমে থাকতেন, আমরা অনেকেই হয়ত এই শিক্ষা থেকে আজ
বঞ্চিত থেকে যেতাম !
আল্লাহ তা'আলা মাওলানা আব্দুল্লাহ সাহেব ও প্রফেসর হামিদুর রহমান সাহেবকে সর্বোত্তম প্রতিদান দান করুন !
সালাহুদ্দিন আইয়্যুবি (র) বলেছেন, একটি মুসলিম সমাজকে ধ্বংস করার সহজ
পন্থা হল সেই সমাজের যুবক শ্রেণীর মাঝে অশ্লীলতা ঢুকিয়ে দেওয়া। কথাটি শতভাগ
সত্য। তবে, এই সহজ পন্থার তুলনায় আরও অনেক কঠিন, অধিক ফলপ্রসূ ও
দীর্ঘমেয়াদি প্ল্যান হল, মুসলিম সমাজের শিশুদেরকে এমন ভাবে গড়ে তোলা যাতে
সে জীবন কাটাবে মুসলিম নামে, কিন্তু তার সমস্ত কাজকর্ম, চিন্তাধারা ও মন
মানসিকতা হবে বিধর্মীদের মত। তার কথা বার্তা থেকে শুরু করে জীবনের প্রতিটি
ক্ষেত্রে তার সাথে একজন অমুসলিমের বিশেষ কোন পার্থক্য থাকবে না।
লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, বর্তমান যুগের বাচ্চাদের পড়াশোনার সিলেবাস ও
শিক্ষাদান পদ্ধতিকে এমন ভাবে সাজানো হয়েছে, যেখানে দ্বীনের সঠিক জ্ঞান ও
তাতে গভীরতা অর্জনের কোন সুযোগই নেই। স্কুলের সিলেবাসের মধ্যে নামে মাত্র
“ইসলামী শিক্ষা” নামে যা চালু আছে, একে তো হাজারো ভুলে ভরা, পাশাপাশি তা
যেই পরিবেশে ও যে ধরণের শিক্ষক দ্বারা পড়ানো হয়, তাতে সুশিক্ষা পাওয়ার থেকে
কুশিক্ষা পাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
এরকম একটি প্রতিকুল অবস্থায় আমরা
যদি নিজেরাই পরিবেশকে আরও জটিল বানিয়ে ফেলি, একজন হুজুর ডেকে বাচ্চাকে এক
খতম কোরআন (শুদ্ধ হোক বা অশুদ্ধ) পড়িয়ে দিয়েই যথেষ্ট মনে করি, অসম্ভব কিছু
নয়, সুরা আহযাবের ৬৮ নং আয়াতের বর্ণনা অনুযায়ী এই সন্তানই কিয়ামতের দিন
উল্টো আমাকে দিগুণ শাস্তি দেয়ার জন্য আল্লাহর কাছে অনুরোধ জানাবে।
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে সতর্ক হওয়ার সৌভাগ্য দিন। আমাদের সন্তানরা বড় হয়ে
যেন আমাদের দুশ্চিন্তার কারণ না হয়। তাদেরকে আমাদের চক্ষু শীতলকারী বানিয়ে
দিন
Subscribe to:
Post Comments (Atom)
One
অনেক ধরনের চিন্তা মাথায় ঘুরপাক খায়। খেয়ে দেয়ে আবার ক্লান্তও হয়ে যায়। যার কিছু হয়তো ভাল, আবার কিছু হয়তো কালো। তেমনি আজ একটা বিষয় মাথায় আসলো।...
-
মানুষ তার পরিবেশের কারণে প্রভাবিত হয়। একজন শিশু যখন ভূমিষ্ঠ হয়, এরপর থেকেই সে প্রতিনিয়ত বড় হয় ও শিখতে থাকে। শিখতে থাকে তার চারপাশে যা আছে ত...
-
কাছে আসার গল্প-০২ গল্পের নায়ক HSC পাশ করে অনেক কষ্টে ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাণিবিদ...
-
কাছে আসার গল্প-০৩ ভোর থেকেই আকাশ কাদঁছে কারণ কাল মেঘ তাকে ঢেকে রেখেছে। চারদিকের পরিবেশ অনেক ঠান্ডা। ঘুমে...
No comments:
Post a Comment