কাছে আসার গল্প-০২
গল্পের নায়ক HSC পাশ করে অনেক কষ্টে ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাণিবিদ্যা বিভাগে পড়ার সুযোগ পায়। তার স্বপ্নের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পেয়ে সে অনেক খুশি। পড়ার বিষয় যদিও প্রাণিবিদ্যা, তারপরও সে খুশি। কারণ স্কুল,কলেজে জীববিজ্ঞান বিষয়ের প্রতি সে বরাবরই ভাল ছিল, তাই ফর্ম পূরণে বিষয় পছন্দ সে ভাবেই করেছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার পর সবার মতো তারও মনে সাধ জাগলো যে, সে প্রম করবে। কিন্তু প্রেম কি হাতের মোয়া যে, চাইলেই করা যায়? কারও চেহারা সুন্দর তো কাজ কর্মে বান্দর, কারও চেহারা কালো তো আচরণে ভালো। এই দু'টোর সমন্বয় করা বড়ো মুশকিল। বন্ধুরা সবাই কাউকে না কাউকে জুটায়া ফেলছে। কিন্তু তার তো মেয়েই পছন্দ হয় না। দু'একটা পছন্দ হয়, সেগুলো আবার বড় আপু। আর অন্য বিভাগের গুলো পছন্দ হলে সে আবার আর দশ জনের মতো ছ্যাঁবলা না যে, আগে যেয়ে কথা বলবে। তার কলেজ বন্ধু গুলো সব চুটিয়ে প্রম করে যাচ্ছে, আর সে এখনও খুঁজেই যাচ্ছে। প্রতিদিন হতাশা নিয়ে ক্লাসে যায় আর আসে। কোনই উন্নতি,অগ্রগতি হয় না। মনে মনে ভাবে এটা কোন জীবন হলো, তার হ্যাবলা,ক্যাবলারা একটা জুটায়া ফেলছে আর সে শুধু তীর্থের কাকের মতো চেয়ে থাকে। সে ভাবে সারা দুনিয়াতে এত সব মেয়ে শুধু আমার ভাগ্যেই জোটে না?
এরপর সে মেস থেকে বিশ্ববিদ্যালয় হলে থাকার ব্যবস্থা করে। এখানে আসার পর দেখলো কিছু ভাই মুখ ভরা সুন্দর দাঁড়ি নিয়ে মাথায় টুপি গায়ে পাঞ্জাবী দিয়ে কত সুন্দর ভাবে চলাফেরা করে। যেখানে সবাই নায়কের মতো চলাফেরা করে সেখানে এরা কিভাবে হুজুরদের মতো হয়ে আছে। একদিন সে রিক্সাতে চড়ে যাচ্ছিল হঠাৎ এক বাস এসে তার রিক্সাতে আঘাত করে। ঐ রিক্সাওয়ালা ওখানেই মারা যায় কিন্তু সে ছিটকে পরে সামান্য হাত কাঁটে। এই রকম দূর্ঘটনা থেকে বেঁচে সে সৃষ্টিকর্তার প্রতি তার আনুগত্য বেড়ে গেল। সে চিন্তা করলো স্রষ্টার দয়া ছাড়া তার বাঁচা সম্ভব ছিল না। সে ভাবলো আসলেই তো ধর্ম কর্মও তো করা উচিত। তাছাড়া মানসিক অস্থিরতা থেকে মুক্তি পেতেও আলাদা পরিবেশে যাওয়া দরকার। এরপর পরীক্ষা দিয়ে গ্রীষ্মের ছুটিতে আল্লাহ্'র রাস্তায় ১০দিন সময় দিয়ে ফিরলো। মনের ভিতর অসাধারণ পরিবর্তন। নিজেই ভাবতে লাগলো তার অনেক পরিবর্তন দরকার, অন্ধকার থেকে আলোর আসা দরকার। তার সবকিছু পরিবর্তন হওয়া শুরু করলো সে নিয়মত নামায পড়া শুরু করলো, দাঁড়ি রাখা শুরু করলো পোশাকআশাক হুজুরদের মতো পরা শুরু করলো। কিভাবে যে এসবের প্রতি তার ভালবাসা শুরু হলো তা সে নিজেও জানে না। সবই ঠিক ছিল কিন্তু তার প্রেম করার কি হবে?
সে জানলো ও দেখলো যে,প্রচলিত ভালবাসা গুলোর পদ্ধতি তার বিবেক ও ধর্ম প্রশ্রয় দেয় না। তাহলে উপায়?
ক্লাসে যখন যায়, দেখে বন্ধুদের সাথে ক্লাসের মেয়েদের বন্ধুত্বের নামে নোংরা খুনসুটি। ক্লাস থেকে বের হলে ক্যাম্পাসের আশে পাশে, আড়ালে নিভৃতিতে কত শত ছেলে মেয়ে তাদের অবৈধ সম্পর্ক স্থাপন করে চলেছে। facebook এ ঢুকলে কত জন তাদের গড়া অবৈধ সম্পর্কের প্রমাণ ছবির মাধ্যমে সবার সামনে মেলে ধরছে, কত জন বুক ফুলে timeline এ In a relationship লিখে বন্ধুদের Like, congregation পেয়ে চলেছে। রাত লাগলেই হলের ছেলেদের বারান্দায়, ছাদে, মাঠে গিয়ে তাদের মোবাইল ফোন নিয়ে প্রেম আলাপ চালাচ্ছে call, video callএর মাধ্যমে। এ অবস্থায় নিজেকে তার বড় অসহায় মনে হত। এত ভীড়ের মাঝেও সে নিজেকে বড় একা পায়। এসব কারও কাছে বলতেও পারে না। নির্দয় সমাজ এসব বুঝবেও না। তার মনের অব্যক্ত কথাগুলো মনেই থেকে যায়। অনেক ভাবে যে, বাসায় বলবে তার সমস্যাগুলো কিন্তু কেউ বুঝবে কি? বাসা পাশের জেলায় হওয়ায় প্রায় বাসায় যায়, অনুশীলন করে বলে দিবে কিন্তু পারে না। লজ্জাবশত কারণে আর পেরে ওঠা হয় না।অবস্থা এমন যে, বুক ফাটে কিন্তু মুখ ফাটে না।এরপর সে স্রষ্টার শরণাপন্ন হয়। রাতে তাহাজ্জুদ নামাযের পরিমান বেড়ে দিয়ে আল্লাহ্'র কাছে সাহায্য চায়। ফলাফল অনেক সাহস নিয়ে বাবা মার সামনে দাঁড়ায়।
ছেলে: আম্মা আমি একটা মেয়েকে পালিয়ে এনে বিয়ে করেছি।
মা: কি?!?!?! তোর কি মাথা খারাপ হয়েছে??
ছেলে: আগে পুরোটা শোনো।
মা:আর কি শোনার বাকি আছে?? শেষ আামার সব স্বপ্ন তুই শেষ করে দিলি।
ছেলে: আমি বলতেছি, যদি আমি এই রকম কোন কাজ করে আসতাম তোমার কি ভাল লাগতো?? অবশ্যই না।
মা: তার মানে তুই করিস নি। যাক বাঁচলাম।
ছেলে: আমি যেখানে থাকি সেখানে ছেলে মেয়েদের অবাধ মেলামেশা হয়। যার ফল তোমরা পত্রিকা গুলোতে প্রায়ই দেখতে পাচ্ছ। আমি তো এরকম কিছু চাচ্ছি না। বিয়ে যখন একদিন করাই লাগবে, তাহলে আগে করলে সমস্যা কি? আমি তো এটাও বলছি না যে আমার মেয়ে পছন্দ করা আছে। মেয়ে তোমরাই পছন্দ করে নিও, শুধু একটু ধার্মিক হলেই চলবে।
মা: এই বয়সে বিয়ে? লোকে বলবে কি?
ছেলে: এই বয়সে একটা ছেলে প্রেম করতে পারলে বিয়ে কেন করতে পারবে না? আর লোক, কোন লোকের কথা বলছো, যারা প্রেম নামের অবৈধ সম্পর্ক গুলোকে ছেলেমানুষি মনে করে, যারা তাদের সন্তানদের সাথে নিয়ে অসামাজিক নাটক, সিনেমা দেখে, তারা? আমি চিন্তা করি শুধু তোমাদের, তোমরা কি ভাববে?তোমাদের অনুমতি ছাড়া আমি কোন কিছুই করবো না।
তারপর তার মা কিছু না বলেই অন্য ঘরে চলে যায়। সেও পরদিন তার হলে ফিরে যায়। ভেবে ছিল প্রেম তো বিয়ের আগে সম্ভব না, তাই আগের প্রেমটাই যদি বিয়ের পর করা যেত, কতই না ভালো হতো। কিন্তু এটা হওয়া যতটা কঠিন তার চেয়ে আটলান্টিক পাড়ি দেয়া সহজ হবে হয়ত। পানির ট্যাংক ভর্তি আফসোস থেকে প্রতিদিন এক গ্লাস করে আফসোস নিত আর দিন পার করতে শুরু করলো। এভাবে প্রায় এক মাস পর সব আফসোস ফুরিয়ে গেল। হয়ত স্রষ্টা তার জন্য অনেক বেশী কিছুই রেখে দিয়েছে। হঠাৎ বাসায় থেকে ফোন আসলো যে, এই সপ্তাহেই বাসায় যেতে হবে। যেতে চাচ্ছে না তার মন, তবুও যেতে হবে। কারণ আদেশ করেছে তার মা, যার মাধ্যমে দুনিয়ার মুখ দেখা। বাধ্য ছেলের ন্যায় চলল বাড়ির পথে আর ভাবতে লাগলো বাবা মার সাথে কিভাবে কথা বলবে। গতবার যে ঘটনা ঘটিয়েছে তাতে তো মনে হয় ভাল কিছুর আশা করা যায়। বাড়িতে যেয়ে দেখে সেই অবস্থা মেহমান দিয়ে পরিপূর্ণ। খোঁজ করে জানতে পারলো বাসায় দাওয়াত দেওয়া হয়েছে সবার। কিন্তু উপলক্ষ কি বোঝা গেল না। বাঙালীরা আবার উপলক্ষ ছাড়া কিছুই করে না। যাই হোক পরদিন ফযর পর মসজিদ থেকে আসতেই শুনলো তারা নাকি কোথায় দাওয়াত খেতে যাবে। যোহর পর মসজিদ থেকে বাসায় আসতেই তার ছোট খালা একখানা সুন্দর পাঞ্জাবী হাতে ধরে দিয়ে বলল প্রস্তুত হয়ে নে। ভাবখানা এমন যে তাকে কুরবানির পশুর মতো জবাই দিবে একটু পর। যাই হোক পাঞ্জাবী পরে বের হতেই দেখে বাসার সামনে ইয়া লম্বা ছোট একটা কার গাড়ি অপেক্ষা করছে। সে ভাবলো আর কি কি যে সামনে আসবে তা তো উপরওয়ালাই ভাল জানে। ওয়ে তেরি, গাড়িতে বসার পর সবাই দেখি তার দিকে তাকায় আর মুচকি হাসে। সে ভাবলো তাকে কি জোকারের মতো লাগছে নাকি পাগলা গারদে পাঠানোর জন্য নির্বাচন করা হয়েছে? সে তো পুরাই মাননীয় স্পিকার হয়ে গেল। এবার তাদের গন্তব্য স্থলে পৌঁছাল। জায়গাটা পরিচিত মনে হচ্ছে তার। ছোট থাকতে এসেছিল, দূর সম্পর্কের আত্মীয়ের বাসা। সবাই দেখি তাকে দেখার জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়ছে। সে অনুমান করলো যে নিশ্চয়ই বড় কিছু হতে চলেছে। বাড়ির ভিতরে ঢোকার পর তার আর বুঝতে বাকি রইলো না যে, কারও বিয়ে হতে চলছে। কাজী তার বিশাল হাজিরা খাতা নিয়ে অপেক্ষা করছে। সে ভাবলো কার বিয়ে হতে পারে। কোন মেয়ের? আরে ধুর মেয়ে বিয়ে করতে কি ছেলের বাসায় যায়? তার সাথে ছেলে বলতে কেউ নেই সব তো বুড়া, যেমন- তার বাবা, ফুফা,চাচা,দাদা। তাদের তো আর সম্ভব না। কারণ আমার পরিবারের সব মহিলারা "লেডি হিটলােরর" মতো, বিয়ে করলে খুন নিশ্চিত। বাকি থাকলো সে নিজে। প্রশ্নের উত্তর পেল যখন কাজী বর হিসেবে তার নাম জানতে চাইলো। সে ভাবলো তাহলে তাকেই কুরবানির পশু বানানো হয়েছে? এই পশু হওয়ার অপেক্ষায় সে কতদিন বসে ছিল। আহা! আজই সেই মহেন্দ্রক্ষণ। সে খুশিতে লাফ দিতে চাইলো বুর্জ খলিফা বিল্ডিং এর উপর থেকে কিন্তু এটা করলে বিয়ে কয়েক দিন পিছিয়ে যাবে ভেবে চুপ থাকলো। এরপর নাম লেখা শেষে বিয়ের জন্য কবুল বলার জন্য তাকে বলতেই সে উত্তেজিত হয়ে একবারেই তিন কবুল একসাথে বলে ফেলল। আর সবাই হাসতে হাসতে শেষ। সে তো লজ্জাই লাল, সবুজ, বেগুনি রঙ ধারণ করলো। যাই হোক বিয়ে শেষে খাওয়া দাওয়া হলো। এরপর তার বউকে এনে তার পাশে বসানো হলো। আর তখনই সবাই কবুল,কবুল, কবুল বলে হাসি শুরু করলো। সে তো লজ্জায় এবার সাদা রঙ হয়ে গেল। কালো রঙ ধারণ করলো তখন,যখন আড় চোখে দেখলো তার বউও হাসতেছে। আর কোথায় যায় এখন নিজেকে সে নিউক্লিয়ার বোমা মারতে চাইলো। সে রাগ হলো এতো উত্তেজিত হওয়া তার ঠিক হয় নি। তার বউকে ঠিক মতো দেখতেও পেল না। তার বাবা বলে উঠলো তার শ্বশুরকে যে, বিয়াই সাহেব থাকেন আপনার মেয়েকে বাসায় নিয়ে যাওয়ার অপেক্ষায় থাকলাম। সে বুঝলো যে তার শর্ত অনুযায়ী চাকরী পেলে বউকে আনা হবে। এরপর তারা বাসায় চলে আসলো, আর পুরো রাস্তা তাকে কবুল শুনতে হলো। বাসায় এসে ভাবলো ধুর এটা কোন বিয়ে হলো তার বউকেই সে দেখলো না। আর মেজাজ খারাপ হলো যখন মনে পড়লো বউয়ের ফোন নম্বরটা পর্যন্ত নেওয়া হয়নি। তখন রাগে নিজেকে কষে একটা চড় মারলো, আর বালিশে মাথা গুজে দিয়ে কবুল বলতে লাগলো।
পরদিন ফযর নামায শেষে দোআ করলো যে, হে মহান প্রতিপালক মনের ইচ্ছা পূরণ করে দিছো তো দিছো, পুরা দেও নি কেন? বাড়ি এসে চুপচাপ মনমরা হয়ে বসে আছে। এই সময় তার বড় বোনের ঘরে প্রবেশ। ঢুকেই জানতে চাইলো কেমন আছে কবুল সাহেব। মেজাজ তার আবার একবার খারাপ হয়ে গেল। বোন বলল যে মন খারাপ করিস না, তোর জন্য এমন এক জিনিস আছে যা তোর মন এক মুহূর্তেই খুশিতে লাফ দিয়ে উঠবে। ভাইয়ের ফোনটা নিয়ে কিছু একটা লিখে দিয়ে বলল যে, এই নে তোর মনের মানুষের ফোন নম্বর। সে তো দেখেই খুশিতে আটখানা। কি বলে যে বোনকে ধন্যবাদ দিবে তার ভাষা হারিয়ে ফেলেছে। বোন আরও বলল যে, মেয়েটি আগে থেকেই ঠিক করেছিল কোন দাঁড়ি ওয়ালাকেই বিয়ে করবে। তাই তার প্রস্তাব আসতেই আর দ্বিতীয় বার ভাবে নি। ছেলেটি সাথে সাথে সিজদাহে পরে গিয়ে তার রবের শুকরিয়া আদায় করলো। এখন ফোন নম্বর তো পাইছে কিন্তু ফোন দিয়ে কি বলবে তা আর ভেবে পাচ্ছে না। ফোন হাতে নিয়ে call দিতে গেলেই হাত কাঁপাকাপি শুরু হয়ে যায়। এভাবে রাত এসে গেল। এবার অনেক সাহস সঞ্চয় করে ফোন দিল।এইদিকে বুকের ভিতর হৃদপিণ্ড ১০০/২০০ বেগে লাফানো শুরু করলো। এই গেল, গেল অবস্থা। অবশেষে ফোন ধরে ওপাশ থেকে মিষ্টি কণ্ঠে ভেসে আসলো,
স্ত্রী: আসসালামু আলাইকুম।
স্বামী: ওয়ালাইকুম সালাম ওয়া রহমাতুল্লাহ। আমি সালাউদ্দিন বলছি।
স্ত্রী: আমি জানি। আমার ফোনে আপনার নম্বর আগে থেকেই ছিল।
স্বামী: কিভাবে? আমি তো আজ প্রথম ফোন দিলাম।
স্ত্রী :কাল আপু নম্বর দিয়ে গিয়েছে। আর বলেও দিছে আপনার পক্ষে নম্বর নেওয়া সম্ভব না। কারণ আপনি নাকি ভীতুর ডিম। আপনি কেমন আছেন?
স্বামী: (মনে মনে"প্রথম দিনেই বোল্ড করলো?") আলহামদুলিল্লাহ্, ভাল। আপনি? (ভাব নিয়ে)
স্ত্রী: আলহামদুলিল্লাহ্, স্রষ্টা তো ভালোই রাখছে কিন্তু আপনি না।
স্বামী: কেন? কেন?? কি গোস্তাখি হয়েছে? (উত্তেজিত কণ্ঠ)
স্ত্রী: এই যে সকাল থেকে আপনার ফোনের অপেক্ষায় থেকে এতক্ষনে আপনার সময় হলো।
স্বামী: (আরও একবার বোল্ড হয়ে) আমি খুবই দুঃখিত। আসলে ফোন দেওয়ার সাহসই পাচ্ছিলাম না।
স্ত্রী: আপু ঠিকই বলেছিল যে আপনি ভীতুর ডিম। ডিমটিও মুরগির না উটপাখির।
স্বামী: তো এই উটপাখির ডিমকে ক্ষমা করা যায় না?(করুন সুরে)
স্ত্রী: এক শর্তে।
স্বামী: কি শর্ত? সব পূরণ হবে ইনশাল্লাহ।
স্ত্রী: দিনে পাঁচ বার ফোন দিতে হবে।
স্বামী: শুধু পাঁচ!!পাঁচ হাজার বার বললেও রাজী ছিলাম।
স্ত্রী: হা হা। এখন রাখি পরে কথা হবে। আসসালামু আলাইকুম।
স্বামী: ওয়ালাইকুম সালাম।
ফোন রেখে কেমন এক শান্তি লাগছে তার।এই রকম অনুভূতির জন্যই তো তার এতদিনের অপেক্ষা ছিল। পুরুষ বাইরে যতই শক্তিশালী, সাহসী হোক, সে চায় কেউ এভাবে তার খেয়াল রাখবে, তার কথার উপর কেউ মান অভিমান করবে, কেউ তার উপর অধিকার খাটাবে। কথা বলার পর তো দেখার ইচ্ছা হাজার গুণ বেড়ে গেল তার, কিন্তু উপায়?
নাহ! এভাবে আর বসে থাকা যায় না।যে কোন মূল্যেই হোক দেখা তো করতেই হবে। তাই বোনের সরণাপন্ন হলো। বোনকে ছয়-নয় বুঝিয়ে রাজী করালো। ঠিক হলো বোন মেয়েকে বের করবে আর খালার বাসায় দেখা করবে। খালাকে বুঝিয়ে আগেই প্রস্তুত হয়ে সে অপেক্ষা করছে। ধুর সময় কেন কাটে না, পরীক্ষার হলে তো উসাইন বোল্টের গতিতে যায়, আর আজ এক মিনিট এক ঘন্টার মতো লাগছে তার। অবশেষে দুই বোরকাওয়ালি আসলো। চোখ দেখে একজনকে চেনা গেল, সে তার বোন আর একজন কে? নিশ্চয়ই তার বুকের বাম পাশের কিছু অংশই হবে। ছেলের কাছে আসতেই মেয়ে আবেগপূর্ণ কণ্ঠে সালাম জানালো। এরপর খালার সাথে কথা বলে দু'জনকে একই ঘরে পাঠানো হলো। সামনাসামনি দু'জন বসে আছে। কারো মুখে কোন কথা নেই। এই দিকে ছেলে ঘেমে অস্থির, কি দিয়ে শুরু করবে তার কুলকিনারা পাচ্ছে না। তারপর
স্বামী : আপনার আসতে সমস্যা হয় নি তো?
স্ত্রী: না। আপনার?
স্বামী: না।
আবার কিছুক্ষণ নিরবতা। মেয়ে তখনো নিকাব খুলে নি। দু'জনের চোখ অবনত। ছেলে চিন্তা করতেছে নিকাব কিভাবে খুলানো যায়?ছেলে পকেট থেকে চকলেট বের করে,
স্বামী: আপনার নাকি চকলেট পছন্দ? এই নিন।
স্ত্রী: জাযাকাল্লাহ (ধন্যবাদ)
স্বামী: খেয়ে দেখেন অনেক ভাল।
স্ত্রী: পরে খাবো।
স্বামী: তাহলে অন্য কিছু খাবেন? পানি খাবেন? তৃষ্ণা পেয়েছে মনে হয়।
স্ত্রী: নাহ, ঠিক আছে।
স্বামী: ওহ। আচ্ছা। (হতাশ হয়ে)
ছেলে ভাবছে বুদ্ধিটা তো কাজে দিলো না। আবার নিরবতা। এইবার নিরবতা ভেঙে মেয়ে বলল,
স্ত্রী: আপনে আসলেই উটপাখির ডিম পরিমান ভীতু, বললেই হয় আমাকে দেখতে চাচ্ছেন।
স্বামী: না মানে, ইয়ে।
এরপর মেয়ে নিকাব খুললো। ছেলে দেখা মাত্র মূর্তিমান হয়ে গেছে। ২-৩ মিনিট পর,
স্ত্রী: আমি কি চলে যাবো?
স্বামী: আলহামদুলিল্লাহ। মাশাল্লাহ। আমার একসাথে তিনবার কবুল বলা স্বার্থক। স্রষ্টা আসলেই আসলেই অনেক সুন্দর করে বানিয়েছে।
স্ত্রী: (লজ্জা পেয়ে) আজ আমি উঠি। আর হ্যাঁ, চকলেট আমি মোটেও পছন্দ করি না, তবে আপনার দেওয়া চকলেট বাদে।
স্বামী: ওহ। আপনার জন্য হাদিয়া( gift) আছে। এই নিন। আমার মা এই বোরকা দুটো দিয়েছে।
স্ত্রী: জাযাকাল্লাহ খায়ের। আমি জানি এটা আপনিই এনেছেন। আর এইটা আপনার পছন্দের হালুয়া। আমার মা পাঠিয়েছে।
স্বামী: হালুয়া!! জাযাকাল্লাহ। হালুয়া ছাড়া তো আমার চলেই না।
স্ত্রী: শুধু শুধু মিথ্যা বলেন কেন? হালুয়া তো আপনি খান না।
স্বামী: মিথ্যা তো তুমি বলেছ। হালুয়া টা তুমিই বানিয়েছ। আর এটাও জানি হালুয়া তুমি অনেক ভাল বানতে পারো। আজ থেকে তোমার হাতের হালুয়াই আমার পছন্দনীয় খবার হবে।
অতপর দুজন চলে গেল তাদের বাসায়।
ছেলের তো রাতের ঘুম উধাও। বারবার শুধু সেই চেহারাটাই ভেসে আাসছে। কিভাবে একজনের সাথে আর একজনের চিন্তা ধারাগুলো এত মিল হতে পারে, তা হয়ত এক উপরওয়ালা ছাড়া কেউ জানে না।পরদিন বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে গেল ছেলে। যেয়ে ক্লাসে তো আর মন বসে না। বারবার দেখতে ইচ্ছা করছে। তবে কি সে প্রেমে পরে গেল? বন্ধুদের থেকে শুনলো প্রেমে পরলে কি হয়। হ্যাঁ, সব লক্ষণগুলোই তো মিলে গেল। কিন্তু কিভাবে বলবে? এরমধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় আন্দোলনের কারণে অনির্দিষ্ট কালের জন্য বন্ধ ঘোষনা হলো।
পরদিন সে ঝড়ের বেগে বাসায় চলে গেল। কিন্তু দেখা করবে কিভাবে ৩ দিন আগেই তো খালার বাসায় দেখা করেছিল। প্রতিদিন গেলে তো সমস্যা হবে, তাই বিকল্প কিছু ভাবা দরকার। সে ভেবে দেখলো মেয়ের কলেজে যেয়ে তো দেখা করা যায়। যেই ভাবা সেই কাজ, ফোন দিয়ে শুনলো সে কলেজেই আছে। কিন্তু মেয়েকে জানালো না। বাসা থেকে বের হলো গুরুত্বপূ্র্ণ কাজ আছে বলে। এটাই স্বাভাবিক যে, একজন প্রেমিকের তার প্রমিকার সাথে দেখা করার চেয়ে গুরুত্বপূূর্ণ কাজ আর কি হতে পারে। ছেলে দাঁড়িয়ে আছে একপাশে, অপরপাশে মহিলা কলেজের প্রবেশদ্বার। তার খুব লজ্জা লাগছে যে, তার পাশে অনেক ছেলেই অপেক্ষা করছে তার মধ্যে সে আবার দাঁড়িওয়ালা হুজুর। ব্যাপারটা কেমন যেন লাগছে। পরক্ষণে তার মনে হলো সে তো তার বিবাহিত বউকেই দেখতে আসছে, বৈধ সম্পর্ক তাই সে মনে মনে খুশিই হলো। তার মনে পরে গেল কলেজে থাকতে তার বন্ধুরা তাদের প্রেমিকার জন্য এভাবেই বিভিন্ন স্কুল, কলেজের সামনে চোখে অদৃশ্য দূরবীক্ষণ যন্ত্র লাগিয়ে অপেক্ষা করতো।এই অনুভূতিটা বেশ ভালোই উপভোগ করছে সে। সময় তো অনেক হয়ে গেল, এখনও ছুটি হয় না? আজকে কি একবারে পিএইচডি করাবে নাকি। আবার ছুটির সময়টাও শুনা হয় নি। শুনবেই বা কেমন করে, যদি জানতে চায় কেন, উত্তর তো তার কাছে ছিল না। এই যে বের হচ্ছে এক এক করে। পাশের ছেলে গুলো কি খুশি হইছে রে। একজন আরেজনকে বলছে, মামা দেখ ঐ যে তোর টা।কিন্তু তার প্রিয় মানুষটা কোথায়? এতগুলো মানুষের মধ্যে খুঁজে পাওয়া তো মুশকিল। সে তো বোরকা পর, কিন্তু বোরকা তো অনেকেই পড়েছে। সে অবশ্য আরেকটা বুদ্ধি আগেই করে রেখেছে, যে বোরকা দুটি হাদিয়া(gift) হিসেবে দিয়ে ছিল সে তাতে আলাদা সোনালী রঙের সীমানা দিতে বলেছিল যাতে করে ভীড়ের ভিতর তার মানুষটাকে অনায়াসেই চিন্তে পারে। এখন ভয় এটা যে, যদি না পরে আসে? আসবে অবশ্যই সে ঐটা পরেই আসবে বলে, তার মনকে শান্তনা দিচ্ছে। ঐ যে দেখা গেছে, হ্যাঁ ঐ বোরকাটা। ছেলেটির দিকে একবার তাকালো কিন্তু বুঝতে পারে নি মনে হয়। একি ওখানেই তার বান্ধবিকে রিক্সা নিয়ে চলে গেল। এইটা কোন কাজ। এতক্ষণ অপেক্ষা করে ফলাফল শূন্য। তবে এইটা ভাল যে দেখতে তো পারেছে, বুঝতে তো পারেছে সে ভাল আছে। এখন তো তার গুরু দ্বায়িত্ব হয়ে যায় যে তার মানুষটা যেন ঠিকভাবে বাসায় পৌঁছাতে পারে। তাই সে রিক্সার পিছনে পিছনে আর একটা রিক্সা নিয়ে গেল। তার বাসায় ঢুকতে দেখে সেও বাসায় ফিরলো। এরপর ২য় দিন গেল, একই অবস্থা আজও শুধু দেখেই গেল। এভাবে কত দিন?? এরপর দিন সে কিছু একটা করেই ফেলবে। কিন্তু পরদিন তার যাইতে দেরি হয়ে যায়। যেয়ে দেখে কলেজ ছুটি হয়ে গেছে।
রাস্তার ওপাশে দাঁড়িয়ে থেকে ভাবছে গেটের দিকে আর কতই তাকিয়ে থাকি তার তাকিয়ে থাকাতে কি আর চলে যাওয়া মানুষ ফিরে আসে? হঠাৎ রিক্সার পাশে থেকে মেয়ে কণ্ঠে কেউ একজন বলে উঠলো একটু চাপুন বসতে হবে। সে মনে করলো কারর এতো সাহস যে তার অনুমতি না নিয়ে রিক্সায় উঠতে চায়? তাকিয়ে দেখে সে চমকিয়ে উঠলো, আরে এ তো আর কেউ না তারই মনের মানুষ।
স্ত্রী: এতক্ষণ কেউ দেরি করে? বান্ধবিকে বিদায় দিয়ে একলা মেয়ে মানুষ দাঁড়িয়ে ছিলাম কত ভয়ে, আপনার কি সেই খেয়াল আছে?
স্বামী: না মানে। (ভয়ে এখনও কাঁপছে)
স্ত্রী: হয়েছে আর বলতে হবে না। আমি জানতাম আজও আপনি কথা বলার সাহস পাবেন না। তাই নিজেই এসেছিলাম। আর আপনি আজই দেরি করলেন?
স্বামী: আসলে রাতে ঘুম কম হয়েছে তো তাই ফযর পড়ে ঘুমিয়েছিলাম আর উঠতে দেরি হয়ে গেল।
স্ত্রী: কেন কম ঘুমিয়েছেন?
স্বামী: থাক ওসব। পরে বলবো। তা আপনি জানতেন আমি আসি এখানে?
স্ত্রী: বাহ! জানবো না কেন? মহিলা কলেজের সামনে একজন হুজুর দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে, এটা কি কোন নজর এড়ানো ব্যাপার? প্রথম দিন আপনাকে দেখার পরই আপুকে ফোন দিয়ে নিশ্চিত হয়েছি। ২য় দিনে ভাবেছিলাম আপনি ঐপাশে আসবেন, কিন্তু আপনি উটপাখির ডিম পরিমান ভীতু এটা আবারও প্রমাণ করলেন। আজ আর এভাবে আপনাকে দাঁড় করিয়ে রাখা ভাল হবে না ভেবে এখানে এসেছিলাম।
স্বামী: কি করবো বলেন, অনুমতি তো দেয় নি কেউ।
স্ত্রী: সব অনুমতি কি দিতে হয়? কিছুটা বুঝে নিতে হয়।
স্বামী: আমি আসলে এ লাইনে কাঁচা তো, তাই।
স্ত্রী: কিছু জিনিস অবশ্য কাঁচাও ভাল(মুচকি হেঁসে)।
স্বামী: হতে পারে।
স্ত্রী: আর শুনুন, কাল থেকে আর কলেজের সামনে।আসবেন না।
স্বামী: ঠিক আছে(হতাশ হয়ে)
স্ত্রী: কারণ জানতে চাইবেন না?
স্বামী: আপনার হয়তো খারাপ লাগে?
স্ত্রী: হলো না। আমি চাই না আপনি অন্য কারো দিকে তাকিয়ে থাকুন।
স্বামী: আমি কেন অন্যকে দেখবো? আমার দেখার তো একজন আছে।
স্ত্রী: আপনাকে আমাকে খুঁজতে গিয়ে ভুলবশত অন্যের দিকে তাকাতে হয়। এই ভুলটাও আমি হতে দিবো না।
স্বামী: তাহলে দেখার ব্যবস্থা একটা করে দাও।
স্ত্রী: কলেজ থেকে বাসায় যাওয়া পথে আমার এক বান্ধবির বাসা পরে। আমি বাসায় বলবো যে আমি বান্ধবির বাসায় যাবো। আমি যাবো ঠিকই কিন্তু ঢুকবো না।
স্বামী: ঠিক আছে আমি বুঝে গেছি। এই তো আপনার বাসা এসে গেছে।
স্ত্রী: আমার বাসা আর আপনার কিছু না? (অভিমান করে)
স্বামী: ওহ, আমার শ্বশুরালয়। বললামই তো আমি এই লাইনে কাঁচা।
স্ত্রী: আসেন বাসায়।
স্বামী: না এভাবে না। একটা ব্যাপার আছে না? কি মনে করবে আমার শ্বশুর মশাই।
স্ত্রী: ঠিক আছে। আমি আসি। আসসালামুআলাইকুম।
স্বামী: ওয়ালাইকুম সালাম ওয়া রহমাতুল্লাহ।
এরপর ছেলেটা তার বাসায় চলে গেল পরদিন আসার জন্য।
পরদিন ছেলেটা দাঁড়িয়ে আছে সেই জায়গাতে তারই প্রিয়জনের অপেক্ষায়। আজ সে বেশি উত্তেজিত কারণ তাদের আজ প্রথম ঘোরাঘুরি ( Dating)। অতপর তার মনের মানুষের আগমন। ছেলেটি মেয়েটার দিকে একটা বই এগিয়ে দিল যা সুন্দর গোলাপি কাগজ দিয়ে মুড়ানো।মেয়েটি খুলে দেখলো মাওলানা হেমায়েত উদ্দিনের লেখা"আহকামুন নিসা" বই। এই রকম বই সে খুঁজছিল কিছুদিন হলো। মেয়েটিও ব্যাগ থেকে একটা ছোট প্যাকেট বের করে দিল। ছেলেটি খুলে দেখলো গাঢ় সবুজ রঙের একটা তুর্কি টুপি। সে সাথে সাথে মাথার টুপিটা খুলে পকেটে রেখে ঐ টুপিটা পড়ে নিল। দুজনে একসাথে বলে উঠলো "জাযাকাল্লাহ খায়ের"(ধন্যবাদ)। এরপর একটা রিক্সা নিয়ে দুজনে শহরের রাস্তাগুলোর দৈর্ঘ্য মাপা শুরু করলো মনের ফিতা দিয়ে। তারা জানে এই ফিতা কখনো শেষ হবার নয়। সূর্য মাথার ঠিক উপর থেকে কিছুটা হেলে পড়ছে, মানে যোহরের সময় হয়ে গেছে। শহরের যে মসজিদে মহিলাদের নামায পড়ার জায়গা আছে সেখানে রিক্সা থামলো। তাদের কাছে সময়টা দ্রুতগতিতে পার হচ্ছে। নামায আদায় করারর পর,
স্বামী: চলেন কোথাও বসা যাক। দুপুর হয়ে গেছে খেয়ে নেওয়া হোক।
স্ত্রী: কিন্তু ওখানে সবার সামনে যে আমাকে নিকাব খুলতে হবে।
স্বামী: দেখেন এইটা নিয়ে আপনাকে ভাবতে হবে না। আপনার পর্দা লঙ্ঘন হোক এটা আমি বেঁচে থাকতে মেনে নিবো না। এই চেহারা অনেক দাম।দেখার অধিকার শুধু আমার।
ছেলেটি মেয়ের চোখে তাকিয়ে দেখছে তার চোখে তৃপ্তির প্রতিচ্ছবি। এরপর দুজনে একটা রেস্তোরাঁয় প্রবেশ করে সবচেয়ে কোণার টেবিলে যেয়ে বসলো। মেয়েকে উল্টো দিকে বসালো যাতে করে গেট থেকে কেউ আসলেও না দেখতে পারে।রেস্তোরাঁর পরিচারককে(waiter) ডেকে কিছু খাবার নিয়ে আসালো আর বলল যে তাকে না ডাকা পর্যন্ত যেন এদিকে না আসে। মেয়েটি খেয়ে চলছে আর ছেলে তা দেখে চলছে।
স্ত্রী: আপনি খাবেন না?
স্বামী: এই একটা সময়ই তোমাকে একটু দেখার সুযোগ পেয়েছি। এখন খাওয়ার চেয়ে আমার কাছে তোমাকে দেখা সবচেয়ে জরুরী কাজ। খাবার তো পেট ভরাবে কিন্তু তোমায় দেখলে যে আমার মনটা ভরবে।
স্ত্রী : আমি এখানেই আছি আপনি খেয়ে নিন।(লজ্জায় মাথা নিচু করে)
এরপর ছেলেটি খাওয়া শুরু করলো।কিছুক্ষণ পর দেখে এবার মেয়েটি খাওয়া বন্ধ করে তাকিয়ে আছে। ছেলেটি বুঝতে পেরে বলল,
স্বামী: কি দেখ? খাবার ঠান্ডা হয়ে যাবে।
স্ত্রী: জানেন আমার আব্বার পরে এই প্রথম কাউকে খাওয়া দেখতেছি।আমার মানে মেয়েদের এটা অনেক ভাল লাগে যে তাদের স্বামী খাবে আর তারা চেয়ে দেখবে।
স্বামী: আমার একটা ইচ্ছা আছে যে, আপনি বাসায় আসলে দুজনে একই প্লেটে খাবো। তাবলীগে অনেক খেয়েছি, কিন্তু নিজের পরিবারের সাথে ইচ্ছাটা পূরণ হয়ে ওঠেনি কখনো।
স্ত্রী: আমি রাজী(খুব খুশি হয়ে)।এই সুন্নতটা আমারও পালন করার অনেক দিনের ইচ্ছা।
তাদের খাওয়া শেষ হওয়ার পর তারা রেস্তোরাঁ থেকে বের হয়ে পাশের পার্কে হাঁটতে যায়। তপ্ত দুপুরে সবাই যখন ক্লান্ত, তখন তারা কথা বলার এত শক্তি কোথায় থেকে পাচ্ছে তা তো উপরওয়ালাই জানে। ছেলে ভাবছে ভালবাসা যতক্ষণ মুখ দ্বারা প্রকাশ না হবে ততক্ষণ সে শান্তি পাবে না। এ যেমন গলার কাঁটা না নিচে যাচ্ছে আর না উপরে আসছে মাঝখানে থেকেই ব্যথা দিচ্ছে। আর এ সময়টাও ভাল, সেও তার সামনে আছে, এর চেয়ে ভাল সুযোগ আর কি হতে পারে?
মনের কথা বলবে ভাবতেই ছেলেটি ঘেমে অস্থির। তার ঘামতে থাকা দেখে মেয়েটি বলে,
স্ত্রী: কি ব্যাপার, আপনি ঘামছেন কেন?
স্বামী: ওহ! একটু গরম লাগেছে তো তাই।
স্ত্রী: কোথায়? আমার তো কিছুই মনে হচ্ছে না।
স্বামী: মনে যখন আগুন লাগে তা কি অন্য কেউ দেখে? ( আস্তে বলল)
স্ত্রী: কিছু বললেন?
স্বামী: হ্যাঁ। এই চোখে তাকান। চোখের ভাষা কি বোঝা যায়?
স্ত্রী: সব ভাষা চোখে থাকতে নেই।
স্বামী: তাহলে শুনুন আমি আর পারছি না। এই আপনা আপনি ডাক আর ভাল লাগছে না।(দীর্ঘ শ্বাস নিয়ে) কবে তুমিতে আসবো এ চিন্তায় সবসময় মাথা ভার হয়ে থাকে। তোমাকে দেখার পর থেকে তোমাকে আবার দেখার চিন্তাতে অস্থির থাকি। তোমার একটু আওয়াজ শোনার জন্য কান সব সময় সচেতন থাকে। কোন দিন কাউকে প্রেমের প্রস্তাব দেই নি, শুধু তোমাকেই দিবো বলে।বিয়ের আগে প্রেম করার দূর্ভাগ্য হয় নি বলে বিয়ের পর প্রেম করার সৌভাগ্য চেয়েছিলাম। আমার মনে হয় তোমাকেই আমি সব সময় চেয়েছিলাম বলে এতদিনের এ প্রতিক্ষা। শুধু এ জীবনেই না, জান্নাতে তোমার সাথে থাকতে চাই। তুমি কি রাজী আছো?
স্ত্রী:(নি:শব্দে কেঁদে চলছে)
স্বামী: কাঁদো কেন? আমার কি কোথাও ভুল হয়েছে?
স্ত্রী: তুমি আসলেই কাঁচা। আর এতদিনেও আমাকে বুঝতে পারো নি?
স্বামী: আমি এ লাইনে কম বুঝি।
স্ত্রী: এই রকম কাঁচা লোককেই আমি স্রষ্টার কাছে সব সময় চেয়েছিলাম। জানো তোমার এই অপেক্ষা করা, ভীতু ভীতু ভাব আমি খুব উপভোগ করি। তোমার বার বার আসা, তোমার চলে যাওয়ার পর আমাকে সব সময় শান্তি দেয়। আমিও চেয়েছিলাম সমাজের তথাকথিত প্রেম না করে বিয়ের পর প্রেম করবো নিজের মতো করে। আমি রাজী তোমার সাথে জান্নাতে যেতে।
স্বামী:(হাঁটু গেড়ে বসে) ও আমার বোরকাওয়ালি আমি তোমাকে ভালবাসি।
স্ত্রী: ও আমার দাঁড়িওয়ালা আমিও তোমাকে ভালবাসি।
স্বামী: তোমার একটু হাত ধরি? কারও হাত ধরিনি আগে।
স্ত্রী : আমি কি ধরেছি আগে। হাত তো তোমারই জন্য এতদিন হেফাজত করেছি।
এরপর দুজন দুজনার হাত ধরে বাকি সময়টা পার করে দেয়। সেদিনের মতো তারা চলে, তবে এ চলে যাওয়া ফিরে আসার জন্য। তারা প্রায়ই দেখা করতে থাকে আর রাতে তাদের কথার ফুল ফুটতে থাকে। তারা ইবাদতে একে অপরের সাথে প্রতিযোগিতা করতে থাকে। যেমন-তাহাজ্জুদ নাময কে বেশি পড়তে পারে, কুরআান তেলাওয়াত কে বেশি করতে পারে ইত্যাদি।
একদিন মেয়ের বাসায়,
বাবা: মা, এদিকে শুনে যা
মেয়ে: জী, বাবা
বাবা: তোর আজ থেকে একা বাইরে যাওয়া বন্ধ।
মেয়ে: কেন বাবা, কি হয়েছে?(উদ্বিগ্ন হয়ে)
বাবা: এত কষ্ট করার কি দরকার, জামাইকে বলিস তোকে বাসায় থেকে নিয়ে যেতে(হেঁসে বলে)। তোরা কি ভেবেছিস আমি জানি না? বাবা হলে সব জানতে হয়।
মেয়ে লজ্জা পেয়ে ঘরে দ্রুত চলে যায়।
পরদিন ছেলের বাসায়,
মা: সালাউদ্দিন।
ছেলে: জী, মা।
মা: তুই বৌমাকে নিয়ে ঘুরতে টুরতে নিয়ে যাস তো নাকি? তোর বয়সের ছেলে মেয়ে প্রেমের নামে কত কি করে বেড়াচ্ছে। একটু আধটু নিয়ে যাবি মেয়েটাকে।
ছেলে: ঠিক আছে চেষ্টা করবো।(খুব খুশি হয়ে)
ঐ দিন রাতে,
স্বামী:আসসলামু আলাইকুম, বোরকাওয়ালি আছে?
স্ত্রী: ওয়ালাইকুম সালাম ওয়া রহমাতুল্লাহ। জী দাঁড়িওয়ালা, আছে।
স্বামী: আজ মা তো তোমাকে নিয়ে ঘুরতে বলল।
স্ত্রী: আর বাবা তোমাকে এখন থেকে বাসায় এসে আমাকে নিয়ে যেতে বলেছে।
স্বামী: কেন ,কি বুঝতে পারছে নাকি?
স্ত্রী: হ্যাঁ, কেন ভয় পাও?
স্বামী: না, ভয়ে ডরে না বীর। হিন্দিতে একটা কথা আছে, "যাব পেয়ার কিয়া তো ডার না ক্যায়া"
স্ত্রী: কালকের অপেক্ষায় থাকলাম। আসসালামু আলাইকুম।
স্বামী: ওয়ালাইকুম সালাম ওয়া রহমাতুল্লাহ।
পরদিন ছেলে তার শ্বশুর বাড়ি যেয়ে সবার সাথে কুশলাদিন বিনিময় করে। তার শ্বাশুরি তার মেয়ের ঘরের দিকে দেখিয়ে যেতে বলে। সে ঘরে ঢোকার পর মেয়েকে দেখে আবার ঘর থেকে বের হয়ে যায়।
স্ত্রী: আরে আরে কোথায় যাও?
স্বামী: আপনি কে? আমি কি ভুল ঘরে ঢুকলাম নাকি?
স্ত্রী: কেন? আমাকে কি চেনা যাচ্ছে না?
স্বামী: সত্যি আমি মুগ্ধ। আমার বিবি এত সুন্দর!
স্ত্রী: যাও। মিথ্যা বলছো।
স্বামী:সত্যি। তোমার সৌন্দর্য্যের কাছে পূর্ণিমার চাঁদও ম্লান, তোমার পবিত্রতার কাছে শত ফুলের পবিত্রতাও তুচ্ছ।
স্ত্রী: জানো, আগে শুধু নিজের জন্য সাজতাম। আজ প্রথম কারো জন্য সাজলাম।
স্বামী: বাহিরে যাওয়া বাদ।
স্ত্রী: কেন?
স্বামী: বাহিরে গেলে এই সৌন্দর্য কি উপভোগ করা যাবে? চলো তোমাদের ছাদে যাই।
স্ত্রী: যেখানে নিয়ে যাবে সেখানেই রাজী।
অতপর দুজন ছাদে।
স্বামী: আসলেই তোমাকে বিয়ে করার পর থেকে আমার বাকি অর্ধেক দ্বীন পূরণ হয়েছে। তোমার সাথে থাকলে, তোমাকে দেখলে, তোমার সাথে কথা বললে যে শান্তি অনুভব করি তা হয়ত আমাদের সমাজের তথাকথিত প্রেম যেসব যুবক যুবতী করে তারা সে শান্তি পায় না।
স্ত্রী: হারাম(অবৈধ) সম্পর্ক, বস্তু গুলো এমনই। স্রষ্টার লাখো কোটি শুকরিয়া যে তিনি আমাদেরকে এসব থেকে হেফাজত করেছেন।
স্বামী: আলহামদুলিল্লাহ্। এখন পড়াশোনা করেও মজা পাই, কারণ জানি পড়া না শেষ হলে তোমার সাথে কথা বলা যাবে না। আল্লাহ্ হয়তো এভাবেই দুজনকে মিলিয়ে দেয় যারা আল্লাহ্'র জন্য অবৈধ মিলন থেকে বিরত থাকে।
স্ত্রী: আল্লাহ্ আসলেই তাঁর বান্দাকে সাহায্য করেন যারা শুধু তাঁর কাছেই সাহায্য চায়। আলহামদুলিল্লাহ্। অত:পর কিছুদিন ছেলেটি অনার্স শেষ করে আল্লাহ্'র বরকতে ভাল একটা চাকরিও পেয়ে যায় এবং মেয়েটিকে বাকি জীবনের জন্য তার কাছে নিয়ে আসে।

No comments:
Post a Comment