কাছে আসার গল্প-০৪
গ্রীষ্মের সময়, বেলা ১১টা। প্রচন্ড গরম, আকাশ পরিষ্কার। কোথাও কোন মেঘের চিহ্ন নেই। অথচ এ অঞ্চলে ভূপৃষ্ঠের উপর মেঘের মতো কি যেন দেখা যাচ্ছে। কিছুক্ষণ আগে বিকট আকারে শব্দ হলো, তারপরই মেঘমালায় এলাকা ছেয়ে গেছে। এ অঞ্চলটার নাম গাজা। হ্যাঁ, এটা ফিলিস্তিনে। এখানে এগুলো মেঘমালা নয়, কিছুক্ষণ আগে দুইটা যুদ্ধবিমান দুই দু গুণে চারটা বোমা নিক্ষেপ করে গেছে। বিকট শব্দে তিনটা বিল্ডিং ভেঙে পড়েছে। উসমান নামের ২৫ বছর বয়সের যুবক চিৎকার করে ডাকছে। বিল্ডিং এর নিচে চাপা পড়া যতজনকে সম্ভব উদ্ধার করতে হবে। বেশ কিছু যুবক ও মধ্য বয়সী লোক এগিয়ে এসেছে। উদ্ধার কাজ শুরু হয়েছে। উদ্ধারের জন্য আলাদা কোন যন্ত্রপাতি নেই, যে যেভাবে পারছে সাধ্য মতো চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তিন দিক থেকে উদ্ধার চলছে। প্রথমে এক মধ্য বয়সী লোক উদ্ধার হলো, শরীর তার সিমেন্ট, বালু দিয়ে সাদা হয়ে আছে। উসমান কাজ করছে উত্তর-পূর্ব কোণে। ওখানে ছাদের ভাঙা অংশের একটু ফাঁক দিয়ে দুই জনকে দেখা যাচ্ছে। একজন সাহায্য চাচ্ছে, আরেক জন সম্ভবত মৃত। অনেক চেষ্টা চালানো হচ্ছে কিন্তু এই অংশটা একটুও নাড়াতে পারলো না। উপায় খুঁজে পাচ্ছে না কেউ।হঠাৎ উসমানের বন্ধু হাশিম কোথা থেকে বড় হাতুড়ি নিয়ে আসলো। উসমান হাতুড়ি নিজে নিয়ে একটু পাশে ভাঙা শুরু করলো। চারটা বাড়ি দিতেই নিচে থেকে একজন চিৎকার করে উঠলো। এক মহিলা বলছে তার বাচ্চার গায়ে এসে পড়ছে ছাদটা। জিজ্ঞেস করা হলো, বাচ্চাটা বেঁচে আছে কিনা? জবাবে মহিলা না বলল। তারপরও সে তার বাচ্চার গায়ে আচড় লাগতে দিবে না। কথা শুনে সবাই বাকরুদ্ধ হয়ে গেল। এমন ভালবাসা মায়ের পক্ষেই সম্ভব। সবার চোখে অশ্রু কেউ আর সাহস পাচ্ছে না। কিন্তু উপায় নেই মহিলাকে ও বাঁচাতে হবে আরও যারা আটকা পড়েছে তাদেরও। অবশেষে উসমান আবার হাতুড়ি চালানো শুরু করলো, আর ঐ পাশ থেকে মহিলার আর্তনাদ। মহিলা বারবার বলছিল, আমাকে এখানেই থাকতে দাও, তারপরও আমার কলিজার টুকরাকে আঘাত করো না। কিছুক্ষণ পরে দু'জনকে উদ্ধার করা হলো। বাচ্চাটাকে যখন বের করে যখন উসমান কোলে নেয় বাচ্চার পুরো শরীর সাদা কিন্তু মাঝখানে থেতলানো। বাচ্চার মা বের হওয়া মাত্র বাচ্চাকে কোলে নিয়ে চিৎকার শুরু করে দিলো। সেই এক ভয়ানক গগনবিদারী চিৎকার। যার শব্দ আশেপাশের পরিবেশকেও অশ্রু ঝরাতে বাধ্য করছে। উসমানের চোখে পানি, এরকম দৃশ্য সে আগে দেখে নি।
উসমান, সে অন্য জর্ডানে দশ বছর ধরে আছে পড়াশুনার জন্য। দেশে মাঝে মাঝে আসতো বাবা-মার সাথে দেখা করতে। কিন্তু এবার এসে সে আর ফিরে যেতে পারলো না।
তারপর
গতমাস থেকে এরকম হামলা শুরু হয়েছে। ঐমাসের শুরুতে ইসরায়লী সৈন্য গাজার কাছাকাছি অঞ্চল দখল করেছে, এখন তাদের মনোযগ গাজার প্রতি। হামলা শুরুর ৩ দিন আগে উসমান বাসায় ছুটিতে। বাবা-মার সাথে দেখা করতে। ছয় মাস পর ছেলেকে পেয়ে তার বাবা-মা অনেক খুশি ছিল। হামলার দিন উসমান বাজারে যায়, রাতে তাদের খাওয়া-দাওয়ার বিশেষ আয়োজন হওয়ার কথা ছিল। উসমান যখন অনেক দেখেশুনে খুশি মনে বাজার করছিল তখন বিকট শব্দে ৩টা যুদ্ধবিমান চোখের পলকে ৪/৫ টা বোমা ফেলে চলে যায়। উসমান তাকিয়ে দেখে তার বাসার ঐ দিক থেকেই ধোয়া উঠতে শুরু করছে। সে সব বাজার ফেলে দৌড় দেয়। যেয়ে দেখে সব শেষ, তার বাড়ির ধ্বংস স্তুপ দেখা যাচ্ছে। সে তার বাবা-মা কে খুজতে লাগলো। অনেক খুড়াখুড়ির পর পাওয়া গেল তার বাবা-মাকে। হাত-পা দেহ থেকে আলাদা হয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল। এদৃশ্য সে সহ্য করতে পারছিল না, বার বার অজ্ঞান হয়ে পরছিল। কিছু সময় পর তাদের শরীরের অংশ গুলো এক সাথে আনলো। কিভাবে সে লাশ ধুবে কিভাবে আর সে গুলো খাটিয়ায় রাখবে। ঝরঝর করে চোখ বেয়ে পানি পরছিল তার। এমুহূর্তে দুনিয়ার সবচেয়ে দুঃখী মানুষ সে। আশেপাশে তাকিয়ে দেখে এদিক সেদিক লাশ ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, কারো হাত নেই তো কারো পা, কেউ লাশ নিয়ে দৌরাচ্ছে তো কেউ আহত হয়ে কাতরাচ্ছে। ভয়ানক হৃদয় বিদারক এক পরিস্থিতি। এরপর সে তার বাবা-মার দাফন-কাফনের ব্যবস্থা করলো। সে আর জর্ডানে ফিরে যাবে না সিদ্ধান্ত নিলো। কার জন্য সে যাবে, তার নিজ পিতা-মাতাই শেষ, তার দেশ আজ কাফেরদের কবলে, সে কিভাবে ফিরে যাবে এসব ছেড়ে। আজ আবার এসব ভাবতে ছিল তখন তার বন্ধু হাশিম তার কাধে হাত দিয়ে তার জন্য আনা খাবার দিলো। হাশিম তার বাবা-মাকে হারিয়েছে সে যখন খুব ছোট। তারা থাকতো জেরুজালেমের কাছে। তারপর ওখান থেকে চলে আসে এখানে। উসমান ও হাশিম এখন একসাথে থাকে।
পরদিন সকাল ১০ টা তারা দূরে এক বাজারে এসেছে। কিছু কাজ করে টাকা আয় করে ফিরে যাবে। ভালোই আয় হয়েছে, এতে কয়েক দিন চলে যাবে। তারা যখন বাসা থেকে কয়েক মাইল দূর তখন ঐএলাকায় আবার ইসরায়েলের যুদ্ধবিমান কয়েকটা বোমা ফেলে মুহূর্তের মধ্যে চলে যায়। তারা বাসায় না গিয়ে বিধ্বস্ত জায়গায় উদ্ধার করতে যায়। উসমান ও হাশিম অনেক চেষ্টা চালিয়ে উদ্ধার করছে লোকদের। একসময় উসমান ধ্বংস স্তুপের ভিতর থেকে অজ্ঞান অবস্থায় এক তরুনীকে উদ্ধার করে। সারাশরীর বালি, সিমেন্ট দিয়ে সাদা হয়ে আছে। মাথায় আর পায়ে আঘাত পেয়েছে, রক্ত ঝরছে সেখান থেকে। তাড়াতাড়ি সে তাকে স্ট্রেচারে করে নিকটস্থ হাসপাতালে নিয়ে গেল। ডাক্তার দেখবে ঠিক এমন সময় মেয়েটির হুশ আসলো এবং সে যখন দেখলো এক পুরুষ ডাক্তার তাকে দেখবে সে চিৎকার করে উঠে বলল যে, তাকে যেন কোন মহিলা ডাক্তারই চিকিৎসা করে। উসমান পাশেই ছিল তখনো, সে খানিকটা অবাক হয়ে গেল যে, এমন সময় কেউ এমন করে? অনেক বোঝানোর চেষ্টা করলেও মেয়ে যখন মানে না, উসমান তখন সারা হাসপাতাল খুজে এক মহিলা ডাক্তার খুজে নিয়ে আসলো। তখনই মেয়েটি চিকিৎসা করতে দিলো। উসমানের রাগ হলো এ অবস্থাতে। সে আবার উদ্ধার করতে চলে গেল।
তারপর
উসমান বাসায় এসে আজ ঘটে যাওয়া ঘটনার কথা চিন্তা করতে লাগলো যে, মেয়েটা কেন এরকম জেদ করলো, ওর কি মাথায় সমস্যা হয়েছে নাকি অন্য কিছু। উসমান এমনিতে যুবক তার উপর আবার মেয়েটিও যুবতী, তো স্বাভাবিক ভাবেই আকর্ষনটা বয়সের কারণেই। রাতে আর উসমানের ভালভাবে ঘুম হলো না। বন্ধু হাশিমকেও ঘটনা এখনো জানায় নি। পরদিন সকালে উঠে উসমান ও তার বন্ধু কাজের উদ্দেশ্যে রওনা হলো। পথিমধ্যে সেই হাসপাতাল পরলো যেখানে সে গতকাল মেয়েটিকে রেখে এসেছিল। উসমান ভাবলো মেয়েটার একটু খোজ নেওয়া যাক আর তা ছাড়া গতকালের আচরণের ব্যাপারেও জিজ্ঞেস করবে ভেবে নিলো। বন্ধু হাশিমকে একটু পরে কাজে যাবে বলে উসমান বাজার থেকে কিছু ফল কিনে হাসপাতালে ঢুকে গেল।
হাসপাতাল মানুষের ভীড়ে পা ফেলানো মুশকিল। লাশগুলো পাশাপাশি না বরং স্তুপ আকারে একটার উপর আরেকটা, এভাবে রাখা আছে। রক্তের গন্ধে স্বাভাবিক শ্বাস নেওয়া দুষ্কর। কত শত ছোট ছেলে-মেয়ে শরীরের এখানে সেখানে ব্যান্ডেজ লেগে ব্যথায় চিৎকার করছে। অনেক ভীড় ঠেলে সে মেয়ের কাছে পৌছায়। বলে,
উসমান: আসসালামু আলাইকুম, কেমন আছেন?
মেয়ে: ওয়ালাইকুম সালাম, আলহামদুলিল্লাহ্ ভাল। আপনি কে? ( বিরক্তি ভাব নিয়ে)
উসমান: চেনেন নি, তাই তো।
মেয়ে: ওহ, হ্যাঁ। কাল আপনিই তো ডাক্তার এনে দিলেন।
উসমান: শুধু কি ডাক্তার? কাল ধ্বংস স্তুপ থেকে হাসপাতাল পর্যন্তও আমিই এনেছিলাম।
মেয়ে: আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। আল্লাহ্ আপনাকে উত্তম বদলা দান করুক।
উসমান: আপনার অবস্থা কি এখন?
মেয়ে: তেমন কিছু না, কয়েকটা সেলাই পড়েছে, আর ব্যথা পেয়েছি এই যা। আমার বাবা-মার কি অবস্থা একটু জানাবেন? এখানকার কেউ বলতে পারলো না।
উসমান: আচ্ছা দেখছি। তার আগে বলেন কাল আপনি ওভাবে আচরণ করছিলেন কেন?
মেয়ে: আসলে আমার বাবা একজন আলেম। আমাদের পরিবারের সবাই পর্দা মেনে চলে। পরপুরুষের হাত তো দূরে তাদের সামনেও আমরা যাই না।
উসমান: ওহ, আচ্ছা।(অবাক হয়ে)। আপনার আর কিছু লাগবে?
মেয়ে: না, শুধু খোজটা নিয়ে জানান।
উসমান: আর কিছু লাগলে বলবেন, টাকা না হয় পরে ফেরত দিয়েন।
মেয়ে: আচ্ছা, তাহলে নিকাবসহ বোরকার ব্যবস্থা করলে ভাল হয়। এখানে সবাই তো পরপুরুষ।
উসমান: ঠিক আছে।( অবাক হয়ে)
উসমান বের হয়ে ভাবে একোন যুগের মেয়ে, যে এভাবে পর্দা মানে। সে তো খাবার, ওষুধ চাইতে পারতো। উসমান ভাবছে এরকম ধার্মিক মেয়েদের কথা সে শুনেছে কিন্তু দেখেনি। উসমান যেখানে পড়াশুনা করে, সেখানে দেশ বিদেশের অনেকে পড়াশুনা করে। অধিকাংশ মুসলিম হলেও তাদের আচরণে পাশ্চাত্যের অনেক প্রভাব আছে। তাদের দেখে বোঝা মুশকিল কে কোন ধর্মের।
উসমান প্রথমে তাদের বাড়ির আশেপাশে খবর নেয়, জানতে পারে মেয়ের বাবা-মা সবাই মারা গিয়েছে, লাশ হাসপাতালে আছে। উসমান হাসপাতালে যাওয়ার সময় মার্কেট থেকে বোরকা কিনে নেয়। হাসপাতালে যেয়ে মেয়েকে জানাতেই মেয়েটি কান্না শুরু করে দেয়। উসমান ভেবে পায় না কিভাবে সান্তনা দিবে, কারণ সে জানে বাবা-মা হারানোর কষ্ট। অনেক সময়পর মেয়েকে বলে যে, তাদের দাফন কাফনের ব্যবস্থা করতে হবে। বন্ধু হাশিমকে ফোন দেয়, সব ঠিক করার জন্য। ঐদিন সন্ধ্যায় লাশগুলোর জানাজা ও দাফন সম্পন্ন করে।
তারপর
মেয়েটাকে হাসপাতালে রেখে সে দিনের মতো উসমান বাসায় চলে আসে। বাসায় এসে আবার রাতের ঘুম হাওয়া। বার বার মেয়েটার অসহায়ত্বের কথা মনে আসছিল উসমানের। বন্ধু হাশিমকে বিষয়টা জানালো। হাশিম সাহায্য করার জন্য সমর্থন দিলো। পরদিন উসমান হাসপাতালে দেখা করতে যায়। মেয়েটা জানায় হাসপাতাল থেকে আজই চলে যেতে হবে, কারণ অনেক রোগীর ভীড়। তার চেয়ে গুরুতর আহত রোগীরা হাসপাতালের বারান্দায়, ছাদে আহতাবস্থা নিয়ে কাতরাচ্ছে। উসমান বলে,
উসমান: আপনি কিছু মনে না করলে আমার বাসায় থাকতে পারেন।
মেয়ে: আপনাকে কেন কষ্ট দিবো?
উসমান: তাহলে কোথায় যাবেন?
মেয়ে: এশহরের শেষে আমার আত্মীয় আছে। ওখানে যাবো।
উসমান: এঅবস্থায় কিভাবে যাবেন, একটু সুস্থ হয়ে নিন আমি আপনাকে দিয়ে আসবো।
মেয়ে: আপনি আর কত কষ্ট করবেন? তাছাড়া....
উসমান: আমি পরপুরুষ এই তো? আসলে আমি আপনাকে আমার দ্বীনি বোন হিসেবে উপকার করছি। আর আপনি এক আলেমের মেয়ে আপনার খোদমত করে আমি বরং তাকে খেদমত করার সৌভাগ্য হারাতে চাই না।
মেয়ে: ঠিক আছে।
তারপর মেয়েকে হাসপাতাল থেকে তার বাসায় নিয়ে যায়। বাসার সামনে যেয়ে অবাক হয়। বাসাটিতে বোমা হামলা হয়েছে। পাঁচতলা ভবন ভেঙে তিনতলা হয়ে আছে। ভবনটি ভিতরে ঢোকার জন্য সিঁড়ি নেই, আছে ছাদ থেকে ভেঙে পরা কিছু অংশ যা একটার পর একটা পরে স্তুপ হয়ে সিঁড়ির মতো হয়ে আছে।
মেয়েটা যখন অবাক হয়ে দেখছিলো, তখন উসমান বলে উঠলো,
উসমান: ভয় পাবার কিছু নেই থাকার ব্যবস্থা মোটামুটি ভাল আছে। আর ভেঙে পড়ার ভয় নেই, আমরা ভালভাবেই দেখেছি। আপনাকে একটু কষ্ট করতে হবে।
মেয়ে: নাহ, সমস্যা নেই। আপনার নাম তোজানা হয় নি।
উসমান: আমি উসমান। আপনি?
মেয়ে: আমি লাবিবা। লাবিবা বিনতে নুমাইয়ের।
উসমান লাবিবাকে থাকার ঘর দেখালো। ঘরটা মোটামুটি ভালোই আছে।বোমার আঘাত এখানে লাগে নি। ঘরের সামনে পিছনে কাঠ দিয়ে ছাদগুলোকে ধরে রাখা হয়েছে যা ভেঙে পরার আশংকা কম। ঘরের সামনেই শৌচাগারটটা ঠিক আছে আর রান্না ঘরটা অর্ধেক ভেঙে আছে, তবে কিছু প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র দেখা যাচ্ছে। লাবিবা বলে উঠলো,
লাবিবা: আপনি কোথায় থাকবেন?
উসমান: আমি পাশেই ভাঙা একটা ঘর আছে ওখানে থাকবো।
লাবিবা: আপনাকে কষ্ট দিয়েই যাচ্ছি।
উসমান: হ্যাঁ, আপনি এসব বলেই কষ্ট দিচ্ছি। আমি আর হাশিম বাইরের এই ঘরটাতেই বেশি থাকি। এখান থেকে রাতে চাঁদের আলো দেখি আর নিজেদের অতীত নিয়ে আলোচনা করি।
লাবিবা: ওহ। সুন্দর তো।
উসমান: ঠিক আছে, আমাকে কাজে যেতে হবে।
এরপর উসমান কাজে চলে যায়। রাতে তারা ফিরে আসে খাবার নিয়ে। যখন লাবিবাকে ডাক দেয় তখন বাহিরে থেকে শুনতে পায় মেয়েটা দোআ করছে সাথে কান্না করছে। ডাক শুনে কান্না কিছুটা থামে। দরজা খুলে,
উসমান: ওহ। আপনার ইবাদতে সমস্যা করলাম মনে হয়।
লাবিবা: না, শেষই করছি ঐসময়ে আপনি এসেছেন।
উসমান: এই যে খাবার, আপনি খেয়ে নিন।
লাবিবা: আপনারা খাবেন না?
উসমান: আমরা খেয়ে নিয়েছি। খাবারের পর।লাবিবা বিদায় জানাতে এসে জিজ্ঞেস করে,
লাবিাবা: আপনি ছোট থেকেই এখানে থাকেন?
উসমান: জন্ম এখানে কিন্তু পড়াশুনার জন্য জর্দানে থাকতাম।
লাবিবা এখন কি করবেন, জিজ্ঞেস করলে উসমান তার ঘটনা পর্যাক্রমে বলতে থাকে। আর বলে এখানেই থেকে যাবে আজীবন।
লাবিবা:এখানে মসজিদ কোথায়?
উসমান: মসজিদ তো বোমার আঘাতে ভেঙে গেছে, আর একটা মসজিদ এখান থেকে খানিকটা দূরে হয়।
লাবিবা: আপনারা নামায কোথায় পড়েন?
উসমান: আসলে ঠিকভাবে পড়া হয় না।( লজ্জিত কন্ঠে)
লাবিবা: আহা! নামায না পড়লে এতো কষ্ট করে লাভ কি? আপনাদের আর ইহুদির মধ্যে পার্থক্য কি থাকলো?
উসমান:....(চুপ)
লাবিবা: আপনি আমাকে অনেক সাহায্য করেছেন এ ঋণ তো শোধ হবার নয়। আমি আপনাকে দ্বীনি বোন হিসেবে বলবো যে নামায শুরু করেন। আমার আব্বাজানকে দেখেছি অনেক কঠিন অবস্থাতেও নামাযের ব্যাপারে তিনি কঠোর ছিলেন।
উসমান: ইনশাল্লাহ্, চেষ্টা করবো।
লাবিবা: আল্লাহ্ আপনার সহায় হোন।
পরদিন সকালে উঠে উসমান ও হাশিম নামায পড়ে কাজে চলে যায়।
এরপর
এরপর রাতে কাজ হতে ফিরে যথারীতি লাবিবাকে ডাক দিয়ে খাবার হাতে তুলে দেয়। খাবার শেষে লাবিবা বিদায় নিতে আসলে উসমান বলে, উসমান: এখন কেমন শরীর আপনার?
লাবিবা: সেটাই আপনাকে জানাতে এসেছি। আমি মোটামুটি সুস্থ। কাল চলে যেতে চাই। যাওয়ার কথা শুনতেই উসমানের বুকটা ধক করে উঠলো। এমন তো হওয়ার কথা না। যার যাওয়া সে তো যাবেই। নিজেকে সামলে বলল, উসমান: ওহ। ঠিক আছে আপনাকে দিয়ে আসবো। আর ভালোই হলো কাল থেকে আমিও অন্য কাজে যাচ্ছি, ফেরা না ফেরার ঠিক থাকবে না।
লাবিবা: আচ্ছা। কি রকম কাজ?
উসমান: আল্লাহ্'র রাস্তায় যুদ্ধ করতে যাচ্ছি। পূর্বদিক থেকে ইসরায়েল বাহিনী অগ্রসর হচ্ছে, কাল থেকে আমরা বাধা দিবো।
লাবিবা: তো আপনাদের নেতৃত্ব দিচ্ছে কে?
উসমান: কে আবার? আমরা নিজেরাই।
লাবিবা: এটা যা করছেন তা আল্লাহ্'র জন্য না, এটা আপনারা নিজেদের পরিবারের প্রতিশোধের জন্য।
উসমান: তা কেন হবে?
লাবিবা: তা নয়তো কি? যাদের দলে নেতৃত্ব কোন হক্বের পথের আলেম দেয় না। আপনারা নামায পাঁচ ওয়াক্ত ঠিক ভাবে পরেন না, মুখে দাঁড়ি নেই, পরনের কাপড়ও সুন্নত অনুযায়ী না। যেখানে নিজের উপর যুদ্ধ করতে পারেন নি যেখানে ইসরায়েলের উপর কিভাবে যুদ্ধ করবেন? ভেবে দেখেছেন?
উসমান: আসলে.....
লাবিবা: যদি আল্লাহ্'র জন্যই যুদ্ধ হতো তাহলে শুধু বাধা না বরং ইসরায়েলদের এই পবিত্র ভূমি থেমে বিতাড়িত করার ইচ্ছা রাখতেন। যেখানে মুসলিমদের প্রথম কিবলা বাইতুল মুকাদ্দাস আজ ইসরায়েলদের দখলে, যেখানে শুধু মুসলিম হওয়ার কারণে লোকজনকে হত্যা, নির্যাতন করা হয় সেখানে শুধু নিজের প্রতিশোধের কথা কখনোই ভাবতেন না।
উসমান:..... (চুপ হয়ে)
লাবিবা: আমি আলেমের ঘরের মেয়ে আমার বড় ভাই গতবছর যুদ্ধে শহীদ হয়েছেন। আমি কোন কাল্পনিক কথা বলি না। আপনারা রাত গান শুনে, তাশ খেলে কাটিয়ে দেন আমার জানা আছে। এভাবে যুদ্ধ হয়? আল্লাহ্'র সাহায্য পাওয়া ছাড়া ইতিহাস বলে কোন মুসলিম জিততে পারে নি।কয়েকটা ইট, পাথর আর আগুন মারলেই কি ওরা পিছু হটবে? যুদ্ধ হবে? কাকে ঠকাচ্ছেন? একটু বসে ঠান্ডা মাথায় ভাবুন, আমি গেলাম ঘুমাতে।
উসমান যেন বাকহীন হয়ে গেছে। এক পাও নড়তে পারছে না। চোখের পাতা যেন বন্ধ হওয়া ভুলে গেছে। কথাগুলো যেন রেডিওর মতো বারবার কানে বাজছে।
একটা কথাও ফেলার নয়। সে ভাবছে, একেমন মুসলিম সে যে, আল্লাহ্ কে ডাকা ভুলে গেছে। অথচ সাহায্যকারী একমাত্র তিনিই। সে সিদ্ধান্ত নিলো এভাবে সে ময়দানে যাবে না, পূর্ণপ্রস্তুতি নিয়েই সে যাবে। এরপর ভাবছে লাবিবা কাল চলে যাবে। কেমন এক মায়া জন্মেছে তার প্রতি। তার প্রত্যেক কথা তাকে ভাবিয়ে তোলে। একয়েক দিনে তার অনেক পরিবর্তন মেয়েটি করেছে। ইসলাম সমন্ধে জ্ঞান মেয়েটার গভীর। এখন যে ভাবে পথ দেখালো সারাজীবন যদি পথ দেখাতো। পরিবার হারার পর সে মানসিক ভাবে অশান্তিতে ছিল এমেয়ে যেন তার সেই শান্তি ফিরিয়ে দিয়েছিল। এখন সে যদি চলে যায় সে আবার অসহায় হয়ে পরবে। কিন্তু তাকে আটকে রাখাও তো যাবে না। তার মতো ছন্নছাড়া লোককে কেন বিয়ে করবে? ভাবতে ভাবতে সে ঘুমিয়ে পরেছে।ফযরের সময় উঠে নামায পরে আল্লাহ্'র কাছে সাহায্য চাইলো। পরে সকাল হলো লাবিবাকে নিয়ে রওনা হলো। পথিমধ্যে অনেকবার বলতে চাইলো তার মনের কথা, কিন্তু অজানা বাধা তাকে আটকে দিচ্ছিলো। একসময় লাবিবার আত্মীয়র বাসা এসে গেল।
লাবিবা: এসে গেছি। আপনাকে আল্লাহ্ উত্তম প্রতিদান দান করুক। আপনার টাকা আমি জোগাতে পারলেই দিয়ে আসবো। আল্লাহ্'র উপর ভরসা করেই সিদ্ধান্ত নিবেন। আসি। আসসালামু আলাইকুম।
উসমান: আপনার যখন প্রয়োজন হবে আমাকে স্মরণ করবেন, ইনশাল্লাহ সাহায্য করবো। ঠিক আছে। ওয়ালাইকুম সালাম। উসমানের মনে হচ্ছে কি যেন বড় জিনিস সে হারিয়ে ফেলছে। দম আটকে আসছে, গলা শুকিয়ে যাচ্ছে। এরকম কষ্ট সে আগে কখনো অনুভূত হয় নি তার। পরিবার মারা গেলে কষ্ট হয়েছে।কিন্তু তা তো মৃত মানুষের জন্য, জীবিত মানুষের জন্য এরকম কষ্ট এই প্রথম।
তারপর
ঐদিনের পর থেকে উসমান ও তার বন্ধু হাশিমকে তাদের বাড়িতে দেখা যায় নি। অপরদিকে লাবিবারও বার বার উসমানের কথা মনে হতে লাগলো যে, কত সহজেই ছেলেটা নিঃস্বার্থ ভাবে তাকে সাহায্য করে গেল, না ছিল পরিচিতি না ছিল টাকা ফেরত দেওয়ার কোন নিশ্চয়তা। উপরন্ত তার নিজেরই টাকার অভাব। দ্বীন মানার আগ্রহ ও আলেমদের প্রতি শ্রদ্ধা যেন এক অপার বৈশিষ্ট্য হোক না সে এখন মানছে না, কিন্তু বুঝালেই সে বুঝবে তা সে দেখেছে। কোন তর্ক ছাড়াই উসমান তার সব কথা শুনতো। নাহ! এরকম কেন হচ্ছে লাবিবার। এক অপরিচিত পুরুষকে নিয়ে কেন ভাবছে সে? হয়তো আর কোনদিন দেখাও হবে না তার। এদিকে অনেক বিয়ের প্রস্তাব আসতে থাকে তার জন্য কিন্তু সে রাজী হয় না। আবার তার আত্নীয়রাও তাকে বেশিদিন রাখতে চাচ্ছে না। এক এতীম অসহায় নারীর দ্বায়িত্ব কে বা নিতে চায়। ফলাফল কিছুদিন পর লাবিবাকে বের হয়ে যেতে বলে। সেও বের হয়ে যায়। এরপর লাবিবারও কোন খোঁজ নাই।
দীর্ঘ ৩ মাস পর উসমান লাবিবার সেই আত্নীয়র বাসায় যায়, অনেক সাহস নিয়ে দরজায় কড়া নাড়ে, এই দিকে মানসিক ভাবে প্রস্তুতি নেয় সে। দরজা খুলে এগিয়ে আসে এক মহিলা।।লাবিবার কথা জিজ্ঞেস করলে জানায় সে ২ মাস আগে চলে গেছে। কোথায় গেছে মহিলাটি জানে না। হতাশ হয়ে উসমান সেখান থেকে ফিরে আসে। এখানে সে কোথায় খুঁজবে তাকে এ ধ্বংস স্তূপে ভেবে পায় না। হাশিমকে জানালে মুখের শান্তনা ছাড়া কিছুই পায় না। দুই বন্ধু আবার ফিরে যায় তাদের পুরনো বাসায়। ২ দিন যাওয়ার পর শুনতে পায় তাদের পাশের এলাকাতে আবার ইসরায়েল বাহিনী বোমা হামলা শুরু করেছে। তারা দৌড়ে গিয়ে উদ্ধার কাজ শুরু করে, এবার তারা আগের তুলনায় বেশি দক্ষ, সাহসী এবং পরিশ্রমী। কয়েকজন জীবিত উদ্ধারের পর এক শিশুকে উদ্ধার করলো। শিশুটিকে দেখার পর সবার চোখে পানি, কেউ কেউ চিৎকার শুরু করে। কার সন্তান কে নিবে, কারণ তাকে চেনা যাচ্ছে না, যাবেই বা কি করে শিশুটির মাথা বোমার আঘাতে উড়ে গেছে। আহ! কি মর্মান্তিক দৃশ্য। এক লোক পরনের কাপড় দেখে চিনে ফেলে তার সন্তান। বুকে নিয়ে সে কি কান্না। কান্নার শব্দে আকাশ-বাতাস মনে হয় দুমড়ে পরছে। আরেক জন শিশু উদ্ধার হয়েছে যার রক্তক্ষরণ হচ্ছে কিন্তু নেওয়ার মতো কেউ নেই হয়তো তার বাবা-মা মারা গেছে। উসমান নিজেই নিয়ে ছুটে চলল হাসপাতালের দিকে। এটা সেই হাসপাতাল যেখানে সে লাবিবাকে এনেছিল ৩ মাস আগে। শিশু বিভাগে যেতেই নার্সরা সব এগিয়ে এসেছে চিকিৎসার জন্য। পিছন থেকে একজনের আওয়াজ শুনে উসমানের বুকে ধক করে উঠলো। পিছনে ঘুরে দেখে সেই লাবিবা, মুখে নিকাব দিয়ে ব্যস্ত হয়ে পরেছে শিশুটির জন্য। উসমানের যেন খুশির আর শেষ নেই। দেখে এখানেও মেয়েটা সবাইকে হুকুম করছে, বুঝিয়ে দিচ্ছে। লাবিবা উসমানকে চিনতে পারে নি। অবশ্য না চেনারও কারণ আছে।ডাক্তার আসলে ডাক্তারকে সহযোগিতা করছে লাবিবা।উসমান একটু দূরে গিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। হঠাৎ ডাক্তার বলল বি পজেটিভ রক্তলাগবে, নার্সরা বলল, এমুহূর্তে এগ্রুপের রক্ত নেই।
এরপর
রক্তের গ্রুপ শোনার পর উসমান বলে উঠলো যে, তারও একই গ্রুপ। এতক্ষণে লাবিবা তার দিকে তাকালো, কিন্তু বুঝে উঠলো না। উসমান যখন রক্ত দেওয়া শুরু করলো, তখন একপর্যায়ে লাবিবা এসে রক্তের প্রবাহ দেখতে লাগলো। জিজ্ঞেস করলো,
লাবিবা: আপনার নাম কি?
উসমান: নামে আর কি আছে, পুরো মানুষই যখন সামনে।
লাবিবা: কিছু বললেন?
উসমান: নাহ! পরিচয় খুঁজছি পাইলে জানাবো( মুখে রহস্যময় হাসি)
উসমানের রহস্যময় কথা শুনে লাবিবা উসমানকে আপাদমস্তক দেখে নিলো যে, গালে সুন্দর দাঁড়ি পরনে সুন্দর কাল পাঞ্জাবী তার উপর কালচে রঙের কোটি আর মাথায় কাল পাগড়ি আফগানদের মতো বেধে রেখেছে। চেহারায় যেন প্রশান্তির এক নূর চকচক করছে। লাবিবার এখন বুঝতে বাকি নেই এ যে সেই উসমান। লাবিবার চোখের কিনারায় পানি এসে গেছে, যে কোন মুহূর্তে বাধ ভেঙে যাবে। লাবিবা কিছু বলতে যাবে সে মুহূর্তে উসমান বলে উঠলো,
উসমান: যোহরের সময় হয়েছে নামাযে যেতে হবে।
লাবিবা: এইমাত্র রক্ত দিলেন একটু আরাম করে যান।
উসমান: কেউ একজন নামাযের গুরুত্ব বুঝিয়েছিল তারপর থেকে আর ফাঁকি দেয় নি। (মুখে রহস্যময় হাসি)
লাবিবা: সেই একজন আপনার জন্য অপেক্ষা করবে।
উসমান: আসবো, তার জন্যেই এতদূর আসা। লাবিবার যেন খুশির সীমানা অতিক্রম করে যাচ্ছে। কখন দেখা হবে সে অপেক্ষায় সে চেয়ে থাকলো। দুপুর গড়িয়ে বিকাল, তারপর সন্ধ্যা উসমানের কোন খবর নেই। লাবিবার অনেক রাগ হলো, সে হাসপাতালের গেটে আসতেই দেখে উসমান দাঁড়িয়ে আছে। কাছে আসতেই লাবিবা বলে উঠলো,
লাবিবা: এত দেরি?
উসমান: সেই দুপুর থেকেই তো এখানে।
লাবিবা: ভিতরে আসেন নি কেন?
উসমান: আপনার দ্বায়িত্ব অবহেলা হতো, তাই।
লাবিবা: আপনি অনেক দ্বায়িত্ববান হয়েছেন।
উসমান: হুম। অনেক মূল্যবান কিছুকে দেখে শুনে রাখতে দ্বায়িত্ববান হতে হবে।
লাবিবা: আপনি এতোদিন কোথায় ছিলেন? জানেন প্রত্যেক সপ্তাহে আপনার বাসায় যেতাম আপনার টাকা দিতে কিন্তু বারবার খালি ফিরে আসতাম।
উসমান: যে পথ দেখে দিয়ে চলে গেলেন সেই পথেই হাঁটতে শিখতে গিয়েছিলাম।
লাবিবা: মাশাল্লাহ্। আল্লাহ্ আপনাকে কবুল করুক।
উসমান: আরেকটা বিষয়ে আমি কবুল চাচ্ছিলাম।
লাবিবা: কোন বিষয়ে? ( লজ্জায় মাথা নিচু করে)
উসমান: যেভাবে আপনি আমাকে সঠিক পথ দেখিয়েছেন, জীবনের বাকিটুকু সময় আমাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবেন?
লাবিবা:..... (মাথা নিচু)
উসমান: কিছু তো জবাব দেন।
লাবিবা: মেয়েরা কি সব বলে... কিছু বুঝে নিতে হয়।( মুচকি হেঁসে)
উসমান: আলহামদুলিল্লাহ্। চলেন আজই বিয়ে করতে চাই, আপনার যদি মত থাকে।
লাবিবা:.... (মাথা ঝুকিয়ে ইশারা করলো)
উসমান: কিন্তু আপনাকে মোহরানা দেয়ার মতো তেমন কিছু নেই।
লাবিবা: আমি সবসময় একজন মুজাহিদকে বিয়ে করার স্বপ্ন দেখতাম, যা এখন আপনার বর্তমান অবস্থা। আমার আর কিছু চাই না, তাছাড়া আপনি আগেই অনেক কিছু দিয়েছেন তা না হয় মোহরানা ধরে নিলাম।
উসমান: আল্লাহ্ আপনার সব নেক আশা কবুল করুক। তারপর উসমান হাশিমকে ডেকে কাছের এক স্থানীয় মসজিদে যেয়ে বিয়ে সম্পন্ন করে। বিয়ে শেষে এলাকার লোকজনের ভিতর খেজুর ছিটিয়ে দেয়।
তারপর
এরপর আর কি? বিয়ে তো হয়েই গেল। আরো গল্প পড়বেন?
ঠিক আছে। এরপর বিয়ের প্রথম রাত। কেমন এক সাদামাটা বিবাহ, নেই কোন আয়োজন, নেই কোন তথাকথিত অনুষ্ঠান, নেই কোন হই হুল্লোড়, নেই টাকা পয়সার কোন ঝামেলা। অথচ বিবাহতে বরকত হয়েছে।
স্বামী-স্ত্রী দু'জনেই খুশি। প্রথম রাত যেহেতু তাই একটু বিশেষ আয়োজন থাকেই। তাদের দুজনের ইচ্ছা তারা তাদের যে ঘরটা আধা ভাঙা সেটাতে চাঁদ দেখতে দেখতে গল্প করে কাটাবে। সৃষ্টিকর্তার অশেষ রহমত যে, সে দিন পূর্ণিমার রাত। আলাপ চলছে স্বামী-স্ত্রীর,
স্বামী: আসুন, শুকরিয়া নামায আদায় করি।
স্ত্রী: আগে আমার একটা শর্ত পূরণ করতে হবে।
স্বামী: কি রকম? (কিছুটা ভয় পেয়ে)
স্ত্রী: আপনি থেকে তুমিতে আসতে হবে (মুচকি হেসে)
স্বামী: আসো।
অতঃপর নামায শেষে দুজনে হাত তুলে আল্লাহ্'র কাছে।দোআ শুরু করলো। দোআ তে উসমান কেঁদে চোখ ভিজে যাচ্ছে, বারবার সে শুকরিয়া আদায় করছে যে, তাকে এত কিছু দিয়েছে আল্লাহ্, অথচ কিছুদিন পূর্বে সে হতাশায় দিন পার করতো। এদিকে লাবিবার অবস্থাও একই। মুনাজাত শেষে উসমান পাগড়ির কাপড় দিয়ে লাবিবার চোখ মুছে দিলো, লাবিবাও তার জামা দিয়ে উসমানের চোখ মুছে দিলো। এবার দু'জনের মুখেই প্রশান্তির হাসি। আলাপ শুরু হলো, স্বামী: রাতের এই নিরবতায় যখন পিনপতন নীরবতা, তখন পাশে আপনজনের উপস্থিতি যেন অন্ধকারকেও রঙিন তুলেছে।
স্ত্রী: আসলে এভাবে প্রশান্তি এর আগে মনে হয় নি। বাবা চলে যাওয়ার পর সবসময় মনে হতো আজ কি হবে? কালকেই বা কি ভাবে কাটাবো? আজ মনে হচ্ছে কাল যা হবার হবে, আমার আল্লাহ্ আছে তুমি আছো।
উসমান: তোমার কি চাওয়ার আছে বল, কিছুই দিতে পারলাম না। বেশি কি দিতে পারবো তাও জানি না, তবে আপ্রাণ চেষ্টা করবো তোমাকে খুশি করার।
স্ত্রী: আমার অনেক গুলো মুজাহিদ সন্তান দরকার। (লজ্জায় মুখ লুকিয়ে)
স্বামী: হ্যাঁ, অবশ্যই এই পবিত্র ভূমিকে এই জালিম কাফেরদের হাত থেকে রক্ষা করতেই হবে। আমি না পারি আমার সন্তানরা যেন মুক্ত করতে পারে। এমন মুহূর্তে তাদের মাথার উপর দিয়ে দুটো বিমান শা শা শব্দে উড়ে গেল আর দূর থেকে বোমার আওয়াজ পাওয়া গেল। কিছুক্ষণ পর কার যেন পায়ের দৌড়ে আসার শব্দ। উসমান বের হয়ে দেখে।তার বন্ধু হাশিম এসে হাপাচ্ছে। হাশিম বলল যে, উত্তরে ইসরায়েল বাহিনী এগিয়ে আসছে তাদের আটকাতে হবে। উসমান বলল যে, পেট্রোল বোমা প্রস্তুত করতে। লাবিবাকে বলল,
স্বামী: শুনছো? আমাকে এখনই যেতে হবে।
স্ত্রী: এখনই? (অভিমান করে)
স্বামী: এভাবে বলো না। বলো তাড়াতাড়ি যাও। শোন তুমি একজন মুজাহিদের স্ত্রী, তুমি আমাদের বিজয়ের জন্য দুআ করবা।
স্ত্রী: মাফ করে দাও, আসলে আবেগে পরে গিয়েছিলাম। যাও, আল্লাহ্ তোমার সহায় হউক। আসসালামু আলাইকুম।
স্বামী: ভালো থেকো, ধৈর্য্য ধরো। ওয়ালাইকুম সালাম। উসমান ও হাশিম বিদায় নিলো। পরদিনও কোন খবর নেই। লাবিবা অনেকের কাছে শুনেছে অনেক ভয়ানক যুদ্ধ হচ্ছে। ইসরায়েল বাহিনী এগিয়ে যেতে পারছে না। লাবিবা শুনে অনেক খুশি কিন্তু মনে উসমানের জন্য চিন্তাও হচ্ছে।
তার পরদিন ভোর বেলা কে যেন দরজায় কড়া নাড়ে, জিজ্ঞেস করলে উসমান খুলতে বলে। লাবিবা উসমানকে দেখে তার বুকে পরে কান্না শুরু করলে উসমান বলে,
স্বামী: তোমার এভাবে কাঁদলে চলবে না। তোমাকে শক্ত হতে হবে। আমি ফিরে নাও আসতে পারতাম।তোমার আমাকে আল্লাহ্'র রাস্তায় কুরবানি করার মানসিকতা রাখতে হবে। অসহায় শিশু, মানুষদের হত্যা করছে আর আমরা আরামে সুখের সংসার করতে পারি না।
স্ত্রী: মাফ করে দাও শত চেষ্টা করেও মনকে আটকাতে পারি নি। আচ্ছা, ঐদিকের কি খবর।
স্বামী: খবর ভালো। ওরা এগিয়ে যেতে পারে নি বরং পিছন ফিরতে শুরু করার পর যখন দেখছে অনেক ক্ষতি তাদের হয়েছে তখন যুদ্ধ বিরতি চুক্তি করলো।
স্ত্রী: আলহামদুলিল্লাহ্, এতো অনেক ভালো খবর।
স্বামী: তা বটে, কিন্তু ওরা চুক্তি ভঙ্গ করবে আমরা তাও জানি, এজন্য ব্যবস্থা নিতে হবে। যাক আমরা কিছুদিন একসাথে কাটাতে পারবো।
শুরু হলো তাদের সুখের সংসার। সকালে উসমান কাজে যায় রাতে ফিরে আসে। ভালোই চলছিল, হঠাৎ একদিন উসমান বলল যে,
স্বামী: শুনছো?
স্ত্রী: হ্যাঁ গো শুনছি। তোমার কথা শোনার জন্যই সারাক্ষণ কান সচেতন থাকে।
স্বামী: খুশির সংবাদ, আমাকে ময়দানে যেতে হবে।
স্ত্রী: আলহামদুলিল্লাহ্ ( চোখে পানি)
স্বামী: কান্না করো না, আরে তুমিই তো আমার প্রেরণা তোমার জন্যই আজ এ পথে।
স্ত্রী: না এ তো খুশির কান্না।
স্বামী: শোন পাগলি, ভালো ভাবে বিদায় দাও। শোন কখনো পিছনে তাকাবে না, আমার সন্তানগুলোকে সাহসী বানাবে, বায়তুল মোকাদ্দস জয় করতে হবে। ইশ! যদি তাদের দেখে যেতে পারতাম। আর আমি ফিরে না আসলে ভয় নেই, তবুও দেখা হবে জান্নাতে। আল্লাহ্'র কাছে তোমাকেই চাইবো।
স্ত্রী: আল্লাহ্ আমাদের কবুল করুক। উসমান চলে যায়। ৩ মাস পর উসমানের লাশ আসে লাবিবার কাছে। এ যেন সাধারণ লাশ না। তিন দিন আগে মারা গেলেও একটু পচন ধরে নি। না, কোন বরফেও রাখা ছিল না। শহীদ তো একেই বলে চেহারায় হাস্যোজ্জল ভাব যেন এখনই কথা বলবে। লাবিবা কেঁদে উঠে এবং পেটে হাত রেখে বলে তোর বাবা তো জান্নাতের যাত্রী হয়ে গেল। হয়তো জান্নাতে তাদের দেখা হবে....

No comments:
Post a Comment