‘সীরাত’ শব্দটা বহুল ব্যবহৃত এবং আলোচিত হলেও ‘ফিকহুস সীরাত’ শব্দটা ততটা আলোচিত নয়। কিন্তু একজন সীরাত পাঠকের শব্দ দুটো সম্পর্কে অবগত থাকা সবচে বেশি প্রয়োজন। ‘সীরাত’ এবং ‘ফিকহুস সীরাত’ দুটো এক জিনিস নয়। দুটোর মাঝে বিস্তর একটা ফারাক আছে। সেই ফারাকটাই স্পষ্ট করছি।
‘সীরাত’ হলো একজন মানুষের জীবন বা কোনো ঘটনার সাধারণ ধারাবাহিক বর্ণনা। এখানে জন্ম, মৃত্যু, বাল্যকাল, যৌবনকাল, শিক্ষা-দীক্ষা ইত্যাদীর সরল বর্ণনা থাকে। এই হিসেবে সীরাত হলো হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পুরো জীবনের সরল বিবরণ। কাল এবং ঘটনার ধারাবাহিকতা ও যোগসূত্র থাকুক কিংবা না থাকুক।
‘ফিকহুস সীরাত’ হলো একটা জীবনকে সামগ্রিকভাবে দেখা। মানে জীবনের প্রতিটি ঘটনার মধ্যে যোগসূত্র তৈরী করা। গভীরভাবে নিরীক্ষার মাধ্যমে তার সম্পূর্ণ জীবনকে একটা কার্যকারণসূত্রে ব্যাখ্যা করা। এই হিসেবে ‘ফিকহুস সীরাত’ হলো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পুরো জীবনকে শুধু ইতিহাস হিসেবে না পড়ে বরং ইতিহাস পাঠের ভেতর দিয়ে তার জীবনের নীরিক্ষা ও তত্ত্বায়নের মাধ্যমে একটি ঘটনার সাথে আরেকটি ঘটনার যোগসূত্র এবং প্রাসঙ্গিকতা তৈরী করা। শুধু ইতিহাস নয়, ইতিহাসের যাত্রার সাথে কোরআন হাদীস মিলিয়ে বর্তমানের সঙ্গে একটা সেতুবন্ধন তৈরী করে দেয়া।
সীরাতের তুলনায় ফিকহুস সীরাত নিয়ে কাজ কম হয়েছে। কিন্তু যতটুকু কাজ হয়েছে এরমধ্যে বিখ্যাত সিরিয়ার লেখক রমজান বুতির লেখা ‘ফিকহুস সীরাতিন নাবাবিয়্যাহ’। গ্রন্থটির শুরুতে সীরাত পাঠের পদ্ধতি নিয়ে নাতিদীর্ঘ একটি আলোচনা আছে। আলোচনার কিয়দাংশ তুলে ধরছি।
সীরাত পাঠের উদ্দেশ্য
সীরাত পাঠের উদ্দেশ্য কেবল ঐতিহাসিক ঘটনার বিবরণ কিংবা নবী জীবনের চমৎকার সব গল্প পড়া নয়, বরং উদ্দেশ্য হলো নির্ধারিত নীতিমালার আলোকে তার পূর্ণাঙ্গ জীবনটাকে দেখা। শুধু ঘটনা পরম্পরা নয়, এই পরম্পরা থেকে প্রকৃত ইসলামের রূপটাকে অনুধাবন করা। সামগ্রিক জীবনকে নীরিক্ষা করার উদ্দেশ্যে সীরাত লিখতে গিয়ে কয়েকটি বিষয়ের দিকে লক্ষ্য রাখা হয়েছে।
১. জীবন ও পরিবেশের আলোকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর ব্যক্তিত্বকে বুঝা। যেন নিজের ভেতরে বিশ্বাস জন্মে—তিনি নিছক কোনো নেতা কিংবা বিস্ময়কর প্রতিভার অধিকারী ছিলেন না, যে নেতৃত্ব ও প্রতিভার যোগ্যতায় তিনি তাঁর সম্প্রদায়ের কাছে বরণীয় হয়েছেন। বরং সবকিছুর পূর্বে তিনি ছিলেন আল্লাহর প্রেরিত রাসূল; ওহি এবং বিশেষ শক্তির বলে তিনি তাকে সুউচ্চে তুলে ধরেছেন।
২. জীবনের সর্বক্ষেত্রে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যেন সর্বোত্তম আদর্শ হিসেবে মানুষের সামনে ফুটে উঠে। তাহলে তারা তাকে আদর্শ হিসেবে নিতে পারবে। এই আদর্শকে আকড়ে ধরে পথ চলতে পারবে। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে মানুষ সর্বোত্তম আদর্শই খুঁজে বেড়ায়। তাই আল্লাহ ঘোষণা করেছেন, ‘রাসূলের মধ্যেই রয়েছে তোমাদের জন্য উত্তম আদর্শ।’ (সূরা আহযাব: ২৩/২১)
৩. সীরাত পাঠ কোরআন বুঝতে এবং তার নিগূঢ় রহস্য উদঘাটন করতে সাহায্য করে। কেননা কোরআনের বহু আয়াতের ব্যাখ্যা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনার মাধ্যমে হয়ে থাকে।
৪. সীরাত পাঠের মাধ্যমে একজন মুসলমান আকিদা, আহকাম এবং আখলাকসহ সংশ্লিষ্ট সকল বিষয়ের বিশুদ্ধ জ্ঞান অর্জন করবে। কারণ এতে সন্দেহ নেই যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবন হলো ইসলামের সকল মূলনীতির সর্বোত্তম প্রকাশিত রূপ।
৫. সীরাত পাঠের মাধ্যমে ইসলামের দাঈগণ তালীম-তারবিয়াতের জীবন্ত উপমা লাভ করবেন। কেননা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর দাওয়াতের প্রচারে সর্বোৎকৃষ্ট পন্থা অবলম্বন করেছেন।
এই সব উদ্দেশ্যগুলোই সফলভাবে অর্জিত হবে সীরাত পাঠের মাধ্যমে। কারণ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনে মানবিক এবং সামাজিক সকল শাখার সুন্দর সম্মিলন ঘটেছে। তাই সমাজের সকল শ্রেণির মানুষের জন্যই তার জীবনীতে রয়েছে সর্বোত্তম আদর্শ।
সীরাত লেখার শুরু
সীরাতকে কেন্দ্র করেই মুসলিম ঐতিহাসিকগণ সর্বপ্রথম ইতিহাস রচনা শুরু করেন। তারপর ধারাবাহিকভাবে পরবর্তি যুগের ঘটনাবলি লিপিবদ্ধ করা হয়। এমনকি ইসলামপূর্ব যুগের ইতিহাসও সীরাতকে কেন্দ্র করেই লেখা হয়েছে। যেমন জাহেলী আর ইসলামী যুগ পার্থক্যের মানদন্ডই হচ্ছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্মকাল। মোটকথা, সীরাতুন্নবী শুধু আরব উপদ্বীপই নয় বরং সমগ্র মুসলিম বিশ্বের ইতিহাসের মূল কেন্দ্রবিন্দু।
হাদীসের কিতাব লেখার পরেই শুরু হয়েছে সীরাত লেখার কাজ। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বেঁচে থাকতেই শুরু হয়েছিল হাদীস লেখার কাজ। যদিও সাহাবিরা সবসময়ই সীরাতের আলোচনা করতেন, কিন্তু সীরাত লেখার কাজ শুরু হয়েছে আরও অনেক পরে। ব্যাপকভাবে সীরাত লেখার প্রতি সর্বপ্রথম গুরুত্ব দিয়েছেন উরওয়া ইবনে যুবায়ের (মৃ:৯২ হি.)। এরপর আবান বিন উসমান (মৃ: ১০৫ হি.)। এরপর ওহাব বিন মুনাব্বিহ (মৃ:১১০ হি.) এরপর শুরাহবীল ইবনে সাদ (মৃ: ১২৩ হি.) এরপর ইবনে শিহাব যুহরী ( মৃ: ১২৪ হি.)। সীরাতের ইতিহাসে এরাই অগ্রজ আমাদের। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলো এদের কোনো সীরাতগ্রন্থ আমাদের পাছে পৌঁছেনি। তবে তাদের মধ্য থেকে ওহাব ইবনে মুনাব্বিহের ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন কিছু বক্তব্য আল্লামা তাবারি রহ. বর্ণনা করেছেন।
এরপর যারা সীরাত লিখেছেন, তাদের মধ্যে সবচে অগ্রজ মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক (মৃ: ১৫২ হি.)।
এইসব সীরাত গ্রন্থ লেখার তথ্য-উৎস ছিলো তিনটি। ১. কোরআন ২. হাদীস ৩. ঐসব রাবি, যারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সীরাতের প্রতি ব্যাপকভাবে গুরুত্ব দিতেন, তাদের বর্ণনা।
সীরাত লেখার ক্ষেত্রে তাদের পদ্ধতি ছিলো—হাদীস শাস্ত্রের মতো সনদ ও মতন এর শুদ্ধতা যাচাই করে নিয়মনীতির আলোকে গবেষণা করা। রিজালশাস্ত্রের অনুসরণ করা। কিন্তু এই নিয়মনীতির ওপর ভিত্তি করে নতুন আহকাম বের করা, বর্তমান সমস্যা সমাধানে ফলাফল বের করার সাথে ইতিহাসের কোনো সংযোগ নেই। এটা স্বতন্ত্র একটা কাজ। সীরাতে নববির ঘটনাবলীর ওপর ভিত্তি করে আকিদা এবং আচার-আচরণের অনেক আহকাম উদ্ভাবিত হয়েছে।
কীভাবে সীরাত পাঠ করবো
উনিশ শতকে এসে ইতিহাস রচনার বিভিন্ন পদ্ধতি আবিষ্কার হয়। এরমধ্যে অন্যতম হলো লেখকের চিন্তা, ধর্ম, রাজনৈতিক মতবাদ অনুযায়ী ইতিহাস লেখা। ঐতিহাসিক তত্ত্বকে বাদ দিয়ে লেখক নিজের চিন্তা ও মতামতের আলোকে ইতিহাস সাজান। ইতিহাস লেখার এই ভয়ংকর আঙ্গিকে শুরু হয় সীরাত লেখার চল। এই ধরনের সীরাতে নবুওয়ত, রিসালাত, ওহি ইত্যাদী বিশেষণের পরিবর্তে ব্যবহার করা হয় সাহসী, রাষ্ট্রনায়ক ইত্যাদি বিশেষণ। অথচ কোনো মুসলমানের জন্যই উচিৎ নয়, রাসূলকে শুধু সাহসী কিংবা রাষ্ট্রনায়ক ভাবা। কেননা এইসব শক্তি ও মহত্বের একমাত্র উৎস হলো রিসালাত এবং নবুওয়ত। এই শাখার আলোচনা বাদ দিয়ে অন্যকিছু নিয়ে আলোচনা করা অনর্থক। মনগড়া বিশ্লেষণে লেখা সীরাতের উৎকৃষ্ট উদাহরণ হুসাইন হাইকালের লেখা ‘হায়াতে মুহাম্মদ’। লেখক গ্রন্থের ভূমিকায় স্পষ্ট করে লিখেছেন, ‘আমি এখানে হাদীস-সীরাতগ্রন্থের বরাতে বর্ণিত কোনো কথা গ্রহণ করিনি। বরং বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে সীরাতের বিশ্লেষণকে প্রাধান্য দিয়েছি।’
নবুওয়ত লাভের পর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মানুষের কাছে এসে সর্বপ্রথম নিজেকে নবী বলে পরিচয় দিয়েছেন। এরপর মানুষ বলে পরিচয় দিয়ে বলেছেন, আমার যত মহত্ত্ব, তা ওই নবুওয়তের কারণেই। পূর্ববর্তী নবীগণ যে দায়িত্ব পালন করেছিলেন, আমিও সেই দায়িত্ব নিয়ে এসেছি। আল্লাহ আমাকে দাওয়াতের দায়িত্ব দিয়ে পাঠিয়েছেন।
সুতরাং তার সীরাত যখন পাঠ করবো, একজন রাসূলের সীরাত হিসেবেই তাকে পাঠ করব।
সীরাত অধয়নের সঠিক পদ্ধতি এটাই যে আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনের সকল দিক অধয়ন করবো; তাঁর জন্ম ও জন্মকাল, ব্যক্তিগত-পারিবারিক-সামাজিক-রা
রমজান বুতির ‘ফিকহুস সীরাতে’র মুগ্ধ পাঠক ছিলেন মুফতি ফজলুল হক আমিনী রহিমাহুল্লাহ। তিনি কিতাবটি পড়তেন আর কাঁদতেন। একবার শেষ করে আরেকবার, আরেকবার শেষ করে আরেকবার; তবুও যেন তাঁর আশ মিটত না। তামিম রায়হানের কাছ থেকে বইটি পাওয়ার পর আনন্দে আটখানা হয়ে গিয়েছিলেন। প্রায়ই তিনি বলতেন, আরবে এমন সীরাতগ্রন্থ লেখার আলেম আছে, আমি জানতামই না। কী আজিব লেখা লিখেছেন উনি।
এই সীরাত-গ্রন্থটি পড়ে এতটাই অভিভূত হয়ে পড়েছিলেন ফজলুল হক আমিনী রাহিমাহুল্লাহ, সঙ্গে সঙ্গে তিনি রমজান বুতির কাছে একটি চিঠিও লিখে ফেললেন। চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন, আমি আপনাকে আমার অন্তর থেকে মুরুব্বি হিসেবে গ্রহণ করে ফেলেছি। আপনার কিতাব আমার অনেকদিনের জমে থাকা প্রশ্নের উত্তর খুলে দিয়েছে।
জীবনের শেষ দিনগুলোতে রমজান বুতির ফিকহুস সীরাতের সাথে মিলিয়ে ‘মাআরিফুস সীরাত’ নামে আরবিতে নবীজীবনী লিখতে শুরু করেছিলেন মুফতি ফজলুল হক আমিনী রাহিমাহুল্লাহ। কী ঘোর, কী মুগ্ধতা তাকে ছুঁয়ে গিয়েছিল, এতেই প্রমাণ হয়।

No comments:
Post a Comment