Friday, November 22, 2019

Prio Nobi

সৃষ্টিকুল যেন সাড়ে চৌদ্দশত বছর পূর্বে এই মাসের সেই সময়ের অপেক্ষায় ছিল। মানবতার সর্বোচ্চ প্রকাশ তাঁর দ্বারাই হয়েছে। আপনার আমার সাথে যার হৃদয়ের গভীর থেকে গভীরের সম্পর্ক। আচ্ছা, কখনো কি জানতে ইচ্ছা করে না মানুষটা পুরো জীবন সমন্ধে? যিনি দেখায়ে গেল আলোর পথ, অন্ধকারের ভাগাড় থেকে মানবতাকে হাত ধরে তুলে এনে সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছালেন। তিনিই তো আরবের জাহেল লোকগুলোকে পৃথিবী বিখ্যাত বানালেন, না জ্ঞান-বিজ্ঞান দিয়ে, আর না নতুন কোন আবিষ্কার দিয়ে। তাঁদের শেখালেন মানবতার কৌশল, সেখালেন কি করে স্রষ্টার সন্তুষ্টিতে সৃষ্টি বদলায়।
পাঠ্যক্রমের বিষয়গুলো পড়তে যেয়ে কতজনেরই না জীবনী পড়া হয়ে গেল, শুধু আমার আপনার হৃদয়ের মানুষটারই জীবনীই বাদ পড়ে গেল? বড় অমানবকি হয়ে গেল না ব্যাপারটা? এখনো সময় শেষ হয় নি। এই পবিত্র মাসে রবিউল আউয়াল উদযাপন করতে, ঈদ' ঈদ না চিৎকার দিয়ে, যার জন্য এই উৎসব, তাঁকেই ভাল করে চিনি। বাস্তব জীবনেও কাউকে ভালবাসতে গেলে ভালবাসার মানুষটির ভাল লাগা না লাগা, সব রকম আবদার আমরা মাথা পেতে নিই। অথচ প্রাণপ্রিয় মানুষটিকে ভালবাসার বেলায় কেন এত কার্পণ্য?

যদি বলা হয় ইতিহাস কি ও কেন প্রয়োজন৷ এটা কি শুধু কিছু গল্প-কাহিনী, যা শুধু বিনোদন দিবে? নাকি শিশুদের ঘুম পাড়িয়ে দেয়ার মাধ্যম? নাকি একজন মানুষের ব্যক্তিত্ব গঠনের উপকারি মাধ্যম? নাকি একটা জাতি গঠনের কার্যকরি চেতনা?
ইতিহাস পাঠের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরতে গেলে বলা যায়, ইতিহাস পাঠে পাঠক তার জাতির ঐতিহ্য ও অতীতের গৌরবজনক অধ্যায়গুলো সম্পর্কে জানতে পারে। পাঠকের সাহস বৃদ্ধি পায়। জ্ঞান ও প্রজ্ঞা বৃদ্ধির পাশাপাশি অন্তর থেকে দুশ্চিন্তা ও চিন্তাক্লিষ্টতা দূর হয়ে যায়। সত্য চেনার ও মিথ্যা প্রতিপন্ন করার মতো অন্তর্দৃষ্টি ও মনোবল বৃদ্ধি পায়। পাঠক সে জাতির অতীত কর্ণধার ও নায়কদের উন্নত চরিত্র দ্বারা প্রভাবিত হয়। জাতির কোন বিপদসময় সে পিছপা হয় না, বরং আত্মবিশ্বাসে পূর্ণ থেকে সমস্যার মোকাবেলা করে।
আলহামদুলিল্লাহ। পৃথিবীর জাতি সমূহের মধ্যে মুসলমানই একমাত্র জাতি, যার রয়েছে সর্বাধিক গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস-ঐতিহ্য। মুসলমানদের পূর্বে পৃথিবীর অন্য কোন জাতির সৌভাগ্য হয়নি যে, ইতিহাসকে একটা সঠিক ভিত্তির উের রীতিমত একটা শাস্ত্ররুপে দাঁড় করাবে। অন্যান্য জাতির কেউই তাদের পূর্বপুরুষদের সঠিক ইতিহাস রচনায় সমর্থ হয় নি। মুসলমানগণ যেভাবে নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সময় থেকে কুরআন ও হাদীসকে বিশুদ্ধভাবে সংরক্ষণ করে এসেছে। তাঁরা ঠিক পরবর্তীতে ইতিহাসও সংরক্ষণ করে আসছে। ইতিহাসের ঘটনা বর্ণনা ও সংরক্ষণের যে পদ্ধতি তৈরী করেছে, ইতিহাসের অন্য কোন জাতির মধ্যে এরকম নযীর আর নেই। আর না কেয়ামত পর্যন্ত আসবে।

সৃষ্টিকুল যেন সাড়ে চৌদ্দশত বছর পূর্বে এই মাসের সেই সময়ের অপেক্ষায় ছিল। মানবতার সর্বোচ্চ প্রকাশ তাঁর দ্বারাই হয়েছে। আপনার আমার সাথে যার হৃদয়ের গভীর থেকে গভীরের সম্পর্ক। আচ্ছা, কখনো কি জানতে ইচ্ছা করে না মানুষটা পুরো জীবন সমন্ধে? যিনি দেখায়ে গেল আলোর পথ, অন্ধকারের ভাগাড় থেকে মানবতাকে হাত ধরে তুলে এনে সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছালেন। তিনিই তো আরবের জাহেল লোকগুলোকে পৃথিবী বিখ্যাত বানালেন, না জ্ঞান-বিজ্ঞান দিয়ে, আর না নতুন কোন আবিষ্কার দিয়ে। তাঁদের শেখালেন মানবতার কৌশল, সেখালেন কি করে স্রষ্টার সন্তুষ্টিতে সৃষ্টি বদলায়।
পাঠ্যক্রমের বিষয়গুলো পড়তে যেয়ে কতজনেরই না জীবনী পড়া হয়ে গেল, শুধু আমার আপনার হৃদয়ের মানুষটারই জীবনীই বাদ পড়ে গেল? বড় অমানবকি হয়ে গেল না ব্যাপারটা? এখনো সময় শেষ হয় নি। এই পবিত্র মাসে রবিউল আউয়াল উদযাপন করতে, ঈদ' ঈদ না চিৎকার দিয়ে, যার জন্য এই উৎসব, তাঁকেই ভাল করে চিনি। বাস্তব জীবনেও কাউকে ভালবাসতে গেলে ভালবাসার মানুষটির ভাল লাগা না লাগা, সব রকম আবদার আমরা মাথা পেতে নিই। অথচ প্রাণপ্রিয় মানুষটিকে ভালবাসার বেলায় কেন এত কার্পণ্য?

Collected- সীরাত পাঠের উদ্দেশ্য

রামাজান বুতি | মুনশী নাঈম :
‘সীরাত’ শব্দটা বহুল ব্যবহৃত এবং আলোচিত হলেও ‘ফিকহুস সীরাত’ শব্দটা ততটা আলোচিত নয়। কিন্তু একজন সীরাত পাঠকের শব্দ দুটো সম্পর্কে অবগত থাকা সবচে বেশি প্রয়োজন। ‘সীরাত’ এবং ‘ফিকহুস সীরাত’ দুটো এক জিনিস নয়। দুটোর মাঝে বিস্তর একটা ফারাক আছে। সেই ফারাকটাই স্পষ্ট করছি।
‘সীরাত’ হলো একজন মানুষের জীবন বা কোনো ঘটনার সাধারণ ধারাবাহিক বর্ণনা। এখানে জন্ম, মৃত্যু,  বাল্যকাল, যৌবনকাল, শিক্ষা-দীক্ষা ইত্যাদীর সরল বর্ণনা থাকে। এই হিসেবে সীরাত হলো হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পুরো জীবনের সরল বিবরণ। কাল এবং ঘটনার ধারাবাহিকতা ও যোগসূত্র থাকুক কিংবা না থাকুক।
‘ফিকহুস সীরাত’ হলো একটা জীবনকে সামগ্রিকভাবে দেখা। মানে জীবনের প্রতিটি ঘটনার মধ্যে যোগসূত্র তৈরী করা। গভীরভাবে নিরীক্ষার মাধ্যমে তার সম্পূর্ণ জীবনকে একটা কার্যকারণসূত্রে ব্যাখ্যা করা। এই হিসেবে ‘ফিকহুস সীরাত’ হলো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পুরো জীবনকে শুধু ইতিহাস হিসেবে না পড়ে বরং ইতিহাস পাঠের ভেতর দিয়ে তার জীবনের নীরিক্ষা ও তত্ত্বায়নের মাধ্যমে একটি ঘটনার সাথে আরেকটি ঘটনার যোগসূত্র এবং প্রাসঙ্গিকতা তৈরী করা। শুধু ইতিহাস নয়, ইতিহাসের যাত্রার সাথে কোরআন হাদীস মিলিয়ে বর্তমানের সঙ্গে একটা সেতুবন্ধন তৈরী করে দেয়া।
সীরাতের তুলনায় ফিকহুস সীরাত নিয়ে কাজ কম হয়েছে। কিন্তু যতটুকু কাজ হয়েছে এরমধ্যে বিখ্যাত সিরিয়ার লেখক রমজান বুতির লেখা ‘ফিকহুস সীরাতিন নাবাবিয়্যাহ’। গ্রন্থটির শুরুতে সীরাত পাঠের পদ্ধতি নিয়ে নাতিদীর্ঘ একটি আলোচনা আছে। আলোচনার কিয়দাংশ তুলে ধরছি।
সীরাত পাঠের উদ্দেশ্য
সীরাত পাঠের উদ্দেশ্য কেবল ঐতিহাসিক ঘটনার বিবরণ কিংবা নবী জীবনের চমৎকার সব গল্প পড়া নয়, বরং উদ্দেশ্য হলো নির্ধারিত নীতিমালার আলোকে তার পূর্ণাঙ্গ জীবনটাকে দেখা। শুধু ঘটনা পরম্পরা নয়, এই পরম্পরা থেকে প্রকৃত ইসলামের রূপটাকে অনুধাবন করা। সামগ্রিক জীবনকে নীরিক্ষা করার উদ্দেশ্যে সীরাত লিখতে গিয়ে কয়েকটি বিষয়ের দিকে লক্ষ্য রাখা হয়েছে।
১. জীবন ও পরিবেশের আলোকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর ব্যক্তিত্বকে বুঝা। যেন নিজের ভেতরে বিশ্বাস জন্মে—তিনি নিছক কোনো নেতা কিংবা বিস্ময়কর প্রতিভার অধিকারী ছিলেন না, যে নেতৃত্ব ও প্রতিভার যোগ্যতায় তিনি তাঁর সম্প্রদায়ের কাছে বরণীয় হয়েছেন। বরং সবকিছুর পূর্বে তিনি ছিলেন আল্লাহর প্রেরিত রাসূল; ওহি এবং বিশেষ শক্তির বলে তিনি তাকে সুউচ্চে তুলে ধরেছেন।
২. জীবনের সর্বক্ষেত্রে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যেন সর্বোত্তম আদর্শ হিসেবে মানুষের সামনে ফুটে উঠে। তাহলে তারা তাকে আদর্শ হিসেবে নিতে পারবে। এই আদর্শকে আকড়ে ধরে পথ চলতে পারবে। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে মানুষ সর্বোত্তম আদর্শই খুঁজে বেড়ায়। তাই আল্লাহ ঘোষণা করেছেন, ‘রাসূলের মধ্যেই রয়েছে তোমাদের জন্য উত্তম আদর্শ।’ (সূরা আহযাব: ২৩/২১)
৩. সীরাত পাঠ কোরআন বুঝতে এবং তার নিগূঢ় রহস্য উদঘাটন করতে সাহায্য করে। কেননা কোরআনের বহু আয়াতের ব্যাখ্যা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনার মাধ্যমে হয়ে থাকে।
৪. সীরাত পাঠের মাধ্যমে একজন মুসলমান আকিদা, আহকাম এবং আখলাকসহ সংশ্লিষ্ট সকল বিষয়ের বিশুদ্ধ জ্ঞান অর্জন করবে। কারণ এতে সন্দেহ নেই যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবন হলো ইসলামের সকল মূলনীতির সর্বোত্তম প্রকাশিত রূপ।
৫. সীরাত পাঠের মাধ্যমে ইসলামের  দাঈগণ তালীম-তারবিয়াতের জীবন্ত উপমা লাভ করবেন। কেননা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর দাওয়াতের প্রচারে সর্বোৎকৃষ্ট পন্থা অবলম্বন করেছেন।
এই সব উদ্দেশ্যগুলোই সফলভাবে অর্জিত হবে সীরাত পাঠের মাধ্যমে। কারণ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনে মানবিক এবং সামাজিক সকল শাখার সুন্দর সম্মিলন ঘটেছে। তাই সমাজের সকল শ্রেণির মানুষের জন্যই তার জীবনীতে রয়েছে সর্বোত্তম আদর্শ।
সীরাত লেখার শুরু
সীরাতকে কেন্দ্র করেই মুসলিম ঐতিহাসিকগণ সর্বপ্রথম ইতিহাস রচনা শুরু করেন। তারপর ধারাবাহিকভাবে পরবর্তি যুগের ঘটনাবলি লিপিবদ্ধ করা হয়। এমনকি ইসলামপূর্ব যুগের ইতিহাসও সীরাতকে কেন্দ্র করেই লেখা হয়েছে। যেমন জাহেলী আর ইসলামী যুগ পার্থক্যের মানদন্ডই হচ্ছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্মকাল। মোটকথা, সীরাতুন্নবী শুধু আরব উপদ্বীপই নয় বরং সমগ্র মুসলিম বিশ্বের ইতিহাসের মূল কেন্দ্রবিন্দু।
হাদীসের কিতাব লেখার পরেই শুরু হয়েছে সীরাত লেখার কাজ। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বেঁচে থাকতেই শুরু হয়েছিল হাদীস লেখার কাজ। যদিও সাহাবিরা সবসময়ই সীরাতের আলোচনা করতেন, কিন্তু সীরাত লেখার কাজ শুরু হয়েছে আরও অনেক পরে। ব্যাপকভাবে সীরাত লেখার প্রতি সর্বপ্রথম গুরুত্ব দিয়েছেন উরওয়া ইবনে যুবায়ের (মৃ:৯২ হি.)। এরপর আবান বিন উসমান (মৃ: ১০৫ হি.)। এরপর ওহাব বিন মুনাব্বিহ (মৃ:১১০ হি.) এরপর শুরাহবীল ইবনে সাদ (মৃ: ১২৩ হি.) এরপর ইবনে শিহাব যুহরী ( মৃ: ১২৪ হি.)। সীরাতের ইতিহাসে এরাই অগ্রজ আমাদের। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলো এদের কোনো সীরাতগ্রন্থ আমাদের পাছে পৌঁছেনি। তবে তাদের মধ্য থেকে ওহাব ইবনে মুনাব্বিহের ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন কিছু বক্তব্য আল্লামা তাবারি রহ. বর্ণনা করেছেন।
এরপর যারা সীরাত লিখেছেন, তাদের মধ্যে সবচে অগ্রজ মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক (মৃ: ১৫২ হি.)।
এইসব সীরাত গ্রন্থ লেখার তথ্য-উৎস ছিলো তিনটি। ১. কোরআন ২. হাদীস ৩. ঐসব রাবি, যারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সীরাতের প্রতি ব্যাপকভাবে গুরুত্ব দিতেন, তাদের বর্ণনা।
সীরাত লেখার ক্ষেত্রে তাদের পদ্ধতি ছিলো—হাদীস শাস্ত্রের মতো সনদ ও মতন এর শুদ্ধতা যাচাই করে নিয়মনীতির আলোকে গবেষণা করা। রিজালশাস্ত্রের অনুসরণ করা। কিন্তু এই নিয়মনীতির ওপর ভিত্তি করে নতুন আহকাম বের করা, বর্তমান সমস্যা সমাধানে ফলাফল বের করার সাথে ইতিহাসের কোনো সংযোগ নেই। এটা স্বতন্ত্র একটা কাজ। সীরাতে নববির ঘটনাবলীর ওপর ভিত্তি করে আকিদা এবং আচার-আচরণের অনেক আহকাম উদ্ভাবিত হয়েছে।
কীভাবে সীরাত পাঠ করবো
উনিশ শতকে এসে ইতিহাস রচনার বিভিন্ন পদ্ধতি আবিষ্কার হয়। এরমধ্যে অন্যতম হলো লেখকের চিন্তা, ধর্ম, রাজনৈতিক মতবাদ অনুযায়ী ইতিহাস লেখা। ঐতিহাসিক তত্ত্বকে বাদ দিয়ে লেখক নিজের চিন্তা ও মতামতের আলোকে ইতিহাস সাজান। ইতিহাস লেখার এই ভয়ংকর আঙ্গিকে শুরু হয় সীরাত লেখার চল। এই ধরনের সীরাতে নবুওয়ত, রিসালাত, ওহি ইত্যাদী বিশেষণের পরিবর্তে ব্যবহার করা হয় সাহসী, রাষ্ট্রনায়ক ইত্যাদি বিশেষণ। অথচ কোনো মুসলমানের জন্যই উচিৎ নয়, রাসূলকে শুধু সাহসী কিংবা রাষ্ট্রনায়ক ভাবা। কেননা এইসব শক্তি ও মহত্বের একমাত্র উৎস হলো রিসালাত এবং নবুওয়ত। এই শাখার আলোচনা বাদ দিয়ে অন্যকিছু নিয়ে আলোচনা করা অনর্থক। মনগড়া বিশ্লেষণে লেখা সীরাতের উৎকৃষ্ট উদাহরণ হুসাইন হাইকালের লেখা ‘হায়াতে মুহাম্মদ’। লেখক গ্রন্থের ভূমিকায় স্পষ্ট করে লিখেছেন, ‘আমি এখানে হাদীস-সীরাতগ্রন্থের বরাতে বর্ণিত কোনো কথা গ্রহণ করিনি। বরং বৈজ্ঞানিক  পদ্ধতিতে সীরাতের বিশ্লেষণকে প্রাধান্য দিয়েছি।’
নবুওয়ত লাভের পর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মানুষের কাছে এসে সর্বপ্রথম নিজেকে নবী বলে পরিচয় দিয়েছেন। এরপর মানুষ বলে পরিচয় দিয়ে বলেছেন, আমার যত মহত্ত্ব, তা ওই নবুওয়তের কারণেই। পূর্ববর্তী নবীগণ যে দায়িত্ব পালন করেছিলেন, আমিও সেই দায়িত্ব নিয়ে এসেছি। আল্লাহ আমাকে দাওয়াতের দায়িত্ব দিয়ে পাঠিয়েছেন।
সুতরাং তার সীরাত যখন পাঠ করবো, একজন রাসূলের সীরাত হিসেবেই তাকে পাঠ করব।
সীরাত অধয়নের সঠিক পদ্ধতি এটাই যে আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনের সকল দিক অধয়ন করবো; তাঁর জন্ম ও জন্মকাল, ব্যক্তিগত-পারিবারিক-সামাজিক-রাজনৈতিক জীবন, স্বভাব-চরিত্র, শত্রু-মিত্রের সাথে তাঁর আচরণ,দুনিয়া ও দুনিয়ার ভোগ-বিলাশের প্রতি তাঁর মনোভাব ইত্যাদি। এই অধ্যয়ন হতে হবে সনদ ও মতন এর শুদ্ধতা যাচাইয়ের শাস্ত্রীয় মূলনীতির আলোকে এবং সত্য-ন্যায়ের সন্ধানে। তবে শুধু গবেষণার জন্য গবেষণা নয়; বরং এই অধ্যয়নের মাধ্যমে আমরা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হব যে তিনি আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত সত্য নবী ছিলেন। তিনি নিজের মনগড়া কোন শরিয়ত নিয়ে আসেননি; বরং আল্লাহপ্রদত্ত শরিয়ত পূর্ণাঙ্গরূপে মানুষের কাছে পৌছে দিয়েছেন। এবং এর মাধ্যমে এই শরিয়ত পালনে আমাদের দায়বদ্ধতা অনুধাবন করতে পারব।
রমজান বুতির ‘ফিকহুস সীরাতে’র মুগ্ধ পাঠক ছিলেন মুফতি ফজলুল হক আমিনী রহিমাহুল্লাহ। তিনি কিতাবটি পড়তেন আর কাঁদতেন। একবার শেষ করে আরেকবার, আরেকবার শেষ করে আরেকবার; তবুও যেন তাঁর আশ মিটত না। তামিম রায়হানের কাছ থেকে বইটি পাওয়ার পর আনন্দে আটখানা হয়ে গিয়েছিলেন। প্রায়ই তিনি বলতেন, আরবে এমন সীরাতগ্রন্থ লেখার আলেম আছে, আমি জানতামই না। কী আজিব লেখা লিখেছেন উনি।
এই সীরাত-গ্রন্থটি পড়ে এতটাই অভিভূত হয়ে পড়েছিলেন ফজলুল হক আমিনী রাহিমাহুল্লাহ, সঙ্গে সঙ্গে তিনি রমজান বুতির কাছে একটি চিঠিও লিখে ফেললেন। চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন, আমি আপনাকে আমার অন্তর থেকে মুরুব্বি হিসেবে গ্রহণ করে ফেলেছি। আপনার কিতাব আমার অনেকদিনের জমে থাকা প্রশ্নের উত্তর খুলে দিয়েছে।
জীবনের শেষ দিনগুলোতে রমজান বুতির ফিকহুস সীরাতের সাথে মিলিয়ে ‘মাআরিফুস সীরাত’ নামে আরবিতে নবীজীবনী লিখতে শুরু করেছিলেন মুফতি ফজলুল হক আমিনী রাহিমাহুল্লাহ। কী ঘোর, কী মুগ্ধতা তাকে ছুঁয়ে গিয়েছিল, এতেই প্রমাণ হয়।

Tuesday, July 30, 2019

ছাড়ব না এ হাত তোমার

রাস্তায় যাতয়াতের সময় অনেক কিছুই চোখে পড়ে। আশাপাশের মানুষের ব্যস্ততা, যানবাহনের গতি। কেউ দ্রুততার সাথে যায়, কেউবা শ্লথ গতিতে। কেউ যায় গুরুত্বপূর্ণ কোন কাজে, কেউবা "আরে গেলেই হলো" এরকম কোন কাজে। এর ফাঁকে যে বিষয়টা এড়িয়ে যায়, সেটি হলো প্রত্যেকের অনুভূতি। ঠিক কোন এক মুহূর্তে রাস্তায় দেখা, মানুষদের কথা মনে করুন তো। হয়তো কেউ খুব আনন্দের সাথে কোথাও যাচ্ছে, হয়তো বাসা থেকে বের হওয়ার স্বামী/স্ত্রীর কোন রোমান্টিক ঘটনা ঘটে গেছে আর তার রেশ এখনো কাটেই নি। কেউ বা খুব কষ্টে আছে, কাছের কোন মানুষের থেকে হয়তো দুঃখ পেয়েছে। কেউ বা খুব টেনশনে, ভাবছে আজকে কামাই বেশি না হলে হয়তো প্রয়োজনীয় জিনিসটা কেনা হবে না বা অফিসের প্রেজেন্টেশনটা কেমন হবে আজ? ইত্যাদি ইত্যাদি।
কয়েকদিন আগে একটা দৃশ্য চোখে ধরা পড়লো। এক বৃদ্ধ, বেশ বয়স হয়েছে, দাঁড়ি পেকে সাদা থেকে হলুদ লালচে ভাব ধরে গেছে, গায়ের চামড়া যথেষ্ট ঢিল হয়ে গেছে। বয়স্ক পাঞ্জাবী গায়ে দিয়ে( বয়স্ক পাঞ্জাবী বলতে খেয়াল করবেন, বেশির ভাগ বৃদ্ধরা টরে কাপড়ের সাদা/ছাই/খয়েরী রঙের একবারে সাধারণ পাঞ্জাবী পড়তে দেখা যায়) রাস্তা পার হচ্ছে। রাস্তা পার হতেই পারে, এটা আবার বলার কি আছে? আগে পুরাটা শুনবেন তো নাকি? সে পার হচ্ছে ডান হাতে এক ব্যাগ নিয়ে আর অপর হাতে? জ্বী, বাম হাতে তাঁর প্রিয়তমা স্ত্রীর হাত। বৃদ্ধারও যথেষ্ট বয়স, বয়স্ক বোরকা পরে(থাক আর বর্ণনা দিলাম না, বুঝে নিয়েন) চেহারায় কিছুটা আতংক নিয়ে তাঁর জীবনসঙ্গী বুড়োর হাতটা যথেষ্ট ভরসার সাথে ধরে আছে।
আমি তাকিয়ে তাকিয়ে তাদের পার হওয়ার দৃশ্যটা দেখছিলাম। বৃদ্ধ বেশ সচেতন হয়েই রাস্তাড গাড়িগুলোর দিকে তাকিয়ে রাস্তা পার হওয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু বয়স হয়ে গেছে তো, চাইলেই কি আর মস্তিষ্ক আগের মতো, শরীর আগের মতো কাজ করবে? একটু পার হতেই এক রিক্সা জোরে তার সামনে দিয়ে চলে গেল, অল্পের জন্য সংঘর্ষ হয় নি। ভয়ে দুজন আবার দুই কদম পিছে চলে গেল। তারপর আবার চেষ্টা শুরু। বৃদ্ধা হয়তো জানে যে তাঁর প্রিয়তম বুড়োটার বয়স হয়ে গেছে, তাকে রাস্তায় সামলানো বেশ কষ্টই হয়ে যাবে। কিন্তু তারপরও যার সাথে ৪০-৫০ বছর পার করে দিলাম, তার সঙ্গ কিভাবে ছাড়ে। কতটা পথ দুজনে একসাথে পারি দিয়েছে। যৌবনে পেয়েছে তাকে, আজ জীবনের শেষের দিকে। কতশত ঘটনা, হাসি, কান্না এই দুজনের। কত বড় বড় বিপদে দুজন দুজনকে আগলে রেখেছে সবসময়। মান-অভিমানের পর প্রেমের গভীরতা কত যে বৃদ্ধি পেয়েছে! আর শেষ সময়ে এসে তাঁকে ছেড়ে দিব! এ হতেই পারে না, জান যায় একসাথে যাক। বুড়োটাকে ছেড়ে বাকি জীবন কাটবেই বা কেমনে! আল্লাহ্‌ যেন তুলে নেয় একসাথে, আবার জান্নাতে রেখেও দেয় একসাথে।
ওহ, আমি যে কখন তাদের পার করে চলে এসেছি মনেই নাই। ভাবনার জগতে ডুব দিলে যা হয় আর কি।

Tuesday, April 9, 2019

Collected - তালাক সম্পর্কিত কিছু ভুলত্রুটি : মাওলানা মুহাম্মাদ আব্দুল মালেক

এ সংখ্যায় শুধু এ বিষয়ে আলোচনা করাই মুনাসিব মনে হল। একটি কথা তো বারবার লেখা হয়েছে, ওলামা-মাশায়েখও আলোচনা করে থাকেন যে, অতীব প্রয়োজন (যা শরীয়তে ওজর বলে গণ্য) ছাড়া স্বামীর জন্য যেমন তালাক দেওয়া জায়েয নয় তেমনি স্ত্রীর জন্যও তালাক চাওয়া দুরস্ত নয়। তালাকের পথ খোলা রাখা হয়েছে শুধু অতীব প্রয়োজনের ক্ষেত্রে ব্যবহারের জন্য। বর্তমান সমাজে, বিশেষ করে আমাদের এতদাঞ্চলে কোনো পরিবারে তালাকের ঘটনা যে কত ফাসাদ-বিশৃঙ্খলা, জুলুম-অত্যাচার এবং ঝগড়া-বিবাদের কারণ হয় তা আর বলে বোঝানোর প্রয়োজন নেই। তালাক প্রদানের ক্ষমতাকে শরীয়তের নির্ধারিত নীতিমালার বাইরে ব্যবহার করা নিঃসন্দেহে আল্লাহর বিধানের সাথে বালখিল্যতার শামিল।
এজন্য কেউ দাম্পত্য জীবনে পা রাখার চেষ্টা করলে তার অপরিহার্য কর্তব্য হবে, বিয়ের আগেই দাম্পত্য জীবনের নিত্য প্রয়োজনীয় মাসআলাগুলোর সাথে তালাকের বিধানসমূহ জেনে নেওয়া।
তালাক অত্যন্ত স্পর্শকাতর একটি বিষয়। কেউ এই ক্ষমতার অপব্যবহার করলে কিংবা ভুল পন্থায় তা প্রয়োগ করলে সে একদিকে যেমন গুনাহগার হবে অন্যদিকে তালাকও কার্যকর হয়ে যাবে। তাই প্রতিটি বিবেচক স্বামীর দায়িত্ব হল, তালাকের শব্দ কিংবা এর সমার্থক কোনো শব্দ মুখে উচ্চারণ করা থেকে সতর্কতার সাথে বিরত থাকা।
অবশ্য অতীব প্রয়োজনে তালাক প্রদানে বাধ্য হলে স্ত্রীর পবিত্র অবস্থায় শুধু এক তালাক দিয়ে ক্ষান্ত হওয়া উচিত। এভাবে বলবে যে, ‘তোমাকে তালাক দিলাম।’ তালাকের সাথে ‘বায়েন’ শব্দ কিংবা ৩ সংখ্যা ব্যবহার করবে না। কেউ ‘বায়েন’ শব্দ বলে ফেললে (চাই তা এক বা দুই তালাক হোক না কেন) নতুন করে শরীয়তসম্মত পন্থায় বিবাহ দোহরানো ছাড়া স্ত্রীর সাথে পুনরায় মিলনের পথ বন্ধ হয়ে যাবে।
অনুরূপভাবে তিন তালাক দিয়ে ফেললে-একই মজলিসে পৃথক পৃথকভাবে তিন তালাক দেওয়া হোক কিংবা একই শব্দে তিন তালাক দেওয়া হোক- যেমন বলল, তোমাকে তিন তালাক দিলাম। অথবা আগে কখনো দুই তালাক দিয়েছিল আর এখন শুধু এক তালাক দিল। সর্বমোট তিন তালাক দেওয়া হল। যেকোনো উপায়ে তিন তালাক দেওয়া হলে বৈবাহিক সম্পর্ক সম্পূর্ণরূপে শেষ হয়ে যায়। এ অবস্থায় শুধু মৌখিকভাবে স্ত্রীকে বিবাহে ফিরিয়ে আনার যেমন কোনো সুযোগ থাকে না তেমনি নতুন করে বিবাহ দোহরানোর মাধ্যমেও ফিরিয়ে নেওয়ার পথ খোলা থাকে না।
একসাথে তিন তালাক দেওয়া কিংবা বিভিন্ন সময় তালাক দিতে দিতে তিন পর্যন্ত পৌঁছে যাওয়া একটি জঘণ্য অপরাধ ও ঘৃণিত কাজ। আল্লাহ তাআলা এর শাস্তি হিসেবে এই বিধান দিয়েছেন যে, তারা স্বামী-স্ত্রী হিসেবে পুনরায় একসাথে বসবাস করতে চাইলে স্ত্রীর ইদ্দত অতিবাহিত হওয়ার পর অন্যত্র তার বিয়ে হওয়া এবং সে স্বামীর সাথে তার মিলন হওয়া অপরিহার্য। এরপর কোনো কারণে সে তালাকপ্রাপ্তা হলে কিংবা স্বামীর মৃত্যু হলে ইদ্দত পালনের পর এরা দুজন পরস্পর সম্মত হলে নতুন করে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারে।
এজন্য শরীয়ত আগেই সাবধান করে দিয়েছে যে, প্রথমত তালাকের কথা
চিন্তাও করবে না। তবে অতীব প্রয়োজনে কখনো তালাক প্রদানের প্রয়োজন হলে শুধু সাদামাটা তালাক দাও, শুধু এক তালাক। যেন উভয়ের জন্যই নতুন করে চিন্তা-ভাবনার সুযোগ থাকে এবং পুনরায় ফিরে আসার পথ খোলা থাকে। এরপর আবারো কোনো সমস্যা দেখা দিলে এভাবেই শুধু এক তালাক দিবে। এখনও ফিরে আসার পথ খোলা থাকবে।
কিন্তু এরপর যদি আবার কখনো শুধু এক তালাকই দেওয়া হয় এবং সব মিলে তিন তালাক হয়ে যায় এ অবস্থায় আর তাকে ফিরিয়ে আনারও সুযোগ থাকবে না, নতুন করে বিয়ে করার বৈধতাও বাকি থাকবে না।
আজকাল স্বামী-স্ত্রী তালাকের বিধান জানা ও সে অনুযায়ী আমল করার পরিবর্তে নিজেদের মনে এমনসব ভুল ও বানোয়াট মাসআলা স্থির করে রাখে যে, আল্লাহ মাফ করুন।
১. তিন তালাক ছাড়া কি তালাক হয় না
যেমন, কেউ মনে করে যে, শুধু এক বা দুই তালাক দেওয়ার দ্বারা তো তালাকই হয় না। তালাকের জন্য একসাথে তিন তালাক দেওয়াকে তারা অপরিহার্য মনে করে।
মনে রাখবেন, এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। তালাক দেওয়ার সঠিক পদ্ধতি হল, শুধু এক তালাক দেওয়া। পরবর্তীতে আবারও প্রয়োজন হলে শুধু এক তালাকই দিবে। এরচেয়ে বেশি দিবে না। কিন্তু তিন তালাক দিয়ে ফেললে তাদের দাম্পত্য সম্পর্ক বহাল রাখার সকল পথ বন্ধ হয়ে যাবে।
একই মজলিসে কিংবা একই শব্দে তিন তালাক দেওয়া হারাম ও কবীরা গুনাহ। কিন্তু কেউ এমনটি করলে তালাক কার্যকর হবে এবং তাদের বৈবাহিক সম্পর্ক সম্পূর্ণভাবে শেষ হয়ে যাবে।
২. তালাকের সাথে কি বায়েন শব্দ ব্যবহার করা জরুরি
অনেকে মনে করে, শুধু তালাক বললে তালাক হয় না; বরং তালাকের সাথে ‘বায়েন’ শব্দও যোগ করা অত্যাবশ্যক।
এটিও ভুল ধারণা। শুধু তালাক শব্দ দ্বারাই তালাক হয়ে যায়। এর সাথে ‘বায়েন’ শব্দ যোগ করার কোনো প্রয়োজন নেই। উপরন্তু এ শব্দের সংযোজন নাজায়েয। তবে কেউ যদি এক তালাক বায়েন বা দুই তালাক বায়েন দেয় তবে সে মৌখিকভাবে রুজু করার (পুনরায় স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করার) পথ বন্ধ করে দিল। এখন শুধু একটি পথই খোলা আছে। আর তা হল, নতুনভাবে শরীয়তসম্মত পন্থায় বিবাহ দোহরানো। অথচ শুধু তালাক বললে এক তালাক বা দুই তালাক পর্যন্ত মৌখিক রুজুর পথ খোলা থাকে। এজন্য স্বামীর উচিত, যত উত্তেজিতই হোক না কেন, কোনো অবস্থাতেই যেন তিন তালাক না দেয়। এমনকি তা কখনো মুখেও না আনে। অথচ অনেকে তো তিন তালাক দেওয়ার পরও পৃথকভাবে ‘বায়েন’ শব্দ যোগ করেন। যেন সব কটি তালাক দেওয়ার পরও তার মন ভরল না। না হলে তিন তালাক দেওয়ার পর আর কী বাকি থাকে যে, ‘বায়েন’ শব্দ বলতে হবে?!
মনে রাখবেন, তিন তালাক দেওয়াই এক গুনাহ, এরপর ‘বায়েন’ শব্দ যোগ করে সে আরো বেশি গুনাহগার হল।
৩. একসাথে তিন তালাক দিলে কি তালাক হয় না
অনেকে এই ভুল ধারণাও প্রচার করে রেখেছে যে, একসাথে তিন তালাক দেওয়া হলে তালাক হয় না কিংবা শুধু এক তালাক হয়।
এটিও একটি মারাত্মক ভুল। একসাথে তিন তালাক দেওয়া জায়েয না হলেও কেউ যদি এই নাজায়েয কাজ করে তাহলে তার স্ত্রীর উপর তিন তালাক ঠিকই পতিত হয়। এক্ষেত্রে তার মৌখিকভাবে রুজু করার অধিকার অবশিষ্ট থাকে না। এমনকি নতুন করে বিবাহ দোহরিয়ে নেওয়ার দ্বারাও তারা একে অপরের জন্য হালাল হতে পারে না। তাই সকল স্বামীরই কর্তব্য, প্রথম থেকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকা। মুখ দিয়ে কখনো তিন তালাক কিংবা তালাক, তালাক, তালাক শব্দ উচ্চারণ না করা। আর আগেই দুই তালাক দিয়ে থাকলে এখন আর তৃতীয় তালাকের চিন্তাও না করা।
৪. গর্ভাবস্থায় তালাক দিলে কি তালাক পতিত হয় না
অনেকে এই মাসআলা বানিয়ে রেখেছে যে, গর্ভাবস্থায় স্ত্রীকে তালাক দেওয়া হলে তা কার্যকর হয় না। এটিও সম্পূর্ণ অবাস্তব কথা। গর্ভাবস্থায় হোক বা অন্য যেকোনো অবস্থাই হোক তালাক দেওয়া হলে তা পতিত হয়ে যায়। এজন্য সঠিক মাসআলা শেখা সকলের দায়িত্ব। অজ্ঞতার ধোকায় থাকার কারণে হারাম কখনো হালাল হতে পারে না।
৫. তালাক পতিত হওয়ার জন্য কি সাক্ষীর উপস্থিতি জরুরি
অনেকের ধারণা, স্বামী তালাকের সময় কোনো সাক্ষী না রাখলে তালাক পতিত হয় না। আগেরটার মতো এটাও মানুষের মনগড়া মাসআলা। কোন মূর্খ এই কথা বলেছে জানা নেই। সাক্ষীর প্রয়োজন তো হয় বিবাহের সময়। তালাক পতিত হওয়ার জন্য এক বা একাধিক কোনো সাক্ষীরই প্রয়োজন নেই। স্বামী যদি রাতের অন্ধকারে একা একা বসে তালাক দেয় তাহলেও তালাক হয়ে যায়।
৬. রাগের অবস্থায় তালাক দিলে কি তালাক হয় না
তালাক তো দেওয়াই হয় রাগ হয়ে। কয়জন আছে, শান্তভাবে তালাক দেয়? আসলে তো এমনই হওয়া উচিত ছিল যে, যদি বাস্তবসম্মত ও অনিবার্য প্রয়োজনে বৈবাহিক সম্পর্ক ছিন্ন করতে হয় তাহলে বড়দের সঙ্গে পরামর্শ করে একে অন্যের কল্যাণকামী হয়ে বুঝে-শুনে, সঠিক মাসআলা জেনে নিয়ে মাসআলা অনুযায়ী তালাক প্রদানের মাধ্যমে বৈবাহিক সম্পর্ক ছিন্ন করবে।
কিন্তু আফসোস! অধিকাংশ মানুষ মাসআলা জানার চেষ্টাও করে না, আর না তাদের মধ্যে এই সুবুদ্ধি আছে যে, বড়দের সাথে পরামর্শ করবে, চিন্তা-ভাবনা করবে। নিজের ইচ্ছাবিরোধী কোনো কিছু পেলেই রাগের বশে তালাক দিয়ে ফেলে। আর তা এক বা দুইটি নয়; এক নিঃশ্বাসে তিন তালাক।
যখন রাগ প্রশমিত হয় তখন অনুতপ্ত হয় এবং বিভিন্ন ধরনের কথা বানাতে থাকে। বলে, আমি রাগের মাথায় বলে ফেলেছি, তালাক দেওয়ার ইচ্ছা ছিল না। এসব লোকের জেনে রাখা উচিত যে, তালাক পতিত হওয়ার জন্য নিয়তের কোনো প্রয়োজন নেই। এটা কোনো ইবাদত নয় যে, এর জন্য নিয়ত করতে হবে। নিয়ত থাক বা না থাক সর্বাবস্থায় তালাক শব্দ বলে ফেললে বা কাগজে লিখে দিলেই তালাক হয়ে যায়। তেমনিভাবে রাগের অবস্থায় তালাক দিলেও তালাক হয়ে যায়, এমনকি হাস্যরস বা ঠাট্টাচ্ছলে তালাক দিলেও তা পতিত হয়ে যায়।
অবশ্য কেউ যদি প্রচন্ড রেগে যায় ও রাগের ফলে বেহুঁশ হয়ে পড়ে আর এ অবস্থায় সে কী বলেছে তার কিছুই মনে না থাকে তাহলে ঐ অবস্থার তালাক কার্যকর হবে না।
শেষকথা এই যে, দাম্পত্য জীবন আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে অনেক বড় ও বিশেষ একটি নেয়ামত। স্বামী-স্ত্রী সকলের কর্তব্য, এই নেয়ামতের যথাযথ মূল্যায়ন করা এবং একে অপরের সকল অধিকার আদায় করা। স্ত্রীর জন্য উচিত নয়, কথায় কথায় স্বামীর কাছে তালাক চাওয়া। আবার স্বামীর জন্যও জায়েয নয় আল্লাহ তাআলার দেওয়া ক্ষমতার অপব্যবহার করা।
বিয়ে, তালাক ও দাম্পত্য জীবনের সকল বিধান ও মাসআলা শিক্ষা করা স্বামী-স্ত্রী উভয়ের জন্য জরুরি। বিশেষ করে স্বামীর কর্তব্য হল, তালাকের মাসআলা ও এর পরিণতি সম্পর্কে অবগত না হয়ে মুখে কখনো তালাক শব্দ উচ্চারণ না করা। আর যদি কোনো কারণে তালাক দেয় এবং এমনভাবে দেয় যে, এখন আর তাদের একসাথে থাকা শরীয়তে বৈধ নয় তাহলে তাদের আল্লাহকে ভয় করা উচিত। বিভিন্ন টাল-বাহানা, অজুহাতের আশ্রয় নিয়ে কিংবা ভুল কথার উপর ভিত্তি করে অথবা মূল ঘটনা গোপন রেখে একসাথে বাস না করা উচিত। বিয়ে শুধু একটি সময়ের বিষয় নয়, সারা জীবনের বিষয়।
বাস্তবেই যদি তালাক হয়ে যায় এবং শরীয়তের দৃষ্টিতে বৈবাহিক সম্পর্ক শেষ হয়ে যায় এরপরও স্বামী-স্ত্রী হিসেবে একসাথে বাস করে তাহলে তা হবে কবীরা গুনাহ এবং উভয়েই যেন ব্যভিচারের গুনাহয় লিপ্ত।
আল্লাহ তাআলা সকলকে হেফাযত করুন এবং তাকওয়া ও পবিত্রতা দান করুন। আমীন।

One

অনেক ধরনের চিন্তা মাথায় ঘুরপাক খায়। খেয়ে দেয়ে আবার ক্লান্তও হয়ে যায়। যার কিছু হয়তো ভাল, আবার কিছু হয়তো কালো। তেমনি আজ একটা বিষয় মাথায় আসলো।...