মানুষের মতোন মানুষ হওয়া মানে আপনি যা চেয়েছেন তা হয়তো এরকম,- আমি যেন আদর্শিক, নৈতিক, মানবিক বোধ সম্পন্ন হিসেবে গড়ে উঠি।
বাবা, আমি মানুষের মতোন মানুষ হবার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করে যাচ্ছি।
সেই শিশুকাল থেকে আজ অবধি আপনি আমাকে আপনার বাহুডোরে, আদরের খাঁচায়, পরম মমতা আর ভালোবাসা দিয়ে আগলে রেখেছেন।
পূরণ করেছেন আমার সকল শখ, আহ্লাদ। মিটিয়েছেন আমার সমস্ত চাহিদা। আপনার আঙুল ধরে মক্তবে যাওয়া থেকে শুরু করে প্রাইমারীর সেই প্রথম পাঠ- সবই আজো আমার স্মৃতির পাতায় পরম যত্নে তোলা আছে।
যখন আমি প্রচন্ড কান্না করতাম, আপনি আমায় বুকে জড়িয়ে আদর করতেন। আমার গালে চুমু খেতেন।
প্রচন্ড বদমেজাজি ছিলেন শুনেছি। অথচ, আমার শৈশবে কখনো আমাকে জোরে একটি থাপ্পড় দিয়েছেন- এমনটি মনে পড়ে না।
কৈশোরে, যখন আমি জগৎটাকে একটু ভালোভাবে বুঝতে শুরু করেছি মাত্র, তখন আপনি আবির্ভূত হলেন সম্পূর্ণ এক নতুন ভূমিকায়।
আমায় হাতে-কলমে শেখাতে লাগলেন ভালো আর মন্দের মধ্যকার পার্থক্য।আমায় বুঝিয়েছিলেন কীসে আমার ভালো হবে, কীসে খারাপ।
যেবার স্কুল থেকে ফুটবল টুর্নামেন্ট খেলতে গিয়ে পা মচকে এসেছিলাম, সেদিন আপনি ব্যবসায়িক কাজে বাইরে ছিলেন। টেলিফোনে সে রাতে আম্মুকে খুব বকাঝকা করেছিলেন আমার জন্যে। তবুও, আমায় একটুও বকলেন না সেদিন। আম্মু আমার মচকে যাওয়া পায়ে মলম লাগাতে লাগাতে বিড়বিড় করে আমায় বকছিলো আর আপনার উপরে জমা ক্ষোভটা আমার উপরেই ঝাঁড়ছিলো।
যখন আমি স্কুলজীবন শেষ করে কলেজ জীবনে পা রেখেছি, তখনও প্রতিটা পদে পদে আপনি ছিলেন আমার ছায়া সঙ্গী। আমার সমস্ত প্রয়োজনে, সমস্ত আকাঙ্ক্ষায় আপনি ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিলেন সর্বদা।
কলেজ জীবন শেষ করে যখন বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে প্রবেশ করেছি, তখন হয়তো আপনি বুঝে গিয়েছিলেন যে, আপনার ছোট্ট বাবুটা আর ছোট্ট নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচে উঁচু সিঁড়িতে সে তার পদচারণা দিয়ে ফেলেছে।
সেবার আমায় বলেছিলেন,- 'তোমার ভালো-মন্দ এখন থেকে তোমাকেই ঠিক করতে হবে।তোমার সিদ্ধান্ত তোমাকেই নিতে হবে। এখন তুমি যথেষ্টই বড় হয়েছো।'
আমি জানি আপনার সেদিনের সেই কথাগুলো ছিলো কেবলই আনুষ্ঠানিকতা মাত্র। জীবনের সিদ্ধান্তগুলো কীভাবে নিতে হবে, তার বীজ তো খুব ছোটবেলাতেই আপনি আমার মধ্যে রোপন করে দিয়েছেন। আপনি কেবল দেখতে চেয়েছেন, আপনার রোপন করা সেই বৃক্ষের শিকড় কতোটা গভীরে প্রোথিত হয়েছে।
বাবা, আজ পর্যন্ত জীবনের প্রতিটা সময়ে আমি আপনার সান্নিধ্য পেয়ে এসেছি। আপনার গাইডলাইন, আপনার নির্দেশনা, সবকিছুই ছিলো আমার জন্য জীবনের পাথেয়।
আমাকে মানুষের মতোন মানুষ করতে যতোটা কাঠখড় পুঁড়ানো দরকার, তার কোন কমতি হতে আপনি দেন নি।
আপনার সেই ছোট্ট বাবু, যাকে সুযোগ পেলেই কাঁধে নিয়ে ঘুরতেন, সে আজ যুবক হয়ে উঠেছে।
প্রিয় বাবা, আপনাকে আজ একান্ত কিছু বলতে ইচ্ছে করছে। আমার জীবনের প্রথম বন্ধু তো আপনিই। আমার প্রথম বন্ধু, প্রথম সহপাঠী, প্রথম সহচর, প্রথম খেলার সাথী- সবকিছুই আপনি। আমার জীবনে যা কিছু প্রথম, সবকিছুতেই আপনি আছেন।
বাবা, আমি এখন যথেষ্টই বড় হয়েছি।চলে এসেছি একটা কঠিন সময়ে, একটা কঠিন বয়সে।
এই সময়, এই বয়স এতোটাই কঠিন যে, লজ্জা শরমের মাথা খেয়ে এই কঠিন বয়স আর কঠিন সময়ের কথা আপনাকে লিখতে বসে গেলাম। প্রথমেই, এরজন্য আমি আন্তরিকভাবে দুঃখিত। কিন্তু আমি মনে করি, জীবনের প্রতিটা কঠিন সময়ে আপনি যেভাবে আমার পাশে ছিলেন, ঠিক এই সময়টাতেও আপনার সান্নিধ্য, আপনার পরামর্শ, আপনার সাহায্য, সহযোগিতা আমার দরকার। শুধু দরকার নয়, খুবই দরকার।
বাবা, আমার যৌবন যুগের সাথে আপনার যৌবন যুগের একটা পার্থক্য আছে।ঠিক এই বয়সটাতে আমি প্রযুক্তির যে অভাবনীয় সুবিধা ভোগ করছি, আপনি তা আপনার সময়ে কল্পনাও করতে পারেন নি।
প্রযুক্তি সবকিছু আমাদের একদম হাতের মুঠোয় এনে দিয়েছে। এই সুবিধার যেমন বিশাল একটি ভালো দিক রয়েছে, ঠিক তেমনি রয়েছে বিশাল একটি খারাপ দিকও।
এখানে, এই ভার্চুয়াল বিশ্বে ভালো জিনিসগুলো যেমন আমাদের একদম হাতের নাগালে, ঠিক সেরকম খারাপ জিনিসগুলোও আমাদের একেবারে নাকের ডগায়।
প্রিয় বাবা! বর্তমান যুগ হলো একটি ফেৎনার যুগ।
এখানে, বাসা থেকে শুরু করে শহরের অলি-গলি, ক্যাম্পাস থেকে ক্যান্টিন, রাস্তাঘাট, পার্ক, উদ্যান, ইন্টারনেট থেকে শুরু করে মোবাইল ফোন, - সবখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে ফেৎনা। ফেৎনা বলতে আমি কী বুঝাতে চাইছি আপনি নিশ্চই এতক্ষণে ধরে ফেলেছেন। জ্বী হ্যাঁ।
যৌবনের এই চরম সময়ে এসে, চারদিকের এতো এতো চোখ ধাঁধানো দুনিয়াবি ফেৎনা থেকে আমি বাঁচতে চাই।
বাবা, আমার হাতে একটি স্মার্টফোন আছে। টেবিলের উপরে আছে একটি ল্যাপটপ।মন চাইলে নিষিদ্ধ বায়বীয় পাতায় ঢুঁ মারার মতো যথেষ্ট ডাটা সর্বদা আমার ফোনে মজুদ থাকে।
কসম আল্লাহর! আমি চেষ্টা করি নিজেকে সংযত রাখার। আমি চেষ্টা করি নিজেকে সামলে রাখার। কিন্তু, আমার এই যে টগবগে তারুণ্য! শরীরে যৌবনের এই যে বারিধারা, এটাকে আমার বড্ড ভয় হয় বাবা।
আমি কতক্ষণ নিজেকে ধরে রাখতে পারবো?
ভয় হয়, যদি বিগড়ে যাই? যদি শয়তানের ওয়াসওয়াসায় পড়ে ভুলে যাই নিজের গন্তব্য? নিজের আদর্শ? যদি কোন সুদর্শিনী রমণীর ফাঁদে (খুব সচেতনভাবেই ফাঁদ বলছি, কারণ, বিবাহপূর্ব সকল বেগানা নারী-পুরুষের মধ্যকার অবাধ মেলামেশা, সম্পর্ক আমার ধর্ম হারাম করেছে) পড়ে বিসর্জন দিয়ে বসি আমার নৈতিকতা?
বড্ড ভয় করে বাবা, বিশ্বাস করুন।
ভাবছেন, এর থেকে পরিত্রাণের কী উপায় আছে? কী সলুশ্যনই বা আমি চাইছি আপনার কাছে,তাই না?
অকপটে বলি- বিয়ে........।
আমি আবারো দুঃখিত বাবা এভাবে বলার জন্যে।
আমাদের বয়েসী ছেলেদের বাবা-মায়েদের ধারণা,
ছেলে পড়াশুনা শেষ করে, ভালো চাকরি-বাকরি ধরে নিজের অবস্থানটা পাকাপোক্ত করতে পারলেই যেন সে বিয়ের উপযুক্ত হয়।
খুবই ভুল ধারণা বাবা, খুবই ভুল। এই পড়ালেখা শেষ করে, চাকরি-বাকরি জোগাড় করতে গিয়ে সন্তান যে কতোটা অধঃপতনে চলে যায়, তা যদি বাবা-মা'রা বুঝতেন।ক্যাম্পাসে এসে যদি তারা দেখতেন এইখানে উনাদের সন্তানেরা কোন পরিবেশে, কোন পরীক্ষার মধ্য দিয়ে প্রতিনিয়ত দিন পার করে!!
বাবা! ভাবছেন, চাকরি-বাকরি না করতে পারলে আমাকে বিয়েটাই বা কে করবে, তাই না?
আরেকটি ভুল ধারণা! বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া একটা ছেলে এতোটাই বেকার, এতোটাই অসহায় নিশ্চয় নয় যে, সে একজন স্ত্রীর ভরণ পোষণের ভার নিতে পারবে না।
ভাবছেন, কোন বাবা-মা সাহস করবে বেকার ছেলের হাতে মেয়ে বিয়ে দেওয়ার, তাই না?
কোন দ্বীনদার যুবক, যার হয়তো কোন বড় প্রতিষ্ঠানে চাকরি নেই, কোন বড় ব্যাংকে হয়তো সে গলায় টাই ঝুলিয়ে অফিস করে না, কিন্তু একনিষ্ঠতার সহিত দ্বীন পালন করছে। খুব ঝমকালো না হোক, মোটামুটি স্বচ্ছলতার সহিত সে চলতে পারছে- এরকম কারো কাছে আপনার মেয়েকে বিয়ে দেওয়ার সাহস করে ফেলুন, দেখবেন আপনার ছেলে, যারও বড় কোন চাকরি নেই, বড় ব্যাংকে জব নেই, কিন্তু দ্বীন পালনের চেষ্টা করে, তার হাতে অন্য কোন দ্বীনদার মেয়ের বাবা তার মেয়ে তুলে দেওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে যাবে।
রাসূল (সাঃ) বলেছেন,- 'সকল কাজ নিয়্যাতের উপর নির্ভরশীল।'
আপনার মেয়ের বিয়েতে আপনি এমনভাবে মোহরানা ধার্য করুন, যাতে আপনার মেয়ের ভাবি জামাই, যার সাথে আপনার মেয়ের আত্মিক বন্ধন হতে চলেছে, যার সাথে আপনার মেয়ে সারাজীবন কাটাবে, তার উপরর যেন কোন চাপ না সৃষ্টি হয়।
তাহলে আপনার ছেলের ক্ষেত্রেও তাই হবে।
মেয়ের বাবা হিসেবে আপনি যা ত্যাগ করবেন, সন্তানের বাবা হিসেবে আপনি তা-ই ফেরত পাবেন।
বাবা, বিয়েটা সুন্নত! সন্তানকে সঠিক সময়ে সুন্নত পালনে সাহায্য করাটা পিতা মাতার অন্যতম দায়িত্ব। বলছিনা যে আপনারা এই দায়িত্ব থেকে গাফেল। শুধু বলছি, সময়টা বড্ড কঠিন।
রিয্বীকের বিলি বন্টন তো আসমান থেকেই নির্ধারিত হয়।
বিয়ে করে কেউ না খেয়ে মরেছে, কিংবা ফকির হয়ে গেছে, এরকম নজির সম্ভবত পৃথিবীতে নেই।
রাসূল (সাঃ) যুবকদের বিয়ে করার নির্দেশ দিয়েছেন, সম্ভব না হলে রোজা রাখতে বলেছেন। তিনি জানতেন, যৌবনের সময়টা বড্ড কঠিন! বড্ড নিষ্ঠুর!
বাবা, অকপটে লিখে ফেলেছি।কারণ, আমি ফেৎনা থেকে নিজেকে বাঁচাতে চাই। যদি ভাবেন আমি ভুল কিছু বলেছি বা ভুল কিছু চেয়েছি, আমায় ক্ষমা করবেন।
ইতি,
আপনার আদরের পুত্র।
(এই চিঠিটা যদি কোন 'বাবা' পড়েন, তিনি বাবার ভূমিকায় পড়বেন, যদি কোন মা পড়েন, মায়ের ভূমিকায় পড়বেন। যদি কোন বিবাহিত বড় ভাই পড়েন, বড় ভাইয়ের ভূমিকায় পড়বেন, বিবাহিত বড় বোন পড়লে, বড় বোনের ভূমিকায় পড়বেন। আর বাকিরা (যাদের সমস্যা নিয়ে লেখা) 'আদরের পুত্রসন্তান/ কন্যা সন্তান' এর ভূমিকায়
'বাবার কাছে পত্র'/ আরিফ আজাদ
No comments:
Post a Comment