Tuesday, May 16, 2017

কাছে আসার গল্প - ০৫

                                             কাছে আসার গল্প - ০৫

আমি থেমে আছি, পৃথিবী চলে যাচ্ছে। গাছ যাচ্ছে, বাড়ি যাচ্ছে, আকাশের মেঘগুলো যাচ্ছে। আমি ট্রেনে বসে বসে তাকিয়ে আছি। তার কথা চিন্তা করছি। কিভাবে কথা বলবো? কিভাবে তাকাবো? ঘাবড়ে যাবো কিনা? এসব ভাবছি আর আনমনেই হেসে যাচ্ছি। আমার বন্ধু পাশে থেকে খোচা দিল। মনে হয় বলছ যে, আমি মনে পাগল হয়ে গেছি। বলুক, আমার তো এমন চিন্তায় পাগল হতে ক্ষতি নাই। এই ট্রেনগুলো কেমন জানি, কু ঝিক ঝিক ঝিক, করে না। আগে গল্প শুনতাম যে, ট্রেনে উঠলে নাকি ট্রেনের কু ঝিক ঝিক না শুনলে ট্রেন যাত্রার মজাই পাওয়া যায় না।আর এখন কিসব শব্দ "ঘট ঘট, ঘট ঘট"।
আমি বাহারুল। পড়ি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে, ওহ দুঃখিত পড়তাম। অনেকদিন পর বাসায় যাচ্ছি। সেই দেড় মাস হলো বাসা থেকে ক্যাম্পাসে গিয়েছিলাম। কি কারণে?? কারণটা আমার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে আজাইরা কাজ মনে হয়। অথচ এটা দিয়েই নাকি মানুষের ভবিষ্যত নির্ধারণ হয়। ওহ! কাজ টা হলো পরীক্ষা, সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষা দিয়ে আসলাম। মরার পরীক্ষার জন্য মাথা হ্যাং হয়েছিল এই কয়দিন। আজ পরীক্ষা শেষ হতেই দৌড় দিলাম শাটল ট্রেনের দিকে, ব্যাগ আগেই গুছিয়ে রেখেছিলাম। শেষ পরীক্ষা নাকি সবাই ভাল করে দেয়, আর আমি বাড়ি যাওয়ার চিন্তা ও ব্যাগ গোছানোর চিন্তায় পড়াই হয় না। কালও তাই হলো, ফলাফল পরীক্ষা ভাল হওয়ার বদলে হলো মোটামোটি। ব্যাগ নিয়ে ট্রেন ধরতে বের হয়ে দুই বন্ধুর অপেক্ষা করছিলাম। ওদের জন্য দেরি হওয়াতে যখন রওনা দিলাম, তখন ট্রেন ছাড়ার জন্য শেষ হুইসেল দিলো আর অমনি আমরা দৌড় ব্যাগ কাধে নিয়ে। আমি আগে আগে দুই বন্ধু পিছে পিছে আর এদিকে উপর থেকে বৃষ্টি টপটপ করে পড়ছে। দৌড়াতে দৌড়াতে পড়ে যাওয়ার শব্দে যখন পিছনে তাকালাম তখন দেখি এক বন্ধু পিছলে মাটিতে পড়ে আছে। ওর অবস্থা দেখে হাসবো, না দৌড়াবো, না ওকে তুলবো? কি যে এক অবস্থা। সব বাদ দিয়ে ট্রেনের পিছনেই দৌড় দিলাম। ট্রেনের কাছে পৌছাতেই দেখি যে, একটা ইঁদুর ঢোকারও জায়গা নেই, ঠেলাঠেলি করা যাবে, কিন্তু পরক্ষণে বন্ধুদের কথা মনে পড়ে আর ট্রেনে উঠলাম না। পরের ট্রেনে রওনা দিলাম।

ট্রেন থেকে নেমে যোহরের নামায পড়ে বাসে উঠলাম। নামাযে খুব দুআ করলাম সফর সহজ হওয়ার জন্য যেন রাস্তায় জ্যাম না লাগে। দুআ কবুল হইছে মনে হয়। জ্যাম ছাড়াই চট্টগ্রাম থেকে বের হলাম। আকাশ থেকে গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি নামছে, ঠান্ডা বাতাস শরীরকে শিহরিত করে যাচ্ছে। শুনেছি এমনও দিনে নাকি তাহার কথা মনে পড়ে। আমার সাথেও ব্যতিক্রম হলো না। কিন্তু দুঃখের বিষয় এই যে, মনে করার জন্যও তো কিছু স্মৃতি থাকার দরকার। আমার এক বাইট মেমোরি পরিমান স্মৃতিও নাই। এই দুনিয়াতে আমিই মনে হয় এক ব্যক্তি যে বিয়ের দেড় মাস পরও তার বউকে দেখা তো দূরে থাক, কথা পর্যন্তও হয় নি। বিশ্বাস হচ্ছে না?? তাহলে শুনুন এই হতভাগার গল্প।
আমি ছোট থেকেই ইসলাম ধর্মীয় অনুশাসনে বড় হয়েছি। বাবা-মা আর আমি তিন জনের পরিবার। বাবা-মা ছোট বেলা থেকেই ধর্ম পালনে উৎসাহ দিতেন যদিও কেউ মাদ্রাসায় পড়েনি। আমাকে ছোটতে তিন বছর মাদ্রাসায় পড়িয়ে স্কুলে দিয়েছেন। ইন্টার পড়ার পর যখন ভার্সিটিতে গেলাম, তখন ওখানকার পরিবেশে ছেলে মেয়েদের বেলাল্লাপানা, ফ্রি মিক্সিং দেখে মন অতিষ্ট হয়ে যাচ্ছিল। দাঁড়ি কাটার মতো দুর্ভাগ্য হয় নি, পাঞ্জাবি টুপিও ছিল বিধায় গুনাহের পরিবেশ থেকে বাঁচা সহজ ছিল। কিন্তু প্রথম বর্ষে সিট নাই গণরুমে থাকার ফলে ব্যাচমেটদের সব উল্টাপাল্টা কথা কানে আসতোই। কিভাবে তারা আজ বান্ধবী জুটিয়েছে, কি কি কথা বলছে, তাদের শারীরিক গঠনের বর্ণনা, উফ!! মন ধরে রাখাই কঠিন। দিনকে দিন এসবের পরিমান বেড়েই চলছিল। আমিও তো মানুষ, আমার ভিতরও তো স্বাদ আল্লাদ আছে। উপায় না দেখে আম্মাকে বললাম সমাধান বের করতে। আমি ছোট থেকেই বাবা-মার খুব সাহায্য পেয়েছি। যাকে বলে বন্ধুর মতো। এমন কি বয়ঃসন্ধি কালে বিভিন্ন পরিবর্তন আসলে বাবা আমাকে বসিয়ে খুব সুন্দরভাবে সব বুঝিয়ে দিয়েছে। যখন বন্ধুদরে দিকে তাকাই তাদের দেখি তারা অন্যদের থেকে বিষয়গুলো খারাপভাবে জেনে অনেক গুনাহে জড়িয়ে পড়েছে। আম্মা দেখি হাসে আমার কথা শুনে। এরপর দ্বিতীয় বর্ষে থাকতে আম্মা বললো আমার জন্য পাত্রী দেখা শুরু করছে। আহ! মনে মনে আলহামদুলিল্লাহ্‌ বললাম। তারপর তাহাজ্জুদে শুকরিয়া আদায় করলাম। শুরু হলো বিয়ের প্রস্তুতি আমার। এ ভাই সে ভাই, অমুক তমুক সবার কাছে গেলেই বিয়ে বিষয়ে আলোচনা করতাম। নেটে, লাইব্রেরী যেখানে সুযোগ পেতাম বিয়ে বিষয়ে বইগুলো সংগ্রহ করতাম। পড়তাম আর বিয়ের গুরুত্ব ও দায়িত্ব দুটোর জন্যই মানসিক প্রস্তুতি নিতে শুরুরু করলাম। সমাজের কত শত লোক বিয়ে শুধু এজন্যই করে কারণ তার পূর্ব পুরুষ বিয়ে করেছিল। বিয়ে যে কত বড় একটা নিয়ামত এবং কত বরকত, কল্যাণ এর মাঝে লুকিয়ে আছে তা আদ্যো উদ্ধার করতে পারে না। কার কি অধিকার, কি কর্তব্য, সমাধান কোথায় সব যেন বেখবর। ফলাফল পারিবারিক সমস্যার পাহাড়ে একবার উঠতে হয় তো আরেক বার নামতে হয়। সব যখন ঠিক ছিল তখনই বের হলো সমাজের দ্বীনদার নামে কিছু লোকজনের আসল মুখ। বাহিরের দৃষ্টিতে দ্বীনদার হলেও এসব মানুষও কম দুনিয়ামুখী না। আমার আম্মা কয়েক জন মেয়েকে পছন্দ করলেও তাদের অভিভাবক যখন জানতে পারছে পাত্র এখনও ছাত্র, তখন আর কথাবার্তা এগিয়ে যায় নি।

সময় তার নিজস্ব ধারায় চলছে, আর আমি আমার। সেমিস্টারেরর পর সেমিস্টার চলে যায়। সুসংবাদের কোন খোঁজ নাই। চারপাশের পরিবেশ বরই বেমানান আমার সাথে। মাস খানেক পর পর আম্মা বলে যে পাত্রী দেখে আসলাম, কিন্তু যখনই বলে পাত্র এখনও ছাত্র আর না করে দেয়। এ যেন স্যারদের কাছে ব্যবহারিক খাতা নিয়ে যাওয়ার মতো, যত ভালোই করি স্যার ছুড়ে মারবেই। অথচ আমার আশেপাশের মানুষজন গোপনে প্রকাশ্যে অবৈধ প্রেম নামক গার্লফ্রেন্ড-বয়ফ্রেন্ড নামক সম্পর্ক চালিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে ভ্যালেন্টাইন দিবসগুলোর দিনে আরো সুযোগ পেয়ে যায়। ভ্যালেন্টাইন দিবস বলতে, যে কোন দিবসই হোক না, এসব গার্লফ্রেন্ড-বয়ফ্রেন্ডরা সব দিবসেই শোকদিবস বা সুখদিবস হোক সাজগোজ করে ক্যাম্পাসটাকে ডেটিং স্পট বানিয়ে দেয়। আর যদি কনসার্ট থাকে, তাহলে তো কথাই নাই, রাত দশটা অবধি তাদের "কাছে আসার নোংরা গল্প" বানানোর সুযোগ হয়ে যায়। আমার তো ঐ দিনগুলোতে হল থেকে বের হতেই খারাপ লাগতো। হলে রাত যত গভীর হয় ওদের কার্যক্রম ততো সক্রিয়তা লাভ করে। আর আমি ফেসবুকে স্ক্রল করতে করতে হাঁপিয়ে উঠি।
দেখতে দেখতে ফাইনাল সেমিস্টারে পৌঁছালাম, কিন্তু বসন্তের কোকিল কুহু কইয়ে ডাক দিল না। মনে হয় "মরার কোকিলে" অন্য কাউকে জাগাইতে গেছে।
কয়দিন পর ফাইনাল পরীক্ষা, তাই ভাবলাম বাড়ি থেকে মনের অবসাদ দূর করে আসি।
আসলে মাবূদ অন্য কিছুই লিখে রাখছিল ভাগ্যে। ছুটি কাটিয়ে ফিরবো কিছুদিনের মধ্যে, এরই মধ্যে শুনি সুখবর এসে গেছে। আম্মা একটা পাত্রী দেখে আসছে, তারা রাজী হয়ে আমার পোড়া কপালকে নতুন প্রাণ দিয়েছে। আমাকে দেখে আসতে বললে আমি বললাম আপনাদের পছন্দই আমার পছন্দ। ঐ সিদ্ধান্ত যে আমাকে এতো ভোগাবে তা কল্পনাও করি নি। আসলে উপরে সাহসী হলেও যখন বিয়ের সব ঠিক দেখলাম, মনের ভিতর এতো ভয় কাজ করলো যে, মনে হলো সুন্দরবনে যেয়ে বাঘের দুআ নিয়ে আসি। যাই হোক ভয়ের পরবর্তী অবস্থা হলো, বিয়ের আগে বের হওয়া বন্ধ করলাম। এমনকি কারও সাথে পরামর্শও করলাম না। বিয়ের দিন পরলো হলে ফেরার আগের দিন শুক্রবারে।
অবশেষে সেই প্রত্যাশিত দিন এসে গেল। পাগড়ি পরে রাজা চলল তার রাণীকে উদ্ধারের জন্য। শ্বশুর বাড়ির লোকজন যথেষ্ট ধার্মিক হওয়ার কারণে বিয়ে সবার ইচ্ছাতে মসজিদেই হলো। বিয়ের পূর্ব মুহূর্তে আমার রাজ্যের রাণীর নাম শুনলাম, ফাতিমা বিনতে ফারুক। আহা, আহা! নামই যে সুন্দর বউ যে কি হবে ভাবতেই মনটা নেচে উঠলো। কবুল বলার সাথে সাথে মন বলে উঠলো, আমি পাইলাম ইহাকে পাইলাম। মনের বাগানে গোলাপ, জবা, গোলাপি রংয়ের কসমস সহ সব গোলাপি রংয়ের ফুল ফুটে উঠলো। এ মুহূর্তে গোলাপি রং আমার সবচেয়ে পছন্দের রং পরিনত হলো, যদিও আগে গোলাপি রং দেখতেই পারতাম না। আমার মনে হলো, যদি ক্ষমতা থাকত দেশের সব বাড়ি-ঘর, অফিস-আদালত, টয়লেট, নাহ টয়লেট না, টয়লেট বাদে সব গোলাপি রঙে সাজানোর হুকুম দিতাম। আর যাই হোক, আমার মহারাণীর আগমন বলে কথা।
জীবনের এ পর্যন্ত সবচেয়ে ভয়াবহ ট্রাজেডি ঘটলো তখন। বিয়ে দুআ'র সময় আমার শ্বশুর মশাইয়ে লম্পট ফোনটা বেজে উঠলো। শুনলাম বউয়ের মামা ইন্তেকাল করেছেন। নিশ্চিত কোন অবিবাহিত তরুণ বদদুআ করছে, যেমন আমি আগে বিয়ের সাজে কোন গাড়ি দেখলে বদদুআ দিতাম যে, বরের যেন পায়জামা ফেটে যায়, পায়খানা বেশি লাগে ইত্যাদি ইত্যাদি। আমি জোরে জোরে কান্না শুরু করলাম। আমার কান্না দেখে সবাই হতবাক, প্রশ্ন সবার মুখে আমি কেন কাঁদতেছি। অনেকে বলছে যে, দেখো প্রথমদিনেই সবাইকে আপন করে নিয়েছে ছেলেটা। আমি জানি আমার এ কান্না কিসের জন্যে। আরে বউয়ের মামাকে তো চিনিই না, কাঁদতেছি তো বউয়ের সাথে দেখাই হলো না আর বউ চলে গেল। কারণ মামার বাড়ি অনেক দূর আজ গেলে পরদিনও ফিরতে পারবো না, অথচ পরদিন ক্যাম্পাসে যেতেই হবে। সবাই আমাকে শান্তনা দিতে শুরু করলো। মনে আমার দুঃখের গান বেজে উঠলো, "মিলন হবে কতদিনে, ও আমার মনের মানুষের শনে"। ভাবলাম মিয়ারা গোটা দুনিয়ার সুখ আনলেও তো এর বদলে কিছুই না।


মনে এক পাহাড় দুঃখ নিয়ে ফিরে গেলাম ক্যাম্পাসে। থেকে থেকেই 'তাহার' কথা মনে পড়ে। মনের বাগানে গাছ তো লাগালাম কিন্তু ফুল আসলো না। আম্মাকে ফোন নম্বর দেয়ার কথা বলতেই যেন হিটলারের রুপ ধারন করলো। কঠোর হস্তে আমার ইচ্ছাকে দমন করলো, শুধু দমনই না পরীক্ষা শেষ হওয়া পর্যন্ত তাকে জেলে বন্দী করলো। এভাবেই কোন রকম পরীক্ষা পার করলাম।
আজ আমার দীর্ঘ নির্বাসনের পর মুক্তি পেতে যাচ্ছি। সব দুঃখ মুছে, বাগানে ফুল ফোটাতে যাচ্ছি। মনে মনে ভাবছি, বাসায় যদি যেয়ে দেখতাম বউ আমার বসে আছে, ইয়া বড় ঘোমটা টেনে বসে থাকবে আর আমি ঘোমটা টেনে তুলবো..আর.... এমন সময় গাড়ির থামার শব্দ। বাস ব্রেক কষলো, বন্ধু গুতা দিয়ে বলল, এসে পড়েছি। আরে গুতা দিবিই যখন আরেকটু পরে দিতি মাত্র ঘোমটা তুলতে নিলাম আর এই বেটা। ধুর, এরা কি বুঝবে আমার অবস্থা।
আলহামদুলিল্লাহ্‌, সফর কোন বিপদ ছাড়াই শেষ হলো। বাস থেকে নেমেই সিএনজি নিয়ে সোজা বাসায় পৌঁছালাম। গেটে নামতেই দারওয়ান চাচা দেখে এগিয়ে আসতেই সালাম দিলাম, কোলাকুলি করলাম। অনেকদিন পর চাচা আমাকে পেয়ে যে এতো খুশি হইছে যা ওনার হাবভাব দেখেই বোঝা যাচ্ছে। মানুষটা আগে এরকম ছিল না, ছিল অনেক রুক্ষ স্বভাবের। নামায কালামে তেমন কোন আগ্রহ ছিল না, সবসময় অভাবের কথা, ভাগ্যের দোষ দিতো। একদিন তাকে দাওয়াত দিলাম নামাযের, বললাম ইসলাম কিভাবে মানুষের ভিতর ও বাহিরের অভাব দূর করে। তিনি চেষ্টা করতে শুরু করলেন। মাশা আল্লাহ্‌। দেখতে দেখতে উনার মানসিক অবস্থা ও অর্থনৈতিক পরিবর্তন হলো। যাই হোক, দোতলার সিড়ি দিয়ে উঠেই কলিং বেল বাজালাম। আম্মা এর আগে ফোন করলে আমি বলেছি অনেক সময় লাগবে, কিন্তু যানজট কম থাকায় তাড়াতাড়ি চলে আসার কথা আর জানাই নি, তাকে চমকে দেয়ার জন্য। প্রস্তুতি নিলাম জোরে একটা সালাম দেয়ার জন্য। এই তো পায়ের আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। ধীরে ধীরে দরজার কাছে আসছে। আমিও প্রস্তুত।
দরজা খুলতেই আসসা.... বলতেই থেমে গেলাম। চোখ কপালে উঠে গেল কে এইটা?? তাসকি খেয়ে হা করে তাকিয়ে আছি। কি দেখছি আমি?? এক তরুণী মাথায় ওড়না দিয়ে, মুখে হৃদয় জুড়ানো হাসি নিয়ে সালাম দিলো। মনে হয় পূর্ণিমার চাঁদের চেয়েও উজ্জল কিছু আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। আমি তো হ্যাং খেয়ে দাঁড়িয়ে। এভাবে কতক্ষণ কেটে গেল জানা নেই। তারপর মেয়েটা আম্মা ডাক দেয়াতে জ্ঞান ফিরে আসলো।

দরজায় দাঁড়িয়ে একবার আশেপাশে উপর নিচ সব দেখে নিলাম। ভাবলাম অন্য কারও বাসায় তো আসি নি, তবে অন্য কারও বাসা আমার কাছে এসেছে? তখনই আম্মাজানের আগমন। সালাম দিয়ে ভিতরে গেলাম। আম্মা তো খুব খুশি, যা হয় আরকি একের পর এক প্রশ্নের পাহাড় খাঁড়া করে দিল। উত্তর দেয়া শুরু করতেই এশার আযান পড়লো। জানে বাঁচলাম, অযু করে কাপড় পাল্টিয়ে দৌড় দিলাম মসজিদে। মসজিদ থেকে ফিরছি আর ভাবছি কে হতে পারে মেয়েটা। মাথার সার্চ ইঞ্জিনে সার্চ দিলাম, কোথাও কোন তথ্য জোগাড় হলো না। নাহ! এভাবে না হাসলেও পারতো, বুকের ভিতর তোলপাড় শুরু হয়ে গেছে। ক্ষীণ আশা জন্মালো, হতে পারে সে...... নাহ, আম্মা তাহলে জানাতো। ধুর, কেন যে বাসায় আসলাম। আরে বাসায় না আসলে কি জেলখানায় যাব নাকি। কি থেকে কি ভাবতেছি, আগা মাথা কিছু নাই। আবার বাসায় কলিং বেল দিলাম, এবার আম্মা খুললো। ভিতরে ঢুকলাম। প্রশ্ন করলাম,
আমি: আম্মা কে ওটা?
আম্মা : কোথায় কে?
আমি : আরে বাসার দরজা খুলে দিলো যে।
আম্মা : দরজা তো আমি খুললাম।
আমি : মজা নাও আমার সাথে? প্রথমবার যে খুলছে।
আম্মা : (মুচকি হেসে) ওহ, ঐটা আমার দূঊঊ...র সম্পর্কেরর ভাগ্নি।
আমি : (হতাশ হয়ে) তো বাসায় কিভাবে?
আম্মা : ওর, আব্বা-আম্মা বিদেশে কাজে গেছে, তাই দেশে থাকার তেমন কোন ব্যবস্থা হচ্ছিল না। তাই আমি একা মানুষ ওকে সঙ্গী বানানোর জন্য আনলাম।
আমি : আম্মা, তুমি জানো না আমি বড় হয়েছি? বাসায় এরকম এক বেগানা মেয়ে থাকবে, কেমন হলো না বিষয়টা?
আম্মা : বিপদে সাহায্য করবো না? তাছাড়া এক মাসের ব্যাপার তো। সমস্যা হবে না।
আমি :....... (চুপ)
সেদিন ক্লান্ত থাকায় রাতে খেয়েই দিলাম ঘুম। পরদিন সকালে নাস্তার পর আম্মার কাছে গেলাম। এখন এই কথা সেই কথা বলতেছি কিন্তু মনের ভিতর যে উথাল পাতাল হয়ে যাচ্ছে, সে বিষয়ে কথা বলার সাহস হচ্ছে না। তারপর বলেই ফেললাম,
আমি : আম্মা.... তোমার.... মানে আমার... মানে...
আম্মা : কি মানে মানে শুরু করছিস....বউয়ের খবর নিবি এই তো??
আমি : না, আম্মা কি বল, আমি তো শুধু
আম্মা : (কথা শেষ করতে না দিয়ে) হয়েছে। শোন বউ মা ওর আত্মীয়ের বাসায় আছে। তোর শ্বশুর-শ্বাশুরী হজ্বে গেছে বলছিলাম না, তারপরই।
আমি : ওহ
তিন পাহাড় দুঃখ মনে নিয়ে ঘরে আসলাম। একটু পর সেই মেয়ের আগমন। মাথায় সুন্দর করে ওড়না দিয়ে ঘোমটা দিয়ে হাতে পায়েসের বাটি নিয়ে ঘরে ঢোকার অনুমতি চাচ্ছে।
মেয়ে : জ্বী, ভিতরে আসবো? আম্মা আপনার জন্য পায়েস দিয়ে পাঠাইছে।
আমি : আরে, আপনি আসলেন কেন? আমাকে ডাকলেই যেতাম।
মেয়ে : ঠিক আছে, সমস্যা নাই।
পায়েস দিয়ে চলে গেল। আবার মেয়ের দিকে তাকাতে হলো। ইয়া মাবূদ, বেগানা মেয়ে বাড়ির মধ্যে ঘুরলে কিভাবে হয়, তার উপর সুশ্রী। আবার এদিকে বউটার কোন খবর নাই। সবকিছু মনে হয় ভেঙ্গে ফেলি। বাহিরে যেতেও মন চাচ্ছে না। নামাযের সময় শুধু বাহিরে যাই। এরকম অবস্থা দেখে রাতে এসে আম্মা 'তাহার' ফোন নম্বর দিয়ে গেল। কি যে খুশি লাগছে। আমারও খেয়াল নাই নম্বরের কথা। আসলে মন খারাপ থাকলে ওসব মাথাতে থাকে না। সাথে সাথে আম্মাকে খুশি করার জন্য একটা মসলাদার পান নিয়ে আসলাম। আম্মা আবার মসলাওয়ালা পান খুব পছন্দ করে। আর আমি ফোনে বিশাল পরিমান টাকা রিচার্জ দিলাম। ক্যাম্পাসে থাকা অবস্থা ফোনে সর্বোচ্চ ১০টাকা থাকতো। সেই ১০টাকাও সপ্তাহ খানিক অনায়াসে চলে যেত। কারণ ফোন দেয়ার মতো কেউ তো ছিল না।
তারপর ফোন হাতে নিয়ে কাগজ দেখে নম্বরটা উঠালাম। হাত কাঁপা শুরু হলো। জীবনে প্রথম কো মেয়ের কাছে ফোন দিচ্ছি, সে কি এক অবস্থা। বুকের ভিতর ধুকধুকি বেড়ে যাচ্ছে। ডায়াল প্যাড টাচ করতে নিয়ে আবার রেখে দিলাম। ভাবলাম কি বলে কথা শুরু করবো, প্রথমে কি জিজ্ঞেস করা উচিত। ক্যাম্পাসে থাকতে অনেক বন্ধুর তাদের বান্ধবীর সাথে কথা বলা শুনেছি। কিন্তু সে তো বান্ধবী না। কি ঝামেলার ভিতর পরলাম। নম্বর পেয়েও দেখি বিপদে পড়লাম। ঘরের মধ্যে পায়চারী করতে শুরু করলাম। নাহ! টেনশন বাড়তেছে। ধুর আজ ফোনই দিবো না। আজ ঠিক করি কি বলবো, কাল ফোন দিবো। আবার ভাবলাম কাল যদি ভেবে রাখা কথা ভুলে যাই? ইয়া প্রভু, আপনি খুশির মধ্যেও টেনশনে কেন ফেলছেন? নাহ! বাহারুল তোমাকে পারতেই হবে। তুমি পুরুষ এক ফোন দিতে ভয় পাইলে বিশ্ব জয় করবে কিভাবে? দিলাম ফোন। ওপাশে বাজছে। টুট টুট.....

প্রথম রিং বেজে শেষ হলো ফোন ধরলো না। কি হলো, নম্বর কি ভুল ছিল? দ্বিতীয়বার আবার দিলাম। এবারও কেউ রিসিভ করার নাম নেই। উৎকণ্ঠা তখন সর্বোচ্চ পর্যায়ে, এমন মুহূর্তে কেউ রিসিভ করলো,
ওপাশ: হ্যালো, কে বলছেন ? হ্যালো
এপাশ : (চুপ, এই প্রথম জীবনসঙ্গিনীর কণ্ঠ শুনলাম। সময় যেন থেমে থাকুক এখানে আর আমি শুধু শুনে যাই)
ওপাশ : আরে কে বলছেন, জবাব তো দিবেন।
এপাশ : (এবারো চুপ। চোখ বন্ধ করে কণ্ঠটা হৃদয়ের নেটওয়ার্কে ধরার চেষ্টা করছি)
ওপাশ : আজব সব লোক ফোন দেয়। ধুর।
(ফোন কেটে দেয়ার সম্ভবনা)
এপাশ : এ থামেন থামেন। কাটবেন না।
ওপাশ : কে আপনি? কোথা থেকে কাকে ফোন করছেন ?
এপাশ : জ্বী, আপনি ফাতিমা নাহ ? আমি বাহারুল
ওপাশ : জ্বী। বাহারুল কে?
বাহারুল : মানে..... আমি.... মানে
ফাতিমা : মানে শুনতে চাইনি। পরিচয় কি সেটা বলেন।
বা : জ্বী, আমি গাজীপুর শহরের গাজীপাড়াতে থাকি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষ করলাম।
ফা :....
বা : কি হলো শুনছেন ?
ফা : জ্বী, আসসালামু আলাইকুম।
বা : ওয়ালাইকুম সালাম। এতক্ষণ পরে?
ফা : আসলে অপরিচিত কারো সাথে ফোনে তেমন কথা হয় না তাই।
বা : মাশা আল্লাহ্‌। আপনি কেমন আছেন?
ফা : আলহামদুলিল্লাহ, ভাল। আপনি?
বা :আলহামদুলিল্লাহ, আগে শুধু ভাল ছিল। এখন বেশি ভাল।
ফা : হি হি (হাসার শব্দ)
বা : কি ব্যাপার হাসছেন যে ?
ফা : আপনার কথা শুনে।
বা : খাওয়া দাওয়া হয়েছে?
ফা : না, নামায শেষ করলাম আর আপনি ফোন দিলেন।
বা : ওহ, তাহলে তো ভুল সময়ে ফোন দিয়েছি।
ফা : না, না। সমস্যা নেই।
বা : তাহলে আর কি রাখি।
ফা : উমম, ঠিক আছে।
বা : আসসালামু আলাইকুম।
ফা : ওয়ালাইকুম সালাম।
ফোন রেখে বিছানায় ধপাশ করে শুয়ে পড়লাম। চোখে মুখে রাজ্যের সব খুশি। আহ! জীবনও এতো সুন্দর হয়। আরেকটু কথা বলাই যেত। নাহ, প্রথম দিনেই সব কথা বলা যাবে না তো। ইশ ! এতো খুশি লাগে কেন রে।
পরদিন সকালে বের হলাম "কিতাব মেলায়" যাবো। খুব কম দামে ইসলামি বই বিক্রয় হচ্ছে। জীবনের ২৫ বছর তো গেল দুনিয়ার পড়াশোনায়। লাভ অনিশ্চিত। কিন্তু আখিরাতের পড়াশোনায় লাভ নিশ্চিত। তাছাড়া রেজাল্টে এখনো দেড় মাস বাকি। হাতে অনেক সময়।
দুপুরে ফিরলাম ১৫ টা বই কিনে। আম্মা ঢুকতেই জিজ্ঞেস করলে বললাম বই কিনতে গেছিলাম। পাশেই দেখি মেয়েটা হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছে। কি আজব, এতো খুশি কেন হয় এসব মেয়ে মানুষ!
বইয়ের জগতে ডুব দিলাম। হারিয়ে গেলাম ইসলামি জগতে। কি সুন্দরই না ইসলামি সমাজ। অথচ আমরা ধরে আছি নিজেদের নিয়মের সমাজ। ইসলামি ইতিহাসে তখনকার সমাজে সবাই সুখী থাকতো। আজ আমরা ডিজিটাল হয়েও মনের অশান্তি দূর করতে পারি নি।
রাতে পড়তে পড়তে হঠাৎ 'তাহার' কথা মনে পড়লো। ফোন দিয়ে মিনিট দুয়েক কথা বলে রেখে দিলাম। কোথায় জানি সংকোচ, আটকে যাচ্ছি। সামনে তো এগোতে হবে। সময়ের উপরই না হয় ছেড়ে দিলাম। ভাবতে ভাবতে আম্মা ঢুকলো।
আম্মা : কাল যুহরার জন্য কিছু বই কিনিস তো। মেয়েটা সারাদিন চুপচাপ থাকে। স্বামী দূরে, বাপ-মা দূরে। বই না হয় ওর সঙ্গী হোক।
আমি: যুহরা টা কে?
আম্মা : আরে গাধা, যে মেয়েটা বাসায় থাকে। ও বিবাহিত। স্বামী একটু দূরে থাকে।
আমি : ওহ, কি বই কিনবো?
আম্মা : দাঁড়া ওর থেকেই শুনি। যুহরা, কই মা যুহরা?
যুহরা : এই তো আম্মা। বলেন।
আম্মা : তুই যেন কি বই কিনবি বললি।
যুহরা : যেটা ভাল হয়। মেয়েদের জন্য হলে আরও ভাল।
আমি : ঠিক আছে কাল এনে দিবো। আর আমার বইগুলোও তো আছেই যে কোন সময় নিয়ে পড়তে পারেন।
সকালে নেটে বসে বেশ কিছু মেয়েদের উপযোগী বইয়ের রিভিউ দেখলাম। এর মধ্যে মশিউর রহমান নিশু ভাইয়ের রিভিউ লেখা "ইউনিভার্সিটির ক্যান্টিনে " সহ বেশ কিছু বইয়ের তালিকা বানালাম। এরপর সকালে যেয়ে নিয়ে আসলাম।
তারপর দুপুরে বইগুলো হস্তান্তর করলাম। রাতে 'তাহাকে' ফোন দিবো দিবো করে গতদিনের সময় থেকে আধা ঘণ্টা পরে ফোন দিলাম। রিং বাজার এক সেকেন্ডেই ধরলো। মনে হয় অপেক্ষায় ছিল।
বাহারুল : আসসালামু আলাইকুম
ফাতিমা : ওয়ালাইকুম সালাম।
বা : এতো তাড়াতাড়ি ফোন ধরলেন ব্যাপার কি, ফোনের কাছেই ছিলেন মনে হয়।
ফা : সেই আধা ঘণ্টা হলো ফোনের দিকে চেয়েই ছিলাম। আপনার তো কোন খবরই নাই।
বা : ইশ, যদি জানতাম আগেই ফোন দিতাম। আমি তো আপনার নামায শেষ করার অপেক্ষায় ছিলাম।
ফা : নামায আগেই পড়ে নিয়েছি।
বা : তাহলে আপনিই ফোন দিতেন, সে অধিকার তো আপনার আছে।
ফা : অধিকার দিলেন তো?
বা : হ্যাঁ, কেন নয়। আমার উপর পুরো অধিকার আছে আপনার।
ফা : অধিকার খাটাবো?
বা : কোন সন্দেহ নাই।

Friday, May 5, 2017

Collected - জান্নাতমহল!


পাশের ভাড়াটিয়া। এ-পাড়ায় নতুন এসেছেন। পরিচিত হতে এলেন। এ ঘরের বাচ্চাগুলোকে সবার চেয়ে আলাদা মনে হয়। চোখে পড়ে। ভদ্র শান্তশিষ্ট। এ নিয়ে তার কৌতূহলের অন্ত নেই। আশেপাশে আরো বাড়িতেও এ-কয়দিনে যাওয়া হয়েছে। গিন্নিদের সাথে গল্পগাছা হয়েছে।
মেজবান হাসিমুখে অভ্যর্থনা করে বসালেন। ঘরের সাজানো-গোছানো পরিবেশ দেখে, মেহমানের চোখ জুড়িয়ে গেল। চারটা ফুটফুটে বাচ্চা। তিনটা ঘর জুড়ে হুটোপুটি করছে। বেড়াল ছানার মত। তিন নাম্বার বাচ্চাটার বয়েস তিন কি চার হবে। জড়ানো আদুরে কণ্ঠে বলে উঠল:
-আম্মু! আজ জান্নাতে ঘর বানাবে না?
তার দেখাদেখি বাকি দুইজনও বলতে শুরু করল:
-আম্মু, আজ জান্নাতে ঘর বানাবে না?
মেহমান অবাক হলেন। এত ছোট্ট পিচ্চি এটা কী বলছে? জান্নাতে ঘর কিভাবে বানাবে? মেজবানকে প্রশ্ন করলেন:
-‘জান্নাতে ঘর বানানো’ ব্যাপারটা কি?
প্রশ্ন শুনে মেজবানের মুখে স্মিত হাসি ফুটে উঠল। শরবতের গ্লাসটা এগিয়ে দিয়ে বললো:
-একটু অপেক্ষা করুন! নিজের চোখেই দেখে যাবেন ব্যাপারটা! ওটা আমাদের ছানাদের ঘরোয়া খেলা!
.
মা হাতের কাজটা গুছিয়ে এলেন। মেহমানকে হালকা নাস্তা দিলেন। তারপর কোলেরটাকে নিয়ে মেঝেতে বসে গেলেন। বড় মেয়ে আর ছোট দু’ভাই মাকে ঘিরে বসল। সবার চোখেমুখ থেকে উৎসাহ উদ্দীপনা ঠিকরে বেরোচ্ছে!
-এক দুই তিন! শুরু ‘জান্নাতমহল’ নির্মাঅাঅাঅাণ!
তিন কচিকাঁচা একসাথে কোরাস করে সূরা ইখলাস পড়তে শুরু করল। পড়া শেষ হল! একে একে দশবার পড়া হল। পড়া শেষ করেই সবাই সমস্বরে হৈ চৈ করে উঠল:
-আলহামদুলিল্লাহ! আমরা জান্নাতে একটা প্রাসাদ বানিয়েছি।
-খুব ভাল করেছ! এবার বলত বাছারা, তোমরা এই প্রাসাদে কী রাখতে চাও?
-কুনূজ! ধনভাণ্ডার রাখতে চাই আম্মু!
-ঠিক আছে রাখ!
-লা হাওলা ওয়া লা কুউয়াতা ইল্লা বিল্লাহ! লা হওলা...........!
-ওমা! কী বড় কুনুজ বানিয়েছ! আচ্ছা, এবার বল, কাকে বেশি ভালবাস?
-আল্লাহকে!
-তারপর?
-আমাদের নবীজি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)কে।
-কেয়ামতের দিন সবার কেমন লাগবে?
-ভীষণ পিপাসা লাগবে?
-আর কী লাগবে?
-নবীজির সুপারিশ লাগবে!
-তোমরা কি সেদিন সুপারিশ আর পানি পেতে চাও?
-জ্বি চাই!
-তাহলে?
-আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মাদ ওয়া আলা আলি মুহাম্মাদ............ ইন্নাকা হামীদুম মাজীদ।
-আচ্ছা, কার কার জান্নাতে বাগান করার শখ?
-আমাল! আমার আমার!
-তাহলে?
-সুবহানাল্লাহ! সুবহানাল্লাহ! সুবহানাল্লাহ!
বাচ্চারা একে একে আরো যিকির করে গেল। যিকির যিকির খেলা শেষ। এবার সবাই আগের হুটোপুটিতে ফিরে গেল।
.
মেজবানের দু’চোখ কপালে। এত সুন্দর খেলার কথা তার কল্পনাতেও আসে নি কখনো। তার ছেলে-মেয়েগুলো যিকির দূরের কথা ‘নবীজি’ কে সেটাও ঠিকমতো বলতে পারবে কি না, ঘোরতর সন্দেহ! তাদের বাবাটাও কি! নিজেও ধর্মকর্মের ধার ধারবে না, অন্যদেরকেও ধর্ম পালন করতে দেবে না। তার কথা হল, কী দরকার এসব! বুড়ো হলে দেখা যাবে! এমন যার মনোভাব, তার ছেলেমেয়েরা আল্লাহ-রাসুল চিনবে কী করে!
-আপা কিভাবে তাদেরকে এভাবে গড়ে তুললেন? আমারগুলো তো আরবী অক্ষরও চেনে না!
-ছোটরা গল্প শুনতে ভালবাসে! খেলাধূলা করতে পছন্দ করে। ছোটবেলা থেকেই ওদেরকে খেলাচ্ছলে, গল্পচ্ছলে এসব শিক্ষা দিয়েছি। সহজ সহজ আয়াতের অর্থ শুনিয়েছি। সহজ সহজ হাদীস শুনিয়েছি। বিভিন্ন যিকির শিখিয়েছি। মাসনুন দু‘আগুলো শিখিয়েছি। সাথে সাথে কোন আমলের কী লাভ, সেটা শিখিয়েছি!
-আমার ঘরে যে এমন করা অসম্ভব? আমার কী হবে? আমি নিজেও ধর্মকর্ম করি না! বুঝিও না! তবে এটুকু বুঝি, এটা করা দরকার!
-সন্তানকে মানুষ করতে হলে, সবচেয়ে বেশি দরকার মা-বাবার দু‘আ। নবীগনও যেখানে সন্তানের জন্যে দু‘আ করেছেন! আমরা সাধারণ মানুষের কেমন করা উচিত বুঝে দেখুন!
-কী দু‘আ করতে পারি!
-আপনি তাদেরকে যেমনটা গড়তে চান, সেই দু‘আ করবেন। একজন নেককার হওয়ার দু‘আ করবেন! তাছাড়া বাচ্চাদের আব্বু আর আমি মিলে কিছু নিয়ম মেনে চলার চেষ্টা করি! সন্তানকে মানুষ করতে হলে কিছু কষ্ট স্বীকার করতেই হয়!
-নিয়মগুলো?
-তেমন কঠিন কিছু নয়:
(এক) আমরা বাইরের কারো সামনে তাদেরকে জামা-কাপড় পরাইনা। এমনকি ভাইবোনদের সামনেও না। একটু বুঝ হওয়ার পর থেকেই চেষ্টা করে আসছি, তাদের ‘সতর’ যেন কেউ না দেখে। নিজেই যেন আড়ালে গিয়ে পোষাক পরতে পারে।
(দুই) হাম্মামে গেলে যেন নিজেই ছুছু দিতে পারে! এটা ওদেরকে বারবার বলে বলে অভ্যস্ত করেছি। প্রথম দিকে আমরা চোখ বন্ধ করে ওদেরকে ছুছু করিয়েছি। তাদেরকে বলেছি, অন্য কেউ সতর দেখা ঠিক নয়। এটা শরমের। আমরা নিজেরা হাম্মামে গেলে দরজা বন্ধ করি। তাদেরকেও ছোটবেলা থেকে উদ্বুদ্ধ করেছি। প্রথম দিকে দরজাটা শুধু ভেজান থাকত, ছিটকিনি লাগিয়ে বন্ধ করা হত না, কারন তারা ছিটকিনি নাগাল পেত না। ওদের আব্বু বারবার আমাকে, বলেন:
-ওদেরকে লজ্জা শেখাও! শরম শেখাও!
আমি প্রথম প্রথম অবাক হয়ে জানতে চাইতাম:
-শরম বুঝি শেখানো যায়!
-কেন যাবে না, অবশ্যই শেখানো যায়! শরম শেখানো মানে, শরম কাকে বলে, সেটা ছানাদেরকে বোঝানো, অনুভব করানো!
(তিন) বাড়িতে মেহমান এলে তাদের সাথে কোনও বাচ্চাকে ঘুমুতে দেয়ার ব্যাপারেও ওদের আব্বুর ঘোরতর আপত্তি। এমনও হয়েছে আমরা সবাই একটা ঘরে ফ্লোরিং করেছি। মেহমান মনক্ষুন্ন হয়েছে, কিন্তু তাদের বাবা বিনয়ের সাথে এড়িয়ে গেছেন। আবার এটাও খেয়াল রাখা, সন্তান যেন আলাদা রূমে একাকী রাত না কাটায়।
(চার) বাড়িতে কোনও পুরুষ মেহমান এলে, তিনি খেয়াল রাখতেন, তারা যেন তার কোলে না বসে। বিশেষ করে দুই পায়ের উপর বা মাঝে না বসে।
(পাঁচ) মুখে বা ঠোঁটেও চুমু খেতে বারণ করতেন। বেশির চেয়ে বেশি কপালে হতে পারে। তাও একদম ছোটবেলায়। শিশুকেও অন্য কাউকে চুমু খেতে জোরাজুরি না করা। কারো কোলে বসতে না চাইলে জোরাজুরি করে না বসানো।
(ছয়) তেল বা লোশন লাগানোর সময়, তাদের লজ্জাস্থানে যতটা সম্ভব আলগোছে তেল-লোশন মেখে চলে যাওয়া। হালকার চেয়ে বেশি চাপ না দেয়া। এ-কাজ যতদূর সম্ভব নিজেরাই করা। খেয়াল রাখা, লজ্জাস্থানের সেনসিটিভিটি (স্পর্শকাতরতা) যেন পুরোই অক্ষুন্ন থাকে। ছেলে-মেয়ে উভয়ের জন্যেই এটা প্রযোজ্য।
(সাত) হারাম বা গুনাহ করতে পারে, এমন কোনও সুযোগ-ফুরসতই তাকে না দেয়া। তাকে তার মতোই থাকতে দেয়া, তবে সব সময় একটা চোখ তার প্রতি নিবদ্ধ রাখা। ভাই-চাচা-মামা কারও হাতেই পুরোপুরি ছেড়ে না দেয়া। এমনকি তার সমবয়েসী বন্ধুর সাথেও না। অল্প সময়ের জন্যে হতে পারে। তবে সে অল্পসময়টা নিয়মিত হয়ে গেলে, ভিন্ন সুযোগ গ্রহণের সম্ভাবনাও থাকে। সচেতন থাকা।
(আট) শিশুদের সাথে সম্পর্কটাকে অত্যন্ত স্বাভাবিক পর্যায়ে নিয়ে আসা। সে যেন সবকিছু মনখুলে বলতে পারে। দ্বিধা-সংকোচ ছাড়াই। বেশি বেশি সন্তানের সাথে সময় কাটানো।
(নয়) শিশুকে একাকী বাসায় রেখে কোথাও না যাওয়া। এমনকি পরিচারিকার সাথে রেখেও না। এমন ঘটনাও ঘটেছে, মা গেছে ধর্মসভায়! ছেলে আর মেয়েকে রেখে গেছে ‘খাদেমার’ কাছে। কোনও কারনে খাদেমাকে চাকুরিচ্যুত করা হল। একদিন মা বাহির থেকে এসে দেখল ছেলেটা তার বোনের সাথে দুর্ব্যবহার করছে। জিজ্ঞাসার করলে ছেলে জানাল। সে খাদেমার সাথেও এমন করত। খাদেমাই তাকে এমনটা করতে শিখিয়েছে। সন্তানের মুখের ভাষা, চিন্তা, আচরণ অনেক সময় বাবা-মায়ের চেয়ে বাড়ির কাজের লোক দ্বারাই বেশি প্রভাবিত হয়।
(দশ) যতদূর সম্ভব কার্টুন দেখা থেকে দূরে সরিয়ে রাখা। কারন এটা থেকেই ভবিষ্যতে ‘গুনাহ’ দেখার পথ তৈরী হতে থাকে। মানসিক প্রস্তুতি শুরু হতে থাকে।
(এগার) এমনকি বাসা-বাড়িতে লিফট থাকলে, সেখানে তাকে একা একা চড়তে না দেয়া। অন্য লোক থাকলে তো প্রশ্নই আসে না। এক পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে, শহরে অনেক সন্তান লিফটেই প্রথম ভিন্নধর্মী আচরণের মুখোমুখি হয়।
(বারো) গণজমায়েত, অন্ধকার স্থান ও পরিত্যাক্ত স্থানে সন্তানকে যেতে না দেয়া। বর্তমানের বিনোদনকেন্দ্রগুলোর ব্যাপারেও সতর্ক থাকা। শিশুমনে পাপের দৃশ্যগুলো গভীর রেখাপাত করে। দু’জনের হাত ধরাধরি করে হাঁটার জীবন্ত দৃশ্য, পর্দায় অবভ্য ছবি দেখার চেয়েও মারাত্মক। তার অবচেতন মনে অনুসিদ্ধান্ত তৈরি হতে থাকে, এভানে দু’জন নারী-পুরুষ হাত ধরাধরি করে হাঁটা বা একান্তে বসে থাকা বৈধ!!!
(তেরো) ছেলে হলে মেয়ে শিক্ষক, মেয়ে হলে পুরুষ শিক্ষক নিয়োগ দানকে শতভাগ পরিহার করে চলা। এমনকি শিক্ষাদানটা পর্দার আড়াল থেকে হলেও নিরাপদ মনে না করা।
(চৌদ্দ) অপরিচিতের দেয়া কিছু না খাওয়া। জোরাজুরি করলেও না। ভদ্রভাবে না বলে দেয়া।
(পনের) আব্বু-আম্মুর অনুমতি ছাড়া, ঘরের দরজা না খোলা। পরিচিত কেউ হলেও না।
(ষোল) বারবার বলে দেয়া, আব্বু-আম্মু ছাড়া অন্য কেউ কিছু শেখাতে চাইলে, বাড়িতে এসে সেটা যেন জানায়। যে শিক্ষকের কাছে, যা শিখতে পাঠানো হয়েছে, এর বাইরে কিছু শিখছে কি না, খোঁজ রাখা। শিক্ষক হলেই তিনি শতভাগ ‘আস্থাভাজন’ হবেন, এমন নয়। হালের অনেক শিক্ষক থেকেও ছাত্ররা ‘ভিন্ন’ কিছুর পাঠ পায়। মেমোরি কার্ডে। পেনড্রাইভে।
(সতের) নিজেদের মধ্যে ভাব আদান-প্রদানের জন্যে একটা নিজস্ব ভাষা তৈরী করা। পাসওয়ার্ডের মত। অন্য কেউ তাকে স্কুল থেকে আনতে গেলে, পাসওয়ার্ড বলতে না পারলে, তাকে যেন বিশ্বাস না করে।
(আঠার) বাড়াবাড়ি পরিহার করা। আদর ও শাসন উভয় ক্ষেত্রে।
(উনিশ) সন্তানের জন্যে কুরআন কারীমের দু‘আগুলো বেশি বেশি পড়া। বাবা ও মা উভয়ে। মাঝেমধ্যে সন্তানদেরকে সাথে নিয়েও দু‘আগুলো পড়া। প্রতিটি দু‘আর অর্থ তাদেরকে শিখিয়ে দেয়া। যাতে তারা বুঝতে পারে, তাদের জন্যে কী দু‘আ তাদের আব্বু আম্মু করছেন! তারা কোন দু‘আয় আমীন বলছে!
১.আমার জন্যে আমার সন্তানদেরকে যোগ্য করে গড়ে তুলুন (আহকাফ ১৫)।
أَصْلِحْ لِي فِي ذُرِّيَّتِي
২. (ইয়া রাব)! আমি তাকে ও তার বংশধরগণকে অভিশপ্ত শয়তান থেকে হেফাজতের জন্যে আপনার আশ্রয়ে অর্পণ করলাম। আলে-ইমরান ৩৬।
إِنِّي أُعِيذُهَا بِكَ وَذُرِّيَّتَهَا مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِ
৩. হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে আমাদের স্ত্রী ও সন্তানদের পক্ষ হতে দান করুন নয়নপ্রীতি এবং আমাদেরকে মুত্তাকীদের নেতা বানান। ফুরকান ৭৪।
رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَاجِنَا وَذُرِّيَّاتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ وَاجْعَلْنَا لِلْمُتَّقِينَ إِمَامًا
৪. হে আমার প্রতিপালক! আমাকেও নামায কায়েমকারী বানিয়ে দিন এবং আমার আওলাদের মধ্য হতেও (এমন লোক সৃষ্টি করুন, যারা নামায কায়েম করবে)। হে আমার প্রতিপালক! এবং আমার দু‘আ কবুল করে নিন। ইবরাহীম ৪০।
رَبِّ اجْعَلْنِي مُقِيمَ الصَّلَاةِ وَمِن ذُرِّيَّتِي ۚ رَبَّنَا وَتَقَبَّلْ دُعَاءِ
৫. হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে আপনার একান্ত অনুগত বানিয়ে নিন এবং আমাদের বংশধরদের মধ্যেও এমন উম্মত সৃষ্টি করুন, যারা আপনার একান্ত অনুগত হবে এবং আমাদেরকে ইবাদতের পদ্ধতি শিক্ষা দিন এবং আমাদের তওবা কবুল করে নিন। নিশ্চয়ই আপনি এবং কেবল আপনিই ক্ষমাপ্রবণ (এবং) অতিশয় দয়ার মালিক। বাকারা ১২৮।
رَبَّنَا وَاجْعَلْنَا مُسْلِمَيْنِ لَكَ وَمِن ذُرِّيَّتِنَا أُمَّةً مُّسْلِمَةً لَّكَ وَأَرِنَا مَنَاسِكَنَا وَتُبْ عَلَيْنَا ۖ إِنَّكَ أَنتَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ
৬. হে আমাদের প্রতিপালক! আমাকে আপনার নিকট হতে কোনও পবিত্র সন্তান দান করুন। নিশ্চয়ই আপনি দু‘আ শ্রবণকারী। আলে ইমরান ৩৮।
رَبِّ هَبْ لِي مِن لَّدُنكَ ذُرِّيَّةً طَيِّبَةًإِنَّكَ سَمِيعُ الدُّعَاءِ
৭. (ইয়া রাব!), আমাকে ও আমার পুত্রকে মূর্তিপূজা হতে রক্ষা করুন। ইবরাহীম ৩৫।
وَاجْنُبْنِي وَبَنِيَّ أَن نَّعْبُدَ الْأَصْنَامَ

Collected - প্রিয় বাবা

আমি আপনার আদরের সন্তান। আপনি সবসময় চেয়েছেন আমি যেন মানুষের মতোন মানুষ হই। মানুষের মতোন মানুষ হওয়া মানে নিশ্চই দুই চোখ, দুই কান, দুই পা, এক মুখ, এক নাক বিশিষ্ট মানুষ বলতে ঠিক যা বুঝায়, তা হয়তো নয়।
মানুষের মতোন মানুষ হওয়া মানে আপনি যা চেয়েছেন তা হয়তো এরকম,- আমি যেন আদর্শিক, নৈতিক, মানবিক বোধ সম্পন্ন হিসেবে গড়ে উঠি।
বাবা, আমি মানুষের মতোন মানুষ হবার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করে যাচ্ছি।
সেই শিশুকাল থেকে আজ অবধি আপনি আমাকে আপনার বাহুডোরে, আদরের খাঁচায়, পরম মমতা আর ভালোবাসা দিয়ে আগলে রেখেছেন।
পূরণ করেছেন আমার সকল শখ, আহ্লাদ। মিটিয়েছেন আমার সমস্ত চাহিদা। আপনার আঙুল ধরে মক্তবে যাওয়া থেকে শুরু করে প্রাইমারীর সেই প্রথম পাঠ- সবই আজো আমার স্মৃতির পাতায় পরম যত্নে তোলা আছে।
যখন আমি প্রচন্ড কান্না করতাম, আপনি আমায় বুকে জড়িয়ে আদর করতেন। আমার গালে চুমু খেতেন।
প্রচন্ড বদমেজাজি ছিলেন শুনেছি। অথচ, আমার শৈশবে কখনো আমাকে জোরে একটি থাপ্পড় দিয়েছেন- এমনটি মনে পড়ে না।
কৈশোরে, যখন আমি জগৎটাকে একটু ভালোভাবে বুঝতে শুরু করেছি মাত্র, তখন আপনি আবির্ভূত হলেন সম্পূর্ণ এক নতুন ভূমিকায়।
আমায় হাতে-কলমে শেখাতে লাগলেন ভালো আর মন্দের মধ্যকার পার্থক্য।আমায় বুঝিয়েছিলেন কীসে আমার ভালো হবে, কীসে খারাপ।
যেবার স্কুল থেকে ফুটবল টুর্নামেন্ট খেলতে গিয়ে পা মচকে এসেছিলাম, সেদিন আপনি ব্যবসায়িক কাজে বাইরে ছিলেন। টেলিফোনে সে রাতে আম্মুকে খুব বকাঝকা করেছিলেন আমার জন্যে। তবুও, আমায় একটুও বকলেন না সেদিন। আম্মু আমার মচকে যাওয়া পায়ে মলম লাগাতে লাগাতে বিড়বিড় করে আমায় বকছিলো আর আপনার উপরে জমা ক্ষোভটা আমার উপরেই ঝাঁড়ছিলো।
যখন আমি স্কুলজীবন শেষ করে কলেজ জীবনে পা রেখেছি, তখনও প্রতিটা পদে পদে আপনি ছিলেন আমার ছায়া সঙ্গী। আমার সমস্ত প্রয়োজনে, সমস্ত আকাঙ্ক্ষায় আপনি ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিলেন সর্বদা।
কলেজ জীবন শেষ করে যখন বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে প্রবেশ করেছি, তখন হয়তো আপনি বুঝে গিয়েছিলেন যে, আপনার ছোট্ট বাবুটা আর ছোট্ট নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচে উঁচু সিঁড়িতে সে তার পদচারণা দিয়ে ফেলেছে।
সেবার আমায় বলেছিলেন,- 'তোমার ভালো-মন্দ এখন থেকে তোমাকেই ঠিক করতে হবে।তোমার সিদ্ধান্ত তোমাকেই নিতে হবে। এখন তুমি যথেষ্টই বড় হয়েছো।'
আমি জানি আপনার সেদিনের সেই কথাগুলো ছিলো কেবলই আনুষ্ঠানিকতা মাত্র। জীবনের সিদ্ধান্তগুলো কীভাবে নিতে হবে, তার বীজ তো খুব ছোটবেলাতেই আপনি আমার মধ্যে রোপন করে দিয়েছেন। আপনি কেবল দেখতে চেয়েছেন, আপনার রোপন করা সেই বৃক্ষের শিকড় কতোটা গভীরে প্রোথিত হয়েছে।
বাবা, আজ পর্যন্ত জীবনের প্রতিটা সময়ে আমি আপনার সান্নিধ্য পেয়ে এসেছি। আপনার গাইডলাইন, আপনার নির্দেশনা, সবকিছুই ছিলো আমার জন্য জীবনের পাথেয়।
আমাকে মানুষের মতোন মানুষ করতে যতোটা কাঠখড় পুঁড়ানো দরকার, তার কোন কমতি হতে আপনি দেন নি।
আপনার সেই ছোট্ট বাবু, যাকে সুযোগ পেলেই কাঁধে নিয়ে ঘুরতেন, সে আজ যুবক হয়ে উঠেছে।
প্রিয় বাবা, আপনাকে আজ একান্ত কিছু বলতে ইচ্ছে করছে। আমার জীবনের প্রথম বন্ধু তো আপনিই। আমার প্রথম বন্ধু, প্রথম সহপাঠী, প্রথম সহচর, প্রথম খেলার সাথী- সবকিছুই আপনি। আমার জীবনে যা কিছু প্রথম, সবকিছুতেই আপনি আছেন।
বাবা, আমি এখন যথেষ্টই বড় হয়েছি।চলে এসেছি একটা কঠিন সময়ে, একটা কঠিন বয়সে।
এই সময়, এই বয়স এতোটাই কঠিন যে, লজ্জা শরমের মাথা খেয়ে এই কঠিন বয়স আর কঠিন সময়ের কথা আপনাকে লিখতে বসে গেলাম। প্রথমেই, এরজন্য আমি আন্তরিকভাবে দুঃখিত। কিন্তু আমি মনে করি, জীবনের প্রতিটা কঠিন সময়ে আপনি যেভাবে আমার পাশে ছিলেন, ঠিক এই সময়টাতেও আপনার সান্নিধ্য, আপনার পরামর্শ, আপনার সাহায্য, সহযোগিতা আমার দরকার। শুধু দরকার নয়, খুবই দরকার।
বাবা, আমার যৌবন যুগের সাথে আপনার যৌবন যুগের একটা পার্থক্য আছে।ঠিক এই বয়সটাতে আমি প্রযুক্তির যে অভাবনীয় সুবিধা ভোগ করছি, আপনি তা আপনার সময়ে কল্পনাও করতে পারেন নি।
প্রযুক্তি সবকিছু আমাদের একদম হাতের মুঠোয় এনে দিয়েছে। এই সুবিধার যেমন বিশাল একটি ভালো দিক রয়েছে, ঠিক তেমনি রয়েছে বিশাল একটি খারাপ দিকও।
এখানে, এই ভার্চুয়াল বিশ্বে ভালো জিনিসগুলো যেমন আমাদের একদম হাতের নাগালে, ঠিক সেরকম খারাপ জিনিসগুলোও আমাদের একেবারে নাকের ডগায়।
প্রিয় বাবা! বর্তমান যুগ হলো একটি ফেৎনার যুগ।
এখানে, বাসা থেকে শুরু করে শহরের অলি-গলি, ক্যাম্পাস থেকে ক্যান্টিন, রাস্তাঘাট, পার্ক, উদ্যান, ইন্টারনেট থেকে শুরু করে মোবাইল ফোন, - সবখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে ফেৎনা। ফেৎনা বলতে আমি কী বুঝাতে চাইছি আপনি নিশ্চই এতক্ষণে ধরে ফেলেছেন। জ্বী হ্যাঁ।
যৌবনের এই চরম সময়ে এসে, চারদিকের এতো এতো চোখ ধাঁধানো দুনিয়াবি ফেৎনা থেকে আমি বাঁচতে চাই।
বাবা, আমার হাতে একটি স্মার্টফোন আছে। টেবিলের উপরে আছে একটি ল্যাপটপ।মন চাইলে নিষিদ্ধ বায়বীয় পাতায় ঢুঁ মারার মতো যথেষ্ট ডাটা সর্বদা আমার ফোনে মজুদ থাকে।
কসম আল্লাহর! আমি চেষ্টা করি নিজেকে সংযত রাখার। আমি চেষ্টা করি নিজেকে সামলে রাখার। কিন্তু, আমার এই যে টগবগে তারুণ্য! শরীরে যৌবনের এই যে বারিধারা, এটাকে আমার বড্ড ভয় হয় বাবা।
আমি কতক্ষণ নিজেকে ধরে রাখতে পারবো?
ভয় হয়, যদি বিগড়ে যাই? যদি শয়তানের ওয়াসওয়াসায় পড়ে ভুলে যাই নিজের গন্তব্য? নিজের আদর্শ? যদি কোন সুদর্শিনী রমণীর ফাঁদে (খুব সচেতনভাবেই ফাঁদ বলছি, কারণ, বিবাহপূর্ব সকল বেগানা নারী-পুরুষের মধ্যকার অবাধ মেলামেশা, সম্পর্ক আমার ধর্ম হারাম করেছে) পড়ে বিসর্জন দিয়ে বসি আমার নৈতিকতা?
বড্ড ভয় করে বাবা, বিশ্বাস করুন।
ভাবছেন, এর থেকে পরিত্রাণের কী উপায় আছে? কী সলুশ্যনই বা আমি চাইছি আপনার কাছে,তাই না?
অকপটে বলি- বিয়ে........।
আমি আবারো দুঃখিত বাবা এভাবে বলার জন্যে।
আমাদের বয়েসী ছেলেদের বাবা-মায়েদের ধারণা,
ছেলে পড়াশুনা শেষ করে, ভালো চাকরি-বাকরি ধরে নিজের অবস্থানটা পাকাপোক্ত করতে পারলেই যেন সে বিয়ের উপযুক্ত হয়।
খুবই ভুল ধারণা বাবা, খুবই ভুল। এই পড়ালেখা শেষ করে, চাকরি-বাকরি জোগাড় করতে গিয়ে সন্তান যে কতোটা অধঃপতনে চলে যায়, তা যদি বাবা-মা'রা বুঝতেন।ক্যাম্পাসে এসে যদি তারা দেখতেন এইখানে উনাদের সন্তানেরা কোন পরিবেশে, কোন পরীক্ষার মধ্য দিয়ে প্রতিনিয়ত দিন পার করে!!
বাবা! ভাবছেন, চাকরি-বাকরি না করতে পারলে আমাকে বিয়েটাই বা কে করবে, তাই না?
আরেকটি ভুল ধারণা! বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া একটা ছেলে এতোটাই বেকার, এতোটাই অসহায় নিশ্চয় নয় যে, সে একজন স্ত্রীর ভরণ পোষণের ভার নিতে পারবে না।
ভাবছেন, কোন বাবা-মা সাহস করবে বেকার ছেলের হাতে মেয়ে বিয়ে দেওয়ার, তাই না?
কোন দ্বীনদার যুবক, যার হয়তো কোন বড় প্রতিষ্ঠানে চাকরি নেই, কোন বড় ব্যাংকে হয়তো সে গলায় টাই ঝুলিয়ে অফিস করে না, কিন্তু একনিষ্ঠতার সহিত দ্বীন পালন করছে। খুব ঝমকালো না হোক, মোটামুটি স্বচ্ছলতার সহিত সে চলতে পারছে- এরকম কারো কাছে আপনার মেয়েকে বিয়ে দেওয়ার সাহস করে ফেলুন, দেখবেন আপনার ছেলে, যারও বড় কোন চাকরি নেই, বড় ব্যাংকে জব নেই, কিন্তু দ্বীন পালনের চেষ্টা করে, তার হাতে অন্য কোন দ্বীনদার মেয়ের বাবা তার মেয়ে তুলে দেওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে যাবে।
রাসূল (সাঃ) বলেছেন,- 'সকল কাজ নিয়্যাতের উপর নির্ভরশীল।'
আপনার মেয়ের বিয়েতে আপনি এমনভাবে মোহরানা ধার্য করুন, যাতে আপনার মেয়ের ভাবি জামাই, যার সাথে আপনার মেয়ের আত্মিক বন্ধন হতে চলেছে, যার সাথে আপনার মেয়ে সারাজীবন কাটাবে, তার উপরর যেন কোন চাপ না সৃষ্টি হয়।
তাহলে আপনার ছেলের ক্ষেত্রেও তাই হবে।
মেয়ের বাবা হিসেবে আপনি যা ত্যাগ করবেন, সন্তানের বাবা হিসেবে আপনি তা-ই ফেরত পাবেন।
বাবা, বিয়েটা সুন্নত! সন্তানকে সঠিক সময়ে সুন্নত পালনে সাহায্য করাটা পিতা মাতার অন্যতম দায়িত্ব। বলছিনা যে আপনারা এই দায়িত্ব থেকে গাফেল। শুধু বলছি, সময়টা বড্ড কঠিন।
রিয্বীকের বিলি বন্টন তো আসমান থেকেই নির্ধারিত হয়।
বিয়ে করে কেউ না খেয়ে মরেছে, কিংবা ফকির হয়ে গেছে, এরকম নজির সম্ভবত পৃথিবীতে নেই।
রাসূল (সাঃ) যুবকদের বিয়ে করার নির্দেশ দিয়েছেন, সম্ভব না হলে রোজা রাখতে বলেছেন। তিনি জানতেন, যৌবনের সময়টা বড্ড কঠিন! বড্ড নিষ্ঠুর!
বাবা, অকপটে লিখে ফেলেছি।কারণ, আমি ফেৎনা থেকে নিজেকে বাঁচাতে চাই। যদি ভাবেন আমি ভুল কিছু বলেছি বা ভুল কিছু চেয়েছি, আমায় ক্ষমা করবেন।
ইতি,
আপনার আদরের পুত্র।
(এই চিঠিটা যদি কোন 'বাবা' পড়েন, তিনি বাবার ভূমিকায় পড়বেন, যদি কোন মা পড়েন, মায়ের ভূমিকায় পড়বেন। যদি কোন বিবাহিত বড় ভাই পড়েন, বড় ভাইয়ের ভূমিকায় পড়বেন, বিবাহিত বড় বোন পড়লে, বড় বোনের ভূমিকায় পড়বেন। আর বাকিরা (যাদের সমস্যা নিয়ে লেখা) 'আদরের পুত্রসন্তান/ কন্যা সন্তান' এর ভূমিকায় :-) )
'বাবার কাছে পত্র'/ আরিফ আজাদ

One

অনেক ধরনের চিন্তা মাথায় ঘুরপাক খায়। খেয়ে দেয়ে আবার ক্লান্তও হয়ে যায়। যার কিছু হয়তো ভাল, আবার কিছু হয়তো কালো। তেমনি আজ একটা বিষয় মাথায় আসলো।...