
[হযরত
মাওলানা মুফতী তাকী উছমানী কিছুদিন আগে বাংলাদেশ সফর করেছেন। সে সফরে ১৭
ফেব্রুয়ারি ’০৯ ঈ. সুন্নত চৌধুরী সাহেবের বাড়িতে মহিলাদের উদ্দেশে এই
বয়ানটি করেছিলেন। তা রেকর্ড করা হয়েছিল। পরে তা কাগজে লেখা হয় ও অনুবাদ
করা হয়। লিখেছেন মাওলানা সায়ীদ আহমদ, অনুবাদ করেছেন মাওলানা আবদুল্লাহ
ফাহাদ]
সম্মানিত বোন ও প্রিয় কন্যা!
আসসালামু আলাইকুম ওয়ারাহমাতুল্লাহ
আজকের
আয়োজন বিশেষভাবে মহিলাদের জন্য করা হয়েছে। উদ্দেশ্য হল, মা, বোন ও
মেয়েদের সাথে কিছু দ্বীনী আলোচনা করা। আল্লাহ তাআলা আমাকে ইখলাসের সঙ্গে
তাঁর সন্তুষ্টি অনুযায়ী কথা বলার এবং আপনাদের সকলকে ইখলাসের সঙ্গে শ্রবণ
করার আর আমাদের সকলকে এই কথাগুলোর উপর আমল করার তাওফীক দান করুন।
আমি
আপনাদের সামনে একটি সূরা তেলাওয়াত করেছি, যা প্রায় সকল মুসলমানেরই
মুখস্থ থাকে এবং নামাযের মধ্যেও অধিক পরিমাণে তেলাওয়াত করা হয়। সূরাটি
ছোট হলেও একটি বড় সত্যের প্রতি ইঙ্গিত করে।
তা
এই যে, এই দুনিয়ার সকল মানুষ, সে পুরুষ হোক কিংবা নারী দুনিয়াতে আসে
শিশু অবস্থায় এরপর শৈশব অতিক্রম করে যৌবনে পদার্পণ করে। এরপর পূর্ণ বয়সে
উপনীত হয় তারপর বার্ধক্যে পৌঁছে। এরপর একদিন দুনিয়া থেকে চলে যায়। কোনো
মানুষ এই দুনিয়ায় স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য আসে না। যত বড় সম্পদশালী
কিংবা প্রভাবশালী হোক কেউ এই নিয়মের ব্যতিক্রম নয়। এমনকি আম্বিয়া আ.,
বুযূর্গানে দ্বীন, আওলিয়ায়ে কেরাম প্রত্যেকের সাথেই এমনটি ঘটে। তারা
দুনিয়ায় আসেন। আসার সময় কারো জানা থাকে না যে, দুনিয়ায় তারা কত দিন
থাকবেন। এরপর একদিন এই দুনিয়া থেকে চলে যান।
মৃত্যু
এমন এক বাস্তবতা, যার ব্যাপারে কোনো মানুষেরই কোনো মতপার্থক্য নেই।
মুসলিম-অমুসলিম, শিক্ষিত-অশিক্ষিত সকলেই স্বীকার করে যে, এই দুনিয়ায়
চিরদিন থাকার জন্য আসিনি, একদিন আমার মৃত্যু হবে। কোনো কাফের, কোনো
বেদ্বীন-মুনাফিকও তা অস্বীকার করতে পারে না। কিছু লোক তো আল্লাহ তাআলার
অস্তিত্বকে পর্যন্ত অস্বীকার করে বসেছে, কিন্তু মৃত্যুকে কেউ অস্বীকার করতে
পারে না। প্রত্যেক মানুষই জানে এবং বিশ্বাস করে যে, তার মৃত্যু হবে।
তদ্রূপ
এটাও বাস্তব যে, মৃত্যুর কোনো সময় নির্দিষ্ট নেই। এ বিষয়েও কোনো মানুষের
কোনো মতানৈক্য নেই। আমি জানি না, কখন আমার মৃত্যু ঘটবে। এখনি একজন মানুষ
বসে আছে, সে সুস্থ, কথাবার্তা বলছে অথচ এক ঘন্টার ভিতরেই সে দুনিয়া থেকে
চলে গেল। কোনো দুর্ঘটনা ঘটে গেল আর সে দুনিয়া থেকে চলে গেল। আল্লাহ তাআলা
আমাদের হেফাযত করুন। কারো হার্ট এ্যাটাক হয়ে গেল আর সে দুনিয়া ছেড়ে চলে
গেল। লোকেরা বলে থাকে এটা তো বড় আশ্চর্যের বিষয় যে, একজন মানুষ বসে আছে,
কথাবার্তা বলছে অথচ মুহূর্তেই সে ঢলে পড়ল, হার্ট এ্যাটাক হয়ে সে দুনিয়া
থেকে চলে গেল!
আজ
পর্যন্ত দুনিয়াতে এমন কোনো প্রযুক্তি আবিষ্কার হয়নি যা এ কথা বলে দিতে
সক্ষম যে, এই মানুষটি কত সময় জীবিত থাকবে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি আজ কত
উন্নতি সাধন করেছে। মানুষ চাঁদে পৌঁছে গেছে, কিন্তু এমন কোনো প্রযুক্তি
আবিষ্কৃত হয়নি যা মানুষকে বলতে পারে যে, সে কতদিন দুনিয়ায় থাকবে এবং কখন
দুনিয়া থেকে বিদায় নিবে।
মোটকথা,
এ বিষয়ে সবাই একমত যে, মৃত্যু অবশ্যই আসবে। তদ্রূপ এ বিষয়েও সকলে একমত
যে, কখন মৃত্যু হবে তা কারো জানা নেই। তাই এখন চিন্তা করা দরকার যে,
মানুষকে যখন যেতেই হবে তবে কেন সে এই দুনিয়ায় আসে? বাস্তবতা বলে যে,
দুনিয়ায় মানুষের আসা একটা সফর। মানুষ কোথাও সফরে গেলে যেমন কিছু দিনের
জন্য যায়, স্থায়ীভাবে থাকার জন্য যায় না। কোনো কাজে-উদ্দেশ্যে সেখানে
অবস্থানের পর পুনরায় নিজের বাড়িতে ফিরে আসে তেমনি দুনিয়ার এই জীবনও একটা
সফর, যা শুরু হয় জন্মলাভের মাধ্যমে আর কখন শেষ হবে তা জানা নেই।
দুনিয়ার
জীবন যদি সফরই হয় তাহলে ভাবতে হবে যে, এই সফরের উদ্দেশ্য কী? মানুষ কেন
এই দুনিয়ায় আসে? কেন দুনিয়ার জীবনের এতই ব্যস্ততা দৌড়-ঝাঁপ? কেনইবা
মানুষ দুনিয়ায় এসে কিছুদিন থেকে আবার চলে যায়?
কুরআন
মজীদ একটি ছোট সূরার মধ্যেই এই উদ্দেশ্যের কথা বলে দিচ্ছে, ‘হে গাফেল
মানুষ! তুমি দুনিয়ায় এসেছ এখন উপলব্ধি কর, কেন তুমি এসেছ? ইরশাদ হয়েছে,
তরজমা : আমি জ্বিন ও মানব জাতিকে শুধুমাত্র এ জন্যই সৃষ্টি করেছি যেন তারা
আমার বন্দেগী করে, আমার ইবাদত করে। এজন্যই তাদেরকে দুনিয়ায় পাঠিয়েছি।
আসল
উদ্দেশ্য তো এটাই ছিল যে, মানুষ আল্লাহ তাআলার ইবাদত করবে। আল্লাহ তাআলা
ইবাদতকে সহজ করে দিয়েছেন। অর্থাৎ ইবাদতের মূল দাবি তো এই যে, মানুষ সারা
দিন সারা রাত আল্লাহ তাআলার সামনে দন্ডায়মান থাকবে, সিজদায় পড়ে থাকবে,
আল্লাহ তাআলার যিকর করবে, তাঁর কাছে দুআ করবে। শুধু এই কাজই করবে, অন্য
কোনো কাজ করবে না। কিন্তু আল্লাহ তাআলা নিজ অনুগ্রহে মানুষের দুর্বলতার
কারণে এই অনুমতি দিয়েছেন যে, তোমরা দুনিয়ায় পানাহার কর, বিশ্রাম কর,
জীবিকা উপার্জন কর তবে দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত আমার কাছে এসে আমার ইবাদত করবে।
পাঁচ ওয়াক্ত নামাযের ব্যাপারে যত্নবান থাকবে। রমযানের এক মাস রোযা রাখবে।
উপার্জিত সম্পদ থেকে শতকরা আড়াই ভাগ বার্ষিক যাকাত হিসেবে আদায় করবে,
জীবনে একবার হজ্ব করবে। এতটুকুই তোমাদের জন্য আবশ্যকীয় করে দিলাম। আর বাকি
সারা জীবন পানাহার, উপার্জন সবকিছুই তোমাদের জন্য বৈধ করে দিলাম। যেন
তোমাদের প্রয়োজন মিটে।
তবে
একটি কথা মনে রাখবে, জীবিকা উপার্জনের ফিকির যেন এমন না হয় যে, তোমরা
তাতেই আচ্ছন্ন জীবনের আসল উদ্দেশ্যই ভুলে গেলে। তোমরা যদি জীবনের আসল
উদ্দেশ্যকে স্মরণ রেখে সে অনুযায়ী ব্যবসা কর তাহলে সে ব্যবসাও ছওয়াবের
হবে! হাদীস শরীফে আছে, সত্যবাদী, আমানতদার ব্যবসায়ীও কিয়ামতের দিন
আম্বিয়া, সিদ্দীকীন ও শহীদগণের সঙ্গে থাকবে।
এত অধিক ফযীলতের কথা বলা হয়েছে কাদের জন্য?
ওই
সব লোক যাদেরকে ব্যবসা, লেনদেন, ক্রয়-বিক্রয় আল্লাহর স্মরণ থেকে বিরত
রাখে না। তাদের এই ব্যবসা তাদের জন্য হালাল। শুধু হালালই নয়; বরং ছওয়াবের
কাজ। আল্লাহ তাআলা এতই সহজ করে দিয়েছেন। সৃষ্টি করেছেন ইবাদতের জন্য।
কিন্তু ইবাদতের জন্য দিনরাতে বিশেষ কিছু কাজ নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন, যাতে
খুব বেশি হলে এক ঘন্টা, সোয়া ঘন্টা সময় লাগে। পাঁচ ওয়াক্ত নামাযে
সাধারণত এরচেয়ে বেশি সময় ব্যয় হয় না। অবিশষ্ট সকল সময় তোমরা নিজেদের
প্রয়োজন পূরণ করতে পার। তবে শর্ত এই যে, আল্লাহকে যেন ভুলে যেও না, আল্লাহ
তাআলার আহকাম, কোন কাজ হালাল আর কোনটি হারাম তা ভুলে যেও না। তাহলে সকল
কিছুই তোমাদের জন্য বৈধ হবে।
কিন’
কী ঘটেছে? মানুষ যখন এই সুযোগ পেল যে, ইবাদত তো পাঁচ ওয়াক্ত করতে হবে আর
বাকি সময় ব্যবসা করা যাবে, মানুষের সঙ্গে মেলামেশা করা যাবে,
স্ত্রী-সন-ানের হক আদায় করা যাবে তখন তারা এতেই মগ্ন হয়ে গেল। আল্লাহ তাআলা
এই অভিযোগই করেছেন সূরা তাকাছূর-এ যা আমি আপনাদের সামনে তেলাওয়াত করেছি।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, (তরজমা) চিন-া তোমাদেরকে (আখিরাতের বিষয়ে) উদাসীন
করে দিয়েছে। অর্থাৎ আমি তো তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছিলাম আমার ইবাদতের জন্য।
আর তোমাদের সহজতার লক্ষ্যে ব্যবসা, উপার্জন ইত্যাদি বৈধ করেছিলাম। কিন’
তোমরা এই প্রতিযোগিতা শুরু করেছ যে, আমার কাছে অন্যের চেয়ে বেশি সম্পদ
থাকুক, অন্যের চেয়ে বেশি টাকা-পয়সা আসুক, আমার বাড়ি অন্যের চেয়ে উন্নত হোক,
গাড়িটা সবার চেয়ে ভালো হোক, আমার অলংকার, কাপড়-চোপড় অন্যের চেয়ে উত্তম
হোক। আর এতেই তোমরা সকল সামর্থ্য ব্যয় করছ। এই প্রতিযোগিতা তোমাদেরকে
ভুলিয়ে দিয়েছে জীবনের মূল লক্ষ্য, যার জন্য তোমরা দুনিয়ায় এসেছ। তাকাছুর
অর্থ ধন-সম্পদ ও দুনিয়ার উপায়-উপকরণের প্রতিযোগিতায় একে অন্যের চেয়ে
অগ্রগামী হওয়ার চেষ্টা করা। অমুকের বাংলো এত ভালো, আমারটা তার চেয়েও ভালো
হওয়া চাই। অমুকের গাড়ি এরকম তো আমারটা তার চেয়ে উন্নত হওয়া চাই। অমুকের
অলংকার, কাপড় এত ভালো তো আমার অলংকার, কাপড় তার চেয়েও ভালো হওয়া চাই।
দিনরাত তোমরা এই চিন-াতেই ব্যস-, এ নিয়েই তোমাদের সকল ভাবনা। আল্লাহ তাআলা
অন্যত্র ইরশাদ করেন, ‘তোমরা দুনিয়ার জীবন, যা ছিল ইবাদতের তা কী করে ফেলেছ?
যে উদ্দেশ্যে তোমাদেরকে দুনিয়ায় পাঠানো হয়েছিল তা তোমরা ভুলে গিয়েছ।
তোমাদের কাছে দুনিয়াবী জীবন হচ্ছে খেলাধুলা, সাজসজ্জা, পরস্পর গর্ব-অহংকার
এবং সন-ান ও সম্পদে পরস্পর প্রতিযোগিতা।’ অর্থাৎ জীবনের শুরু হয় খেলাধুলা
দিয়ে। বাল্যকালে সবচেয়ে বেশি আগ্রহ খেলাধুলার প্রতিই থাকে। তাই খেলাধুলা
নিয়েই পড়ে থাকলে। তাতেই সকল আগ্রহ ও সকল উৎসাহ, সর্বক্ষণ এক চিন-া খেলায়
কিভাবে বিজয়ী হব। এরপর যৌবনে উপনীত হলে আগ্রহ জাগল জাঁকজমকের। এখন শখ শুধু
এই যে, আমার কাপড় সুন্দর হওয়া চাই, অলংকার সুন্দর হওয়া চাই। তারপর কী হল?
এখন অন্যের উপর গর্ব করব যে, আমার এত টাকা-পয়সা আছে, আমার এত
ব্যাংক-ব্যালেন্স আছে। আমার সন-ান এতজন, আমার এত আয়-উপার্জন। আমার এত সেট
কাপড়, এত সেট অলংকার এভাবে একে অন্যের উপর গর্ব করা। এরপর ধন-সম্পদ ও
সন-ান-সন-তির প্রতিযোগিতায় একে অন্যের চেয়ে অগ্রগামী হওয়ার চিন-া। আল্লাহ
তাআলা শৈশব থেকে বার্ধক্য পর্যন- গোটা জীবনের চিত্র তুলে ধরেছেন। আর তা এমন
চিত্র যে, পরবর্তী স-রে পৌঁছে মানুষ পূর্বের স-রকে বোকামি মনে করে এবং
ভাবতে থাকে যে, কী বোকাই না ছিলাম তখন! সারাক্ষণ ওই কাজ নিয়েই পড়ে থাকতাম।
আমরা যখন শিশু ছিলাম তখন কী করতাম? খেলাধুলা। আগ্রহ ও চেষ্টা থাকত শুধু এক
বিষয়ে। তা এই যে, ভালো একটা খেলা হয়ে যাক, খেলায় যেন জয় লাভ করি! এখন যখন
বড় হয়ে পিছনের কথা মনে করি যে, শৈশবে যখন খেলাধুলা করতাম এবং জয়-পরাজয়কেই
জীবনের বড় বিষয় মনে করতাম তখন কি আমাদের হাসি পায় না? আমাদের কি মনে হয় না
যে, তখন কেমন বোকার রাজ্যে বাস করছিলাম! আমার শ্রদ্ধেয় পিতা তাঁর শৈশবের
ঘটনা বলতেন যে, ছোটকালে দেওবন্দে এক ধরনের খেলা ছিল ‘সারকান্ডা’। সারকাণ্ডা
হচ্ছে, তুলার একটি ছোট চারাগাছ, যাতে একটি ডাল হত। সে সময় খেলাধুলাও এমন
হত যে, তাতে অর্থ খরচ হত না। আজকাল তো খেলাধুলার জন্যও হাজার হাজার টাকা
প্রয়োজন। আগেকার দিনে খেলাধুলার পিছনে টাকা-পয়সা খরচ হত না। সাধারণ জিনিস
নিয়েই শিশুরা খেলাধুলা করত। সারকাণ্ডা খেলার নিয়ম এই ছিল যে, সকলেই তা উপর
থেকে নিচে নিক্ষেপ করত। যার সারকাণ্ডা আগে পৌঁছে যেত সে জয়ী হত আর যারটা
পিছনে রয়ে যেত সে পরাজিত হত। তিনি বলেন, আমার মনে আছে, আমি আমার কাজিনের
সঙ্গে সারকাণ্ডা খেলছিলাম। খেলায় যে জয়ী হত সে অন্যজনের চারাগুলো নিয়ে যেত।
আব্বাজান বলেন, আমি খেলাধুলায় সব সময় পিছনে থাকতাম। খেলাধুলার অভিজ্ঞতা
আমার কখনো হয়নি। আমার কাজিন ছিল খুবই চৌকস।সারকাণ্ডা নিক্ষেপ করা হলে তার
সারকাণ্ডা আগে পৌঁছে যেত আর আমার গুলো পিছনে থেকে যেত। ফলে আমার কাছে যত
সারকাণ্ডা ছিল সবগুলোই সে জিতে নিল। একটিও অবশিষ্ট থাকল না। এতে আমার এত
দুঃখ হল এবং এত বেশি ক্রন্দন করলাম, যেন দুনিয়ার সব কিছুই আমি হারিয়ে
ফেলেছি। আজও শৈশবের সে কান্নার কথা ভাবলে খুব হাসি পায় যে, কীসের জন্য এত
কেঁদেছিলাম? তা তো ছিল সামান্য কয়েকটি চারা। অথচ এর কারণে আমি মনে করতাম
যে, আমার সারা দুনিয়া লুট হয়ে গেছে। মোটকথা পরবর্তী স-রে উপনীত হয়ে পূর্বের
স-রের অজ্ঞতাগুলো বোঝা যায়। যৌবনে পৌঁছে শৈশবের খেলাধুলাকে অজ্ঞতা মনে
করে। বার্ধক্যে এসে যৌবনের সাজসজ্জা, পোশাক-পরিচ্ছদ, ইত্যাদি সবকিছু
অর্থহীন মনে হয়। যুবকদের চালচলন, সাজসজ্জা দেখে হাসি পায়। মনে হয় তারা কত
বোকামীতে লিপ্ত রয়েছে। এ সময়ের একমাত্র ভাবনা, ব্যাংক-ব্যালেন্স কত বেশি
করা যায়, কত বেশি সুনাম-সুখ্যাতি লাভ করা যায়, সম্পদ কত বৃদ্ধি করা যায়
ইত্যাদি। কোনো ভাবে কাপড় নষ্ট হয়ে গেলে, ময়লা হয়ে গেলে সে দিকে ভ্রুক্ষেপও
করা হয় না। সাজসজ্জা না হলেও অসুবিধা নেই তবে সম্পদ বৃদ্ধি হওয়া চাই। সকল
মানুষই পরের স-রে পৌঁছে পূর্বের স-রকে বেওকুফী মনে করে এবং তা মনে করে
হাসে। কিন’ এতটুকুই। এটুকু ভেবেই শেষ। আর এটাই হল মন্দ অভ্যাস। আব্বাজান
বলেন, মৃত্যুর পর যখন এর পরের স-র আসবে, মানুষ আখেরাতে পৌঁছবে তখন সম্পদ
নিয়ে ঝগড়া-বিবাদের উপরও তেমনি হাসি আসবে যেমন আজ সারকাণ্ডা খেলার জন্য হাসি
পায়। আখিরাতে পৌছে বুঝে আসবে যে, দুনিয়ার সহায়-সম্পদ নিয়ে ঝগড়া-বিবাদ করা
ছিল কত বড় অজ্ঞতা। কেননা সেখানে গিয়ে বুঝতে পারব যে, এসব জিনিসের কোনো
মূল্যই নেই। এসব ছিল শুধুমাত্র ধোঁকা। কুরআন মজীদে ইরশাদ হয়েছে, ‘দুনিয়ার
জীবন কেবল ধোঁকার উপকরণ।’ কুরআন মজীদে এ কথা ঘোষণা করা হয়েছে যে,
ধন-সম্পদের প্রাচুর্য অর্জনের চেষ্টা তোমাদেরকে জীবনের মূল লক্ষ্য ভুলিয়ে
দিয়েছে। এমনকি তোমরা কবরস-ান পর্যন- পৌঁছে গেছ। অর্থাৎ মৃত্যু পর্যন-
তোমাদের ভাবনা ও প্রচেষ্টা সবকিছুই অধিক সম্পদ উপার্জন নিয়ে। পরের আয়াতে
বলা হয়েছে, কখনোই এমন হওয়া উচিত নয়। অচিরেই তোমরা বুঝতে সক্ষম হবে। কুরআন
মজীদের বাক্যগুলো লক্ষ করুন, তোমরা অচিরেই বুঝতে পারবে যে, যেসব বস’ তোমরা
অধিকতর অর্জন করার পিছনে পড়ে ছিলে তার কোনো মূল্যই নেই। পুনরায় কুরআন মজীদ
বলছে, তোমাদের কখনো এমন করা উচিত নয়। অচিরেই তোমরা বুঝতে সক্ষম হবে। যতক্ষণ
এই চোখ দুটি খোলা আছে ততক্ষণ পর্যন- এই সব পার্থিব ধন-সম্পদ তোমাদের ধোঁকা
দিতে থাকবে। যেদিন চোখ বন্ধ হয়ে যাবে সেদিন বাস-বতা প্রকাশিত হবে। সেদিন
দুনিয়ার সাজসজ্জা, ধন-সম্পদের প্রকৃত অবস’া বুঝে আসবে। এরপর বলা হয়েছে,
‘তোমাদের কখনো এমন করা উচিত নয়। আহা! যদি তোমাদের ইলমে ইয়াকীন হাসিল হয়ে
যেত তাহলে তোমরা বুঝতে পারতে। তোমরা স্বচক্ষে দেখবে প্রজ্বলিত অগ্নির
দোযখকে। তোমরা অবশ্যই দেখবে জাহান্নামকে।’ কিভাবে দেখবে? বলা হয়েছে,
ইকায়ীনের চোখে দেখবে। অর্থাৎ চোখে দেখে তোমাদের ইয়াকীন হাসিল হয়ে যাবে। আজ
শুধু বিশ্বাসে আছে, কিন’ সেদিন চোখে দেখে ইয়াকীন হয়ে যাবে। এরপর আল্লাহ
তাআলা বলেন, সেদিন তোমাদেরকে জিজ্ঞাসা করা হবে, দুনিয়ায় আমি তোমাদেরকে যে
নেয়ামতসমূহ দান করেছিলাম তার কী হক আদায় করেছ? ওই নেয়ামতসমূহের কীরূপ
ব্যবহার করেছ?
সেদিন তোমাদেরকে ওই নেয়ামতসমূহের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হবে যা আমি তোমাদেরকে দুনিয়ায় দান করেছি। সেসবের কী হক তোমরা আদায় করেছ?
হাদীস
শরীফে আছে, একবারের ঘটনা। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উপবাসী
ছিলেন। ঘরে কোনো খাবার ছিল না। চিন্তা করুন, আজ আমরা কত সুখে দিন
কাটাচ্ছি। কত উত্তম খাবার গ্রহণ করছি। আর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লাম এভাবে জীবন যাপন করেছেন যে, তাঁকে ও তাঁর পরিবার-পরিজনকে উপবাসও
করতে হয়েছে। উম্মুল মু’মিনীন হযরত আয়েশা রা. বলেন, কখনো কখনো এমনও হয়েছে
যে পরপর তিন মাসের চাঁদ দেখা হয়ে যেত অথচ আমাদের ঘরে আগুন জ্বালানোর
ব্যবস্তা হত না। জিজ্ঞাসা করা হল, কীভাবে জীবন ধারণ করতেন? উত্তরে বললেন,
খেজুর ও পানি দ্বারা।’ তিন মাস যাবৎ শুধু খেজুর আর পানি দ্বারা জীবন ধারণ!
এক
সাহাবী বলেন, ‘নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পুরো জীবনে কখনো পেট
ভরে যবের রুটি খাননি।’ একদা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ক্ষুধার্ত
ছিলেন আর ঘরেও খাওয়ার মতো কিছু ছিল না। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
কোনো কাজে বাইরে বের হয়েছেন। দেখলেন যে, একজন সাহাবী আসছেন। নবী
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞাসা করলেন, কেন এসেছ? উত্তরে তিনি
বললেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ! খুব ক্ষুধার্ত আর খাওয়ারও কিছু নেই। তখন দো
জাহানের বাদশাহ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ভাই! আমারও তো
একই অবস্থা। চল, আমার এক বন্ধুর (একজন আনসারী সাহাবী) বাগান আছে। আমরা
বাগানে প্রবেশ করলাম। সাহাবী আমাদের দেখে অত্যন্ত খুশি হলেন যে, নবী
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আগমন করেছেন। তখন ছিল গরম কাল। তিনি নবী
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে একটি গাছের নিচে বসিয়ে নিজে খেজুর
ইত্যাদি আনতে গেলেন। কিছুক্ষণ পর খেজুর ও ঠাণ্ডা পানি নিয়ে এলেন। নবী
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খেজুর খেলেন এবং পানি পান করলেন। এরপর
সাহাবীদের লক্ষ করে বললেন, যা কুরআন মজীদে বলা হয়েছে, (তরজমা) ‘কেয়ামতের
দিন তোমাদেরকে নেয়ামতসমূহের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হবে।’ এই খেজুর ও ঠাণ্ডা
পানি সম্পর্কেও কেয়ামতের দিন জিজ্ঞাসা করা হবে যে, তোমাদেরকে যে নেয়ামত
দান করেছিলাম তার কী হক আদায় করেছ?
একটু
ভাবুন, ক্ষুধার সময় যখন ঘরে খাওয়ার কিছুই ছিল না সে অবস্থায়ও যে খেজুর ও
পানি পাওয়া গেল সে সম্পর্কেও কেয়ামতের দিন জিজ্ঞাসা করা হবে যে, তোমরা তার
কী হক আদায় করেছ?
অথচ
আজ আমরা বিলাসী জীবন যাপন করছি। যা ইচ্ছা খাচ্ছি, পান করছি। সাহাবায়ে
কেরামের সামনে কোনো উত্তম খাবার আসলে তারা কান্নায় ভেঙ্গে পড়তেন, খাবার
খেতে পারতেন না। তারা বলতেন, আমাদের মনে পড়ে যায় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লাম কীভাবে জীবন যাপন করেছেন। আজ আমরা এত উন্নত জীবন যাপন করছি!
আমি
বলছিলাম, আমাদেরকে কুরআন মজীদ সতর্ক করে দিচ্ছে যে, তোমরা তো দিনরাত
নিজেদের শরীর পূজায় লিপ্ত রয়েছ এবং এই চিন্তায় নিমগ্ন রয়েছ যে, কীভাবে
বিলাসী থেকে বিলাসী জীবন-যাপন করা যায়, অধিক থেকে অধিক সম্পদ উপার্জন করা
যায় আর এ চিন্তাই তোমাদেরকে আখিরাত সম্পর্কে উদাসীন করে রেখেছে। যার ফলে
তোমরা এ অবস্থায়ই কবরস্থানে চলে যাবে এবং সেখানে গিয়ে তোমরা বুঝতে পারবে,
তোমরা কেমন নির্বুদ্ধিতার শিকার ছিলে। সেদিন তোমাদেরকে জিজ্ঞাসা করা হবে,
যেসব নেয়ামত তোমাদেরকে দান করা হয়েছিল তার কী হক তোমরা আদায় করেছ? তোমরা কি
আল্লাহ তাআলার শোকর আদায় করেছ? আল্লাহ তাআলার ইবাদত করেছ? আল্লাহর বিধান
মেনে চলেছ? আমার ভাই ও বোনেরা!
আমরা
এ সূরা সবসময়ই পড়ে থাকি প্রত্যেক মুসলমানেরই এ সূরা মুখস্ত আছে। কিন্তু
যেহেতু অর্থ জানা নেই তাই এতে যে গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ দেওয়া হয়েছে সে
সম্পর্কে আমরা উদাসীন থাকি। প্রত্যেকেই নিজের অবস্থা যাচাই করে দেখি যে,
সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কোন চিন্তায় মগ্ন ছিলাম আর কতটুকু সময় মূল
লক্ষ্যের প্রতি মনোযোগী ছিলাম। কতটুকু সময় আল্লাহ তাআলার স্মরণে কেটেছে?
কখনো কি এ চিন্তা এসেছে যে, আমাকে দুনিয়া ছেড়ে চলে যেতে হবে, আল্লাহ তাআলার
সামনে দাঁড়াতে হবে এবং কৃতকর্মের জবাবদিহী করতে হবে? এ চিন্তাটা কতটুকু
সময় হয়েছে? তাহলে বাস্তব তো তা-ই, যা কুরআন মজীদ স্পষ্ট করে বলে দিয়েছে
(তরজমা) অর্থ-প্রাচুর্য তোমাদেরকে উদাসীন করে দিয়েছে।
এই উদাসীনতা থেকে মুক্তির উপায় খোঁজা প্রয়োজন
এ
বিষয়ে সর্বপ্রথম কথা হল মাথা থেকে এ ভ্রান্ত ধারণা ঝেড়ে ফেলা যে, এই
দুনিয়া শুধু উপার্জনের জন্য। কাফেররা যেমন বলে, (তরজমা) আমাদের পার্থিব
জীবন ছাড়া আর তো কোনো জীবন নেই। এতেই আমাদের জীবন ও মৃত্যু। আর সময়ই
আমাদেরকে বিলুপ্ত করে। আল্লাহর ওয়াস্তে এই বাস্তবতাটুকু বুঝতে চেষ্টা করুন
যে, দুনিয়ার জীবন হল একটি সফর এবং তা যে কোনো সময় সমাপ্ত হয়ে যাবে। এরপর
আখেরাতের জীবন শুরু হবে। আল্লাহ তাআলার সামনে জবাবদিহী করতে হবে। নবী করীম
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘সকল স্বাদ বিনষ্টকারী
মৃত্যুর কথা বেশি বেশি স্মরণ কর।’ অথচ আমাদের তো তা স্মরণই হয় না।
নিজের
হাতে প্রিয়জনদের কাফন পরাই, নিজের হাতে কবরে দাফন করি, নিজের কাঁধে জানাযা
উঠিয়ে নিয়ে যাই, নিজের হাতে মাটি দেই। এরপর হাত পরিষ্কার করে ফিরে আসি।
তখনো এ চিন্তা আসে না যে, এমন সময় আমারও একদিন আসবে। আমিও একদিন কবরে যাব।
একটি কথা তো হল মৃত্যুকে স্মরণ করা। হাকীমুল উম্মত হযরত থানভী রাহ. বলেছেন,
দিনের কোনো একটি সময় এই ধ্যান করা চাই যে, আমার জীবনের শেষ মুহূর্ত এসে
গেছে, আমি দুনিয়া থেকে চলে যাচ্ছি। আত্মীয়-স্বজন আমাকে কবরে রেখে চলে গেছে।
ফেরেশতাগণ এসেছেন। সুওয়াল-জওয়াব শুরু হয়েছে। আমার সারা জীবনের আমলনামা
সামনে রাখা হয়েছে। বলুন, এ সময় কী অবস্থা হবে? এ বিষয়টি ধ্যান করা জরুরি।
এর জন্য অল্প সময় বের করতে হবে। আল্লাহ তাআলা নিজ রহমতে এই ফিকির আমাদের
অন্তরে মজবুত করে দিন যে, এই দুনিয়াই সবকিছু নয়। দুনিয়ার পরে আরো একটি জীবন
আছে।
এই
চিন্তা-ভাবনা ও মানসিকতা তৈরির বিষয়ে সবচেয়ে বড় দায়িত্ব মহিলাদের। তারা
প্রথম দিন থেকেই শিশুর মনে এই চিন্তার বীজ বপন করবে। আল্লাহ তাআলা
মহিলাদেরকে উচ্চ মর্যাদা দান করেছেন। এত অধিক মর্যাদা দিয়েছেন যে, পুরুষের
তাতে ঈর্ষা করা উচিত। কেননা, নারীর কোলেই জাতির ভবিষ্যত তৈরি হয়। ভবিষ্যতের
বড় বড় আলেম মনীষী তাঁদের কোলেই লালিত-পালিত হয়। যাদের মধ্যে মানুষের
ব্যক্তিত্ব গঠিত হয়। মহিলারাই এসব দায়িত্ব পালন করে থাকে।
আমি
বলে থাকি, পৃথিবী এখন বড় বড় ইমাম ও বড় বড় ওলিকে চিনে। ইমাম আবু হানীফা,
ইমাম শাফেয়ী, ইমাম মালেক, শায়খ আবদুল কাদের জিলানী, ইমাম গাযালী, শিবলী,
জুনায়েদ যাদের ব্যক্তিত্ব ও বুযুর্গি গোটা বিশ্বে সমাদৃত। কিন্তু এটি কারো
চোখে পড়ে না আবু হানীফার ইমাম আবু হানীফা হওয়ার পেছনে প্রথম ভূমিকা কার,
গাযালিকে ইমাম গাযালি কে বানিয়েছেন, আবদুল কাদের জিলানীর শায়খ আবদুল কাদের
জিলানী হওয়ার পেছনে কার ভূমিকা ছিল? বাস্তবিক পক্ষে তাঁদের মায়েরাই তাদেরকে
এমনভাবে প্রতিপালন করেছেন, যার ফলে আল্লাহ তাআলা তাদেরকে এই মর্যাদায়
অধিষ্ঠিত করেছেন। তাঁরা এমন মা ছিলেন, যারা নাড়ি ভেদ করে ক্ষুধার যন্ত্রণা
সহ্য করে নিজের সন্তানদেরকে জ্ঞান ও প্রজ্ঞা দ্বারা সুসজ্জিত করেছেন এবং
তাদের মাঝে আখিরাতের চিন্তা সৃষ্টি করেছেন। তাঁরা এমন মা ছিলেন যারা সূরা
ইয়াসীন পাঠ করে সন্তানকে দুধ পান করাতেন, সন্তানকে সর্বপ্রথম ‘লা ইলাহা
ইল্লাল্লাহ’ শিক্ষা দিতেন। যারা সন্তানকে এমনভাবে তরবিয়ত করেছেন যেন সে
স্বভাবগতভাবে সত্যভাষী, আমানতদার ও শরীয়তের অনুগামী হয়ে গড়ে ওঠে। সে
হালাল-হারামের পার্থক্য বুঝবে, সুন্নতের অনুসারী হবে। তাদের অন-রে এই ভাবনা
সর্বদা বিরাজমান ছিল যে, এই সন্তানের তরবিয়তের দায়িত্ব আমার। আজ সেসব
মায়েদের নাম কেউ জানে না। তাই আমি বলছি যে, পুরুষদের চেয়ে বেশি মর্যাদা
সেসব মায়েরা। কেননা, মনে করুন, একজন আলেম কিংবা আল্লাহ ওয়ালা দুনিয়াতে খুব
প্রসিদ্ধি লাভ করলেন। এতে কিন্তু প্রসিদ্ধির ফেতনাও থেকে যায়। আল্লাহ না
করুন-তার মধ্যে সুনাম-সুখ্যাতির চিন্তাও আসতে পারে, তার মধ্যে অহংবোধও
জাগ্রত হতে পারে, উজবও হতে পারে। কিন্তু পিছনের সে অজানা-অপরিচিতা মা, যার
কথা কোথাও পাওয়া যায় না, যাকে কেউ চেনেও না তিনি তো শুধু ইখলাছের সঙ্গে
জাতির বুনিয়াদ স্থাপন করে যাচ্ছেন; যার মধ্যে শয়তানের ধোঁকার কোনো
সম্ভাবনাও নেই।
সে
মায়েরা কীভাবে সন্তানকে লালন-পালন করেছেন! হযরত রবীআতুর রায় যিনি হযরত
ইমাম মালেক রাহ.-এর উস্তাদ। তার পিতা বিয়ের পরপরই জিহাদে চলে গিয়েছিলেন।
দীর্ঘ সময়ের জিহাদ ছিল। আনুমানিক ২২ বছর তিনি জিহাদে থাকার পর মদীনা
মুনাওয়ারায় ফিরে এলেন। বাড়ি ফিরে গৃহে প্রবেশ করার সময় দেখলেন, এক যুবক তার
ঘর থেকে বের হচ্ছে। তিনি মনে করলেন, কোনো অপরিচিত মানুষ। তিনি তাকে ধমক
দিলেন-তুমি আমার ঘরে প্রবেশ করলে কীভাবে? একপর্যায়ে তাদের মাঝে ঝগড়া বেধে
গেল। ভিতর থেকে স্ত্রী বলল, ঝগড়া করবেন না। সে আপনার ছেলে। মসজিদে নববীতে
নামায পড়তে গিয়ে লোকদের একটি বড় মজলিস দেখতে পেলেন, যারা হাদীস পড়তে
এসেছেন। চেহারা চাদরাবৃত ছিল এজন্য তিনি তাকে চিনতে পারেননি। তিনিও দরসে
বসে পড়লেন। পরবর্তীতে জানতে পারলেন, তা তার ছেলের দরস ছিল। ইনি রবীআতুর
রায়-ইমাম মালেকের উস্তাদ ছিলেন।
হযরত
রবীআতুর রায় রাহ.-এর পিতা একদিন স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করলেন, আমি তোমাকে দশ
হাজার দিনার দিয়েছিলাম। তোমার কোনো কষ্ট হয়নি তো? উত্তরে স্ত্রী বললেন, আমি
দশ হাজার দিনার এই ছেলের লালন-পালনে খরচ করেছি। নিজের সকল প্রয়োজন উৎসর্গ
করেছি এবং আপনার এই ছেলেকে হাদীসের ইলম শিক্ষা দেওয়ার জন্য ২২ বছর পর্যন্ত
আমি এমনটি করেছি। রবীআতুর রায়কে তো আজ সবাই চিনে, তাকে ইমাম মালেকের উস্তাদ
বলে। কিন্তু যে মা সবকিছু উৎসর্গ করে এই মানুষটিকে তৈরি করেছেন, এই আলেমকে
সৃষ্টি করেছেন তাকে কেউ চিনে না। সুতরাং সে মায়ের মর্যাদা নিঃসন্দেহে
রবীআতুর রায় থেকে হাজার গুণ বেশি হবে। যিনি এত ইখলাছের সঙ্গে, এত কিছু
উৎসর্গ করে এই মানুষটিকে গঠন করেছেন। আল্লাহ তাআলা মহিলাদেরকে এমনই মর্যাদা
দান করেছেন। কিন্তু আফসোসের বিষয়, আজ পশ্চিমা প্রচারণার ফলে মহিলারা তাদের
মর্যাদা ভুলে গেছে। তাদেরকে এই মর্যাদার কথা ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। ইংরেজ ও
পশ্চিমা শক্তির অপপ্রচার মহিলাদেরকে বুঝিয়েছে যে, তোমাদেরকে ঘরের চার
দেওয়ালের ভিতরে আবদ্ধ করে রাখা হয়েছে। অথচ তোমার তো পুরুষের সঙ্গে কাঁধে
কাঁধ মিলিয়ে কাজ করার কথা। তুমিও বের হও, তুমিও রাষ্ট্রপ্রধান হও, তুমিও
প্রধানমন্ত্রী হও, তুমিও বড় বড় পদ লাভের চেষ্টা কর। তোমাকে কেন তা থেকে
বঞ্চিত করা হবে? ফলে মহিলারা ধোঁকায় পড়ে গেছে এবং ঘর থেকে বের হয়ে গেছে। এ
ধোঁকায় তাকে ঘর থেকে বের করা হয়েছে যে, তোমাকে প্রধানমন্ত্রী বানানো হবে,
রাষ্ট্রপ্রধান বানানো হবে, উচ্চ পদ প্রদান করা হবে।
আজ
আমেরিকার অবস্থা দেখুন, আমেরিকার ইতিহাসে কোনো মহিলা রাষ্ট্রপ্রধান হয়নি।
কিছুদিন আগে একজন প্রার্থী হয়েছিল কিন্তু পরাজিত হয়েছে। রাষ্টপ্রধান তো কেউ
হতে পারেনি। কিন্তু লক্ষ লক্ষ মহিলাকে রাস্তায় বের করা হয়েছে। পৃথিবীর যত
নিকৃষ্টতম কাজ আছে তা মহিলাদেরকে দেওয়া হয়েছে। রাস্তা পরিষ্কার করছে
মহিলারা, হোটেলে বেয়ারার কাজও তারা করছে। হোটেলে পুরুষদের বিছানার চাদর
সাজানোর দায়িত্ব মহিলাদের, তাদের ঘরবাড়ি পরিচ্ছন্ন করার কাজও মহিলারা করছে।
এছাড়া আরো নিকৃষ্টতম কাজ তাদের উপর ন্যস্ত করা হয়েছে। অথচ এই মহিলা যদি
নিজের ঘরে নিজের জন্য, নিজের স্বামীর জন্য এবং নিজের সন্তানের জন্য রান্না
করে তখন তা লজ্জার চোখে দেখা হয় এবং তা পশ্চাদপদতা হয়ে যায়!
আশ্চর্য
দর্শন এই যে, মহিলা যখন বিমানে বিমানবালা হয়ে মানুষের সেবা করে, তাদের
সামনে ট্রে সাজিয়ে পরিবেশন করে এবং তাদের কামাসক্ত দৃষ্টিতে বিদ্ধ হয় তখন
তা হয় ‘স্বাধীনতা’। পক্ষান্তরে সে যদি নিজের ঘরে নিজের জন্য, স্বামী ও
সন্তানের জন্য, পিতামাতার জন্য খাবার রান্না করে তাহলে তা পরাধীনতা। এই
আশ্চর্য দর্শনে নারীকে ভুলিয়ে বণিক সমপ্রদায় তাকে ব্যবহার করেছে বাণিজ্যিক
স্বার্থে। তাকে বানানো হয়েছে প্রদর্শনীর বস্তু। সেলসগার্ল দরকার তো মহিলা
হতে হবে, পণ্য বিক্রির প্রয়োজন তো মহিলারই বিক্রি করতে হবে। যেন তার
রূপ-সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে মানুষ পণ্য ক্রয় করে। তার প্রতিটি অঙ্গ খোলা
বাজারের পণ্যে পরিণত হয়েছে। এমন কোনো বিজ্ঞাপন পাওয়া যাবে না, যাতে নারীর
ছবি নেই। নারীকে পণ্য বানিয়ে নিজেরা অর্থ উপার্জন করছে। এর নাম দিয়েছে নারী
স্বাধীনতা! প্রিয় বোন, আমি এই নিবেদন করতে চাই যে, আল্লাহর ওয়াস্তে এই
প্রতারণার শিকার হয়ো না। আল্লাহ তাআলা তোমাকে যে মর্যাদা দান করেছেন তা
অনুধাবন কর। তোমার মাধ্যমে জাতির ভবিষ্যত তৈরি হয়। তোমার কোলে লালিত-পালিত
হয় উম্মাহর আগামী প্রজন্ম। নারীকে বাইরে বের করার জন্য ভদ্রতার ভেক ধারণ
করা হয়েছে। বোঝানো হয়েছে যে, মুসলমানরা একাধিক পত্নী রাখা বৈধ মনে করে। অথচ
আমাদের দেখ, আমরা কত ভদ্র! আমাদের কারো একাধিক পত্নী নেই! এভাবে ভদ্রতার
ছলে নারীকে বাইরে টেনে এনে, পথে নামিয়ে, হোটেলে বসিয়ে অবস্থা এমন করেছে যে,
ঘরের স্ত্রীও এখন আর ঘরে নেই, সেও এখন বাইরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। প্রতি স্থানে
নতুন নতুন পত্নী সৃষ্টি হচ্ছে। প্রতিটি দাওয়াত, প্রতিটি ডিনার, প্রতিটি
হোটেল সর্বত্রই একাধিক সম্পর্ক গড়ে উঠছে। ফলে অবৈধ যৌন সম্পর্ক ব্যাপক হয়ে
গেছে, বিবাহ-বিচ্ছেদের পরিমাণ বেড়ে গেছে। এখন লোকেরা বলে, বিয়ের কী
প্রয়োজন? পশ্চিমা বিশ্বে এমন রাষ্ট্রের সংখ্যাই বেশি যার নাগরিকদের
অধিকাংশই পিতৃ পরিচয়হীন। যেহেতু পশ্চিমা প্রতারক-গোষ্ঠীর উদ্দেশ্য হল
নারীকে বাইরে বের করে আনা এবং তাকে অবাধ ভোগের বস্তুতে পরিণত করা তাই তার
পোশাকও তারা নির্বাচন করে দিয়েছে। পোশাক যত আঁটসাঁট ও উন্মুক্ত হবে ততই
ফ্যাশনেবল হবে! আফসোসের বিষয় এই যে, পশ্চিমা সংস্কৃতির ছায়া আমাদের দেশের
নারীদের মাঝেও ছড়িয়ে পড়েছে। তারা বাইরে বের হোক বা না হোক তাদের এমন পোশাক
চাই, যা পশ্চিমারা পরিধান করে এবং যা হবে সংক্ষিপ্ত ও আঁটসাঁট। হাদীস শরীফে
বর্ণিত হয়েছে, দুনিয়ার অনেক বস্ত্র পরিধানকারিনী আখিরাতে বিবস্ত্র হবে।
অর্থাৎ এমন অনেক মহিলা আছে যারা পোশাক পরিধান করলেও আখিরাতের বিচারে তারা
বিবস্ত্র। আমাদের দেশেও তাদের পোশাকের অনুকরণ শুরু হয়ে গেছে। নারীকে আল্লাহ
তাআলা এত মূল্যবান করে সৃষ্টি করেছেন, যা সংরক্ষণ উপযোগী। আর এজন্য আল্লাহ
তাআলা তার পর্দার বিধান দান করেছেন। কিন্তু পশ্চিমা সভ্যতার প্রভাবে পর্দা
বিলুপ্ত হতে চলেছে। আমাদের চিন্তা করা উচিত যে, আমরা কি দুনিয়াতেই থেকে
যাব, না কখনো মৃত্যুবরণ করতে হবে? কখনো আল্লাহ তাআলার সামনে জবাবদিহী করতে
হবে? তাই পর্দাহীনতার পরিবেশ দূর করা জরুরি। মহিলাদের দায়িত্ব হল নিজেও
মুসলমান হওয়া এবং সন্তানকেও মুসলমান বানানো। তার প্রতিটি কথা ও কাজে ঈমান ও
ইসলামের প্রতিফলন থাকা চাই। তাকে সত্যবাদী হতে হবে। তার মুখে কখনো মিথ্যা
উচ্চারিত হবে না। গীবত-শেকায়েত হবে না, গালিগালাজ হবে না। তার প্রতিটি কর্ম
ও আচরণ সন্তানের জন্য আদর্শ হবে। এক হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, একদা নবী
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক সাহাবীকে দেখলেন, তিনি সন্তানকে নিজের
কাছে ডাকছেন। কিন্তু বাচ্চাটি আসছে না। তখন সাহাবী বললেন, এস বৎস, আমার
কাছে এস। আমি তোমাকে একটি জিনিস দিব। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
সাহাবীকে তাৎক্ষণিক জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি তো বাচ্চাটিকে কিছু দেওয়ার কথা
বলেছ। বাস্তবেই কি কিছু দেওয়ার ইচ্ছা করেছ? সাহাবী বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ!
আমার কাছে একটি খেজুর ছিল। আমি ইচ্ছা করেছি যে, তাকে খজুরটি দিব। তখন
নবীজী বললেন, যদি বাস্তবেই তোমার এই ইচ্ছা থাকে তাহলে তো ভালো। কিন্তু যদি
শুধু বাচ্চাটিকে প্রলোভন দেখানোর জন্য বলে থাক তবে তা গুনাহর কাজ।’ এটি
দ্বিগুণ গুনাহ : একদিকে ওয়াদা ভঙ্গের গুনাহ। দ্বিতীয়ত বাচ্চাটিকে এই শিক্ষা
দেওয়া হল যে, ওয়াদা ভঙ্গ করা খারাপ বিষয় নয়। সে মনে করবে, আমার পিতা, আমার
বড়রাও ওয়াদা করে তা পূর্ণ করে না। অতএব এতে কোনো অসুবিধা নেই। ফলে
ভবিষ্যতে সেও ওয়াদা ভঙ্গ করবে। আর সে যতগুলো ওয়াদা ভঙ্গ করবে তার গুনাহ ওই
পিতামাতার আমলনামাতেও লেখা হবে। সুতরাং সন্তানের সঙ্গে মাতা-পিতার প্রতিটি
আচরণের সময় লক্ষ রাখতে হবে যে, তাদের আচরণটি যেন সত্য হয়। মিথ্যা না হয়।
মিথ্যা বলা হলে সন্তানের মধ্যে এই ধারণা সৃষ্টি হবে যে, মিথ্যা বলা খারাপ
কিছু নয়। আমার মাতা-পিতাও মিথ্যা বলেন। তাই আমিও যদি মিথ্যা বলি তাহলে কোনো
অসুবিধা হবে না। এসব তাকে মিথ্যুক বানিয়ে দিবে। আর গীবত তো এমন একটি বিষয়,
যাতে পুরুষ-মহিলা সবাই লিপ্ত। আল্লাহ তাআলা আমাদের রক্ষা করুন। আমাদের
কোনো মজলিস এমন পাওয়া কঠিন, যাতে গীবত হয় না। সম্ভবত পুরুষের তুলনায়
মহিলাদের মধ্যে এর প্রবণতা একটু বেশি। অথচ গীবত হল নিজের মৃত ভাইয়ের গোশত
খাওয়ার মতো অপরাধ। কত বড় অপরাধ! কত বড় গুনাহ! এখন যদি বাচ্চাদের সামনে এই
কাজ করা হয় তাহলে তারা মনে করবে, গীবত করতে কোনো দোষ নেই। প্রিয় মা-বোনেরা,
আমরা আজ এখানে একটি মহৎ দ্বীনী উদ্দেশ্যে সমবেত হয়েছি এবং দ্বীন সম্পর্কে
কিছু কথা আলোচনা করেছি। আসুন আমরা চিন্তা করি যে, আমরা কেন পৃথিবীতে এসেছি?
আমরা একটি বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে এসেছি। আল্লাহ তাআলার বিধান অনুযায়ী
জীবন-যাপনের জন্য এসেছি। এমন যেন না হয় যে, দুনিয়ার চাকচিক্যে আত্মবিস্মৃত
হয়ে এবং দুনিয়ার প্রাচুর্যে মত্ত হয়ে এ উদ্দেশ্যকেই ভুলে গেলাম। এই
চিন্তাটা আমাদের মধ্যে সৃষ্টি হওয়া জরুরি। যেদিন এই চিন্তা সৃষ্টি হবে
সেদিনটি হবে আমাদের জীবনের একটি উত্তম দিন এবং একটি ইতিবাচক বিপ্লবের দিন।
আল্লাহ
তাআলা আমাদেরকে এমন দ্বীন দান করেছেন, যাতে বস্তুত কোনো কাঠিন্য ও জটিলতা
নেই। কুরআন মজীদের বিভিন্ন স্থানে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন, আমি
তোমাদেরকে এমন কোনো বিধান পালনে বাধ্য করিনি, যা তোমাদের সাধ্যের বাইরে।
আমার সকল বিধান তোমরা পালন কর। তোমাদের রান্না-বান্না, পানাহার,
অতিথি-আপ্যায়ন, বিশ্রাম, মোটকথা দুনিয়ার যাবতীয় কাজ ইবাদতে পরিণত হবে। সঠিক
নিয়তে, সঠিক পন্থায় এ কাজগুলো সম্পাদন করা হলে তা ইবাদত হয়ে যাবে। এতই সহজ
করে দিয়েছেন আল্লাহ তাআলা। পরিশেষে আপনাদের খেদমতে কিছু আবেদন করছি। দেখুন
ভাই, রসমী ওয়াজ-নসীহতে কোনো ফায়দা নেই। তা কেবল কিছু সময়ের জন্য বসা আর
ওয়াজ শেষে কাপড় ঝেড়ে উঠে যাওয়া। ওয়াজ-নসীহতে ফায়দা তখন হবে যখন আমরা
চিন্তা-ভাবনা করব এবং আমাদের ভবিষ্যত জীবন উন্নত করতে সচেষ্ট হব। আমি
আপনাদের নিকট কয়েকটি প্রস্তাব পেশ করছি। এসবের উপর আমল করতে চেষ্টা করুন,
ইনশাআল্লাহ এর বরকতে আল্লাহ তাআলা আমাদের জীবনের ধারা পরিবর্তন করে দিবেন।
সর্বপ্রথম কথা হল, নিজের দৈনন্দিন জীবনের চব্বিশ ঘণ্টা থেকে কিছু সময়
দ্বীনী ইলম অর্জনের জন্য নির্ধারণ করুন। প্রত্যেকের আলেম হওয়া জরুরি নয়।
৮-১০ বছর মাদরাসায় ভর্তি হয়ে দরসে নেযামীর পাঠ সমাপ্ত করা সকলের প্রয়োজন
নেই। তবে এতটুকু ইলম অর্জন করা প্রতিটি নারী ও পুরুষের জন্য আবশ্যকীয়-ফরয,
যা একজন মুসলমানের ইসলামী জীবন-যাপনের জন্য প্রয়োজন। হাদীস শরীফে ইরশাদ
হয়েছে-ইলম অর্জন করা প্রত্যেক মুসলমানের অবশ্য কর্তব্য-ফরয। অর্থাৎ যতটুকু
ইলম অর্জন করলে মানুষ দ্বীন অনুযায়ী জীবন যাপন করতে পারে-এতটুকু ইলম অর্জন
করা ফরযে আইন। কোনো মাদরাসায় ভর্তি হয়ে তা অর্জন করাও জরুরি নয়।
আলহামদুলিল্লাহ, প্রায় সকল ভাষায় ওলামায়ে কেরাম এমন পঠনসামগ্রী প্রস্তুত
করে দিয়েছেন, যা অধ্যয়ন করে অতি সহজেই ইলমে দ্বীন লাভ করা যায়। এটা কঠিন
কিছু নয়। তাই চব্বিশ ঘণ্টা থেকে কিছু সময় বের করুন। অন্তত আধা ঘণ্টাই বের
করুন। এবং তা যত্নের সঙ্গে ব্যয় করুন। যেন দ্বীনের অপরিহার্য বিষয়গুলোর ইলম
এ সময়ে লাভ করা যায়।
আমি কয়েকটি কিতাবের পরামর্শ দিচ্ছি :
- ১. হাকীমুল উম্মত হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানবী রাহ.-এর ‘ইসলাহী নেসাব’। শুনেছি, বাংলা ভাষায়ও এর অনুবাদ প্রকাশিত হয়েছে। এটি সংগ্রহে রাখুন। প্রতিদিন অল্প অল্প করে পড়ুন এবং সন্তানদেরকেও পাঠ করে শোনান।
- ২. ‘উসওয়ায়ে রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।’ এ কিতাবটিরও বাংলা অনুবাদ হয়েছে। এতে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সুন্নতসমূহ অধিক পরিমাণে আলোচনা করা হয়েছে। প্রতিটি কাজের সুন্নত তরীকা বলে দেওয়া হয়েছে। দেখুন, অনেক কাজই আমরা করি। তা সুন্নত তরীকায় করলে কোনো কষ্ট-জটিলতা নেই, কোনো পেরেশানী নেই। অতিরিক্ত সময়ও ব্যয় হয় না। আলাদা কোনো মেহনত করারও প্রয়োজন নেই।
অনেক
কাজই আমরা করি। অথচ তা সুন্নত তরীকায় করলে কোনো কষ্ট-জটিলতা নেই। অতিরিক্ত
সময়ও ব্যয় হয় না। আলাদা কোনো মেহনত করারও প্রয়োজন নেই। শুধু একটু মনোযোগ
প্রয়োজন। কেবল অমনোযোগিতা ও অবহেলার কারণেই এসব সুন্নত থেকে আমরা বঞ্চিত
হই। এজন্য ‘উসওয়ায়ে রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম’ কিতাবটি
অত্যন্ত চমৎকার কিতাব। এরপর আল্লাহ তাআলা তাওফীক দিলে ‘বেহেশতী যেওর’
অধ্যয়ন করা যেতে পারে। এতে দ্বীন ও দুনিয়ার প্রয়োজনীয় অনেক বিষয় সন্নিবেশিত
হয়েছে। এই তিনটি কিতাব অধ্যয়ন করলে একজন মুসলমানের অপরিহার্য পরিমাণ ইলম
অর্জিত হবে ইনশাআল্লাহ। এ কিতাবগুলো নিজেও পড়ুন এবং সন্তানদেরকেও শামিল
করার চেষ্টা করুন। যেন তারাও দ্বীনী ইলম অর্জন করতে পারে। দ্বিতীয় কথা এই
যে, এসব কিতাবের পাশাপাশি কিংবা এগুলোর পর সাহাবায়ে কেরাম এবং বুযুর্গানে
দ্বীনের জীবন ও চরিত্র অধ্যয়ন করুন। এতে অনেক উপকার। হযরত মাওলানা ইউসুফ
রাহ.-এর ‘হায়াতুস সাহাবা’ অধ্যয়ন করা যেতে পারে। এটিরও বাংলা অনুবাদ
প্রকাশিত হয়েছে। তেমনিভাবে শায়খুল হাদীস মাওলানা যাকারিয়া রাহ.-এর
‘ফাযায়েলে আমাল’ও অধ্যয়ন করতে পারেন। এ কিতাবেরও বাংলা অনুবাদ পাওয়া যায়।
এসব কিতাব নিয়মিত পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন। প্রতিদিন অল্প করে হলেও পড়ুন।
কোনোদিন যেন ছুটে না যায়। সবশেষে আসুন, সবাই মিলে আল্লাহ তাআলার নিকট দুআ
করি, হে আল্লাহ! আমরা আমাদের জীবনের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য থেকে দূরে সরে গিয়েছি।
হে আল্লাহ! আমরা আপনার সন্তুষ্টি মোতাবেক জীবন যাপন করতে চাই। হে আল্লাহ!
আপনি আমাদেরকে হিম্মত দান করুন, উদ্দীপনা দান করুন এবং তাওফীক দান করুন।
আমাদের আমল-আখলাকে যেসব ত্রুটি রয়েছে, হে আল্লাহ! আপনি তা সংশোধন করে দিন।
প্রতিদিন হৃদয় থেকে আল্লাহ তাআলার দরবারে এই প্রার্থনা করুন। আমি নিজ থেকে
বলছি না। হযরত হাকীমুল উম্মত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী রাহ.বলেছেন, চল্লিশ
দিন আমল করে দেখুন, ইনশাআল্লাহ জীবনে পরিবর্তন আসবে। চল্লিশ দিন দুআ করে
দেখুন; এটি সাধারণ কোনো দুআ নয়; বরং অনেক গুরুত্বপূর্ণ একটি দুআ। এর
উপকারিতাও অনেক বেশি। এর মাধ্যমে বহু মানুষের জীবনে পরিবর্তন এসেছে। আমার
নিজেরও অনেক ঘটনা আছে, আমি নিজেও এই দুআর উপকারিতা প্রত্যক্ষ করেছি।
আপনাদের কাছে প্রতিদিন শোয়ার পূর্বে আধা ঘণ্টা সময় চাই, যে সময় এই
কিতাবগুলো অধ্যয়ন করবেন এবং অধ্যয়ন শেষে আল্লাহ তাআলার নিকট দুআ করবেন।
এরপর যা কিছু জানা হল পরবর্তী দিনের শুরু থেকেই সে অনুযায়ী আমল করার চেষ্টা
করুন। (এ সময় কেউ দুআর বিষয়বস্তু সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি পুনরায় বলেন,)
এভাবে দুআ করুন যে, হে আল্লাহ, আমরা আপনার দ্বীন অনুযায়ী এবং নবী
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর তালীম অনুযায়ী জীবন যাপন করতে চাই,
কিন্তু আমাদের নফস আমাদেরকে ধোকা দেয়, শয়তান আমাদেরকে ধোকা দেয়। হিম্মত হয়
না, সাহস হয় না। হে আল্লাহ, আমাদের মস্তিষ্ক ও অন্তর আপনার হাতে। শয়তান ও
নফসও আপনার অধীন। হে আল্লাহ, এদের ধোকা থেকে আমাদেরকে রক্ষা করুন এবং
আমাদেরকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর তালীম মোতাবেক জীবন যাপনের
তাওফীক দান করুন। প্রতিদিন এই দুআ করুন এবং কিতাবগুলো অধ্যয়ন করুন,
ইনশাআল্লাহ আল্লাহ তাআলার রহমতে আশা করা যায় যে, জীবনে পরিবর্তন আসবে, জীবন
সুন্দর হবে। উপরোক্ত সকল কাজের পাশাপাশি মৃত্যুকেও প্রতিদিন স্মরণ
করুন-একদিন মৃত্যু হবে, আল্লাহ তাআলার সামনে দণ্ডায়মান হতে হবে। কুরআন
মজীদের আয়াত واما من خاف مقام ربه ونهى النلفس عن الهوى فان الجنة هى
المأوى (তরজমা) ‘যে স্বীয় প্রতিপালকের সম্মুখে উপস্থিত হওয়ার ভয় রাখে এবং
প্রবৃত্তি থেকে নিজেকে বিরত রাখে জান্নাতই হবে তার আবাস।’ সম্পর্কেও একটু
চিন্তা করুন। তাহলে আল্লাহ তাআলার রহমতে সুফল হবে ইনশাআল্লাহ । এরপর আপনার
চাকরি-ব্যবসা, আয়-উপার্জন, জীবিকা, বাসস্থান, আরাম-আয়েশ ইত্যাদি সবকিছু
আল্লাহর নিকট হালাল হবে এবং আল্লাহর রহমতে এগুলোও ইবাদতে পরিণত হবে
ইনশাআল্লাহ। আল্লাহ তাআলা চান না যে, আপনারা অনাহারে থাকুন, কষ্ট-পেরেশানির
সম্মুখীন হন। তবে সর্বাবস্থায় একটি পথেরই অনুসরণ করতে হবে। আল্লাহ তাআলা
ইরশাদ করেন, (তরজমা) আমি পৃথিবীর সকল বস্তু তোমাদের জন্যই সৃষ্টি করেছি।
তোমরা তা ব্যবহার কর তবে আমাকে ভুলে যেও না। যিনি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন,
যার দিকে তোমাদেরকে প্রত্যাবর্তন করতে হবে তাকে ভুলে যেও না। মরহুম আকবর
এলাহাবাদী বলেছেন, অর্থ : তোমাদের কলেজে পড়া, পার্কে বেড়ে ওঠা/ধুলায় উড়ে
বেড়ানো আর দোলনায় দোল খাওয়া সবই বৈধ।/তবে শুধু অধমের একটি কথা স্মরণ
রেখো/আল্লাহ তাআলাকে এবং নিজের অস্তিত্বকে ভুলে যেও না। শুধু এতটুকুই কাজ।
মানুষ যদি এতটুকু কাজ করে এবং হালাল-হারামের বিধান মেনে চলে তাহলে আল্লাহ
তাআলার পক্ষ থেকে দুনিয়ার কোনো কাজেই বাধা থাকবে না। আল্লাহ তাআলা স্বীয়
অনুগ্রহে আমাদের সকলকে এ কথাগুলোর উপর আমল করার তাওফীক দান করুন এবং আমাদের
জীবনের ধারা পরিবর্তন করে দিন। আমীন।
No comments:
Post a Comment