Monday, December 12, 2016

Collected - পর্দানশীন — মুফতি তকী উছমানী


[হযরত মাওলানা মুফতী তাকী উছমানী কিছুদিন আগে বাংলাদেশ সফর করেছেন। সে সফরে ১৭ ফেব্রুয়ারি ’০৯ ঈ. সুন্নত চৌধুরী সাহেবের বাড়িতে মহিলাদের উদ্দেশে এই বয়ানটি করেছিলেন। তা রেকর্ড করা হয়েছিল। পরে তা কাগজে লেখা হয় ও অনুবাদ করা হয়। লিখেছেন মাওলানা সায়ীদ আহমদ, অনুবাদ করেছেন মাওলানা আবদুল্লাহ ফাহাদ]
সম্মানিত বোন ও প্রিয় কন্যা!
আসসালামু আলাইকুম ওয়ারাহমাতুল্লাহ
আজকের আয়োজন বিশেষভাবে মহিলাদের জন্য করা হয়েছে। উদ্দেশ্য হল, মা, বোন ও মেয়েদের সাথে কিছু দ্বীনী আলোচনা করা। আল্লাহ তাআলা আমাকে ইখলাসের সঙ্গে তাঁর সন্তুষ্টি অনুযায়ী কথা বলার এবং আপনাদের সকলকে ইখলাসের সঙ্গে শ্রবণ করার আর আমাদের সকলকে এই কথাগুলোর উপর আমল করার তাওফীক দান করুন।
আমি আপনাদের সামনে একটি সূরা তেলাওয়াত করেছি, যা প্রায় সকল মুসলমানেরই মুখস্থ থাকে এবং নামাযের মধ্যেও অধিক পরিমাণে তেলাওয়াত করা হয়। সূরাটি ছোট হলেও একটি বড় সত্যের প্রতি ইঙ্গিত করে।
তা এই যে, এই দুনিয়ার সকল মানুষ, সে পুরুষ হোক কিংবা নারী দুনিয়াতে আসে শিশু অবস্থায় এরপর শৈশব অতিক্রম করে যৌবনে পদার্পণ করে। এরপর পূর্ণ বয়সে উপনীত হয় তারপর বার্ধক্যে পৌঁছে। এরপর একদিন দুনিয়া থেকে চলে যায়। কোনো মানুষ এই দুনিয়ায় স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য আসে না। যত বড় সম্পদশালী কিংবা প্রভাবশালী হোক কেউ এই নিয়মের ব্যতিক্রম নয়। এমনকি আম্বিয়া আ., বুযূর্গানে দ্বীন, আওলিয়ায়ে কেরাম প্রত্যেকের সাথেই এমনটি ঘটে। তারা দুনিয়ায় আসেন। আসার সময় কারো জানা থাকে না যে, দুনিয়ায় তারা কত দিন থাকবেন। এরপর একদিন এই দুনিয়া থেকে চলে যান।
মৃত্যু এমন এক বাস্তবতা, যার ব্যাপারে কোনো মানুষেরই কোনো মতপার্থক্য নেই। মুসলিম-অমুসলিম, শিক্ষিত-অশিক্ষিত সকলেই স্বীকার করে যে, এই দুনিয়ায় চিরদিন থাকার জন্য আসিনি, একদিন আমার মৃত্যু হবে। কোনো কাফের, কোনো বেদ্বীন-মুনাফিকও তা অস্বীকার করতে পারে না। কিছু লোক তো আল্লাহ তাআলার অস্তিত্বকে পর্যন্ত অস্বীকার করে বসেছে, কিন্তু মৃত্যুকে কেউ অস্বীকার করতে পারে না। প্রত্যেক মানুষই জানে এবং বিশ্বাস করে যে, তার মৃত্যু হবে।
তদ্রূপ এটাও বাস্তব যে, মৃত্যুর কোনো সময় নির্দিষ্ট নেই। এ বিষয়েও কোনো মানুষের কোনো মতানৈক্য নেই। আমি জানি না, কখন আমার মৃত্যু ঘটবে। এখনি একজন মানুষ বসে আছে, সে সুস্থ, কথাবার্তা বলছে অথচ এক ঘন্টার ভিতরেই সে দুনিয়া থেকে চলে গেল। কোনো দুর্ঘটনা ঘটে গেল আর সে দুনিয়া থেকে চলে গেল। আল্লাহ তাআলা আমাদের হেফাযত করুন। কারো হার্ট এ্যাটাক হয়ে গেল আর সে দুনিয়া ছেড়ে চলে গেল। লোকেরা বলে থাকে এটা তো বড় আশ্চর্যের বিষয় যে, একজন মানুষ বসে আছে, কথাবার্তা বলছে অথচ মুহূর্তেই সে ঢলে পড়ল, হার্ট এ্যাটাক হয়ে সে দুনিয়া থেকে চলে গেল!
আজ পর্যন্ত দুনিয়াতে এমন কোনো প্রযুক্তি আবিষ্কার হয়নি যা এ কথা বলে দিতে সক্ষম যে, এই মানুষটি কত সময় জীবিত থাকবে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি আজ কত উন্নতি সাধন করেছে। মানুষ চাঁদে পৌঁছে গেছে, কিন্তু এমন কোনো প্রযুক্তি আবিষ্কৃত হয়নি যা মানুষকে বলতে পারে যে, সে কতদিন দুনিয়ায় থাকবে এবং কখন দুনিয়া থেকে বিদায় নিবে।
মোটকথা, এ বিষয়ে সবাই একমত যে, মৃত্যু অবশ্যই আসবে। তদ্রূপ এ বিষয়েও সকলে একমত যে, কখন মৃত্যু হবে তা কারো জানা নেই। তাই এখন চিন্তা করা দরকার যে, মানুষকে যখন যেতেই হবে তবে কেন সে এই দুনিয়ায় আসে? বাস্তবতা বলে যে, দুনিয়ায় মানুষের আসা একটা সফর। মানুষ কোথাও সফরে গেলে যেমন কিছু দিনের জন্য যায়, স্থায়ীভাবে থাকার জন্য যায় না। কোনো কাজে-উদ্দেশ্যে সেখানে অবস্থানের পর পুনরায় নিজের বাড়িতে ফিরে আসে তেমনি দুনিয়ার এই জীবনও একটা সফর, যা শুরু হয় জন্মলাভের মাধ্যমে আর কখন শেষ হবে তা জানা নেই।
দুনিয়ার জীবন যদি সফরই হয় তাহলে ভাবতে হবে যে, এই সফরের উদ্দেশ্য কী? মানুষ কেন এই দুনিয়ায় আসে? কেন দুনিয়ার জীবনের এতই ব্যস্ততা দৌড়-ঝাঁপ? কেনইবা মানুষ দুনিয়ায় এসে কিছুদিন থেকে আবার চলে যায়?
কুরআন মজীদ একটি ছোট সূরার মধ্যেই এই উদ্দেশ্যের কথা বলে দিচ্ছে, ‘হে গাফেল মানুষ! তুমি দুনিয়ায় এসেছ এখন উপলব্ধি কর, কেন তুমি এসেছ? ইরশাদ হয়েছে, তরজমা : আমি জ্বিন ও মানব জাতিকে শুধুমাত্র এ জন্যই সৃষ্টি করেছি যেন তারা আমার বন্দেগী করে, আমার ইবাদত করে। এজন্যই তাদেরকে দুনিয়ায় পাঠিয়েছি।
আসল উদ্দেশ্য তো এটাই ছিল যে, মানুষ আল্লাহ তাআলার ইবাদত করবে। আল্লাহ তাআলা ইবাদতকে সহজ করে দিয়েছেন। অর্থাৎ ইবাদতের মূল দাবি তো এই যে, মানুষ সারা দিন সারা রাত আল্লাহ তাআলার সামনে দন্ডায়মান থাকবে, সিজদায় পড়ে থাকবে, আল্লাহ তাআলার যিকর করবে, তাঁর কাছে দুআ করবে। শুধু এই কাজই করবে, অন্য কোনো কাজ করবে না। কিন্তু আল্লাহ তাআলা নিজ অনুগ্রহে মানুষের দুর্বলতার কারণে এই অনুমতি দিয়েছেন যে, তোমরা দুনিয়ায় পানাহার কর, বিশ্রাম কর, জীবিকা উপার্জন কর তবে দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত আমার কাছে এসে আমার ইবাদত করবে। পাঁচ ওয়াক্ত নামাযের ব্যাপারে যত্নবান থাকবে। রমযানের এক মাস রোযা রাখবে। উপার্জিত সম্পদ থেকে শতকরা আড়াই ভাগ বার্ষিক যাকাত হিসেবে আদায় করবে, জীবনে একবার হজ্ব করবে। এতটুকুই তোমাদের জন্য আবশ্যকীয় করে দিলাম। আর বাকি সারা জীবন পানাহার, উপার্জন সবকিছুই তোমাদের জন্য বৈধ করে দিলাম। যেন তোমাদের প্রয়োজন মিটে।
তবে একটি কথা মনে রাখবে, জীবিকা উপার্জনের ফিকির যেন এমন না হয় যে, তোমরা তাতেই আচ্ছন্ন জীবনের আসল উদ্দেশ্যই ভুলে গেলে। তোমরা যদি জীবনের আসল উদ্দেশ্যকে স্মরণ রেখে সে অনুযায়ী ব্যবসা কর তাহলে সে ব্যবসাও ছওয়াবের হবে! হাদীস শরীফে আছে, সত্যবাদী, আমানতদার ব্যবসায়ীও কিয়ামতের দিন আম্বিয়া, সিদ্দীকীন ও শহীদগণের সঙ্গে থাকবে।
এত অধিক ফযীলতের কথা বলা হয়েছে কাদের জন্য?
ওই সব লোক যাদেরকে ব্যবসা, লেনদেন, ক্রয়-বিক্রয় আল্লাহর স্মরণ থেকে বিরত রাখে না। তাদের এই ব্যবসা তাদের জন্য হালাল। শুধু হালালই নয়; বরং ছওয়াবের কাজ। আল্লাহ তাআলা এতই সহজ করে দিয়েছেন। সৃষ্টি করেছেন ইবাদতের জন্য। কিন্তু ইবাদতের জন্য দিনরাতে বিশেষ কিছু কাজ নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন, যাতে খুব বেশি হলে এক ঘন্টা, সোয়া ঘন্টা সময় লাগে। পাঁচ ওয়াক্ত নামাযে সাধারণত এরচেয়ে বেশি সময় ব্যয় হয় না। অবিশষ্ট সকল সময় তোমরা নিজেদের প্রয়োজন পূরণ করতে পার। তবে শর্ত এই যে, আল্লাহকে যেন ভুলে যেও না, আল্লাহ তাআলার আহকাম, কোন কাজ হালাল আর কোনটি হারাম তা ভুলে যেও না। তাহলে সকল কিছুই তোমাদের জন্য বৈধ হবে।
কিন’ কী ঘটেছে? মানুষ যখন এই সুযোগ পেল যে, ইবাদত তো পাঁচ ওয়াক্ত করতে হবে আর বাকি সময় ব্যবসা করা যাবে, মানুষের সঙ্গে মেলামেশা করা যাবে, স্ত্রী-সন-ানের হক আদায় করা যাবে তখন তারা এতেই মগ্ন হয়ে গেল। আল্লাহ তাআলা এই অভিযোগই করেছেন সূরা তাকাছূর-এ যা আমি আপনাদের সামনে তেলাওয়াত করেছি। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, (তরজমা) চিন-া তোমাদেরকে (আখিরাতের বিষয়ে) উদাসীন করে দিয়েছে। অর্থাৎ আমি তো তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছিলাম আমার ইবাদতের জন্য। আর তোমাদের সহজতার লক্ষ্যে ব্যবসা, উপার্জন ইত্যাদি বৈধ করেছিলাম। কিন’ তোমরা এই প্রতিযোগিতা শুরু করেছ যে, আমার কাছে অন্যের চেয়ে বেশি সম্পদ থাকুক, অন্যের চেয়ে বেশি টাকা-পয়সা আসুক, আমার বাড়ি অন্যের চেয়ে উন্নত হোক, গাড়িটা সবার চেয়ে ভালো হোক, আমার অলংকার, কাপড়-চোপড় অন্যের চেয়ে উত্তম হোক। আর এতেই তোমরা সকল সামর্থ্য ব্যয় করছ। এই প্রতিযোগিতা তোমাদেরকে ভুলিয়ে দিয়েছে জীবনের মূল লক্ষ্য, যার জন্য তোমরা দুনিয়ায় এসেছ। তাকাছুর অর্থ ধন-সম্পদ ও দুনিয়ার উপায়-উপকরণের প্রতিযোগিতায় একে অন্যের চেয়ে অগ্রগামী হওয়ার চেষ্টা করা। অমুকের বাংলো এত ভালো, আমারটা তার চেয়েও ভালো হওয়া চাই। অমুকের গাড়ি এরকম তো আমারটা তার চেয়ে উন্নত হওয়া চাই। অমুকের অলংকার, কাপড় এত ভালো তো আমার অলংকার, কাপড় তার চেয়েও ভালো হওয়া চাই। দিনরাত তোমরা এই চিন-াতেই ব্যস-, এ নিয়েই তোমাদের সকল ভাবনা। আল্লাহ তাআলা অন্যত্র ইরশাদ করেন, ‘তোমরা দুনিয়ার জীবন, যা ছিল ইবাদতের তা কী করে ফেলেছ? যে উদ্দেশ্যে তোমাদেরকে দুনিয়ায় পাঠানো হয়েছিল তা তোমরা ভুলে গিয়েছ। তোমাদের কাছে দুনিয়াবী জীবন হচ্ছে খেলাধুলা, সাজসজ্জা, পরস্পর গর্ব-অহংকার এবং সন-ান ও সম্পদে পরস্পর প্রতিযোগিতা।’ অর্থাৎ জীবনের শুরু হয় খেলাধুলা দিয়ে। বাল্যকালে সবচেয়ে বেশি আগ্রহ খেলাধুলার প্রতিই থাকে। তাই খেলাধুলা নিয়েই পড়ে থাকলে। তাতেই সকল আগ্রহ ও সকল উৎসাহ, সর্বক্ষণ এক চিন-া খেলায় কিভাবে বিজয়ী হব। এরপর যৌবনে উপনীত হলে আগ্রহ জাগল জাঁকজমকের। এখন শখ শুধু এই যে, আমার কাপড় সুন্দর হওয়া চাই, অলংকার সুন্দর হওয়া চাই। তারপর কী হল? এখন অন্যের উপর গর্ব করব যে, আমার এত টাকা-পয়সা আছে, আমার এত ব্যাংক-ব্যালেন্স আছে। আমার সন-ান এতজন, আমার এত আয়-উপার্জন। আমার এত সেট কাপড়, এত সেট অলংকার এভাবে একে অন্যের উপর গর্ব করা। এরপর ধন-সম্পদ ও সন-ান-সন-তির প্রতিযোগিতায় একে অন্যের চেয়ে অগ্রগামী হওয়ার চিন-া। আল্লাহ তাআলা শৈশব থেকে বার্ধক্য পর্যন- গোটা জীবনের চিত্র তুলে ধরেছেন। আর তা এমন চিত্র যে, পরবর্তী স-রে পৌঁছে মানুষ পূর্বের স-রকে বোকামি মনে করে এবং ভাবতে থাকে যে, কী বোকাই না ছিলাম তখন! সারাক্ষণ ওই কাজ নিয়েই পড়ে থাকতাম। আমরা যখন শিশু ছিলাম তখন কী করতাম? খেলাধুলা। আগ্রহ ও চেষ্টা থাকত শুধু এক বিষয়ে। তা এই যে, ভালো একটা খেলা হয়ে যাক, খেলায় যেন জয় লাভ করি! এখন যখন বড় হয়ে পিছনের কথা মনে করি যে, শৈশবে যখন খেলাধুলা করতাম এবং জয়-পরাজয়কেই জীবনের বড় বিষয় মনে করতাম তখন কি আমাদের হাসি পায় না? আমাদের কি মনে হয় না যে, তখন কেমন বোকার রাজ্যে বাস করছিলাম! আমার শ্রদ্ধেয় পিতা তাঁর শৈশবের ঘটনা বলতেন যে, ছোটকালে দেওবন্দে এক ধরনের খেলা ছিল ‘সারকান্ডা’। সারকাণ্ডা হচ্ছে, তুলার একটি ছোট চারাগাছ, যাতে একটি ডাল হত। সে সময় খেলাধুলাও এমন হত যে, তাতে অর্থ খরচ হত না। আজকাল তো খেলাধুলার জন্যও হাজার হাজার টাকা প্রয়োজন। আগেকার দিনে খেলাধুলার পিছনে টাকা-পয়সা খরচ হত না। সাধারণ জিনিস নিয়েই শিশুরা খেলাধুলা করত। সারকাণ্ডা খেলার নিয়ম এই ছিল যে, সকলেই তা উপর থেকে নিচে নিক্ষেপ করত। যার সারকাণ্ডা আগে পৌঁছে যেত সে জয়ী হত আর যারটা পিছনে রয়ে যেত সে পরাজিত হত। তিনি বলেন, আমার মনে আছে, আমি আমার কাজিনের সঙ্গে সারকাণ্ডা খেলছিলাম। খেলায় যে জয়ী হত সে অন্যজনের চারাগুলো নিয়ে যেত। আব্বাজান বলেন, আমি খেলাধুলায় সব সময় পিছনে থাকতাম। খেলাধুলার অভিজ্ঞতা আমার কখনো হয়নি। আমার কাজিন ছিল খুবই চৌকস।সারকাণ্ডা নিক্ষেপ করা হলে তার সারকাণ্ডা আগে পৌঁছে যেত আর আমার গুলো পিছনে থেকে যেত। ফলে আমার কাছে যত সারকাণ্ডা ছিল সবগুলোই সে জিতে নিল। একটিও অবশিষ্ট থাকল না। এতে আমার এত দুঃখ হল এবং এত বেশি ক্রন্দন করলাম, যেন দুনিয়ার সব কিছুই আমি হারিয়ে ফেলেছি। আজও শৈশবের সে কান্নার কথা ভাবলে খুব হাসি পায় যে, কীসের জন্য এত কেঁদেছিলাম? তা তো ছিল সামান্য কয়েকটি চারা। অথচ এর কারণে আমি মনে করতাম যে, আমার সারা দুনিয়া লুট হয়ে গেছে। মোটকথা পরবর্তী স-রে উপনীত হয়ে পূর্বের স-রের অজ্ঞতাগুলো বোঝা যায়। যৌবনে পৌঁছে শৈশবের খেলাধুলাকে অজ্ঞতা মনে করে। বার্ধক্যে এসে যৌবনের সাজসজ্জা, পোশাক-পরিচ্ছদ, ইত্যাদি সবকিছু অর্থহীন মনে হয়। যুবকদের চালচলন, সাজসজ্জা দেখে হাসি পায়। মনে হয় তারা কত বোকামীতে লিপ্ত রয়েছে। এ সময়ের একমাত্র ভাবনা, ব্যাংক-ব্যালেন্স কত বেশি করা যায়, কত বেশি সুনাম-সুখ্যাতি লাভ করা যায়, সম্পদ কত বৃদ্ধি করা যায় ইত্যাদি। কোনো ভাবে কাপড় নষ্ট হয়ে গেলে, ময়লা হয়ে গেলে সে দিকে ভ্রুক্ষেপও করা হয় না। সাজসজ্জা না হলেও অসুবিধা নেই তবে সম্পদ বৃদ্ধি হওয়া চাই। সকল মানুষই পরের স-রে পৌঁছে পূর্বের স-রকে বেওকুফী মনে করে এবং তা মনে করে হাসে। কিন’ এতটুকুই। এটুকু ভেবেই শেষ। আর এটাই হল মন্দ অভ্যাস। আব্বাজান বলেন, মৃত্যুর পর যখন এর পরের স-র আসবে, মানুষ আখেরাতে পৌঁছবে তখন সম্পদ নিয়ে ঝগড়া-বিবাদের উপরও তেমনি হাসি আসবে যেমন আজ সারকাণ্ডা খেলার জন্য হাসি পায়। আখিরাতে পৌছে বুঝে আসবে যে, দুনিয়ার সহায়-সম্পদ নিয়ে ঝগড়া-বিবাদ করা ছিল কত বড় অজ্ঞতা। কেননা সেখানে গিয়ে বুঝতে পারব যে, এসব জিনিসের কোনো মূল্যই নেই। এসব ছিল শুধুমাত্র ধোঁকা। কুরআন মজীদে ইরশাদ হয়েছে, ‘দুনিয়ার জীবন কেবল ধোঁকার উপকরণ।’ কুরআন মজীদে এ কথা ঘোষণা করা হয়েছে যে, ধন-সম্পদের প্রাচুর্য অর্জনের চেষ্টা তোমাদেরকে জীবনের মূল লক্ষ্য ভুলিয়ে দিয়েছে। এমনকি তোমরা কবরস-ান পর্যন- পৌঁছে গেছ। অর্থাৎ মৃত্যু পর্যন- তোমাদের ভাবনা ও প্রচেষ্টা সবকিছুই অধিক সম্পদ উপার্জন নিয়ে। পরের আয়াতে বলা হয়েছে, কখনোই এমন হওয়া উচিত নয়। অচিরেই তোমরা বুঝতে সক্ষম হবে। কুরআন মজীদের বাক্যগুলো লক্ষ করুন, তোমরা অচিরেই বুঝতে পারবে যে, যেসব বস’ তোমরা অধিকতর অর্জন করার পিছনে পড়ে ছিলে তার কোনো মূল্যই নেই। পুনরায় কুরআন মজীদ বলছে, তোমাদের কখনো এমন করা উচিত নয়। অচিরেই তোমরা বুঝতে সক্ষম হবে। যতক্ষণ এই চোখ দুটি খোলা আছে ততক্ষণ পর্যন- এই সব পার্থিব ধন-সম্পদ তোমাদের ধোঁকা দিতে থাকবে। যেদিন চোখ বন্ধ হয়ে যাবে সেদিন বাস-বতা প্রকাশিত হবে। সেদিন দুনিয়ার সাজসজ্জা, ধন-সম্পদের প্রকৃত অবস’া বুঝে আসবে। এরপর বলা হয়েছে, ‘তোমাদের কখনো এমন করা উচিত নয়। আহা! যদি তোমাদের ইলমে ইয়াকীন হাসিল হয়ে যেত তাহলে তোমরা বুঝতে পারতে। তোমরা স্বচক্ষে দেখবে প্রজ্বলিত অগ্নির দোযখকে। তোমরা অবশ্যই দেখবে জাহান্নামকে।’ কিভাবে দেখবে? বলা হয়েছে, ইকায়ীনের চোখে দেখবে। অর্থাৎ চোখে দেখে তোমাদের ইয়াকীন হাসিল হয়ে যাবে। আজ শুধু বিশ্বাসে আছে, কিন’ সেদিন চোখে দেখে ইয়াকীন হয়ে যাবে। এরপর আল্লাহ তাআলা বলেন, সেদিন তোমাদেরকে জিজ্ঞাসা করা হবে, দুনিয়ায় আমি তোমাদেরকে যে নেয়ামতসমূহ দান করেছিলাম তার কী হক আদায় করেছ? ওই নেয়ামতসমূহের কীরূপ ব্যবহার করেছ?
সেদিন তোমাদেরকে ওই নেয়ামতসমূহের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হবে যা আমি তোমাদেরকে দুনিয়ায় দান করেছি। সেসবের কী হক তোমরা আদায় করেছ?
হাদীস শরীফে আছে, একবারের ঘটনা। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উপবাসী ছিলেন। ঘরে কোনো খাবার ছিল না। চিন্তা করুন, আজ আমরা কত সুখে দিন কাটাচ্ছি। কত উত্তম খাবার গ্রহণ করছি। আর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এভাবে জীবন যাপন করেছেন যে, তাঁকে ও তাঁর পরিবার-পরিজনকে উপবাসও করতে হয়েছে। উম্মুল মু’মিনীন হযরত আয়েশা রা. বলেন, কখনো কখনো এমনও হয়েছে যে পরপর তিন মাসের চাঁদ দেখা হয়ে যেত অথচ আমাদের ঘরে আগুন জ্বালানোর ব্যবস্তা হত না। জিজ্ঞাসা করা হল, কীভাবে জীবন ধারণ করতেন? উত্তরে বললেন, খেজুর ও পানি দ্বারা।’ তিন মাস যাবৎ শুধু খেজুর আর পানি দ্বারা জীবন ধারণ!
এক সাহাবী বলেন, ‘নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পুরো জীবনে কখনো পেট ভরে যবের রুটি খাননি।’ একদা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ক্ষুধার্ত ছিলেন আর ঘরেও খাওয়ার মতো কিছু ছিল না। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোনো কাজে বাইরে বের হয়েছেন। দেখলেন যে, একজন সাহাবী আসছেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞাসা করলেন, কেন এসেছ? উত্তরে তিনি বললেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ! খুব ক্ষুধার্ত আর খাওয়ারও কিছু নেই। তখন দো জাহানের বাদশাহ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ভাই! আমারও তো একই অবস্থা। চল, আমার এক বন্ধুর (একজন আনসারী সাহাবী) বাগান আছে। আমরা বাগানে প্রবেশ করলাম। সাহাবী আমাদের দেখে অত্যন্ত খুশি হলেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আগমন করেছেন। তখন ছিল গরম কাল। তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে একটি গাছের নিচে বসিয়ে নিজে খেজুর ইত্যাদি আনতে গেলেন। কিছুক্ষণ পর খেজুর ও ঠাণ্ডা পানি নিয়ে এলেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খেজুর খেলেন এবং পানি পান করলেন। এরপর সাহাবীদের লক্ষ করে বললেন, যা কুরআন মজীদে বলা হয়েছে, (তরজমা) ‘কেয়ামতের দিন তোমাদেরকে নেয়ামতসমূহের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হবে।’ এই খেজুর ও ঠাণ্ডা পানি সম্পর্কেও কেয়ামতের দিন জিজ্ঞাসা করা হবে যে, তোমাদেরকে যে নেয়ামত দান করেছিলাম তার কী হক আদায় করেছ?
একটু ভাবুন, ক্ষুধার সময় যখন ঘরে খাওয়ার কিছুই ছিল না সে অবস্থায়ও যে খেজুর ও পানি পাওয়া গেল সে সম্পর্কেও কেয়ামতের দিন জিজ্ঞাসা করা হবে যে, তোমরা তার কী হক আদায় করেছ?
অথচ আজ আমরা বিলাসী জীবন যাপন করছি। যা ইচ্ছা খাচ্ছি, পান করছি। সাহাবায়ে কেরামের সামনে কোনো উত্তম খাবার আসলে তারা কান্নায় ভেঙ্গে পড়তেন, খাবার খেতে পারতেন না। তারা বলতেন, আমাদের মনে পড়ে যায় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কীভাবে জীবন যাপন করেছেন। আজ আমরা এত উন্নত জীবন যাপন করছি!
আমি বলছিলাম, আমাদেরকে কুরআন মজীদ সতর্ক করে দিচ্ছে যে, তোমরা তো দিনরাত নিজেদের শরীর পূজায় লিপ্ত রয়েছ এবং এই চিন্তায় নিমগ্ন রয়েছ যে, কীভাবে বিলাসী থেকে বিলাসী জীবন-যাপন করা যায়, অধিক থেকে অধিক সম্পদ উপার্জন করা যায় আর এ চিন্তাই তোমাদেরকে আখিরাত সম্পর্কে উদাসীন করে রেখেছে। যার ফলে তোমরা এ অবস্থায়ই কবরস্থানে চলে যাবে এবং সেখানে গিয়ে তোমরা বুঝতে পারবে, তোমরা কেমন নির্বুদ্ধিতার শিকার ছিলে। সেদিন তোমাদেরকে জিজ্ঞাসা করা হবে, যেসব নেয়ামত তোমাদেরকে দান করা হয়েছিল তার কী হক তোমরা আদায় করেছ? তোমরা কি আল্লাহ তাআলার শোকর আদায় করেছ? আল্লাহ তাআলার ইবাদত করেছ? আল্লাহর বিধান মেনে চলেছ? আমার ভাই ও বোনেরা!
আমরা এ সূরা সবসময়ই পড়ে থাকি প্রত্যেক মুসলমানেরই এ সূরা মুখস্ত আছে। কিন্তু যেহেতু অর্থ জানা নেই তাই এতে যে গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ দেওয়া হয়েছে সে সম্পর্কে আমরা উদাসীন থাকি। প্রত্যেকেই নিজের অবস্থা যাচাই করে দেখি যে, সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কোন চিন্তায় মগ্ন ছিলাম আর কতটুকু সময় মূল লক্ষ্যের প্রতি মনোযোগী ছিলাম। কতটুকু সময় আল্লাহ তাআলার স্মরণে কেটেছে? কখনো কি এ চিন্তা এসেছে যে, আমাকে দুনিয়া ছেড়ে চলে যেতে হবে, আল্লাহ তাআলার সামনে দাঁড়াতে হবে এবং কৃতকর্মের জবাবদিহী করতে হবে? এ চিন্তাটা কতটুকু সময় হয়েছে? তাহলে বাস্তব তো তা-ই, যা কুরআন মজীদ স্পষ্ট করে বলে দিয়েছে (তরজমা) অর্থ-প্রাচুর্য তোমাদেরকে উদাসীন করে দিয়েছে।
এই উদাসীনতা থেকে মুক্তির উপায় খোঁজা প্রয়োজন
এ বিষয়ে সর্বপ্রথম কথা হল মাথা থেকে এ ভ্রান্ত ধারণা ঝেড়ে ফেলা যে, এই দুনিয়া শুধু উপার্জনের জন্য। কাফেররা যেমন বলে, (তরজমা) আমাদের পার্থিব জীবন ছাড়া আর তো কোনো জীবন নেই। এতেই আমাদের জীবন ও মৃত্যু। আর সময়ই আমাদেরকে বিলুপ্ত করে। আল্লাহর ওয়াস্তে এই বাস্তবতাটুকু বুঝতে চেষ্টা করুন যে, দুনিয়ার জীবন হল একটি সফর এবং তা যে কোনো সময় সমাপ্ত হয়ে যাবে। এরপর আখেরাতের জীবন শুরু হবে। আল্লাহ তাআলার সামনে জবাবদিহী করতে হবে। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘সকল স্বাদ বিনষ্টকারী মৃত্যুর কথা বেশি বেশি স্মরণ কর।’ অথচ আমাদের তো তা স্মরণই হয় না।
নিজের হাতে প্রিয়জনদের কাফন পরাই, নিজের হাতে কবরে দাফন করি, নিজের কাঁধে জানাযা উঠিয়ে নিয়ে যাই, নিজের হাতে মাটি দেই। এরপর হাত পরিষ্কার করে ফিরে আসি। তখনো এ চিন্তা আসে না যে, এমন সময় আমারও একদিন আসবে। আমিও একদিন কবরে যাব। একটি কথা তো হল মৃত্যুকে স্মরণ করা। হাকীমুল উম্মত হযরত থানভী রাহ. বলেছেন, দিনের কোনো একটি সময় এই ধ্যান করা চাই যে, আমার জীবনের শেষ মুহূর্ত এসে গেছে, আমি দুনিয়া থেকে চলে যাচ্ছি। আত্মীয়-স্বজন আমাকে কবরে রেখে চলে গেছে। ফেরেশতাগণ এসেছেন। সুওয়াল-জওয়াব শুরু হয়েছে। আমার সারা জীবনের আমলনামা সামনে রাখা হয়েছে। বলুন, এ সময় কী অবস্থা হবে? এ বিষয়টি ধ্যান করা জরুরি। এর জন্য অল্প সময় বের করতে হবে। আল্লাহ তাআলা নিজ রহমতে এই ফিকির আমাদের অন্তরে মজবুত করে দিন যে, এই দুনিয়াই সবকিছু নয়। দুনিয়ার পরে আরো একটি জীবন আছে।
এই চিন্তা-ভাবনা ও মানসিকতা তৈরির বিষয়ে সবচেয়ে বড় দায়িত্ব মহিলাদের। তারা প্রথম দিন থেকেই শিশুর মনে এই চিন্তার বীজ বপন করবে। আল্লাহ তাআলা মহিলাদেরকে উচ্চ মর্যাদা দান করেছেন। এত অধিক মর্যাদা দিয়েছেন যে, পুরুষের তাতে ঈর্ষা করা উচিত। কেননা, নারীর কোলেই জাতির ভবিষ্যত তৈরি হয়। ভবিষ্যতের বড় বড় আলেম মনীষী তাঁদের কোলেই লালিত-পালিত হয়। যাদের মধ্যে মানুষের ব্যক্তিত্ব গঠিত হয়। মহিলারাই এসব দায়িত্ব পালন করে থাকে।
আমি বলে থাকি, পৃথিবী এখন বড় বড় ইমাম ও বড় বড় ওলিকে চিনে। ইমাম আবু হানীফা, ইমাম শাফেয়ী, ইমাম মালেক, শায়খ আবদুল কাদের জিলানী, ইমাম গাযালী, শিবলী, জুনায়েদ যাদের ব্যক্তিত্ব ও বুযুর্গি গোটা বিশ্বে সমাদৃত। কিন্তু এটি কারো চোখে পড়ে না আবু হানীফার ইমাম আবু হানীফা হওয়ার পেছনে প্রথম ভূমিকা কার, গাযালিকে ইমাম গাযালি কে বানিয়েছেন, আবদুল কাদের জিলানীর শায়খ আবদুল কাদের জিলানী হওয়ার পেছনে কার ভূমিকা ছিল? বাস্তবিক পক্ষে তাঁদের মায়েরাই তাদেরকে এমনভাবে প্রতিপালন করেছেন, যার ফলে আল্লাহ তাআলা তাদেরকে এই মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছেন। তাঁরা এমন মা ছিলেন, যারা নাড়ি ভেদ করে ক্ষুধার যন্ত্রণা সহ্য করে নিজের সন্তানদেরকে জ্ঞান ও প্রজ্ঞা দ্বারা সুসজ্জিত করেছেন এবং তাদের মাঝে আখিরাতের চিন্তা সৃষ্টি করেছেন। তাঁরা এমন মা ছিলেন যারা সূরা ইয়াসীন পাঠ করে সন্তানকে দুধ পান করাতেন, সন্তানকে সর্বপ্রথম ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ শিক্ষা দিতেন। যারা সন্তানকে এমনভাবে তরবিয়ত করেছেন যেন সে স্বভাবগতভাবে সত্যভাষী, আমানতদার ও শরীয়তের অনুগামী হয়ে গড়ে ওঠে। সে হালাল-হারামের পার্থক্য বুঝবে, সুন্নতের অনুসারী হবে। তাদের অন-রে এই ভাবনা সর্বদা বিরাজমান ছিল যে, এই সন্তানের তরবিয়তের দায়িত্ব আমার। আজ সেসব মায়েদের নাম কেউ জানে না। তাই আমি বলছি যে, পুরুষদের চেয়ে বেশি মর্যাদা সেসব মায়েরা। কেননা, মনে করুন, একজন আলেম কিংবা আল্লাহ ওয়ালা দুনিয়াতে খুব প্রসিদ্ধি লাভ করলেন। এতে কিন্তু প্রসিদ্ধির ফেতনাও থেকে যায়। আল্লাহ না করুন-তার মধ্যে সুনাম-সুখ্যাতির চিন্তাও আসতে পারে, তার মধ্যে অহংবোধও জাগ্রত হতে পারে, উজবও হতে পারে। কিন্তু পিছনের সে অজানা-অপরিচিতা মা, যার কথা কোথাও পাওয়া যায় না, যাকে কেউ চেনেও না তিনি তো শুধু ইখলাছের সঙ্গে জাতির বুনিয়াদ স্থাপন করে যাচ্ছেন; যার মধ্যে শয়তানের ধোঁকার কোনো সম্ভাবনাও নেই।
সে মায়েরা কীভাবে সন্তানকে লালন-পালন করেছেন! হযরত রবীআতুর রায় যিনি হযরত ইমাম মালেক রাহ.-এর উস্তাদ। তার পিতা বিয়ের পরপরই জিহাদে চলে গিয়েছিলেন। দীর্ঘ সময়ের জিহাদ ছিল। আনুমানিক ২২ বছর তিনি জিহাদে থাকার পর মদীনা মুনাওয়ারায় ফিরে এলেন। বাড়ি ফিরে গৃহে প্রবেশ করার সময় দেখলেন, এক যুবক তার ঘর থেকে বের হচ্ছে। তিনি মনে করলেন, কোনো অপরিচিত মানুষ। তিনি তাকে ধমক দিলেন-তুমি আমার ঘরে প্রবেশ করলে কীভাবে? একপর্যায়ে তাদের মাঝে ঝগড়া বেধে গেল। ভিতর থেকে স্ত্রী বলল, ঝগড়া করবেন না। সে আপনার ছেলে। মসজিদে নববীতে নামায পড়তে গিয়ে লোকদের একটি বড় মজলিস দেখতে পেলেন, যারা হাদীস পড়তে এসেছেন। চেহারা চাদরাবৃত ছিল এজন্য তিনি তাকে চিনতে পারেননি। তিনিও দরসে বসে পড়লেন। পরবর্তীতে জানতে পারলেন, তা তার ছেলের দরস ছিল। ইনি রবীআতুর রায়-ইমাম মালেকের উস্তাদ ছিলেন।
হযরত রবীআতুর রায় রাহ.-এর পিতা একদিন স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করলেন, আমি তোমাকে দশ হাজার দিনার দিয়েছিলাম। তোমার কোনো কষ্ট হয়নি তো? উত্তরে স্ত্রী বললেন, আমি দশ হাজার দিনার এই ছেলের লালন-পালনে খরচ করেছি। নিজের সকল প্রয়োজন উৎসর্গ করেছি এবং আপনার এই ছেলেকে হাদীসের ইলম শিক্ষা দেওয়ার জন্য ২২ বছর পর্যন্ত আমি এমনটি করেছি। রবীআতুর রায়কে তো আজ সবাই চিনে, তাকে ইমাম মালেকের উস্তাদ বলে। কিন্তু যে মা সবকিছু উৎসর্গ করে এই মানুষটিকে তৈরি করেছেন, এই আলেমকে সৃষ্টি করেছেন তাকে কেউ চিনে না। সুতরাং সে মায়ের মর্যাদা নিঃসন্দেহে রবীআতুর রায় থেকে হাজার গুণ বেশি হবে। যিনি এত ইখলাছের সঙ্গে, এত কিছু উৎসর্গ করে এই মানুষটিকে গঠন করেছেন। আল্লাহ তাআলা মহিলাদেরকে এমনই মর্যাদা দান করেছেন। কিন্তু আফসোসের বিষয়, আজ পশ্চিমা প্রচারণার ফলে মহিলারা তাদের মর্যাদা ভুলে গেছে। তাদেরকে এই মর্যাদার কথা ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। ইংরেজ ও পশ্চিমা শক্তির অপপ্রচার মহিলাদেরকে বুঝিয়েছে যে, তোমাদেরকে ঘরের চার দেওয়ালের ভিতরে আবদ্ধ করে রাখা হয়েছে। অথচ তোমার তো পুরুষের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করার কথা। তুমিও বের হও, তুমিও রাষ্ট্রপ্রধান হও, তুমিও প্রধানমন্ত্রী হও, তুমিও বড় বড় পদ লাভের চেষ্টা কর। তোমাকে কেন তা থেকে বঞ্চিত করা হবে? ফলে মহিলারা ধোঁকায় পড়ে গেছে এবং ঘর থেকে বের হয়ে গেছে। এ ধোঁকায় তাকে ঘর থেকে বের করা হয়েছে যে, তোমাকে প্রধানমন্ত্রী বানানো হবে, রাষ্ট্রপ্রধান বানানো হবে, উচ্চ পদ প্রদান করা হবে।
আজ আমেরিকার অবস্থা দেখুন, আমেরিকার ইতিহাসে কোনো মহিলা রাষ্ট্রপ্রধান হয়নি। কিছুদিন আগে একজন প্রার্থী হয়েছিল কিন্তু পরাজিত হয়েছে। রাষ্টপ্রধান তো কেউ হতে পারেনি। কিন্তু লক্ষ লক্ষ মহিলাকে রাস্তায় বের করা হয়েছে। পৃথিবীর যত নিকৃষ্টতম কাজ আছে তা মহিলাদেরকে দেওয়া হয়েছে। রাস্তা পরিষ্কার করছে মহিলারা, হোটেলে বেয়ারার কাজও তারা করছে। হোটেলে পুরুষদের বিছানার চাদর সাজানোর দায়িত্ব মহিলাদের, তাদের ঘরবাড়ি পরিচ্ছন্ন করার কাজও মহিলারা করছে। এছাড়া আরো নিকৃষ্টতম কাজ তাদের উপর ন্যস্ত করা হয়েছে। অথচ এই মহিলা যদি নিজের ঘরে নিজের জন্য, নিজের স্বামীর জন্য এবং নিজের সন্তানের জন্য রান্না করে তখন তা লজ্জার চোখে দেখা হয় এবং তা পশ্চাদপদতা হয়ে যায়!
আশ্চর্য দর্শন এই যে, মহিলা যখন বিমানে বিমানবালা হয়ে মানুষের সেবা করে, তাদের সামনে ট্রে সাজিয়ে পরিবেশন করে এবং তাদের কামাসক্ত দৃষ্টিতে বিদ্ধ হয় তখন তা হয় ‘স্বাধীনতা’। পক্ষান্তরে সে যদি নিজের ঘরে নিজের জন্য, স্বামী ও সন্তানের জন্য, পিতামাতার জন্য খাবার রান্না করে তাহলে তা পরাধীনতা। এই আশ্চর্য দর্শনে নারীকে ভুলিয়ে বণিক সমপ্রদায় তাকে ব্যবহার করেছে বাণিজ্যিক স্বার্থে। তাকে বানানো হয়েছে প্রদর্শনীর বস্তু। সেলসগার্ল দরকার তো মহিলা হতে হবে, পণ্য বিক্রির প্রয়োজন তো মহিলারই বিক্রি করতে হবে। যেন তার রূপ-সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে মানুষ পণ্য ক্রয় করে। তার প্রতিটি অঙ্গ খোলা বাজারের পণ্যে পরিণত হয়েছে। এমন কোনো বিজ্ঞাপন পাওয়া যাবে না, যাতে নারীর ছবি নেই। নারীকে পণ্য বানিয়ে নিজেরা অর্থ উপার্জন করছে। এর নাম দিয়েছে নারী স্বাধীনতা! প্রিয় বোন, আমি এই নিবেদন করতে চাই যে, আল্লাহর ওয়াস্তে এই প্রতারণার শিকার হয়ো না। আল্লাহ তাআলা তোমাকে যে মর্যাদা দান করেছেন তা অনুধাবন কর। তোমার মাধ্যমে জাতির ভবিষ্যত তৈরি হয়। তোমার কোলে লালিত-পালিত হয় উম্মাহর আগামী প্রজন্ম। নারীকে বাইরে বের করার জন্য ভদ্রতার ভেক ধারণ করা হয়েছে। বোঝানো হয়েছে যে, মুসলমানরা একাধিক পত্নী রাখা বৈধ মনে করে। অথচ আমাদের দেখ, আমরা কত ভদ্র! আমাদের কারো একাধিক পত্নী নেই! এভাবে ভদ্রতার ছলে নারীকে বাইরে টেনে এনে, পথে নামিয়ে, হোটেলে বসিয়ে অবস্থা এমন করেছে যে, ঘরের স্ত্রীও এখন আর ঘরে নেই, সেও এখন বাইরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। প্রতি স্থানে নতুন নতুন পত্নী সৃষ্টি হচ্ছে। প্রতিটি দাওয়াত, প্রতিটি ডিনার, প্রতিটি হোটেল সর্বত্রই একাধিক সম্পর্ক গড়ে উঠছে। ফলে অবৈধ যৌন সম্পর্ক ব্যাপক হয়ে গেছে, বিবাহ-বিচ্ছেদের পরিমাণ বেড়ে গেছে। এখন লোকেরা বলে, বিয়ের কী প্রয়োজন? পশ্চিমা বিশ্বে এমন রাষ্ট্রের সংখ্যাই বেশি যার নাগরিকদের অধিকাংশই পিতৃ পরিচয়হীন। যেহেতু পশ্চিমা প্রতারক-গোষ্ঠীর উদ্দেশ্য হল নারীকে বাইরে বের করে আনা এবং তাকে অবাধ ভোগের বস্তুতে পরিণত করা তাই তার পোশাকও তারা নির্বাচন করে দিয়েছে। পোশাক যত আঁটসাঁট ও উন্মুক্ত হবে ততই ফ্যাশনেবল হবে! আফসোসের বিষয় এই যে, পশ্চিমা সংস্কৃতির ছায়া আমাদের দেশের নারীদের মাঝেও ছড়িয়ে পড়েছে। তারা বাইরে বের হোক বা না হোক তাদের এমন পোশাক চাই, যা পশ্চিমারা পরিধান করে এবং যা হবে সংক্ষিপ্ত ও আঁটসাঁট। হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে, দুনিয়ার অনেক বস্ত্র পরিধানকারিনী আখিরাতে বিবস্ত্র হবে। অর্থাৎ এমন অনেক মহিলা আছে যারা পোশাক পরিধান করলেও আখিরাতের বিচারে তারা বিবস্ত্র। আমাদের দেশেও তাদের পোশাকের অনুকরণ শুরু হয়ে গেছে। নারীকে আল্লাহ তাআলা এত মূল্যবান করে সৃষ্টি করেছেন, যা সংরক্ষণ উপযোগী। আর এজন্য আল্লাহ তাআলা তার পর্দার বিধান দান করেছেন। কিন্তু পশ্চিমা সভ্যতার প্রভাবে পর্দা বিলুপ্ত হতে চলেছে। আমাদের চিন্তা করা উচিত যে, আমরা কি দুনিয়াতেই থেকে যাব, না কখনো মৃত্যুবরণ করতে হবে? কখনো আল্লাহ তাআলার সামনে জবাবদিহী করতে হবে? তাই পর্দাহীনতার পরিবেশ দূর করা জরুরি। মহিলাদের দায়িত্ব হল নিজেও মুসলমান হওয়া এবং সন্তানকেও মুসলমান বানানো। তার প্রতিটি কথা ও কাজে ঈমান ও ইসলামের প্রতিফলন থাকা চাই। তাকে সত্যবাদী হতে হবে। তার মুখে কখনো মিথ্যা উচ্চারিত হবে না। গীবত-শেকায়েত হবে না, গালিগালাজ হবে না। তার প্রতিটি কর্ম ও আচরণ সন্তানের জন্য আদর্শ হবে। এক হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, একদা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক সাহাবীকে দেখলেন, তিনি সন্তানকে নিজের কাছে ডাকছেন। কিন্তু বাচ্চাটি আসছে না। তখন সাহাবী বললেন, এস বৎস, আমার কাছে এস। আমি তোমাকে একটি জিনিস দিব। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবীকে তাৎক্ষণিক জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি তো বাচ্চাটিকে কিছু দেওয়ার কথা বলেছ। বাস্তবেই কি কিছু দেওয়ার ইচ্ছা করেছ? সাহাবী বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার কাছে একটি খেজুর ছিল। আমি ইচ্ছা করেছি যে, তাকে খজুরটি দিব। তখন নবীজী বললেন, যদি বাস্তবেই তোমার এই ইচ্ছা থাকে তাহলে তো ভালো। কিন্তু যদি শুধু বাচ্চাটিকে প্রলোভন দেখানোর জন্য বলে থাক তবে তা গুনাহর কাজ।’ এটি দ্বিগুণ গুনাহ : একদিকে ওয়াদা ভঙ্গের গুনাহ। দ্বিতীয়ত বাচ্চাটিকে এই শিক্ষা দেওয়া হল যে, ওয়াদা ভঙ্গ করা খারাপ বিষয় নয়। সে মনে করবে, আমার পিতা, আমার বড়রাও ওয়াদা করে তা পূর্ণ করে না। অতএব এতে কোনো অসুবিধা নেই। ফলে ভবিষ্যতে সেও ওয়াদা ভঙ্গ করবে। আর সে যতগুলো ওয়াদা ভঙ্গ করবে তার গুনাহ ওই পিতামাতার আমলনামাতেও লেখা হবে। সুতরাং সন্তানের সঙ্গে মাতা-পিতার প্রতিটি আচরণের সময় লক্ষ রাখতে হবে যে, তাদের আচরণটি যেন সত্য হয়। মিথ্যা না হয়। মিথ্যা বলা হলে সন্তানের মধ্যে এই ধারণা সৃষ্টি হবে যে, মিথ্যা বলা খারাপ কিছু নয়। আমার মাতা-পিতাও মিথ্যা বলেন। তাই আমিও যদি মিথ্যা বলি তাহলে কোনো অসুবিধা হবে না। এসব তাকে মিথ্যুক বানিয়ে দিবে। আর গীবত তো এমন একটি বিষয়, যাতে পুরুষ-মহিলা সবাই লিপ্ত। আল্লাহ তাআলা আমাদের রক্ষা করুন। আমাদের কোনো মজলিস এমন পাওয়া কঠিন, যাতে গীবত হয় না। সম্ভবত পুরুষের তুলনায় মহিলাদের মধ্যে এর প্রবণতা একটু বেশি। অথচ গীবত হল নিজের মৃত ভাইয়ের গোশত খাওয়ার মতো অপরাধ। কত বড় অপরাধ! কত বড় গুনাহ! এখন যদি বাচ্চাদের সামনে এই কাজ করা হয় তাহলে তারা মনে করবে, গীবত করতে কোনো দোষ নেই। প্রিয় মা-বোনেরা, আমরা আজ এখানে একটি মহৎ দ্বীনী উদ্দেশ্যে সমবেত হয়েছি এবং দ্বীন সম্পর্কে কিছু কথা আলোচনা করেছি। আসুন আমরা চিন্তা করি যে, আমরা কেন পৃথিবীতে এসেছি? আমরা একটি বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে এসেছি। আল্লাহ তাআলার বিধান অনুযায়ী জীবন-যাপনের জন্য এসেছি। এমন যেন না হয় যে, দুনিয়ার চাকচিক্যে আত্মবিস্মৃত হয়ে এবং দুনিয়ার প্রাচুর্যে মত্ত হয়ে এ উদ্দেশ্যকেই ভুলে গেলাম। এই চিন্তাটা আমাদের মধ্যে সৃষ্টি হওয়া জরুরি। যেদিন এই চিন্তা সৃষ্টি হবে সেদিনটি হবে আমাদের জীবনের একটি উত্তম দিন এবং একটি ইতিবাচক বিপ্লবের দিন।
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে এমন দ্বীন দান করেছেন, যাতে বস্তুত কোনো কাঠিন্য ও জটিলতা নেই। কুরআন মজীদের বিভিন্ন স্থানে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন, আমি তোমাদেরকে এমন কোনো বিধান পালনে বাধ্য করিনি, যা তোমাদের সাধ্যের বাইরে। আমার সকল বিধান তোমরা পালন কর। তোমাদের রান্না-বান্না, পানাহার, অতিথি-আপ্যায়ন, বিশ্রাম, মোটকথা দুনিয়ার যাবতীয় কাজ ইবাদতে পরিণত হবে। সঠিক নিয়তে, সঠিক পন্থায় এ কাজগুলো সম্পাদন করা হলে তা ইবাদত হয়ে যাবে। এতই সহজ করে দিয়েছেন আল্লাহ তাআলা। পরিশেষে আপনাদের খেদমতে কিছু আবেদন করছি। দেখুন ভাই, রসমী ওয়াজ-নসীহতে কোনো ফায়দা নেই। তা কেবল কিছু সময়ের জন্য বসা আর ওয়াজ শেষে কাপড় ঝেড়ে উঠে যাওয়া। ওয়াজ-নসীহতে ফায়দা তখন হবে যখন আমরা চিন্তা-ভাবনা করব এবং আমাদের ভবিষ্যত জীবন উন্নত করতে সচেষ্ট হব। আমি আপনাদের নিকট কয়েকটি প্রস্তাব পেশ করছি। এসবের উপর আমল করতে চেষ্টা করুন, ইনশাআল্লাহ এর বরকতে আল্লাহ তাআলা আমাদের জীবনের ধারা পরিবর্তন করে দিবেন। সর্বপ্রথম কথা হল, নিজের দৈনন্দিন জীবনের চব্বিশ ঘণ্টা থেকে কিছু সময় দ্বীনী ইলম অর্জনের জন্য নির্ধারণ করুন। প্রত্যেকের আলেম হওয়া জরুরি নয়। ৮-১০ বছর মাদরাসায় ভর্তি হয়ে দরসে নেযামীর পাঠ সমাপ্ত করা সকলের প্রয়োজন নেই। তবে এতটুকু ইলম অর্জন করা প্রতিটি নারী ও পুরুষের জন্য আবশ্যকীয়-ফরয, যা একজন মুসলমানের ইসলামী জীবন-যাপনের জন্য প্রয়োজন। হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে-ইলম অর্জন করা প্রত্যেক মুসলমানের অবশ্য কর্তব্য-ফরয। অর্থাৎ যতটুকু ইলম অর্জন করলে মানুষ দ্বীন অনুযায়ী জীবন যাপন করতে পারে-এতটুকু ইলম অর্জন করা ফরযে আইন। কোনো মাদরাসায় ভর্তি হয়ে তা অর্জন করাও জরুরি নয়। আলহামদুলিল্লাহ, প্রায় সকল ভাষায় ওলামায়ে কেরাম এমন পঠনসামগ্রী প্রস্তুত করে দিয়েছেন, যা অধ্যয়ন করে অতি সহজেই ইলমে দ্বীন লাভ করা যায়। এটা কঠিন কিছু নয়। তাই চব্বিশ ঘণ্টা থেকে কিছু সময় বের করুন। অন্তত আধা ঘণ্টাই বের করুন। এবং তা যত্নের সঙ্গে ব্যয় করুন। যেন দ্বীনের অপরিহার্য বিষয়গুলোর ইলম এ সময়ে লাভ করা যায়।

আমি কয়েকটি কিতাবের পরামর্শ দিচ্ছি :

  • ১. হাকীমুল উম্মত হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানবী রাহ.-এর ‘ইসলাহী নেসাব’। শুনেছি, বাংলা ভাষায়ও এর অনুবাদ প্রকাশিত হয়েছে। এটি সংগ্রহে রাখুন। প্রতিদিন অল্প অল্প করে পড়ুন এবং সন্তানদেরকেও পাঠ করে শোনান।
  • ২. ‘উসওয়ায়ে রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।’ এ কিতাবটিরও বাংলা অনুবাদ হয়েছে। এতে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সুন্নতসমূহ অধিক পরিমাণে আলোচনা করা হয়েছে। প্রতিটি কাজের সুন্নত তরীকা বলে দেওয়া হয়েছে। দেখুন, অনেক কাজই আমরা করি। তা সুন্নত তরীকায় করলে কোনো কষ্ট-জটিলতা নেই, কোনো পেরেশানী নেই। অতিরিক্ত সময়ও ব্যয় হয় না। আলাদা কোনো মেহনত করারও প্রয়োজন নেই।
অনেক কাজই আমরা করি। অথচ তা সুন্নত তরীকায় করলে কোনো কষ্ট-জটিলতা নেই। অতিরিক্ত সময়ও ব্যয় হয় না। আলাদা কোনো মেহনত করারও প্রয়োজন নেই। শুধু একটু মনোযোগ প্রয়োজন। কেবল অমনোযোগিতা ও অবহেলার কারণেই এসব সুন্নত থেকে আমরা বঞ্চিত হই। এজন্য ‘উসওয়ায়ে রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম’ কিতাবটি অত্যন্ত চমৎকার কিতাব। এরপর আল্লাহ তাআলা তাওফীক দিলে ‘বেহেশতী যেওর’ অধ্যয়ন করা যেতে পারে। এতে দ্বীন ও দুনিয়ার প্রয়োজনীয় অনেক বিষয় সন্নিবেশিত হয়েছে। এই তিনটি কিতাব অধ্যয়ন করলে একজন মুসলমানের অপরিহার্য পরিমাণ ইলম অর্জিত হবে ইনশাআল্লাহ। এ কিতাবগুলো নিজেও পড়ুন এবং সন্তানদেরকেও শামিল করার চেষ্টা করুন। যেন তারাও দ্বীনী ইলম অর্জন করতে পারে। দ্বিতীয় কথা এই যে, এসব কিতাবের পাশাপাশি কিংবা এগুলোর পর সাহাবায়ে কেরাম এবং বুযুর্গানে দ্বীনের জীবন ও চরিত্র অধ্যয়ন করুন। এতে অনেক উপকার। হযরত মাওলানা ইউসুফ রাহ.-এর ‘হায়াতুস সাহাবা’ অধ্যয়ন করা যেতে পারে। এটিরও বাংলা অনুবাদ প্রকাশিত হয়েছে। তেমনিভাবে শায়খুল হাদীস মাওলানা যাকারিয়া রাহ.-এর ‘ফাযায়েলে আমাল’ও অধ্যয়ন করতে পারেন। এ কিতাবেরও বাংলা অনুবাদ পাওয়া যায়। এসব কিতাব নিয়মিত পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন। প্রতিদিন অল্প করে হলেও পড়ুন। কোনোদিন যেন ছুটে না যায়। সবশেষে আসুন, সবাই মিলে আল্লাহ তাআলার নিকট দুআ করি, হে আল্লাহ! আমরা আমাদের জীবনের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য থেকে দূরে সরে গিয়েছি। হে আল্লাহ! আমরা আপনার সন্তুষ্টি মোতাবেক জীবন যাপন করতে চাই। হে আল্লাহ! আপনি আমাদেরকে হিম্মত দান করুন, উদ্দীপনা দান করুন এবং তাওফীক দান করুন। আমাদের আমল-আখলাকে যেসব ত্রুটি রয়েছে, হে আল্লাহ! আপনি তা সংশোধন করে দিন। প্রতিদিন হৃদয় থেকে আল্লাহ তাআলার দরবারে এই প্রার্থনা করুন। আমি নিজ থেকে বলছি না। হযরত হাকীমুল উম্মত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী রাহ.বলেছেন, চল্লিশ দিন আমল করে দেখুন, ইনশাআল্লাহ জীবনে পরিবর্তন আসবে। চল্লিশ দিন দুআ করে দেখুন; এটি সাধারণ কোনো দুআ নয়; বরং অনেক গুরুত্বপূর্ণ একটি দুআ। এর উপকারিতাও অনেক বেশি। এর মাধ্যমে বহু মানুষের জীবনে পরিবর্তন এসেছে। আমার নিজেরও অনেক ঘটনা আছে, আমি নিজেও এই দুআর উপকারিতা প্রত্যক্ষ করেছি। আপনাদের কাছে প্রতিদিন শোয়ার পূর্বে আধা ঘণ্টা সময় চাই, যে সময় এই কিতাবগুলো অধ্যয়ন করবেন এবং অধ্যয়ন শেষে আল্লাহ তাআলার নিকট দুআ করবেন। এরপর যা কিছু জানা হল পরবর্তী দিনের শুরু থেকেই সে অনুযায়ী আমল করার চেষ্টা করুন। (এ সময় কেউ দুআর বিষয়বস্তু সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি পুনরায় বলেন,) এভাবে দুআ করুন যে, হে আল্লাহ, আমরা আপনার দ্বীন অনুযায়ী এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর তালীম অনুযায়ী জীবন যাপন করতে চাই, কিন্তু আমাদের নফস আমাদেরকে ধোকা দেয়, শয়তান আমাদেরকে ধোকা দেয়। হিম্মত হয় না, সাহস হয় না। হে আল্লাহ, আমাদের মস্তিষ্ক ও অন্তর আপনার হাতে। শয়তান ও নফসও আপনার অধীন। হে আল্লাহ, এদের ধোকা থেকে আমাদেরকে রক্ষা করুন এবং আমাদেরকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর তালীম মোতাবেক জীবন যাপনের তাওফীক দান করুন। প্রতিদিন এই দুআ করুন এবং কিতাবগুলো অধ্যয়ন করুন, ইনশাআল্লাহ আল্লাহ তাআলার রহমতে আশা করা যায় যে, জীবনে পরিবর্তন আসবে, জীবন সুন্দর হবে। উপরোক্ত সকল কাজের পাশাপাশি মৃত্যুকেও প্রতিদিন স্মরণ করুন-একদিন মৃত্যু হবে, আল্লাহ তাআলার সামনে দণ্ডায়মান হতে হবে। কুরআন মজীদের আয়াত واما من خاف مقام ربه ونهى النلفس عن الهوى فان الجنة هى المأوى (তরজমা) ‘যে স্বীয় প্রতিপালকের সম্মুখে উপস্থিত হওয়ার ভয় রাখে এবং প্রবৃত্তি থেকে নিজেকে বিরত রাখে জান্নাতই হবে তার আবাস।’ সম্পর্কেও একটু চিন্তা করুন। তাহলে আল্লাহ তাআলার রহমতে সুফল হবে ইনশাআল্লাহ । এরপর আপনার চাকরি-ব্যবসা, আয়-উপার্জন, জীবিকা, বাসস্থান, আরাম-আয়েশ ইত্যাদি সবকিছু আল্লাহর নিকট হালাল হবে এবং আল্লাহর রহমতে এগুলোও ইবাদতে পরিণত হবে ইনশাআল্লাহ। আল্লাহ তাআলা চান না যে, আপনারা অনাহারে থাকুন, কষ্ট-পেরেশানির সম্মুখীন হন। তবে সর্বাবস্থায় একটি পথেরই অনুসরণ করতে হবে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, (তরজমা) আমি পৃথিবীর সকল বস্তু তোমাদের জন্যই সৃষ্টি করেছি। তোমরা তা ব্যবহার কর তবে আমাকে ভুলে যেও না। যিনি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন, যার দিকে তোমাদেরকে প্রত্যাবর্তন করতে হবে তাকে ভুলে যেও না। মরহুম আকবর এলাহাবাদী বলেছেন, অর্থ : তোমাদের কলেজে পড়া, পার্কে বেড়ে ওঠা/ধুলায় উড়ে বেড়ানো আর দোলনায় দোল খাওয়া সবই বৈধ।/তবে শুধু অধমের একটি কথা স্মরণ রেখো/আল্লাহ তাআলাকে এবং নিজের অস্তিত্বকে ভুলে যেও না। শুধু এতটুকুই কাজ। মানুষ যদি এতটুকু কাজ করে এবং হালাল-হারামের বিধান মেনে চলে তাহলে আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে দুনিয়ার কোনো কাজেই বাধা থাকবে না। আল্লাহ তাআলা স্বীয় অনুগ্রহে আমাদের সকলকে এ কথাগুলোর উপর আমল করার তাওফীক দান করুন এবং আমাদের জীবনের ধারা পরিবর্তন করে দিন। আমীন।

Monday, November 28, 2016

Collected - ওয়াসজুদ ওয়াকতারিব!

বাবা নেই। শুধু মা আছেন। বিয়ের বয়েস হয়ে গেছে। গরীব দেখে কেউ বিয়ে করতে রাজি হচ্ছে না। ভাঙচোরা ঘর। মা রাতদিন আল্লাহর দরবারে ফরিয়াদ জানিয়ে যাচ্ছেন। মেয়েটার একটা গতি হোক। আল্লাহ মায়ের কথা শুনলেন। পাশের বাড়ির এক যুবকের মনে দয়া হলো। নিজ থেকেই প্রস্তাব দিল। মায়ের মনে শংকা দেখা দিল:
-বিয়েটা আমাদের অসহায় অবস্থার দিকে করছো না তো বাবা!
-জ্বি না। আমার বিয়ে করা প্রয়োজন। আপনার মেয়েটাও উপযুক্ত! বাড়ির কাছে ফুল রেখে দূরের বাগানে কেন যাবো! তবে মিথ্যা বলবো না, বিয়েটা হলে আপনাদেরও একটু সুসার হবে, এমন চিন্তাও মাথায় আছে বৈকি! কিন্তু সেটাই মূল কারণ নয়!
-ঠিক আছে বাবা! তোমাকে ছোটবেলা থেকেই চিনি। তুমিও আমাদেরকে চেনো। চেনাজানা কেউ প্রস্তাব দিলে ভরসা লাগে। কারন তারা তো সব জেনেশুনেই অগ্রসর হয়েছে। যদি কিছু মনে না করো, আরেকটা কথা বলবো!
-জ্বি বলুন!
-আমাদের প্রতি দয়া করছো কি না, সেটা কেন জানতে চেয়েছি বলবো?
-অবশ্যই!
-বিয়েটা যদি করুণা বা দয়া দেখানোর জন্যে হয়, তাহলে সেটা আর বিয়ে থাকে না। রাজা-প্রজার সম্পর্ক হয়ে যায়। ব্যতিক্রমী মানুষও আছে।
.
বিয়ে হয়ে গেলো। মাকে ছেড়ে মেয়েটা স্বামীর ঘরে গিয়ে উঠলো। মায়ের সাথেও প্রতিদিন দেখা হয়। কথা হয়। কয়েকটা বাড়িই তো মাঝে। প্রথম কয়েকটা দিন দেখতে দেখতে কেটে গেলো। তারপর থেকে রঙ বদলাতে শুরু করলো। শ্বশুরবাড়ির লোকেরা তাকে খোঁটা দিতে শুরু করেলো। সে গরীব বলে। তাদের ছেলেকে আরো বড় ঘরে বিয়ে করাতে পারতো। আরো ভালো মেয়ে পেতো। ছেলের মাথায় কী ভীমরতি ধরলো, সে কোথাকার ফকিরনি একটাকে এনে ঘরে তুলেছে। শুরুতে আড়ালে আবডালেই এসব চলতো। নববধূ না শোনার ভান করে থাকতো। আস্তে আস্তে আড় ভেঙে গেলো। তার সামনেই কথাবার্তা শুরু হয়ে গেলো। এটুকুতেই থেমে থাকলো না। ঘরের মানুষগুলো স্বামীর কানও ভাঙাতে শুরু করলো। মিছেমিছি অভিযোগ করতে শুরু করলো। প্রতিদিন শুনতে শুনতে কঠিন মিথ্যাকেও সত্য বলে মনে হতে থাকে। স্বামী প্রথম প্রথম অবিশ্বাসভরে এসব উড়িয়ে দিলেও, পরের দিকে তার মনেও খটকা দেখা দিল! তাইতো! কোনও কারন ছাড়া তো এত এত অভিযোগ উত্থাপিত হতে পারে না।
.
শুরু হলো স্বামীর পক্ষ থেকেও অভিযোগ। স্বামীর সমর্থন পেয়ে শ্বশুরবাড়ির অন্যরা এবার সীমাহীন লাই পেয়ে গেলো। লাগামছাড়া হয়ে গেলো তাদের নির্যাতন। মুখ দিয়ে যা তা বলার পাশাপাশি ঘরের সবকাজ তাকেই করতে দেয়া হলো। একটু উনিশ-বিশ হলেই আর রক্ষা নেই। সারাদিন অমানুষিক কাজ করার পরও যদি অভিযোগের মাত্রাটা একটু কমতো! মাঝেমাঝে মনে হয়, কাজ করাটাই তার দোষ! কারন সে কাজ করলে, তারা রাগ ঝাড়ার সুযোগ পায় না! পুঞ্জীভূত রাগ অন্যভাবে প্রকাশ করে।
.
দুপুরের দিকে হাতে তেমন কাজ থাকে না। পুরুষেরা যে যার কাজে। মহিলারা বিছানায় গড়াগড়ি দেয়। এই ফাঁকে মেয়েটা একছুটে মায়ের কাছে যায়। সমস্ত কষ্ট মায়ের কাছে খুলে বলে। বুকের ভার কিছুটা হলেও কমে। অসহায় বিধবা মা কিইবা করতে পারেন। মেয়েকে বোবা কান্নামাখা স্বরে সান্ত¦না দেন। এভাবেই দিন কেটে যাচ্ছে। কষ্টের মাত্রাও বেড়ে চলছে। যে স্বামী রানী করে ঘরে তুলেছিল, সে-ই এখন চাকরানী করে ঘরছাড়া করার চেষ্টা করছে। তাও মিথ্যা অভিযোগে! কিভাবে মানুষটা বদলে গেলো! মিছরি থেকে ধুতরা হয়ে গেলো! আশ্চর্য!
.
মায়ের বয়েস হয়েছে। মেয়ের কষ্ট আর নিজের খাওয়া-দাওয়ার কষ্ট সহ্য করতে না পেরে, স্বাস্থ্য ভেঙে পড়লো। বিছানায় পড়ে গেলেন। মেয়ে দিনে একবার এসে মায়ের কাজ যতটুকু পারে করে দিয়ে যায়। তার নিজের স্বামীর ঘরে সুখ নেই, মাকে কিভাবে এ-দুর্দিনে সাহায্য করবে? মায়ের মনে ভীষণ কষ্ট, মেয়েটাকে সুখী দেখে যেতে পারলেন না। মেয়ের মনে কষ্ট, মা চলে গেলে কার কাছে মনের ভার লাঘব করবে?
.
মা শীর্ণ দুর্বল হাতটা মেয়ের মাথায় বুলিয়ে দিতে দিতে বললেন:
-মা রে! আমার আর বেশি দেরী নেই। তোর জন্যে কলিজাটা ফেটে যাচ্ছে। আমি আল্লাহর রহমতের প্রত্যাশী। জেনে শুনে কখনো স্বামীর অবাধ্য হইনি! পর্দা ভাঙিনি। নামায-রোজা কাযা করিনি। অজান্তে গুনাহ করে ফেললে, বারবার তাওবা করেছি! আমার জন্যে চিন্তা করিস না।
-তুমি যে আমার শেষ আশ্রয় ছিলে! তুমি না থাকলে আমি কার কাছে যাবো!
-ভুল বললি মা! আমি তোর শেষ আশ্রয় নই রে!
-কে?
-আমি তুই সবারই শেষ আশ্রয় হলেন ‘আল্লাহ’! একমাত্র আশ্রয়ও বটে। আমি নেই তো কী হয়েছে! আল্লাহ আছেন। ছিলেন। থাকবেন। তোর বাবা মারা যাওয়ার পরও আমি সাহস হারাইনি। হতোদ্যম হইনি। যৎসামান্য সঞ্চয় ছিল, ওটা দিয়েই কোনও রকমে দিন পার করে দিয়েছি। ভেবেছিলাম তুই সুখী হবি! মিলল না। তবে তোর সুখী হওয়ার সময়ও ফুরিয়ে যায় নি। মাত্র তো দুই বছর গেলো। তোর সামনে এখনো দীর্ঘ জীবন পড়ে আছে। অবশ্য আল্লাহ যদি তোকে আগেই কাছে ডেকে নেন, সে ভিন্ন কথা!
-তাই যেন হয় মা, তাই যেন হয়। তুমি বিনা আমি আর পৃথিবীতে থাকতে চাই না!
-পাগলী! এমন কথা বলে না। দুনিয়া কারো জন্যে থেমে থাকে না। যাবার আগে তোকে একটা কথা বলতে চাই!
-কী কথা মা!
-আমি চলে গেলে, তুই নিঃসঙ্গ একাকী হয়ে পড়বি, এটা ঠিক নয়। আগেও তোকে কথাটা বলেছি! একটা কাজ করবি! আমি থাকতে যেমন প্রতিদিন এ-ঘরে আসতি, আমার মৃত্যুর পরও আসবি!
-খালি ঘরে এসে কী করবো! মনটা আরো বেশি খারাপ হবে !
-না হবে না। প্রথম প্রথম কষ্ট লাগলেও পরে ঠিক হয়ে যাবে। ঘরে এসে, আমার জায়নামাযটা বিছিয়ে, দুই রাকাত নামাজ পড়ে, আল্লাহর কাছে সব কষ্টের কথা খুলে বলবি। ঠিক আমাকে যেভাবে বলতি, সেভাবে। চোখের পানি ফেলে। মনের সব দুঃখ একসাথ করেই বলবি। তাহলে দেখবি, আমার অনুপস্থিতির অভাব ধীরে ধীরে কেটে যাবে!
.
মা নেই। মেয়েকে শোকের সাগরে ভাসিয়ে পরপারে পাড়ি জমালেন। এমন দুর্দিনেও স্বামীকে পাশে পেলো না। কষ্টগুলোর আগের মতোই আছে। সারাদিন হাঁড়ভাঙ্গা খাটুনি। রাতে স্বামীর বকুনি। শুধু দুপুরবেলাটা একান্ত নিজের করে পাওয়া। মায়ের কথামতো আল্লাহর দরবারে ধর্না দিতে শুরু করেছে অসহায় বিপন্ন মেয়েটা। প্রথম দিন তেমন কিছু হয়নি। আসলে আল্লাহর কাছে এভাবে কখনো বলাই হয়নি। নিয়মিত নামাজ-কালাম হয়েছে। বাবা-মা ছোটবেলা থেকেই এবাদতে অভ্যস্ত করে তুলেছিলেন। কিন্তু আল্লাহকেই শেষ ও একমাত্র আশ্রয় মনে করার মানসিকতাটা কেন যেন গড়ে ওঠেনি। মায়ের মৃত্যুশয্যার মিনতিভরা আখেরী উপদেশ! জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিল।
.
মায়ের কাছেও যেসব কথা বলা যেতো না, মায়ের কষ্টের কথা ভেবে রেখেঢেকে বলতে হতো, আল্লাহর দরবারে সেসবের বালাই নেই। যা ইচ্ছে খুলে বলা যায়। আরও অবাক করা ব্যাপার হলো, মায়ের কাছে বলার সময় প্রতিদিন কান্না পেতো না। দুঃখ-কষ্টও একটা অভ্যেসে পরিণত হয়েছিল। কিন্তু রবের কাছে হাত তুললেই বুকভেঙে কান্না আসে। আগের চেয়ে মনটা বেশি হালকা হয়ে যায়। একটা পাষাণ নেমে যায়।
.
নেশার মতো হয়ে গেছে। মনটা আকুলি-বিকুলি করতে থাকে। কখন দুপুর হবে। কখন আল্লাহর কাছে যাবে। এখন শ্বশুর বাড়ির যাতনাকে অসহ্য মনে হয় না। মনটাও হাসিখুশি থাকে। ব্যাপারটা এ-বাড়ির কুটনীদের দৃষ্টি এড়াল না। কী ব্যাপার! মা-মরা মেয়ের মুখে এমন হাসি! তারা নিপীড়নের মাত্রা আরো বাড়িয়ে দিল। কাজ হলো না। এক মহিলা বললো:
-বউকে তার মায়ের বাড়ি থেকে আসার পরই বেশি উৎফুল্ল দেখা যায়! প্রতিদিন সাথে করে ভরা কলসি নিয়ে যায়, আসে খালি কলসি নিয়ে! ব্যাপার কি! ব্যাপারটা সুবিধের ঠেকছে না। তার জামাইকে বিষয়টা তাড়াতাড়ি জানাতে হবে! এমন দুশ্চরিত্রের মেয়ে ঘরের বধূ হয়ে থাকবে! মেনে নেয়া যায় না। আমাদের সোনার টুকরা সহজ সরল ছেলেটা বলেই সহ্য করে আছে! আজ একটা হেস্তনেস্ত হতেই হবে! আরো আগেই খেয়াল করা উচিত ছিল। মা-ও বোধ হয় এমন ছিল। তার কাছেই শিখেছে। কে জানে, মা বেঁচে থাকতেই এসব শুরু করেছিল। এখন আর নিজেকে বশ মানাতে পারছে না! আমাদের সরলতার সুযোগে এই করে বেড়াচ্ছে! দেশে কি দ্বীন-ধর্ম নেই!
.
ছেলে এলো রাতে। তাকে একান্তে ডেকে ফিসফিস করে সব সালংকারে বলা হলো। ছেলের মাথায় আগুন ধরে গেলো। তাকে সমঝে-সুমঝিয়ে ঠান্ডা করা হলো। ঠিক হলো, আগামী কাল আর অফিসে গিয়ে কাজ নেই। ঘর থেকে অফিসের নাম করে বের হয়ে, সোজা শ্বাশুড়ীর ঘরে গিয়ে লুকিয়ে থাকবে। একেবারে হাতেনাতে ধরা যাবে ‘দু’জনকে’।
.
দুপুর হলো। স্বামী অবাক হয়ে দেখলো, স্ত্রী ঝটফট গোসল সারলো। মায়ের রেখে যাওয়া ধবধবে শাদা পোশাকটা পড়লো। নামাযে দাঁড়িয়ে গেলো। তারপর দীর্ঘ মুনাজাতে ডুবে গেলো। একে একে নিজের কষ্টের কথাগুলো বললো। কারো বিরুদ্ধে কোনও অভিযোগ না করেই, নিজের জীবনে সুখশান্তি কামনা করলো। স্বামীর জন্যে দু‘আ করলো। শ্বাশুড়ীর জন্যে দু‘আ করলো। এমন অপার্থিব দৃশ্য দেখে স্বামীর মনটা কেমন যেন হয়ে গেলো। অনুশোচনায়। লজ্জায়। বিবেকের দংশনে।
.
-আরিয়া! তুমি কতোদিন ধরে এমন করে নামায পড়ছো?
-আম্মুর ইন্তেকালের পর থেকে!
-কী আশ্চর্য! আমি এতটাই নির্দয়-নির্বোধ, একটুও টের পেলাম না! অন্ধ হয়ে অন্ধকারেই ডুবে ছিলাম! তোমার প্রতি যে যুলুম করেছি, তার প্রায়শ্চিত্ত কিভাবে হবে বলো!
-কিছুই করতে হবে না! আগে মনে ভীষণ কষ্ট থাকলেও, আম্মু মারা যাওয়ার পর থেকে, কারো প্রতি কোনও রাগ নেই।
-অবাক করলে! মায়ের মৃত্যুর পর তোমার কষ্ট তো আরও বেশি হওয়ার কথা। আমরা সবাই মিলে যা করেছি!
-তেমনি হওয়ার কথা ছিল। হয়নি তার কারন, আম্মু মারা যাওয়ার আগের দিন, আমাকে কাছটিতে বসিয়ে কিছু উপদেশ দিয়েছিলেন। বিশেষ করে দু’টো শব্দ বলেছিলেন। আব্বুও ইন্তেকালের সময় আম্মুর অসহায় বিপন্ন অবস্থা দেখে, শব্দদুটো বলেছিলেন। সাথে ব্যাখ্যা শুনিয়ে সান্ত¦না দিয়ে গিয়েছিলেন। এজন্য আম্মু শত কষ্টেও নুয়ে পড়েন নি। আপনি যখন বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে এসেছিলেন, সেটা ছিল আমাদের জন্যে আকাশের চাঁদ হাতে পাওয়ার মতো। আম্মুর দৃঢ় বিশ্বাস জন্মেছিল, এটা আব্বুর উপদেশ অনুযায়ী আমল করারই ফল! পরে অবশ্য কিছু সময়ের জন্যে, আমার কষ্ট দেখে, তার বিশ্বাসে কিছুটা চিড় ধরেছিল। ইন্তেকালের আগে আবার আল্লাহর প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস ফিরে পেয়েছিলেন।
-শব্দ দু’টো কি কি?
-সেগুলো আসলে কুরআনের একটা আয়াতের অংশ! সূরা ‘আলাক’ মানে ইক্বরা-এর শেষ দু’টি শব্দ। উসজুদ ইকতারিব! তুমি সিজদা করো। নিকটবর্তী হও!
নবীজি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সবে দ্বীনের দাওয়াত দেয়া আরম্ভ করেছেন। প্রকাশ্যে কাবাচত্বরে নামায পড়তে শুরু করেছেন। আবু জাহলের এ-নিয়ে ভীষণ উষ্মা! সে নামায বন্ধ করার জন্যে অতি তৎপর হয়ে উঠলো! বাধা দিতে এলো। দম্ভভরে বললো:
-তুমি নামায পড়লে আমি পা দিয়ে তোমার গর্দন পিষে দেব (নাউযুবিল্লাহ)!
আবু জাহলের এই দম্ভোক্তির প্রেক্ষিতেই আল্লাহ তা‘আলা সূরা আলাকের ছয় থেকে শেষ পর্যন্ত আয়াতগুলো নাযিল করেন। প্রথম পাঁচ আয়াত নাযিল হয়েছিল আরো আগে। সেই শুরুতে। হেরা গুহায়।
নবীজি আবু জাহলের কথা শুনে তাকে উল্টো ধমক দিলেন। আবু জাহল তেলেবেগুনে জ্বলে উঠে বলেছিল:
-আমি মক্কায় একা নই। আমার একান্ত বৈঠকে প্রচুর লোক সমাগম হয়। আমি ডাকলেই তারা ছুটে আসবে।
নরাধমের এহেন ঔদ্ধত্যের জবাবে আল্লাহ তা‘আলা পাল্টা হুমকি দিয়েছেন:
-সুতরাং সে ডাকুক তার জলসা-সঙ্গীদের! আমিও ডাকব জাহান্নামের ফেরেশতাদের। হে নবী! আপনি তার আনুগত্য করবেন না। আপনি আমার সিজদা করুন। তাহলে আপনি আমার আরো নিকটবর্তী হতে থাকবেন!
নবীজি সিজদার মাধ্যমে সব দুঃখ-কষ্ট ভুলে গিয়েছিলেন। আল্লাহর কাছাকাছি হয়েছেন। আম্মুকেও দেখেছি দিনদিন আল্লাহর আরো কাছে, আরো কাছে যেতে। আমিও সে চেষ্টায় রত ছিলাম। যাতে সব কষ্ট ভুলে থাকা যায়। আর এটা পেয়ারা নবীর আদর্শ। সুন্নাত। তার চেয়েও বড় কথা, সরাসরি আল্লাহর দেয়া অব্যর্থ ধন্বন্তরি ‘ব্যবস্থাপত্র’। অারেকটা ব্যাপারও বেশ অবাক করা!
-কোন ব্যাপারটা?
-আমি এতদিন যাকে সবচেয়ে কাছের মনে করতাম, তাকেই সব খুলে বলতাম! এভাবেই মাস কে মাস বলে গেছি! কোনও সমাধান আসে নি। কিন্তু যেই আল্লাহকে সরাসরি নিজের কথা বললাম, অল্প ক’দিনের মধ্যে তিনি সমাধান করে দিলেন! আলহামদুলিল্লাহ!
.
-আরিয়া! তুমি এতকিছু জানো। কখনো টের পেতে দাওনি তো!
-আপনি টের পেতে চেয়েছেন?
-চলো, আজ আর ঘরে ফিরবো না! এখানেই কিছু সময় কাটিয়ে দেই!
-কেন টের পেতে ইচ্ছে হচ্ছে বুঝি!
-তোমার হচ্ছে না?
-জ্বি।
-তবে আর দেরী কেন!
-এ্যাই কী হচ্ছে এসব! আমাদের ঘরের কলটা নষ্ট তো!

Collected - হুন্না লিবাস❤বডি হিটার!

বডি হিটার। মানে যা শরীরকে গরম করে। উত্তাপ দেয়। উষ্ণ করে। স্ত্রীর ভূমিকা কী, বডি হিটিং, স্বামীর শরীর গরম করা? সোজাসাপটা উত্তর দিতে গেলে, অবলীলায় বলতে হবে:
= জ্বি, স্ত্রীর একটা কাজ হলো, স্বামীকে গরম করা। তবে উল্টোটাও সত্যি। স্বামীর একটা ভূমিকাও তাই। স্ত্রীর বডি ‘হট’ করা। দু’জনের মধ্যেই আল্লাহ হিটিং সিস্টেম ফিট করে দিয়েছেন।.উঁহু! এটা আমার কথা নয়।
-কার কথা?
-স্বয়ং আম্মাজান আয়েশা রা.-এর কথা। তাও যার তার সম্পর্কে নয়, খোদ নবীজি সা. সম্পর্কে। আপনি কোথাকার এত ‘রুচিবাগীশ’ চলে এসেছেন! ওরে আমার লাজুক রে!
একটা গল্প শোনা যাক! গল্পটা সবার জানা। তারপরও বলা যাক!
= হুযুর ওয়াজ করতে গিয়েছেন। গ্রামে। ধানী ফসল উঠেছে। মানুষের মনে সুখ। পকেটে সুখ। সুখের চোটে কেউ ওয়াজ-মাহফিল দিচ্ছে। কেউ যাত্রাপালার আয়োজন করছে। গ্রামবাসীর ইচ্ছে হলো, এবার ফসল মাশাআল্লাহ ভালোই হয়েছে। আল্লাহ-খোদার নাম না নিলে কেমন দেখায় না! একটা ওয়াজের আয়োজন করা যাক! সুরেলা একজন ওয়ায়েজ দাওয়াত দেয়া হলো। কচি বয়েসের আলেম। রক্ত গরম। গলা গরম। আরো অনেক কিছুই গরম। হুযুর মাইক পেয়ে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না। দীর্ঘ এক ওয়াজ দিলেন। ওয়াজের এক পর্যায়ে হুযুর বললেন:
-আপনারা পাক-পবিত্রতার দিকে নযর রাখবেন। গ্রামের মানুষজন এদিকটাতে ভীষণ উদাসীন। তারা মা-বোনদের শাড়ি দিয়ে সেলাই করা ‘কাঁথা’ গায়ে দেয়। ছিঃ ছিঃ ছিঃ! এমন কাঁথা কিভাবে গায়ে দেন? এ-ধরনের কাঁধা না ধুয়ে গায়ে দেয়া যাবে না।
.
ওয়াজ শেষ। গ্রামের মানুষেরা খাবারের অয়োজনে কমতি করে নি। রান্নাটাও হয়েছে মন্দ না। বেশ জমিয়ে খাওয়া গেছে। কাতলা মাছের মুড়োটা! আহ! মোরগের রানটা? লা জওয়াব! মুগ ডালের চচ্চরি? ওহ! এখনো জিভে লেগে আছে। শেষে গামছাপাতা দৈ? কলিজাটা মোচড় দিয়ে উঠছে! পেটে আর জায়গা ছিল না বলে। তা এত কষ্টের মধ্যে সুখ, একটা পদও ‘অনাঘ্রাত’ ছিল না। ঢেঁকুরের মধ্যে কী রকম খোশবাই ছড়াচ্ছে! আল্লাহ মালুম! অন্যকিছুও বোধ হয় সুবাসিত হয়ে গেছে!
.
এবার শোয়ার পালা। কী নরম আর তুলতুলে বিছানা। শুলেই ঘুম চলে আসবে। এ কি! গায়ে দেয়ার যে কিছু নেই? কেমন বেত্তমিজি! রাজভোগের পর শরীফ মেজাজটাই খাট্টা হয়ে গেলো। সভাপতি সাহেব!
-জ্বি হুযুর!
-আমি মাঘ মাসের এই কনকনে শীতে কি মারা পড়ব?
-কেন হুযুর কী হয়েছে?
-আমি গায়ে দেবো কী?
-ইয়ে মানে, হুযুর ওয়াজে বলেছিলেন, মেয়েছেলেদের শাড়ী দিয়ে সেলাই করা কাঁথা গায়ে পুরুষের জন্যে হারাম! তাই........!
(সবাই গল্পটার শুধু এটুকুই জানে। বাকীটা অনেকেরই জানা নেই। তাহলে গল্পের বাকী অংশ? ..... চলবে)
.
আচ্ছা, হিটিং সিস্টেম নিয়ে আলোচনাটা আপাতত ‘ফ্রিজ’ করে রাখা যাক। তার আগে শিরোনামের প্রথম অংশকে ‘হিট’ করা যাক।
.
কুরআন কারীমে একটু পরপরই কিছু বাক্য পাওয়া যায়। এগুলো অনেকটা ‘ইউনিভার্সাল ট্রুথ’-এর মতো। চিরন্তন সত্য। সর্বকালের জন্যে প্রযোজ্য। তার মানে এই নয়, অন্য অংশগুলো ব্যতিক্রম। কুরআন কারীম অতি অল্পকথায় অনেক বড় বড় বক্তব্য প্রকাশ করে। দুয়েক শব্দেই বিরাট বিরাট মূলনীতি দাঁড় করিয়ে দেয়। তেমনি দু’টি বাক্য হলো:
➜ হুন্না লিবাসু-ল্লাকুম। তারা (স্ত্রীরা) তোমাদের জন্যে পোষাক। আবরণস্বরূপ।
➜ আনতুম লিবাসু-ল্লাহুন্না। তোমরা (স্বামীরা) তাদের জন্যে পোষাক। আবরণস্বরূপ।
মাত্র কয়েকটা শব্দে কুরআন কারীম পুরো দাম্পত্যজীবনকে জীবন্ত করে দিয়েছে। সব সমস্যার সমাধান দিয়ে দিয়েছে। সমস্ত সুখের আকরকে জীবন্ত করে দিয়েছে। কিভাবে?

(এক) একে অপরের জন্যে আসলেই আবরণস্বরূপ। সুরক্ষা। পোশাক পরলে, বিপদাপদ থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। স্বামী বা স্ত্রী থাকলে, হারাম থেকে বেঁচে থাকা যায়। গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা যায়। চারিত্রিক বিচ্যুতি থেকে বেঁচে থাকা যায়। পদস্খলন থেকে বেঁচে থাকা যায়।

(দুই) পোশাক পরলে, বাইরের ক্ষতি থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। রোদের উত্তাপ থেকে। শীতের প্রকোপ থেকে। সাপ-বিচ্ছু থেকে। পোকা-মাকড়ের দংশন থেকে। স্বামীও তার স্ত্রীকে সেভাবে সব ধরনের বাহ্যিক অনিষ্ট থেকে রক্ষা করেন। বদলোকের লোলুপতা থেকে হেফাযত করেন।

(তিন) পোশাক সতর ঢেকে রাখে। লজ্জাস্থান ঢেকে রাখে। মান-সম্ভ্রম রক্ষা করে। শালীনতা বজায় রাখতে সহায়তা করে। শরীরের দোষ-ত্রুটি-খুঁত লুকিয়ে রাখে। স্বামী-স্ত্রীও একে অপরের দুর্বলতাগুলো অন্যদের থেকে আড়াল করে রাখে। আচ্ছাদন দিয়ে রাখে।

(চার) পোশাক পরলে মানুষ প্রশান্তি অনুভব করে। আরাম পায়। স্বস্তি পায়। নিরাপত্তাবোধ করে। নিশ্চিন্ত হয়। উসখুসভাব থাকে না। খুঁতখুঁতানিও থাকে না। স্বামী-স্ত্রী পাশে থাকলেও জীবনে পরম ‘স্থিতি’ আসে। থিতুভাব আসে।

(পাঁচ) জ্ঞানী ব্যক্তি মাত্রেই নিজের জন্যে উপযুক্ত পোষাক বেছে নেয়। কোন পোষাকটা নিজের জন্যে বেশি উপযুক্ত হবে, চিন্তা-ভাবনা করে। পরামর্শ করে। মার্কেটে যাওয়ার সময় সাথী-সঙ্গীদের নিয়ে যায়। যেন উপযুক্ত রঙটা কেনা যায়। সঠিক কাপড়টা পাওয়া যায়। স্বামী-স্ত্রীর ব্যাপারটাও এমনি। উপযুক্ত মানুষটাকেই বেছে নিতে হয়। তাহলেই শান্তি।

(ছয়) পোষাক মানুষকে পরিপূর্ণতা দেয়। অসম্পূর্ণতাগুলোকে ভরাট করে দেয়। স্বামী-স্ত্রীও একে অপরের অসম্পূর্ণতাগুলো দূর করে। যৌথ প্রচেষ্টায় দু’জনের খামতিগুলো দূর হয়। সংসারে নানা অসঙ্গতি থাকলেও, ঢেকেঢুকে রাখে। ঘরের কথা পরে জানে না।

(সাত) সবাই নিজের জন্যে সুন্দরতম পোষাক বেছে নিতে চায়। ঝলমলে পোষাক চায়। নিখুঁত ডিজাইনের সেটটা সংগ্রহ করতে চায়। নিজের ব্যক্তিত্বের সাথে খাপ খায় এমন পোশাকটার জন্যে হন্যে হয়ে ফেরে। এ-দোকান সে-দোকান করতে করতে পা ফুলিয়ে ফেলে। স্বামী বা স্ত্রীও তেমন ‘খাপ খাওয়ানো’ হওয়া উচিত।

(আট) পোশাক আর শরীরের মাঝে একটা সম্পর্ক থাকে। একটা আরেকটার সাথে অঙ্গাঙ্গী জড়িয়ে থাকে। অপরিহার্য্যভাবে। অবিচ্ছেদ্যরূপে। স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক সম্পর্কও তেমনি। আত্মিক। শারীরিক। আবেগের। অনুভূতির।

(নয়) পোশাক আঁটসাঁট হয়ে গেলে, অনেক সময় সেটা পরেই চলাফেরা করতে হয়। প্রথম প্রথম কোনও কোনও পোশাক একটু আঁটো লাগে। বাধো বাধো ঠেকে। পরে আস্তে আস্তে সয়ে যায়। সহনীয় হয়ে আসে। স্ত্রী-স্বামীও এমনি। সহ্য করে নিতে হয়। হজম করতে হয়। কষ্ট হলেও জোর করে থাকতে হয়। আস্তে আস্তে ঠিক হয়ে আসে।

(দশ) পোশাক আর শরীর এক হয়ে থাকে। দোঁহে মিলে। যেন দু’টো মিলে এক সত্তা। এক প্রাণ। এক দেহ। স্বামী-স্ত্রীও তেমন। দু’জন হলেও, থাকতে হয় একদেহের মতো। একাকার হয়ে। একীভূত হয়ে। একে অপরের মধ্যে লীন হয়ে।

(এগার) পোশাক পরলে এক ধরনের প্রশান্তি নেমে আসে। মনে ও তনে। আরাম আরাম বোধ হতে থাকে। স্বামী-স্ত্রীও তেমনি। কাছে গেলেই ভাল লাগা শুরু হয়। আরামবোধ হতে শুরু করে। (سَكَنٌ) সাকান শান্তিবোধ হতে থাকে। কাতাদা রহ. বলেছেন: লিবাস অর্থ: সাকান। শান্তি।

(বারো) পোশাক তৈরী করার পর, ডিজাইন বা সেলাই পছন্দ না হলে, পরিবর্তন করা হয়। নতুন করে সেলাই করা হয়। কুঁচি, ফুল, ভাঁজ নতুন করে দেয়া হয়। স্বামী-স্ত্রীও তেমন। সাংসারিক জীবনে একসাথে থাকতে গেলে, উভয়ের মাঝেই কিছু অভ্যেস-আচরন ধরা পড়ে। যৌথ জিন্দেগীর জন্যে এসব অভ্যেস ক্ষতিকর। তাই এসব ‘খাসিয়ত-খাসলত’ পরিবর্তন করা আবশ্যক হয়ে পড়ে। নিজেকে নতুন করে ঢেলে সাজানোর প্রয়োজন হয়ে পড়ে।

(তেরো) বিপদের সময়, শীত-গ্রীষ্মে পোশাকই মানুষকে ক্ষতিকর প্রভাব থেকে রক্ষা করে। প্রচন্ড ঠান্ডার প্রকোপ, তীব্র গরমের ঝাপটা থেকে বাঁচতে মানুষ পোশাকের আশ্রয় নেয়। জীননের নানা ঘাত-প্রতিঘাতেও স্বামী-স্ত্রী একে অপরের কাছে আশ্রয় খোঁজে। সান্ত¦না খোঁজে।

(চৌদ্দ) তোমার জন্যে পোশাকস্বরূপ। তার মানে এটাই তোমার জন্যে নির্দিষ্ট। অন্য কারো চিন্তা করো না। অন্য কারো দিকে তাকিও না। অন্য কারো দিকে উঁকি দিও না। অন্য কারো প্রতি প্রলুব্ধ হয়ো না। অন্য কারো প্রেমে পড়ো না।

(পনের) লিবাস মানে? বৈবাহিক সম্পর্ক। অর্থাৎ: পারস্পরিক বোঝাপড়া। পারস্পরিক একাত্মতা। পারস্পরিক সৌহার্দ্য। পারস্পরিক সম্প্রীতি। পারস্পরিক নির্ভরতা। পারস্পরিক সহযোগিতা। কুরআনের ভাষ্য অনুযায়ী: পারস্পরিক (مَوَدَّةٌ)-মাওয়াদ্দাহ। প্রগাঢ় ভালোবাসা। পারস্পরিক (رَحَمَةٌ)-রহমত। হৃদ্যত।

(ষোল) রবী বিন আনাস রহ. বলেছেন: লিবাস মানে লিহাফ। লেপ। শীতের সময় যেমন লেপ গায়ে দেয়, স্বামী-স্ত্রীও একে অপরকে গায়ে দিবে। উষ্ণতা বিলাবে।

(সতের) পোশাক মাঝে মধ্যে খুলে রাখতে হয়। শরীর থেকে আলগা করতে হয়। দু’জনের মাঝেও কখনো কখনো বাঁধন আলগা হয়ে আসে। দূরত্ব সৃষ্টি হয়। বৈরিতা তৈরী হয়। সম্পর্কটাকে ঝালাই করার প্রয়োজনেই, সংকটের সময় দু’জন কিছুটা সময় আলাদা-অন্তরালে থাকা জরুরী। নতুন করে শুরুর জন্যে এটা বেশ উপযোগী।

(আঠার) লিবাস শব্দটাকে রূপকার্থে ব্যবহার করা হয়েছে। বাস্তবে তো স্বামী-স্ত্রী লিবাস নয়। লিবাস বলে, পোশাক যেমন শরীরের সাথে লেপ্টে থাকে, দু’জনকেও এভালে আজীবন লেপ্টে থাকার প্রতি উৎসাহিত করা হয়েছে।

(উনিশ) আবরী অলংকার শাস্ত্র অনুযায়ী, লিবাস শব্দটা ‘একবচন’। দু’জনের ক্ষেত্রেই একবচনই ব্যবহার করা হয়েছে। এবং লিবাস শব্দটার কোনও বিশেষণ ব্যবহার করা হয়নি। অর্থাৎ কোনও বাড়তি কথা নেই। অতিরিক্ত প্রটোকল নেই। অপ্রয়োজনীয় আড় নেই। সরাসরি। স্বামী-স্ত্রীর মাঝেও কোনও আড়াল থাকবে না। প্রটোকল থাকবে না। আড়ম্বর থাকবে না। যা কিছু হবে, সব সরাসরি। ডিরেক্ট একশন।

(বিশ) একে অপরের জন্যে ‘লিবাস’। এখানে দু’জনের সম্পর্ককে লিবাস ও শরীরের সম্পর্কের সাথে ‘তুলনা’ করা হয়েছে। উপমা দুই ধরনের হয়:
➝ ক: হিসসি। স্পর্শজাত। ধরা যায়। ছোঁয়া যায়। অর্থাৎ পোশাক যেমন শরীরকে চারদিক থেকে বেষ্টন করে রাখে, আগলে রাখে, স্বামী-স্ত্রীও একে অপরকে এভাবে আগলে রাখবে।
➝ খ: আকলী। বুদ্ধিবৃত্তিক। অনুভূতিজাত। পোশাক শুধু বাহ্যিকভাবেই নিরাপত্ত দেয় না। মানসিকভাবেও দেয়। বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট পরে মাঠে নামা আর শুধু আটপৌরে পোশাক পরে মাঠে নামার মধ্যে নিশ্চই আকাশ-পাতাল তফাত হবে। দু’জনের মানসিক স্থিতি-অস্থিতির মাত্রায় অনেক ফারাক হবে। স্বামী-স্ত্রী শুধু একে অপরের জন্যে বাহ্যিক ‘আবরন’ হবে না। দু’জন দু’জনকে মানসিক ‘সাপোটর্’ও দেবে।

(একুশ) প্রথমে স্বামীকে বলা হয়েছে: স্ত্রীরা তোমাদের জন্যে আবরণস্বরূপ। স্ত্রীদেরকে প্রথমে তাদের স্বামীর কথা বলা হয়নি। তার মানে, একজন স্ত্রীর জন্যে স্বামী যতটা প্রয়োজন, একজন স্বামীর জন্যে স্ত্রীর প্রয়োজন তার চেয়ে বেশি। বুড়ো বয়েসের কথা চিন্তা করলে ব্যাপারটা খোলাসা হয়ে যাবে। বুড়ো মারা গেলে, বুড়ি বাকি জীবন পার করে দিতে পারে। অতবেশি সমস্যা হয় না। কিন্তু বুড়ি মরে গেলে, বুড়োর সবদিক আঁধার হয়ে যায়। স্ত্রী ঘরে থাকে। তার পাপের আশংকা কম। পাপের সুযোগ কম। স্বামী বাইরে বাইরে থাকে। তার পাপের সুযোগ বেশি। তাই তার স্ত্রীরও প্রয়োজন বেশি। আবার এটাও বলা যায়, সংসারে স্বামীর চেয়ে স্ত্রীর ভূমিকাই বেশি প্রভাবশালী। সন্তান লালনপালনের দিকটা লক্ষ্য করলে, পরিষ্কার হয়ে যাবে বিষয়টা।

(বাইশ) বৈবাহিক সম্পর্কটা শুধু বাহ্যিক রুসুম-রেওয়াজ নয়। একজন আরেকজনের পোশাক বলে, বোঝানো হয়েছে, একা একা থাকা নয়। যৌথভাবে থাকাই কাম্য। তাহলে পারিবারিক বন্ধন অটুট থাকবে। অফিসিয়াল সম্পর্ক নয়। কৃত্রিম হাই-হ্যালোর সম্পর্ক নয়। আলাদা সত্তা, ব্যক্তি স্বাধীনতার চর্চা নয়। দু’জনকে থাকতে হবে এক হয়ে। এটাই পোশাকের দাবি। লিবাসের নিগূঢ় মিনিং।

(তেইশ) পোশাককে সুন্দর রাখতে হয়। পরিচ্ছন্ন রাখতে হয়। দু’জনের সম্পর্ককেও তরতাজা রাখতে হয়। জীবন্ত প্রাণবন্ত রাখতে হয়। পোশাকে ময়লা আর্বজনা যাতে না লাগে,সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হয়। দু’জনের সম্পর্ককেও যেন আবিলতা না লাগে, সেদিকে চৌকান্না থাকতে হয়।

(চব্বিশ) পোশাককে গ্রহনযোগ্য করার জন্যে সুবাস ব্যবহার করতে হয়। সুন্দর বোতাম লাগাতে হয়। দু’জনের সম্পর্ককে সুন্দর করতে হলে, টেকসই করতে হলে, গ্রহনযোগ্য করতে হলেও এমন কিছু করা প্রয়োজন হয়ে পড়ে। সুন্দর কথা। ভদ্র ও সৌজন্যমূলক আচরণ দিয়ে। উপহার কিনে দিয়ে। কোথাও বেড়াতে নিয়ে গিয়ে। আদর দিয়ে। সোহাগ দিয়ে। হাসি-কৌতুক দিয়ে। আনন্দ দিয়ে। চাঁদনি রাতে দৌড় প্রতিযোগিতা করে এবং......।

(পঁচিশ) পোশাককে ধোয়া প্রয়োজন। মাঝেমধ্যে বেশি ময়লা হয়ে গেলে, ধোপার কাছেও দেয়া প্রয়োজন হয়ে পড়ে। সংসারেও ময়লা জমে। কিছু ময়লা নিজেরাই ধুয়ে ফেলা যায়। কিছু ময়লা ধুতে তৃতীয় পক্ষের প্রয়োজন হয়ে পড়ে। তখন উপযুক্ত ব্যবস্থা নেয়াই যুক্তিযুক্ত।

(ছাব্বিশ) পোশাককে অতি যত্নের সাথে ব্যবহার করতে হয়। দু’জনকে একে অপরের সাথে কোমল আচরণ করতে হয়।

(সাতাশ) মেয়ের শোকাতুর বাবা-মাকে আশ্বস্ত করা হয়েছে। মেয়ে তোমাদের কাছ থেকে আরেক ঘরে গেলেও, স্বামী তাকে পোশাকের মতোই যত্ন করে রাখবে।

(আঠাশ) একটা চ্যালেঞ্জ এখানে দেয়া যায়, সমস্ত জ্বিন-মানব একসাথ হলেও, এমন একটা ব্যাপক অর্থবহ বাক্য বানানো সম্ভব হবে কি? দাম্পত্যজীবনের সবদিককে ধারন করতে পারে এমন?

(উনত্রিশ) পোশাক পরা মানে, পোশাকের মধ্যে ঢুকে পড়া। স্বামী-স্ত্রী একে অপরের পোশাক মানে? একজন আরেকজনের মধ্যে ঢুকে পড়া। ভালোবাসায়। মহব্বতে। অনুরাগে। বোঝাপড়ায়। সমঝোতায়। গভীর আবেশে।

(ত্রিশ) পোশাক শরীরকে তাপ দেয়। স্বামী-স্ত্রীও একে অপরকে তাপ দেয়। কিভাবে?
ইমাম বুখারী রহ.-এর গুরুস্থানীয় ব্যক্তি হলেন ‘ইবনে শায়বা’ রহ.। তিনি তার বিখ্যাত কিতাব ‘মুসান্নাফে একটা অধ্যায়ের শিরোনাম দিয়েছেন: গোসলের পর পুরুষ তার স্ত্রী থেকে উত্তাপ গ্রহণ।
ইমাম তিরমিযী রহ.ও তার বিখ্যাত কিতাবে এমন শিরোনাম দিয়েছেন। এ-বিষয়ক হাদীস সংগ্রহ করেছেন। কিছু পড়ে নেয়া যাক:
➨ ১: আম্মাজান আয়েশা রা. বলেছেন: আল্লাহর রাসূল ফরজ গোসল করার পর, আমাকে জড়িয়ে ধরে ‘উত্তাপ’ গ্রহণ করতেন। আমিও তাকে আমার সাথে জড়িয়ে নিতাম। আমার গোসল তখনো বাকী ছিল। এ-অবস্থাতে (তিরমিযী)।
➨ ২. উমার রা. ইবনে উমার রা. আবু দারদা রা. ইবনে আব্বাস রা.-ও এমন মজার ও সুখকর আমল করেছেন বলে হাদীসে আছে।
➨ ৩. ইবনে বলেছেন: আমি ফরয গোসল করে, স্ত্রীকে জড়িয়ে ধরি। সে গোসল করার আগেই।
ইবনে আব্বাস রা. বলেছেন: শীতকালে কুরাইশ পুরুষদের এটাই ছিল জীবনরীতি।
➨ ৪. ইবনে মাসউদ রা. বলেছেন: আমি স্ত্রী থেকে শীতে উষ্ণতা গ্রহণ করি। গ্রীষ্মে শীতলতা গ্রহণ করি।
☰ কাপড় পরা থাকলে, উত্তাপ ভালোভাবে আসবে না। আর আম্মাজান শব্দ ব্যবহার করেছেন: (استدفاء) ইস্তেদফা‘। উষ্ণতা লাভ করা। এটা কাপড় থাকলে জোরালো হয় না। চামড়ার সাথে চামড়া লাগলে যতোটা হয়। হাদীসের ব্যখ্যাগ্রন্থগুলোতে এমনটাই বলা হয়েছে।

হুযুর এমনিতে গরম। সভাপতির কথা শুনে আরো গরম হয়ে গেলেন:
-আপনাদের আয়োজন দেখে তো আমি ভেবেছিলাম আপনার বুদ্ধিমান। এখন ধারনা পুরোপুরি উল্টে গেলো!
-কেন হুযুর! আমরা বোকামীর কী করলাম?
-আমি কি শুধু কাঁথার ওয়াজ করেছি! এত টাকা দিয়ে ওয়াজের এন্তেজাম করেছেন! নিজেরাই যদি মনোযোগ দিয়ে ওয়াজ না শুনবেন, তাহলে এত পরিশ্রমের কী মূল্য রইল!
-হুযুর ভুল হয়ে গেছে! একটু যদি ধরিয়ে দিতেন!
-আমি স্বামী-স্ত্রীর কিভাবে সুন্নাত তরীকায় থাকবে, সে ওয়াজ করিনি! শীতকালে নবীজি কিভাবে আম্মাজানের কাছ থেকে উত্তাপ গ্রহণ করতেন সেটা খুলে বলিনি! খালি কাঁথার কথাটা মনে রাখলেন?
-সুবহানাল্লাহ! আল্লাহর লাখ লাখ শোকর! হুযুরের ওয়াজ শুনে গিন্নি এত খুশি হয়েছে, আর বলার নয়। গিন্নি একটা আবদারও জুড়েছে!
-আবার কী আবদার!
-হুযুর যদি রাজি থাকেন! আমাদের ‘মা’ রাবিয়াকে আপনার হাতে তুলে দিতে চেয়েছেন! মেযের মায়ের দুশ্চিন্তা, ইতিমধ্যে অারো কয়েকজনও এ-বিষয়ে চিন্তাভাবনা করতে শুরু করেছে!
-ইন্নালিল্লাহ! ছিঃ ছিঃ আব্বাজান! আমি এতক্ষণ আপনার সাথে কত বেয়াদবিই না করে ফেলেছি। মাফ করে দিন!
-তাহলে কি......!
-জ্বি জ্বি! শুভ কাজে দেরী কেন! মাসয়ালা হলো: বিয়ের বয়েস হওয়ার পর, বিয়ে ঠিক হযে যাওয়ার পর দেরী করতে নেই!
-এত রাতে?
-তবে কি অামি কি এই দীর্ঘ শীতের রাত হি হি করে মরবো?

Monday, November 14, 2016

Collected - আমার স্বামীর ডায়েরি

(১)
সকাল থেকে মন ভালো লাগছে না, ইউসুফের সাথে আজ ঝগড়া হয়েছে। ঝগড়া হলেও ছেলেরা কী সুন্দর কাজেকর্মে লেগে যায়! অথচ আমার তো কিছুতেই মন বসে না। অবাক লাগে! একটা মানুষ কীভাবে এতো ঝটপট সব ভুলে কাজে লেগে যায়। ওর তো ঝগড়া করেও কোনো ক্ষতি নেই, কী চমৎকার গটগট করে অফিসে চলে গেল। এদিক আমার বারোটা বাজে, রান্নায় মন বসল না, বান্ধবী ঘুরতে যাওয়ার জন্য ডাকল তাও যেতে ইচ্ছা হল না, চুলার রান্নাটা অন্যমনস্কতায় পুড়ে ছাই হল। কিন্তু কাজের কাজ একটা হয়েছে বৈকি! রাগ ভুলতে ঘর গোছাতে শুরু করেছিলাম, অনেকদিনের পুরোনো ড্রয়ারটা দেখে ভাবলাম গুছাই। কখনও এটায় হাত দেওয়া হয় না। ভেতরে রাজ্যের ফেলনা জিনিস, মাকড়সার জাল, আর ধুলোময়লা জমে টাল পড়ে আছে। গোছাতে গিয়ে ড্রয়ারের মধ্যে একটা ডায়েরি পেয়ে গেলাম--ইউসুফের ডায়েরি! বাহ! ইউসুফ ডায়েরি লেখে কখনও বলেনি তো! ভেতরে অজস্র গুটি গুটি লেখা। প্রায় পুরোটা ডায়েরি ভরা লেখাতে। জানি অন্যের ব্যক্তিগত লেখা এভাবে পড়া অন্যায় কাজ কিন্তু কৌতূহলে আমার মন ভরে গেল! কিছুক্ষণ দোমনা-দোটনা করে শেষপর্যন্ত কৌতূহলের কাছেই হার মানলাম, কয়েকপাতা উল্টেই বুঝলাম, এই ডায়েরি লেখা হয়েছে আমাদের বিয়ের প্রায় দেড় বছর আগে। ২০১২ তেই বেশিরভাগ লেখা, শেষ হয়েছে ২০১৩ তে। কী লেখা আছে এখানে? কোথায় গেল আমার ঘর গোছানো, কোথায় রান্না। ডায়েরিতে মুখ গুঁজে বসে গেলাম। আজই আমি ডায়েরিটা পড়ে শেষ করতে চাই..
২৩ জানুয়ারি ২০১২
ভার্সিটি শুরু করেছি প্রায় তিন বছর হয়ে গেল। বন্ধু-বান্ধব নিয়ে খুব বেশি মাতামাতি কখনোই আমার অতোটা ভালো লাগে নি। জীবনে নারী বলেও কেউ নেই। মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে আসা ছেলে আমি, বাবা রিটায়ার্ড হয়ে যাওয়ার পর থেকে পারিবারিক একটা চাপ তো আছেই। নিজেকে বরাবর খুব অথর্ব মনে হয়, সংসারের দায়দায়িত্ব তেমন কিছুই নিতে পারছি না, একসাথে টিউশন আর লেখাপড়া করে ঠিকমতো নিজের খরচ জোগাতেও কোমর ভেঙে যাওয়ার জোগাড়। দু-একজন কাছের বন্ধু, ক্লাস-পড়াশোনা-পরীক্ষা আর টিউশনি নিয়ে নিস্তরঙ্গ জীবন চলছিল একরকম। এর বেশি মাতামাতি করার সামর্থ্যও নেই, ইচ্ছাও নেই। ক্লাসের ছেলেমেয়ে থেকে শুরু করে বন্ধুবান্ধব সবাই এখন গার্লফ্রেন্ড সাথে নিয়ে ঘুরে, একজন অতিরিক্ত নারীর বিলাসিতা আমার জীবনে এখন নেই বলেই আমি মেনে নিয়েছি। তাই ওদিকে কখনও নজর দেই নি। মনের মধ্যে কারো ভাবনা এলেও দূরে ঠেলে সরিয়েছি। বার বার নিজের মনকে শাসন করেছি। কিন্তু তবুও সব এলোমেলো হয়ে গেল। ঝড়ের মতো দু’টি চোখ এসে তছনছ করে দিল সবকিছু--আমার এতোদিনের চিন্তা-চেতনা, ধ্যানধারণা, লেখাপড়া নিয়ে ব্যস্ততা, পরিবার নিয়ে দুর্ভাবনা, ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ সব নিমিষেই কোথায় যেন মিশে গেল। তার বদলে শরীরে ভর করল অদ্ভুত এক মাদকতা! এই মাদকতার স্বাদ আমি কোনোদিন পাই নি। যেন বসন্তের হাওয়া আমাকে মাতাল করে দিচ্ছে, যেন দূরে কোথাও থেকে একটা সুর এসে আমাকে আচ্ছন্ন করে নিচ্ছে, যেন সমুদ্রের অতল গহ্বরে আমি হারিয়ে যাচ্ছি, ডুবছি, ডুবছি, চিরদিনের মতো--এই ডোবার কোনো শেষ নেই।
ইমা। সেই স্বপ্নের রাজকন্যার নাম।
২৬ জানুয়ারি ২০১২
কী হল, কেন হল, কীভাবে হল কিছুই বুঝতে পারছি না। নিজেকে যুক্তিবাদী বলেই সবসময় বিশ্বাস করে এসেছি। কিন্তু আজ আমার সব বোধবুদ্ধি থমকে গেছে।
আচ্ছা, একটু শুরু থেকেই বলি। স্কুল-কলেজে প্রেম করা তো দূরের কথা, গত তিন বছরের ভার্সিটি জীবনেও ক্লাসের কোনো মেয়েকেই আমি তেমন পাত্তা দেই নি। পড়ায় আমার কারো সাহায্য নেওয়ার দরকার হতো না। উল্টো আমার কাছেই সবাই পড়া বুঝতে চাইত, নোট নিতে আসত। পার্টি, শিক্ষাসফর জাতীয় ইভেন্টগুলোয় ক্লাসের মেয়েদের সাথে টুকটাক কথা হয়েছে--মেয়েদের সাথে আমার বন্ধুত্ব বলতে গেলে এ পর্যন্তই। মাঝেসাঝে ক্যাম্পাসের মাঠে আড্ডার সময় বন্ধুদের ‘গার্লফ্রেন্ড’রাও আসত। কী সব ন্যাকা ন্যাকা মেয়ে বাবা! হয়ত বয়ফ্রেন্ডরা সামনে থাকত বলেই ন্যাকামিটা যেন আরেকটু বেড়ে যেত। এই ধরণের মেয়েকে আমি কখনোই মন থেকে পছন্দ করতে পারিনা। কিন্তু ইমা! আমার হৃদয়ের রাণী ইমা! ও সবার থেকে সত্যিই আলাদা! ওর হয়তো এই ভার্সিটিতে পড়ার কথাই ছিল না! বিদেশের ভার্সিটিতে পড়ত। বাবা বিশাল বড়োলোক। দু’বছর আগে ওর মা খুব অসুস্থ হয়ে যাওয়ায় আমেরিকা চলে যায় ওরা। এরপর ওখানেই পড়াশোনা শুরু করে ইমা, কিন্তু মা মারা যাবার পর ব্যবসার কাজে দেশে ফিরতে হয় ওর বাবাকে, আর একমাত্র মেয়েকে চোখের আড়ালে রেখে উনি কোনোমতেই ফিরতে রাজি না। তাই ইমা ক্রেডিট ট্রান্সফার করে এই ভার্সিটির শেষ বর্ষে ভর্তি হলো। আর একেবারে আমার ডিপার্টমেন্টেই এসে পড়লো!
এমনও কি হয়?
গল্প-সিনেমায় হলেও একটা কথা ছিল। আমি ভাবতেও পারিনা ইমা আমার ক্লাসের একজন! অন্য সব মেয়ের থেকে ও একদম ভিন্ন। যেন অসংখ্য ঘাসফুলের মাঝে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো একটি সদ্য ফোটা লাল গোলাপ। ওর তাকানো, ওর কথাবার্তা, ওর চালচলন, পোশাক-আষাক সবকিছুতেই স্পষ্ট একটা রুচির ছাপ। বড়োলোকি উগ্রতা নেই, নেই মধ্যবিত্ত কুণ্ঠিত ভাব, আর গরিবির সাথে তো ওর তুলনাই চলে না। ও যখন কথা বলে তখন সবাই তাকিয়ে থাকে, ক্লাসের ছেলেরা তো বটেই, মেয়েরাও ওর নামে বাজে কথা বলতে ভয় পায়, সবাই যেন সমীহ করে চলে ওকে। কখনও এই ভার্সিটিতে ক্লাস করে নি, কিন্তু হঠাৎ এসেও সবার সাথে মিশে গেল দু’দিনেই। ক্লাসের সবচেয়ে প্রাণোচ্ছ্বল মানুষটি ইমা, ইমাকে ছাড়া এখন সি-সেকশন কল্পনাই করা যায় না। একদিন ক্লাসে আসেনি, ওমনি সবাই ওর জন্য অস্থির হয়ে গেল! এমনকি স্যাররা পর্যন্ত ওর খোঁজ করছিল। ইমা! কেমন একটা আবেশ ছড়িয়ে রাখে ওর চারপাশে, ফুলের মিষ্টি সুবাসের মতো, ও থাকলে আনন্দ, আর না থাকলে সেই শূন্যস্থান পূরণের কেউ থাকে না।
২৭ জানুয়ারি, ২০১২
এখনও ইমার সাথে সামনা-সামনি কোনো কথা হয় নি। কিন্তু ঐ দুটো চোখে চোখ পড়েছে। পাগলের মতো সেদিন সবকিছু ভুলে গেছি। ক্লাসের পড়া পারিনি, স্যারের রোল কলে সাড়া দেই নি, পরীক্ষার মাঝখানে খাতা দিয়ে বেরিয়ে গেছি। রাতে গায়ে জ্বর উঠেছে। উত্তেজনা থেকেই কি এমনটা হচ্ছে?
কোনো মেয়েকে এতো তীক্ষ্ণ আর গভীর দৃষ্টিতে তাকাতে দেখি নি। যেন একবার তাকিয়েই আমার ভেতরের সব খবর জেনে যাচ্ছিল ইমা!
ইমা! কোনো কথা হয়নি ঠিকই, তবু যেন চোখে চোখে একটা সেতুবন্ধন হয়ে গেল। যেন ইশারায় বলে দিল সেও আমাকে পছন্দ করে। ক্লাসের সব ছেলের আরাধ্য ইমা কি সত্যি আমাকে চায়? এ প্রশ্নের উত্তর আমায় কে দেবে! ওহ, আমি পাগল হয়ে যাব!
২৯ জানুয়ারি, ২০১২
আজকের দিনটি আমার স্মৃতিতে সেরা দিন হয়ে থাকবে। আজকে প্রথমবারের মত ইমার সাথে আমার কথা হয়েছে।
ইমার সাথে কীভাবে কথা বলব, কী বলব ভেবে পাচ্ছিলাম না। ছেবলা ছেলেদের মতো পিছে পিছে ঘুরে মেয়ে-পটানোতে আমি অভ্যস্ত নই। আর ইনিয়ে-বিনিয়ে চিঠি লেখার যুগও শেষ।
একদম হঠাৎ করেই একটা সুযোগ এসে গেল। কোনোদিন যা করিনি, অনিকের চাপাচাপিতে আজ তাই করলাম, দুজনে মিলে গেলাম জন্মদিনের দাওয়াতে। ক্লাসেরই কোন মেয়ের যেন জন্মদিন পার্টি। এসব পার্টিতে যোগ দেওয়ার প্রশ্নই আসে না, তাও আবার মেয়েদের বাসায় গিয়ে! কিন্তু মনে হচ্ছে যেন প্রকৃতি, পৃথিবী, স্রষ্টা সবাই চায় আমাদের দেখা হোক, কথা হোক, ভালোবাসা হোক। তাই অনিকের অনুরোধ আর ফেলতে পারলাম না। তখনও জানতাম না যে ইমাও সেখানে আসবে।
ক্লাসের পড়াশোনা পারি দেখে আমার একটা আলাদা দাপট আছে। সবাই বেশ ভাব করতে চায় আমার সাথে। কিন্তু পার্টিতে আমি একেবারেই আনাড়ি! এক কোণায় চুপচাপ বসে আছি, হঠাৎ একটা ডাক শুনে চমকে উঠলাম। ইমা!
- এই যে শুনছেন, এখানে একা বসে আছেন কেন?
- এইতো মানে .. কী বলব বুঝে না পেয়ে বিব্রত একটা হাসি দিলাম আমি! নিশ্চয়ই আমাকে খুব বোকার মত দেখাচ্ছিল!
ইমা বোধ হয় বুঝতে পারল। অন্য প্রসঙ্গে গিয়ে বলল, চলুন, বারান্দায় গিয়ে বসি, আশা করি আমার সঙ্গ খারাপ লাগবে না।
ইমার পেছন পেছন মন্ত্রমুগ্ধের মত হেঁটে বারান্দায় গেলাম। কত কথা হল ওর সাথে! যেন হাজার বছরের পরিচয়।
ইমা খুব মিশুক মেয়ে, একদিনের পরিচয়েই অবলীলায় নিজের কথা, নিজের পরিবারের কথা, ভালো-মন্দ সব দিকের কথা বলে দিল। ওদের এতো সম্পদ নিয়ে ওর কোনো বড়াই নেই, দেবীর মতো ঝলসানো রূপ কিন্তু সেই সুন্দর মুখে কোনো অহংকার নেই। আমিও গড়বড় করে অনেক কথাই বললাম। আমার গ্রামের পরিবারের কথা, ছোটো বোনের কথা, জীবন নিয়ে আমার পরিকল্পনার কথা।
আমি প্রেমে বিশ্বাসী না শুনে ইমা তো হেসেই খুন! বলে কিনা আমি নারীজাতিকে ভয় পাই। আসলে ভয় না, বললাম, আমার কাঁধের সব দায়িত্ব শেষ না করে কোনোভাবেই নতুন সম্পর্কে জড়াতে রাজি নই।
ইমা একথা শুনে অবাক মুগ্ধ দৃষ্টিতে আমার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে ছিল। এরপর মৃদুস্বরে বলল, আপনি সত্যি অন্যরকম, অনেক বেশি দায়িত্ববান।

(২)
সেই ছিল শুরু। ইমার সাথে এভাবেই তাহলে ইউসুফের দেখা হয়। ইমার কথা কখনই আমাকে কিছু বলে নি ইউসুফ। ঊনত্রিশ জানুয়ারির পর আরও আছে ওর অসংখ্য লেখা, সেখানে ইমার খুঁটিনাটি বিবরণ। পড়তে পড়তে মেয়েটাকে যেন চিনে ফেলেছি, এখন সামনে দেখলেই চিনে ফেলব।
জানুয়ারি থেকে শুরু করে প্রতি মাসেই পনেরো-বিশটা করে লেখা। মে মাস পর্যন্ত পড়তে পেরেছি। ইমার সাথে বন্ধুত্ব আরও গাঢ় হল, ওদের সম্পর্ক ‘আপনি’ থেকে ‘তুমি’তে নামল। ওরা প্রায়ই বাইরে ঘুরতে বেরোত। উপহার আদান-প্রদানও হত! ইমার দেওয়ার হাতই বেশি লম্বা ছিল বোঝা যায়। ইউসুফকে এক বসায় দশ সেট শার্ট কিনে দিত। কিন্তু ইউসুফকে খারাপ লাগতে দিত না, নার্সারি ঘুরতে গিয়ে সেখান থেকে ইউসুফের টাকায় নিজের জন্য হয়তো পাঁচটা গাছ কিনে নিত। দু’জন মিলে অ্যাডভেঞ্চারও কম করে নি! ঢাকার বাইরেও আরও অনেক জায়গায় গেছে দুইজন! বিয়ের আগেই এত কিছু!
পড়তে পড়তে আমি কখনও কাঁদছি, কখনও ইমার স্থানে নিজেকেই রেখে কল্পনা করছি। আমার সঙ্গে ঘোরার জন্য ইউসুফের এত সময় নেই। অথচ ও এতটা রোমান্টিক! এতটা অন্তরঙ্গ সম্পর্ক ছিল একটা মেয়ের সাথে!
কিন্তু কী হয়েছিল তারপর? কেন ইমার সাথে বিয়ে হল না? ইমা খুব বড়োলোকের মেয়ে বলেই কি ওর পরিবার রাজি হয় নি? খুব জানতে ইচ্ছা করছে। কিন্তু ইউসুফের আসার সময় হয়ে যাওয়ায় আজ আর পড়তে পারব না। আবার আগামীকালের অপেক্ষা! এই অপেক্ষার প্রহর বড্ড কঠিন লাগছে…।
খাবার টেবিলেও আজকে ইউসুফের সাথে কথা বলি নি। এমনকি ও বাসায় ঢুকে যখন সালাম দিল, আমার উত্তরটা দিতে খুব কষ্ট হয়েছিল। সাধারণত ঝগড়া হলেও সালাম-খাবার এসব নিয়ে আমি এমন করি না। সালাম দিলে উত্তর দিই, খাবার সময় এটা-সেটা এগিয়ে দিই। বলতে গেলে এভাবেই আমার রাগ অর্ধেকটা পড়ে যায়। কিন্তু আজ ইমার কথা পড়ে এত রাগ আর হিংসা হচ্ছে যে, কিছুই করতে মন টানছে না। থাকুক ও নিজের মতো। পুড়ে যাওয়া তরকারি দিয়েই ইউসুফ নিঃশব্দে খেয়ে গেল। কোনো অভিযোগ ও আমার রান্নার কখনোই করে না, আজও করল না। কিন্তু তবু আজ ওর প্রতি কোনো কৃতজ্ঞতাও এলো না আমার। যদিও বুঝতে পারছি, যা ঘটেছে বিয়ের আগেই সবকিছু। কিন্তু তারপরও একটা অবুঝ আক্রোশে আমার মন ক্রুদ্ধ হয়ে আছে। মনে হচ্ছে একটা লম্পট, ধোঁকাবাজের সাথে সংসার করছি।
রাতে শোওয়ার সময় ও আমার রাগ ভাঙাতে এসেছিল,
বউ, তোমার এতো অভিমান কেন?
এখনও কথা বলবে না?
আমি কোনো কথার জবাব দিই নি। কী জবাব দেব? আমার মন যে দাউদাউ করে জ্বলছে! ডায়েরি পুরোটা শেষ না করার আগ পর্যন্ত আমার অন্তরের আগুন বোধ হয় আর নিভবে না। সাড়াশব্দ না পেয়ে একসময় ও ঘুমিয়ে পড়লো। আর আমি বিছানায় ছটফট করে এদিক-ওদিক করতে লাগলাম।

(৩)
পরদিন ইউসুফ বাসা থেকে বের হওয়ার সাথে সাথেই আমি ডায়েরি নিয়ে বসেছি। পুরোটা আজ শেষ করেই ছাড়ব..।
১২ এপ্রিল ২০১২
ছয় মাসে কি একটা মানুষকে চেনা যায়? কিন্তু আমার মনে হয় ছয় মাস কেন, ইমাকে বুঝতে আমার তিন দিনও লাগেনি। এতো কাছাকাছি চলে এসেছি আমরা যে ইমা আমার জন্য সব করতে রাজি, সব ছাড়তে রাজি। মানুষ মানুষকে কতোটা ভালোবাসে, আদৌ ভালোবাসে কিনা জানা যায় তার ত্যাগ দেখে। ইমা এতো বড়োলোকের মেয়ে হয়েও আমার জন্য সেই জীবন ছাড়তে ওর বিন্দুমাত্র আপত্তি নেই। ওর বাবার সাথেও কয়েকবার আমার কথা বলে ফেলেছে।
খুব দুশ্চিন্তা হতো আমার ইমাকে নিয়ে। সামাজিক স্ট্যাটাসের দিক থেকে এত দূরত্ব আমাদের, কীভাবে বিয়ে হবে? কিন্তু ইমা আমাকে আশ্বস্ত করে বলে, সব হয়ে যাবে। ওর বাবার একমাত্র সন্তান ও, বাবা ওর কথা ফেলবেন না। ইমার কথায় আমি ভরসা খুঁজে পাই, কারণ জানি, ইমা বাজে কথা বলার মেয়ে না। ও যা বলবে তা করেই ছাড়বে।
ইমাকে যদি আমি ডাকি এক ডাকে ও আমার বিছানায় আসতে রাজি হবে। শরীর দেখানো মেয়ে ও না, কিন্তু আমার জন্য ও সব করতে পারে সেজন্যই আসবে। আমাকে স্বামী হিসেবেই ও মনে মনে মেনে নিয়েছে। কিন্তু এসব করতে আমার বিবেকে বাধে। সতীত্বের দাম নিশ্চয়ই আছে। আর ইমার দায়িত্ব না নিয়ে ওকে ভোগ করা স্বার্থপরতার শামিল।
তবু আজকের মতোই কত রাত ওকে একটু কাছে পাওয়ার জন্য ছটফট করি! এ কথা কী ইমা বোঝে? নিশ্চয়ই বোঝে।
২১ এপ্রিল ২০১২
গত কয়েকদিন লিখতে পারিনি। ডায়েরি লেখা আরম্ভ করার পর এই প্রথম এতদিন গ্যাপ গেল। প্রচণ্ড জ্বর এসেছিল। শরীর অবসন্ন, দুর্বল হতে হতে বিছানা থেকে নামার মত অবস্থাও ছিল না। হল থেকে বেরোতে পারিনা, তাই ইমার সাথেও দেখা হল না প্রায় দশ দিন! বাড়িতে সময়মত টাকা পাঠানো গেল না। একটা ক্লাসটেস্ট মিস হয়ে গেল।
খারাপের মধ্যে ভালো একটাই, একটা অসাধারণ ছেলের দেখা পেলাম! আমাদেরই ডিপার্টমেন্ট, কিন্তু অন্য সেকশনে পড়ায় আগে ওর সাথে তেমন আলাপ হয় নি। মাঝেমধ্যে পড়া বুঝতে ঘরে আসত, একসাথে কয়েকজনের সাথে আসত বলে আলাদা করে কথা হয় নি। শুধু নামটা জানি--রেহান। পরিচয় বলতে এতটুকুই। কিন্তু আমার শরীর খারাপ শুনে ‘ইউসুফ ভাই, ইউসুফ ভাই’ করে দৌড়ে এসেছে! কিছু মানুষের আন্তরিকতা একদম ভেতর থেকে আসে বোঝা যায়। এই ছেলেরও তেমন। ঠিকমতো ওর নামটাও আমার মনে ছিল না, অথচ কী সেবাটাই না করল আমার।
দিনে-রাতে আমার খোঁজখবর নেওয়া, নিজের পকেটের টাকা খরচ করে ওষুধ-পত্র কেনা, খাবার-দাবার ঠিকমত খাচ্ছি কিনা সেদিকে নজর রাখা। এক ঝুরি ফলও কিনে মাথার কাছে টেবিলটায় রেখে দিয়েছিল, যদি কিছু খেতে ইচ্ছা করে! অথচ রেহানও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে আসা, হাতখরচ নিয়ে টানাটানি। তবু কত করল! আসলে মানুষের মনটাই ব্যাপার। এই ছেলের হাতে টাকা থাকলে আরও করত। যা করেছে সেটাই কজনা করে! সুস্থ হওয়ার পর ওর চেহারায় যে হাসিটা ছিল, একদম অকৃত্রিম! সেদিনই বাইরে নিয়ে আমাকে বিরানি খাওয়াল, জোর করে দুজনের বিল মেটাল। এরপর হাত ধরে বলল, ভাই, আমাদের একটা আড্ডায় আসেন, দ্বীন ইসলামের কথাবার্তা হয়, আপনি আসলে খুব খুশি হব।
ধর্মীয় দিকটা নিয়ে আমি কখনও ভাবার তেমন সুযোগ পাই নি। সে অবসরই হয়নি আমার। কিন্তু রেহানের কথাটা ফেলতে পারলাম না, তাই বললাম যাব।
কিন্তু যাব বলেও বিপাকে পড়েছি। এই ধরণের আড্ডায় কখনও যাই নি, যেতে মোটেও ইচ্ছা হচ্ছে না। এখন আবার অজুহাত খুঁজতে হবে, কেন যাই নি। ভাবছি আগামী কয়েকদিন রেহানকে একটু এড়িয়ে চলতে হবে। কেন যে অনুরোধে ঢেঁকি গিলতে যাই! ভদ্রভাবে বলে দিলেই পারতাম, ভাই এসবে আমার আগ্রহ নেই। এরচেয়ে একটা বিকাল ইমার সাথে কাটানোও অনেক চমৎকার! আহ, কতদিন ইমার মুখটা দেখিনা! পাখির নীড়ের মতো সেই দুটো চোখ…
২২ এপ্রিল ২০১২
ঠিক দশদিন পর আজ ইমার সাথে দেখা। আমার জ্বরে-ভুগে-ওঠা ফ্যাকাসে চেহারার চেয়েও ওর মুখটা বেশি ফ্যাকাসে হয়ে ছিল। গত দশদিন যে ওর নাওয়া-খাওয়া-ঘুম কোনোটাই হয় নি, সেটা ও না বললেও বুঝতে পারছিলাম। এত মায়া লাগে ইমার জন্য! ইশ! আমি কি এত ভালোবাসার যোগ্য?
আমার কাঁধে মাথা রেখে কাঁদো কাঁদো গলায় ইমা আমাকে আজ বললো,
কথা দাও, আমাকে ছেড়ে তুমি কোথাও যাবে না।
- কথা দিলাম।
২৩ এপ্রিল ২০১২
কথা গুছিয়ে লিখতে আজ বেগ পেতে হবে। খুব উদভ্রান্ত হয়ে আছি আজ। অস্থিরতা কাজ করছে।
শনিবার বিকেলে ইমার সাথে দেখা করে এসে রুমে ঢুকেই দেখি রেহান এসে হাজির, সে আমাকে আড্ডায় নিয়ে যেতে এসেছে! আমি তো হতভম্ব! এগুলোকে এতো সিরিয়াসলি নেয় কেউ! ওকে মুখে যাব বললেও যাওয়ার ইচ্ছা আমার মোটেও ছিল না বলাই বাহুল্য। কিন্তু ঘর থেকে কাউকে বের করে তো দিতে পারিনা। অগত্যা যেতে হল।
নবী ইউসুফকে নিয়ে আলোচনা।
নবী ইউসুফের বাবাও নাকি নবী ছিলেন, জানতাম না আগে। ইউসুফ ছোটোবেলাতেই স্বপ্ন দেখলেন, স্বপ্ন শুনে বাবা বুঝলেন ইউসুফ একজন নবী হবেন। এই ছেলেই ছিল সব সন্তানের মধ্যে তাঁর চোখের মণি। ভাইয়ের প্রতি বাবার এই অতিরিক্ত ভালোবাসা অন্য ভাইদের সহ্য হল না। তারা বুদ্ধি আঁটল, ধাক্কা মেরে ফেলে দিল ইউসুফকে অন্ধকার কুয়ার মধ্যে। একাকী ইউসুফকে উদ্ধার করল পথের একদল যাত্রী। এরপর সে বিক্রি হয়ে গেল সুদূর মিসরে এক রাজার কাছে।
গল্পের মতো কাহিনি! আগে কখনও শুনি নি! নবী ইউসুফের সাথে জুলেখা বিবির প্রেমের গান শুনেছিলাম। ওরা বললো, এসব নাকি মিথ্যা কথা। নবীদের কেউ এমন অবৈধ প্রেম করেন নি। এমনকি জুলেখা নামটাও কুরআনে নেই! মন্ত্রী আযিযের স্ত্রী ইউসুফকে নানাভাবে প্রলুব্ধ করে, অবৈধ সম্পর্কের জন্য জোর-জবরদস্তি করতে থাকে। সুন্দরী নারী, মোহনীয় ডাক, কিন্তু নবী ইউসুফ! নিজেকে বাঁচাতে, নিজেকে চরিত্রকে পবিত্র রাখতে, এই অগ্নিপরীক্ষা থেকে দূরে থাকতে কারাগারে যাওয়ার জন্য দু’আ চায়!
এরপর কয়েক বছরের কারাবাস শেষে ফিরে এসে রাজ্যের উঁচু পদে যোগ দেয়। শেষ পর্যন্ত মিল হয় তার পরিবারের সাথে, তার ভাই আর বাবার সাথে। ভাইদেরকে তিনি মাফ করে দেন।
কাহিনি শেষ করেও অনেকক্ষণ পর্যন্ত আলোচনা চলল। আরও কয়েকজন সিনিয়র আর জুনিয়র ছাত্রও এসেছিল। প্রেম করা মারাত্মক গুনাহ--এটা নিয়েই প্রায় চল্লিশ মিনিট মতো কথা বলল। আমি খুব সংকুচিত বোধ করছিলাম। মনে হচ্ছিল যেন আমাকে উদ্দেশ্য করেই এসব বলা! অথচ ওরা কেউই ইমার কথা জানে না, জানার কথা নয়। ক্লাসের ছেলেরা ইমার জন্য আমাকে ঈর্ষা করে, কেউ কেউ তো বলেই বসে, দোস্ত, তোর ভাগ্যটা সেইরকম ভালো! শুনে মনে মনে আমার খুব গর্ব হয়! নিজেকে রাজা-রাজা মনে হয়। এটা সত্যি, ইমাকে পাওয়া মানে সত্যি সত্যিই রাজকন্যা আর রাজত্ব একসাথে পাওয়া। ইমারা প্রচণ্ড বড়োলোক, ওর বাবার জন্য যোগ্যতাসম্পন্ন কোনো ছেলের ভাগ্য রাতারাতি বদলে ফেলা দু’মিনিটের কাজ।
অথচ এই কয়টা ছেলের কথা শুনে মনে হচ্ছে ওরা ইমার কথা জানতে পারলে আমাকে খুব খারাপ ভাববে। একজন একটা হাদীস বললো, পরনারীর গায়ে স্পর্শ করার চাইতে নাকি লোহার পেরেক দিয়ে কপালে ফুটো হয়ে যাওয়া বেশি ভালো! শুনেই আমি কুঁকড়ে-মুকড়ে গেলাম।
মনের মধ্যে একটা প্রশ্ন এসেছিল, সঙ্কোচে সবার সামনে শেষপর্যন্ত আর জিজ্ঞেস করতে পারলাম না, প্রেম করা কি এতই খারাপ?
২৫ এপ্রিল ২০১২
সকালে ওঠার পর অস্থির ভাবটা দূর হয়ে গেল। মনটা হালকা খচখচ করছিল, ক্লাস শেষে ইমার সাথে আলাদা করে দেখা করলাম। ওর হাতে হাত রাখলেই আমার রাজ্যের চিন্তা দূর হয়ে যায়। ইমাকে শোনালাম নবী ইউসুফের কাহিনি, ও আগ্রহ নিয়ে শুনল। এরপর এ কথা-সে কথা করে আমরা দুজনেই অনেক কথা বললাম। খচখচে বোধটা কখন উধাও হয়ে গেল টেরই পেলাম না।

(৪)
- কী হল দরজা খুললে না যে? আওয়াজ শোনো নি?
পড়তে পড়তে ডায়েরির মধ্যে এতো ডুবে গিয়েছিলাম যে দরজার খটখট শব্দ কানে আসে নি। ইউসুফের গলায় চমকে চোখ বড়ো বড়ো করে ওর দিকে তাকালাম!
- তুমি! এখন?
বেলা মাত্র বারোটা বাজে, এমন অসময়ে ইউসুফকে বাসায় আসতে দেখে আমি এতো আশ্চর্য হলাম যে এটাও ভুলে গেছি ওর সাথে আমার কথা বন্ধ! সম্বিৎ ফিরে পেতে খানিকক্ষণ লাগল আমার। এরপর জিজ্ঞেস করলাম,
- এত জলদি কীভাবে আসা হল? চাবি দিয়ে লক খুললে যে? নক করতে পারো নি?
- শরীর খারাপ লাগছিল, তাই আগেভাগেই চলে এলাম। কারেন্ট নেই দেখে কলিং বেল শোনো নি, দরজায় নক করেও কেউ খুললো না, তাই .. কিন্তু তোমার হাতে এটা কি! আরে আমার পুরোনো ডায়েরি! এটা তুমি কোথায় পেলে?
- তুমি যেখানে রেখেছিলে সেখানেই নিশ্চয়ই। আর কতো কাহিনি আছে তোমার জীবনে?
আমার হাতে খোলা ডায়েরি দেখে ইউসুফের মুখ থমথমে গম্ভীর হয়ে গেল। ও অসুস্থ হয়ে বাসায় ফিরেছে সে কথা আমার খেয়াল থাকল না, রাগে অন্ধ হয়ে ছিলাম আগে থেকেই, তার ওপর ওর কাছে ডায়েরিসহ এভাবে ধরা পড়ে যাওয়ায় অনেকটা আত্মরক্ষার জন্যই হয়তো আমি আজেবাজে সব কথা বলে ওকে আক্রমণ করতে থাকলাম। ও চুপ করে সব শুনল। এরপর বলল, তোমার যদি আমাকে নিয়ে সন্দেহ থাকে, তাহলে পড়ো, পুরো ডায়েরিটাই পড়ো। তারপর কথা হবে।
আমি ডায়েরি হাতে গটগট করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলাম। বিছানাপত্র সকাল থেকে অগোছালো হয়ে আছে, তাতে কি! আমি শুধু জানি, আমাকে এই কাহিনির শেষ জানতে হবে।
ড্রয়িং রুমে বসে আবার পড়া শুরু করলাম।
এখন আর লুকিয়ে পড়ার ভয় নেই। কিন্তু পাতার পর পাতা পড়ার ধৈর্য্যও হারিয়ে ফেলেছি! রাগে তখন আমার শরীর কাঁপছে। একসাথে কয়েক পাতা উল্টাচ্ছি, এর শেষ আমার জানাই লাগবে! যত দ্রুত সম্ভব! পড়তে পড়তেই বুঝলাম বড়ো ভুল হয়ে গেছে..
২৯ মে ২০১২
প্রথমদিন যখন রেহানদের আড্ডায় গিয়েছিলাম তেমন ভালো লাগে নি। বিরক্তি, দ্বিধা, সংকোচ, অস্বস্তি সব মিলিয়ে একটা মিশ্র অনুভূতি কাজ করছিল। ইউসুফ আলাইহিস সালামের ঘটনা শুনে মনটা কেমন খচখচ করছিল, কিন্তু কারণটা ধরতে পারছিলাম না।
কারণটা আমি এখন ধরতে পেরেছি। নিজেকে মুসলিম দাবি করে আসা এই আমি এতদিন ইসলাম নিয়ে একটুও চিন্তা করি নি। নবীজি (সা) কে বিশ্বাস করি বলেছি মুখে মুখে, কিন্তু উনার সম্পর্কে তেমন কিছুই জানতাম না, উনার শিক্ষা মেনে চলা তো দূরের কথা! প্রেম নিয়ে আল্লাহর আদেশ আমার কাজের ঠিক বিপরীত। এটাই মানতে কষ্ট হচ্ছিল। কিন্তু রেহানের সাথে আরও আলাপের পর বুঝতে পারছি আমার এতদিনের ধ্যানধারণাগুলোতেই ভুল ছিল। বিয়ের বাইরে প্রেম আসলেই গোলমেলে ব্যাপার। সবচেয়ে বড়ো কথা--আল্লাহ আর রাসূলুল্লাহ যা বলেছেন, তা একজন মুসলিম হিসেবে আমাদের মানতে হবে। মেনে চলার মধ্যেই আমাদের জন্য কল্যাণ নিহিত।
১৩ জুন ২০১২
আজ রেহানের সাথে অনেক রাত পর্যন্ত আলোচনা করলাম। মূলত আখিরাত, জান্নাত-জাহান্নাম এগুলো নিয়েই। আমার খুব ভয়-ভয় করছে। অন্ধকার বা ভূতের ভয় না, এটা একটা অন্যরকম ভয়! জান্নাত হারানোর ভয়, শাস্তি পাবার ভয়।
আখিরাতটা এই জীবনের তুলনায় বিশাল, অনেক বিশাল! সেই আখিরাতে যদি আমি ব্যর্থ হই, তাহলে এই মুহূর্তের জীবনের লাভ-খ্যাতি-টাকাপয়সা-ভালোবাসা কোনো কাজেই আসবে না। ব্যর্থদের দলে যুক্ত হয়ে যাব চিরদিনের জন্য। জাহান্নামের আগুনে পটপট করে আমার হাড্ডি-মাংস-চামড়া পুড়বে, ফুটবে। কিন্তু কেউ এগিয়ে আসবে না। কোথায় থাকবে সেদিন বাবা-মা-ভাইবোন সবাই! কোথায় থাকবে সেদিন ইমা! ইমা কি আমাকে বাঁচাতে পারবে?
নাহ, আল্লাহর বিচারের সামনে সবাই তুচ্ছ।
৩০ জুন ২০১২
ইমার সাথে আপাতত সম্পর্ক না রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এই সিদ্ধান্তে আসতে আমার অনেক সময় লেগেছে। ওকে কিছুতেই বোঝাতে পারছি না কেন আমি এরকম প্রেম করতে চাই না!
ইমা! আমি কিছু বলার আগেই যে আমাকে বুঝে ফেলত, সেই ইমা আমাকে এখন কেন বুঝতে চাইছে না?
ওকে এড়িয়ে চলা আমার পক্ষে সম্ভব না! হে আল্লাহ! তুমিই আমার জন্য সহজ করে দাও!
৪ জুলাই ২০১২
ইমাকে ছাড়া থাকা আমার জন্যেও কী যে কঠিন! বিয়ের কথা এই মুহূর্তে চিন্তা করা মোটেই মানায় না, কিন্তু ইমাকে ছেড়ে থাকাও অসম্ভব। প্রেম করব না-করব না বলেও প্রায়ই কথা হচ্ছে আমাদের। ইমাও মরিয়া হয়ে উঠেছে। আমার সাথে যেন কথা বলেই ছাড়বে! ওকে উপেক্ষা করা আমার জন্য দুঃসাধ্য ব্যাপার। সেদিনও ক্লাসের মাঝে খপ করে আমার হাত ধরেছে, মেসেজের পর মেসেজ, ফোনের পর ফোন তো আছেই। এভাবে চলতে থাকলে আমি নিজেকে কতদিন সামলে রাখতে পারব! বিয়ের পর সংসার কোনো না কোনো একভাবে চলেই যাবে, লাগলে ছোটো কোনো চাকরি করব, কিন্তু বিয়ে করাই এখন নিজেকে এই ফিতনা থেকে বাঁচানোর একমাত্র পথ।
বিয়ের মাধ্যমে মানুষের রিযিক বেড়ে যায়, এটা তো আল্লাহর ওয়াদা। তাহলে আমি ওকে খাওয়ানো-পরানোর ভয় কেন পাচ্ছি? ও বড়োলোকের মেয়ে বলেই কি! কিন্তু ও তো কখনো আমার কাছে অনেক জিনিসের দাবি করে নি। ছোটোখাটো একটা বাসা নিলেই আমাদের চলে যাবে, আর পড়াশোনা নাহয় নিজে নিজেই করব। আর বেশিদিন বাকিও নেই ফাইনাল পরীক্ষার। এর পরেই বিয়েটা সেরে নিলে কেমন হয়?
২৭ জুলাই ২০১২
ইমাকে আজ আমি বিয়ের কথা বলেছি। ও বিয়েতে রাজি! আলহামদুলিল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ!! আমি জানতাম ও রাজি হবেই। আমার জন্য সব করতে পারে আমার ইমা, আমার আদুরে পাখি ইমা। আজ যে আমি কী খুশি লিখে বোঝানো যাবে না। ইচ্ছা করছে দুনিয়ার সবাইকে জড়িয়ে ধরে কোলাকুলি করি। চিৎকার করে জানাই--ইমা আমার! আমরা বিয়ে করছি!
রেহান আমাদের বিয়ের সিদ্ধান্তের কথা শুনে খুব খুশি হয়েছে। আমি নিশ্চিত আমার বাবা-মায়েরও অমত হবে না। ইমার বাবাও আমার কথা জানে, তারও নাকি তেমন অমত নেই আমার ব্যাপারে।
আমার আর ইমার বিয়ে হলে এই ডিপার্টমেন্ট থেকে এটাই হবে প্রথম বিয়ে!
১৮ আগস্ট ২০১২
ইমার সাথে বিয়েটা মনে হয় না হবে। বিয়ের ব্যাপারটা সহজে মেনে নিলেও ইমা কিছুতেই নিজেকে পরিবর্তন করছে না। ওকে আমি নামাজ আর হিজাবটা অন্তত করতে বলেছিলাম, কিছু বই লেকচারও দিয়েছি। কিন্তু ওর মধ্যে কোনো বদল নেই। আগের মতোই হৈ-হুল্লোড়, সবার সাথে আড্ডা। এমনকি ক্লাসের ছেলেদের সাথেও সেই একই রকম কথা-হাসি-তামাশা। ইদানিং এগুলো সহ্য করা খুব কঠিন লাগে। আমি বহু কষ্টে নিজেকে সামলে রাখি, ইমার সাথে কোনো রাগারাগি করি না। ইসলামকে বুঝতে আমারই তো কতদিন লেগেছে! ইমাকেও সময় দেওয়া দরকার। যেন ও ইসলামের অর্থ বুঝতে পারে।
ইমা না বদলালে আমাদের বিয়ে হলেও টেকার কোনো সম্ভাবনা নেই। ছেলেদের সাথে এভাবে গায়ে পড়ে মেশা, সবাই মিলে হ্যাং-আউট করা, পার্টিতে যাওয়া--এগুলো আমি কিছুতেই মেনে নিতে পারব না। এগুলো মেনে নিলে আমার নিজেরও গুনাহ হবে, আল্লাহর কথার অবাধ্য হতে হবে। আর যে মেয়ে এখন পর্যন্ত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে না, সে ভবিষ্যতে আমাদের সন্তানদের কী শিক্ষা দেবে?
মাঝে মাঝে মনে হয়, এভাবেই ইমাকে বিয়ে করে নিই। হয়তো ও আস্তে আস্তে বদলাবে। কিন্তু বিয়ের আগে এত বলার পরেও যাকে বদলাতে পারছি না, বিয়ের পর তাকে আমি কীভাবে বদলাব! হেদায়েতের মালিক তো আল্লাহ! আমাদের কাউকে বদলে ফেলার কোনো ক্ষমতাই নেই।
১১ সেপ্টেম্বর ২০১২
একই ক্লাসে প্রতিদিন আসি, অথচ ইমার সাথে কথা হয় না অনেকদিন! শুধু দূর থেকে দেখি। তবুও একবার চোখ পড়লেই চোখ নামিয়ে নিই। উহ! কী যে কঠিন নিজের নজরকে হেফাজতে রাখা! বিশেষ করে ইমার সাথে! ইমার চোখে চোখ পড়া মানে বড়শিতে গেঁথে যাওয়া মাছ। যার দিকে একবার ইমা ইশারা করে, সে কখনও সেই দৃষ্টি উপেক্ষা করতে পারে না। মোহনীয় ওর দৃষ্টি, মাতাল করে দেওয়া ওর চোখের ডাক!
আমিও অবশ্য ওর সাথে যোগাযোগ করি, তবে তা কালেভদ্রে। মাঝে মাঝেই ওকে ভালো লেখা পেলে মেসেজ করি, ইসলামি বই পাঠাই, কয়েকজন দ্বীনী বোনের সাথে পরিচিত হতেও বলেছিলাম। বোনগুলোকে আমি চিনিনা, রেহান বললো ওরা নাকি ইসলাম মেনে চলে। ওদের সাথে হয়তো ইমার কথা হয়! কে জানে! আজকে ইমার দিকে একবার চোখ পড়েছিল, দেখলাম ও স্কার্ফ পরা। কী যে খুশি লাগছে! ইমা কি তাহলে ইসলামের পথে পা বাড়িয়েছে?
হে আল্লাহ, তুমি ইমাকে ইসলামের জ্ঞান আর হেদায়েত দান করো! আমি এটাই চাই..।
৫ নভেম্বর ২০১২
কিছু সত্য এত ভয়ংকর কেন? মনে হয় যেন না জানলেই ভালো হতো। অনিকের সাথে কথা বলতে গিয়ে ভয়াবহ ব্যাপার জানতে পারলাম। ইমা নাকি আমাকে বিয়ে করার জন্যই এখন স্কার্ফ ধরেছে! অথচ গতকালই ফোন করে অনেক কান্নাকাটি করে আমাকে বললো, ও নাকি বদলে গেছে! ইসলামের পথে পা বাড়িয়েছে!
আসলে ইমা কখনও “না” শুনে অভ্যস্ত না। বড়োলোকের মেয়ে, ছোটোবেলা থেকে যা চেয়েছে তাই পেয়েছে। আমি এখন ওর কাছে একটা চ্যালেঞ্জ! আমাকে ওর পাওয়া চাই। তার জন্য ও সবকিছুই করতে রাজি। ও কেন বুঝতে চাইছে না যে আমি বদলে গেছি! আল্লাহকে খুশি করলেই আমি খুশি হই। ও যদি সত্যি ইসলামের দিকে মনোযোগী হতো, তাহলে আমি নির্দ্বিধায় ওকে বিয়ে করতাম। কিন্তু খেলার ছলে ও ইসলামকে নিয়ে যা করছে, তার জন্য ওর প্রতি আমার সম্মান দিনে দিনে কমে যাচ্ছে। ইসলাম নিয়ে মিথ্যে অভিনয় করার কোনো সার্থকতা নেই। এভাবে ইমা আমাকে কোনোদিনও পাবে না।
২১ নভেম্বর ২০১২
ইমা স্কার্ফ ছেড়ে দিয়েছে। হেদায়েত ব্যাপারটা নিয়ে বেশিদিন অভিনয় করা যায় না। ইদানিং ও আগের চাইতেও অনেক বেশি উগ্র পোশাক পরে আসে। হয়তো আমাকে ভোলানোর জন্য এটাও ওর একটা কৌশল! প্রায়ই অচেনা নাম্বার থেকে ফোন দেয়। মাঝে মাঝে টেক্সট করে বলে খুব জরুরি কথা আছে, কিন্তু ফোন ধরে দেখেছি কথা আর শেষ হয় না, জরুরি কথার অজুহাতে এমন সব কথা হতে থাকে, যা শুধু স্বামী-স্ত্রীর মাঝেই মানানসই। মিথ্যা বলব না, মাঝরাতে এত একাকী লাগে! ওর ফোন পেলে মনে হয়, ধরি। একটু গলার স্বর শুনি। কোনো কথা বলব না।
কিন্তু আমি জানি, একবার পা ফসকালে আমি পিছলে নিচে পড়তেই থাকব, পড়তেই থাকব। আমাকে টেনে তোলার কেউ থাকবে না। ইউসুফ আলাইহিস সালামের কাহিনিটা ইদানিং খুব মনে পড়ে। উনিও ইউসুফ ছিলেন, আর আমিও এক ইউসুফ! কত পার্থক্য আমাদের। উনি নারীর ফিতনা থেকে বাঁচতে কারাগারে চলে গিয়েছিলেন, আর আমি জীবনে কত ভুল করেছি, করেই চলেছি!
তবু যেন উনার জীবনের সাথে একটা সূক্ষ্ম মিল খুঁজে পাই। ইমার জন্য তীব্র টান থাকা সত্ত্বেও ওকে এড়িয়ে চলা, ওর ঝলসানো রুপ, নজরকাড়া চোখ আর অঢেল সম্পদের লোভ থেকে নিজেকে বেঁধে রাখা, বন্ধুবান্ধব সবার চাপাচাপিকে উপেক্ষা করে, ওদের সবরকম খোঁটা সহ্য করেও প্রতিদিন শক্ত থাকার চেষ্টা করা-- এই সবকিছুর জন্য আমি এই মানুষটার কাছ থেকেই প্রেরণা পাই। সায়্যিদিনা ইউসুফ যদি প্রচণ্ড চাপের মুখেও আযিযের স্ত্রী’র আহবান প্রত্যাখ্যান করতে পারেন, আমি সামান্য প্রেমের আহবান উপেক্ষা করতে পারব না?
৩০ নভেম্বর ২০১২
ভাবতেও পারিনি এমন হবে! চরম দুঃস্বপ্নেও ভাবিনি! আজ আমার দুঃখের দিন…
আজ সকাল থেকেই ইমার জন্য মনটা খুব আনচান করছিল। ক্লাসে গিয়ে দেখি ইমাকে অপ্সরীর মতো সুন্দর লাগছে। এত ভয়াবহ সুন্দর তার সাজ যে না তাকিয়ে উপায় নেই! ঠোঁটে কড়া লাল রং, ফর্সা গালে গোলাপি আভা টকটক করছে। কামিজটাও কেমন যেন খুবই আকর্ষণীয়। আমি মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছি। ইমা আমার দিকে তাকিয়ে ইশারা দিল ক্লাসের বাইরে যাবার। কি মনে করে আমিও চট করে বাইরে চলে গেলাম। আজ স্যার আসেন নি, তাই ক্লাস হচ্ছিল না। ইমা বের হয়েই আমাকে টানতে টানতে নিয়ে গেল…
আজ সর্বনাশ হতে পারত। নফসের তাড়নায় আমিও ভুলের পথে পা বাড়িয়েই দিয়েছিলাম, খুব দুর্বল হয়ে গিয়েছিলাম, শয়তানের ওয়াসওয়াসায় ভুলতে বসেছিলাম আমার এতদিনের পরিশ্রম! কিন্তু আল্লাহর অশেষ রহমত, আমি নিজেকে তা থেকে বের করে আনতে পেরেছি। যে ভয় আমার নিজেকে নিয়ে ছিল, আল্লাহ আমাকে সেখান থেকে রক্ষা করেছেন!
আমি নিজেকে গুটিয়ে নিলে ইমা খুব ক্রুদ্ধ হয়ে ওঠে। অনেক কান্নাকাটি করে। ইমা চেয়েছিল আমি যেন ওর রূপের কাছে হার মানি, এরপর বিয়ে করতে বাধ্য হই। নাছোড়বান্দা ইমা। কিন্তু না, আমার পক্ষে ইমাকে এভাবে গ্রহণ করা সম্ভব না। নবী ইউসুফ পেরেছিলেন, আল্লাহ আমাকেও সাহায্য করেছেন। আজ একটা সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হলাম- ইমার সাথে একই ক্লাসে থেকে ফিতনায় জড়ানোর চাইতে বরং পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়াই আমার জন্য উত্তম হবে।
০৭ মার্চ ২০১৩
অনেক কষ্ট করে নিজে নিজে পড়েই পরীক্ষা দিলাম। পরীক্ষার আগের খুব জরুরি সব ক্লাসই মিস দিয়েছি। ইমার কথা ভেবে, নিজের কথা ভেবে নিজেকে দূরে রাখাই শ্রেয় মনে হয়েছিল। আলহামদুলিল্লাহ রেজাল্ট বরাবরের মতোই ভালো এসেছে। আল্লাহর কথা ভেবে কিছু ছাড়লে আল্লাহ তারচাইতেও উত্তম কিছু মানুষকে দেবেনই। গত সপ্তাহে চাকরির জন্য কয়েকটা ইন্টারভিউ দিয়েছি। যে ফলাফল এসেছে, তাতে আশা করি চাকরি আটকাবে না ইনশা আল্লাহ।
কিন্তু ইমার সাথে সুন্দর একটা সংসারের স্বপ্ন ছিল, সেটা বোধ হয় আর হবে না। ইমা আজকাল আরেকটা ছেলের সাথে ঘোরে, কদিনেই বেশ অন্তরঙ্গতা হয়ে গেছে মনে হয়। কষ্ট লাগে, খুব কষ্ট লাগে। আমার ইমা আর আমার নেই! মাঝে মাঝে রাগে অন্ধ হয়ে গিয়ে প্রশ্ন করতে ইচ্ছা করে, তাহলে কেন এতদিন আমার সাথে ছিলে? কেন আমাকে পাওয়ার জন্য এত্তো মরিয়া হয়ে আমার জীবনটা কঠিন করে দিলে? কীভাবে পারলে এত সহজে আরেকজনের সাথে সম্পর্ক করতে?
কিন্তু করা হয় না। বেশি খারাপ লাগলে রেহানের রুমে চলে যাই, গভীর রাত পর্যন্ত কথা হয়। ইমার কথা, দ্বীনের কথা, আখিরাতের কথা। তখন একরকম খুশিও হই। ইমা আমার ছিলই বা কবে! আমার জন্য ইমা না। আমি ইমাকে আল্লাহর জন্য ত্যাগ করেছি, নিশ্চয়ই আল্লাহ এর বিনিময়ে উত্তম কাউকেই আমার জন্য রেখেছেন যে শুধু এই জীবনে না, ওপারের জীবনেও আমার স্ত্রী হবে। আমার জান্নাতী স্ত্রী! আমি মনেপ্রাণে তার জন্যে অপেক্ষা করে আছি..।
“হে আমাদের রব, আপনি আমাদেরকে এমন স্ত্রী ও সন্তানসন্ততি দান করুন যারা আমাদের চোখ জুড়িয়ে দেবে। আর আপনি আমাদেরকে মুত্তাকীদের জন্য আদর্শ বানিয়ে দিন।” [সূরা ফুরক্বান: আয়াত ৭৪]

(৫)
একনাগাড়ে এতটুকু পড়ে আমি উঠে দাঁড়ালাম। চোখ পানিতে ভিজে গেছে। মনে অপরাধবোধ কাজ করছে। ইউসুফ কেন আমাকে এসব কথা বলে নি এখন বুঝতে পারছি। অতীতের গুনাহর কথা জানিয়ে অবিশ্বাস আর সন্দেহ সৃষ্টি করা ছাড়া তো কোনো লাভ নেই। তাছাড়া ও ওই জীবনকে অনেক আগেই পেছনে ফেলে এসেছে। এখন ও শুধু আমাকেই ভালোবাসে।
নিজের হাতে ডায়েরির পাতাগুলো ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করলাম, এরপর আগুন ধরিয়ে দিলাম। অতীতের গুনাহর সাক্ষী রাখার কোনো মানে নেই। কাগজগুলোয় লকলক করে আগুনের শিখারা জ্বলছে-- পুড়ে যাক সব কাগজ, পুড়ে যাক বীভৎস সব স্মৃতি।
ঘরে ঢুকে দেখি ইউসুফ অগোছালো বিছানাতেই ঘুমিয়ে পড়েছে। কী নিষ্পাপ মায়াময় একটা চেহারা! মাথার নিচের বালিশটা ভেজা, আমি কেঁদেছি, সেও কেঁদেছে। কী পরিমাণ সংগ্রামই না করেছে মানুষটা আল্লাহর পথে চলার জন্য! যুবতী নারীর ডাকে সাড়া না দেওয়া একজন পুরুষের পক্ষে প্রায় অসম্ভব ব্যাপার! সেই সাথে বন্ধুবান্ধবের জোরাজুরি, পিয়ার-প্রেশার, অঢেল সম্পদের মোহ ত্যাগ করা! এরপর ভালোবাসার মানুষকে পর হয়ে যেতে দেখা! সেটাও কী সম্ভব! কত রাগ ছিল আমার মনে, কত প্রশ্ন, কত কৌতূহল। ঠিক করলাম সেসব কিছু প্রকাশ করে এই ভাঙা অন্তরটাকে আর বিব্রত করব না। আল্লাহ তা’আলা এই মানুষটার ত্যাগের বিনিময়ে আমাকে স্ত্রী হিসেবে পাঠিয়েছেন, যেন আমি মানুষটার মনের যত্ন নিই। আল্লাহ তা’আলা আমাকে এই সংগ্রামী মানুষটার যোগ্য ভেবেছেন, কী করে তাকে কষ্ট দিই! অনেক মমতায় ঘুমন্ত মানুষটার মাথা বুকে জড়িয়ে ধরলাম।
এত মমতা বোধ হয় শুধু স্বামী-স্ত্রী’র মাঝেই সম্ভব। একমাত্র আল্লাহই পারেন স্বামী-স্ত্রী’ র মাঝে এই গভীর ভালোবাসা ঢেলে দিতে.

Wednesday, November 9, 2016

Collected - আমার স্বামীর ডায়েরি

(১)
সকাল থেকে মন ভালো লাগছে না, ইউসুফের সাথে আজ ঝগড়া হয়েছে। ঝগড়া হলেও ছেলেরা কী সুন্দর কাজেকর্মে লেগে যায়! অথচ আমার তো কিছুতেই মন বসে না। অবাক লাগে! একটা মানুষ কীভাবে এতো ঝটপট সব ভুলে কাজে লেগে যায়। ওর তো ঝগড়া করেও কোনো ক্ষতি নেই, কী চমৎকার গটগট করে অফিসে চলে গেল। এদিক আমার বারোটা বাজে, রান্নায় মন বসল না, বান্ধবী ঘুরতে যাওয়ার জন্য ডাকল তাও যেতে ইচ্ছা হল না, চুলার রান্নাটা অন্যমনস্কতায় পুড়ে ছাই হল। কিন্তু কাজের কাজ একটা হয়েছে বৈকি! রাগ ভুলতে ঘর গোছাতে শুরু করেছিলাম, অনেকদিনের পুরোনো ড্রয়ারটা দেখে ভাবলাম গুছাই। কখনও এটায় হাত দেওয়া হয় না। ভেতরে রাজ্যের ফেলনা জিনিস, মাকড়সার জাল, আর ধুলোময়লা জমে টাল পড়ে আছে। গোছাতে গিয়ে ড্রয়ারের মধ্যে একটা ডায়েরি পেয়ে গেলাম--ইউসুফের ডায়েরি! বাহ! ইউসুফ ডায়েরি লেখে কখনও বলেনি তো! ভেতরে অজস্র গুটি গুটি লেখা। প্রায় পুরোটা ডায়েরি ভরা লেখাতে। জানি অন্যের ব্যক্তিগত লেখা এভাবে পড়া অন্যায় কাজ কিন্তু কৌতূহলে আমার মন ভরে গেল! কিছুক্ষণ দোমনা-দোটনা করে শেষপর্যন্ত কৌতূহলের কাছেই হার মানলাম, কয়েকপাতা উল্টেই বুঝলাম, এই ডায়েরি লেখা হয়েছে আমাদের বিয়ের প্রায় দেড় বছর আগে। ২০১২ তেই বেশিরভাগ লেখা, শেষ হয়েছে ২০১৩ তে। কী লেখা আছে এখানে? কোথায় গেল আমার ঘর গোছানো, কোথায় রান্না। ডায়েরিতে মুখ গুঁজে বসে গেলাম। আজই আমি ডায়েরিটা পড়ে শেষ করতে চাই..
২৩ জানুয়ারি ২০১২
ভার্সিটি শুরু করেছি প্রায় তিন বছর হয়ে গেল। বন্ধু-বান্ধব নিয়ে খুব বেশি মাতামাতি কখনোই আমার অতোটা ভালো লাগে নি। জীবনে নারী বলেও কেউ নেই। মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে আসা ছেলে আমি, বাবা রিটায়ার্ড হয়ে যাওয়ার পর থেকে পারিবারিক একটা চাপ তো আছেই। নিজেকে বরাবর খুব অথর্ব মনে হয়, সংসারের দায়দায়িত্ব তেমন কিছুই নিতে পারছি না, একসাথে টিউশন আর লেখাপড়া করে ঠিকমতো নিজের খরচ জোগাতেও কোমর ভেঙে যাওয়ার জোগাড়। দু-একজন কাছের বন্ধু, ক্লাস-পড়াশোনা-পরীক্ষা আর টিউশনি নিয়ে নিস্তরঙ্গ জীবন চলছিল একরকম। এর বেশি মাতামাতি করার সামর্থ্যও নেই, ইচ্ছাও নেই। ক্লাসের ছেলেমেয়ে থেকে শুরু করে বন্ধুবান্ধব সবাই এখন গার্লফ্রেন্ড সাথে নিয়ে ঘুরে, একজন অতিরিক্ত নারীর বিলাসিতা আমার জীবনে এখন নেই বলেই আমি মেনে নিয়েছি। তাই ওদিকে কখনও নজর দেই নি। মনের মধ্যে কারো ভাবনা এলেও দূরে ঠেলে সরিয়েছি। বার বার নিজের মনকে শাসন করেছি। কিন্তু তবুও সব এলোমেলো হয়ে গেল। ঝড়ের মতো দু’টি চোখ এসে তছনছ করে দিল সবকিছু--আমার এতোদিনের চিন্তা-চেতনা, ধ্যানধারণা, লেখাপড়া নিয়ে ব্যস্ততা, পরিবার নিয়ে দুর্ভাবনা, ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ সব নিমিষেই কোথায় যেন মিশে গেল। তার বদলে শরীরে ভর করল অদ্ভুত এক মাদকতা! এই মাদকতার স্বাদ আমি কোনোদিন পাই নি। যেন বসন্তের হাওয়া আমাকে মাতাল করে দিচ্ছে, যেন দূরে কোথাও থেকে একটা সুর এসে আমাকে আচ্ছন্ন করে নিচ্ছে, যেন সমুদ্রের অতল গহ্বরে আমি হারিয়ে যাচ্ছি, ডুবছি, ডুবছি, চিরদিনের মতো--এই ডোবার কোনো শেষ নেই।
ইমা। সেই স্বপ্নের রাজকন্যার নাম।
২৬ জানুয়ারি ২০১২
কী হল, কেন হল, কীভাবে হল কিছুই বুঝতে পারছি না। নিজেকে যুক্তিবাদী বলেই সবসময় বিশ্বাস করে এসেছি। কিন্তু আজ আমার সব বোধবুদ্ধি থমকে গেছে।
আচ্ছা, একটু শুরু থেকেই বলি। স্কুল-কলেজে প্রেম করা তো দূরের কথা, গত তিন বছরের ভার্সিটি জীবনেও ক্লাসের কোনো মেয়েকেই আমি তেমন পাত্তা দেই নি। পড়ায় আমার কারো সাহায্য নেওয়ার দরকার হতো না। উল্টো আমার কাছেই সবাই পড়া বুঝতে চাইত, নোট নিতে আসত। পার্টি, শিক্ষাসফর জাতীয় ইভেন্টগুলোয় ক্লাসের মেয়েদের সাথে টুকটাক কথা হয়েছে--মেয়েদের সাথে আমার বন্ধুত্ব বলতে গেলে এ পর্যন্তই। মাঝেসাঝে ক্যাম্পাসের মাঠে আড্ডার সময় বন্ধুদের ‘গার্লফ্রেন্ড’রাও আসত। কী সব ন্যাকা ন্যাকা মেয়ে বাবা! হয়ত বয়ফ্রেন্ডরা সামনে থাকত বলেই ন্যাকামিটা যেন আরেকটু বেড়ে যেত। এই ধরণের মেয়েকে আমি কখনোই মন থেকে পছন্দ করতে পারিনা। কিন্তু ইমা! আমার হৃদয়ের রাণী ইমা! ও সবার থেকে সত্যিই আলাদা! ওর হয়তো এই ভার্সিটিতে পড়ার কথাই ছিল না! বিদেশের ভার্সিটিতে পড়ত। বাবা বিশাল বড়োলোক। দু’বছর আগে ওর মা খুব অসুস্থ হয়ে যাওয়ায় আমেরিকা চলে যায় ওরা। এরপর ওখানেই পড়াশোনা শুরু করে ইমা, কিন্তু মা মারা যাবার পর ব্যবসার কাজে দেশে ফিরতে হয় ওর বাবাকে, আর একমাত্র মেয়েকে চোখের আড়ালে রেখে উনি কোনোমতেই ফিরতে রাজি না। তাই ইমা ক্রেডিট ট্রান্সফার করে এই ভার্সিটির শেষ বর্ষে ভর্তি হলো। আর একেবারে আমার ডিপার্টমেন্টেই এসে পড়লো!
এমনও কি হয়?
গল্প-সিনেমায় হলেও একটা কথা ছিল। আমি ভাবতেও পারিনা ইমা আমার ক্লাসের একজন! অন্য সব মেয়ের থেকে ও একদম ভিন্ন। যেন অসংখ্য ঘাসফুলের মাঝে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো একটি সদ্য ফোটা লাল গোলাপ। ওর তাকানো, ওর কথাবার্তা, ওর চালচলন, পোশাক-আষাক সবকিছুতেই স্পষ্ট একটা রুচির ছাপ। বড়োলোকি উগ্রতা নেই, নেই মধ্যবিত্ত কুণ্ঠিত ভাব, আর গরিবির সাথে তো ওর তুলনাই চলে না। ও যখন কথা বলে তখন সবাই তাকিয়ে থাকে, ক্লাসের ছেলেরা তো বটেই, মেয়েরাও ওর নামে বাজে কথা বলতে ভয় পায়, সবাই যেন সমীহ করে চলে ওকে। কখনও এই ভার্সিটিতে ক্লাস করে নি, কিন্তু হঠাৎ এসেও সবার সাথে মিশে গেল দু’দিনেই। ক্লাসের সবচেয়ে প্রাণোচ্ছ্বল মানুষটি ইমা, ইমাকে ছাড়া এখন সি-সেকশন কল্পনাই করা যায় না। একদিন ক্লাসে আসেনি, ওমনি সবাই ওর জন্য অস্থির হয়ে গেল! এমনকি স্যাররা পর্যন্ত ওর খোঁজ করছিল। ইমা! কেমন একটা আবেশ ছড়িয়ে রাখে ওর চারপাশে, ফুলের মিষ্টি সুবাসের মতো, ও থাকলে আনন্দ, আর না থাকলে সেই শূন্যস্থান পূরণের কেউ থাকে না।
২৭ জানুয়ারি, ২০১২
এখনও ইমার সাথে সামনা-সামনি কোনো কথা হয় নি। কিন্তু ঐ দুটো চোখে চোখ পড়েছে। পাগলের মতো সেদিন সবকিছু ভুলে গেছি। ক্লাসের পড়া পারিনি, স্যারের রোল কলে সাড়া দেই নি, পরীক্ষার মাঝখানে খাতা দিয়ে বেরিয়ে গেছি। রাতে গায়ে জ্বর উঠেছে। উত্তেজনা থেকেই কি এমনটা হচ্ছে?
কোনো মেয়েকে এতো তীক্ষ্ণ আর গভীর দৃষ্টিতে তাকাতে দেখি নি। যেন একবার তাকিয়েই আমার ভেতরের সব খবর জেনে যাচ্ছিল ইমা!
ইমা! কোনো কথা হয়নি ঠিকই, তবু যেন চোখে চোখে একটা সেতুবন্ধন হয়ে গেল। যেন ইশারায় বলে দিল সেও আমাকে পছন্দ করে। ক্লাসের সব ছেলের আরাধ্য ইমা কি সত্যি আমাকে চায়? এ প্রশ্নের উত্তর আমায় কে দেবে! ওহ, আমি পাগল হয়ে যাব!
২৯ জানুয়ারি, ২০১২
আজকের দিনটি আমার স্মৃতিতে সেরা দিন হয়ে থাকবে। আজকে প্রথমবারের মত ইমার সাথে আমার কথা হয়েছে।
ইমার সাথে কীভাবে কথা বলব, কী বলব ভেবে পাচ্ছিলাম না। ছেবলা ছেলেদের মতো পিছে পিছে ঘুরে মেয়ে-পটানোতে আমি অভ্যস্ত নই। আর ইনিয়ে-বিনিয়ে চিঠি লেখার যুগও শেষ।
একদম হঠাৎ করেই একটা সুযোগ এসে গেল। কোনোদিন যা করিনি, অনিকের চাপাচাপিতে আজ তাই করলাম, দুজনে মিলে গেলাম জন্মদিনের দাওয়াতে। ক্লাসেরই কোন মেয়ের যেন জন্মদিন পার্টি। এসব পার্টিতে যোগ দেওয়ার প্রশ্নই আসে না, তাও আবার মেয়েদের বাসায় গিয়ে! কিন্তু মনে হচ্ছে যেন প্রকৃতি, পৃথিবী, স্রষ্টা সবাই চায় আমাদের দেখা হোক, কথা হোক, ভালোবাসা হোক। তাই অনিকের অনুরোধ আর ফেলতে পারলাম না। তখনও জানতাম না যে ইমাও সেখানে আসবে।
ক্লাসের পড়াশোনা পারি দেখে আমার একটা আলাদা দাপট আছে। সবাই বেশ ভাব করতে চায় আমার সাথে। কিন্তু পার্টিতে আমি একেবারেই আনাড়ি! এক কোণায় চুপচাপ বসে আছি, হঠাৎ একটা ডাক শুনে চমকে উঠলাম। ইমা!
- এই যে শুনছেন, এখানে একা বসে আছেন কেন?
- এইতো মানে .. কী বলব বুঝে না পেয়ে বিব্রত একটা হাসি দিলাম আমি! নিশ্চয়ই আমাকে খুব বোকার মত দেখাচ্ছিল!
ইমা বোধ হয় বুঝতে পারল। অন্য প্রসঙ্গে গিয়ে বলল, চলুন, বারান্দায় গিয়ে বসি, আশা করি আমার সঙ্গ খারাপ লাগবে না।
ইমার পেছন পেছন মন্ত্রমুগ্ধের মত হেঁটে বারান্দায় গেলাম। কত কথা হল ওর সাথে! যেন হাজার বছরের পরিচয়।
ইমা খুব মিশুক মেয়ে, একদিনের পরিচয়েই অবলীলায় নিজের কথা, নিজের পরিবারের কথা, ভালো-মন্দ সব দিকের কথা বলে দিল। ওদের এতো সম্পদ নিয়ে ওর কোনো বড়াই নেই, দেবীর মতো ঝলসানো রূপ কিন্তু সেই সুন্দর মুখে কোনো অহংকার নেই। আমিও গড়বড় করে অনেক কথাই বললাম। আমার গ্রামের পরিবারের কথা, ছোটো বোনের কথা, জীবন নিয়ে আমার পরিকল্পনার কথা।
আমি প্রেমে বিশ্বাসী না শুনে ইমা তো হেসেই খুন! বলে কিনা আমি নারীজাতিকে ভয় পাই। আসলে ভয় না, বললাম, আমার কাঁধের সব দায়িত্ব শেষ না করে কোনোভাবেই নতুন সম্পর্কে জড়াতে রাজি নই।
ইমা একথা শুনে অবাক মুগ্ধ দৃষ্টিতে আমার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে ছিল। এরপর মৃদুস্বরে বলল, আপনি সত্যি অন্যরকম, অনেক বেশি দায়িত্ববান।

(২)
সেই ছিল শুরু। ইমার সাথে এভাবেই তাহলে ইউসুফের দেখা হয়। ইমার কথা কখনই আমাকে কিছু বলে নি ইউসুফ। ঊনত্রিশ জানুয়ারির পর আরও আছে ওর অসংখ্য লেখা, সেখানে ইমার খুঁটিনাটি বিবরণ। পড়তে পড়তে মেয়েটাকে যেন চিনে ফেলেছি, এখন সামনে দেখলেই চিনে ফেলব।
জানুয়ারি থেকে শুরু করে প্রতি মাসেই পনেরো-বিশটা করে লেখা। মে মাস পর্যন্ত পড়তে পেরেছি। ইমার সাথে বন্ধুত্ব আরও গাঢ় হল, ওদের সম্পর্ক ‘আপনি’ থেকে ‘তুমি’তে নামল। ওরা প্রায়ই বাইরে ঘুরতে বেরোত। উপহার আদান-প্রদানও হত! ইমার দেওয়ার হাতই বেশি লম্বা ছিল বোঝা যায়। ইউসুফকে এক বসায় দশ সেট শার্ট কিনে দিত। কিন্তু ইউসুফকে খারাপ লাগতে দিত না, নার্সারি ঘুরতে গিয়ে সেখান থেকে ইউসুফের টাকায় নিজের জন্য হয়তো পাঁচটা গাছ কিনে নিত। দু’জন মিলে অ্যাডভেঞ্চারও কম করে নি! ঢাকার বাইরেও আরও অনেক জায়গায় গেছে দুইজন! বিয়ের আগেই এত কিছু!
পড়তে পড়তে আমি কখনও কাঁদছি, কখনও ইমার স্থানে নিজেকেই রেখে কল্পনা করছি। আমার সঙ্গে ঘোরার জন্য ইউসুফের এত সময় নেই। অথচ ও এতটা রোমান্টিক! এতটা অন্তরঙ্গ সম্পর্ক ছিল একটা মেয়ের সাথে!
কিন্তু কী হয়েছিল তারপর? কেন ইমার সাথে বিয়ে হল না? ইমা খুব বড়োলোকের মেয়ে বলেই কি ওর পরিবার রাজি হয় নি? খুব জানতে ইচ্ছা করছে। কিন্তু ইউসুফের আসার সময় হয়ে যাওয়ায় আজ আর পড়তে পারব না। আবার আগামীকালের অপেক্ষা! এই অপেক্ষার প্রহর বড্ড কঠিন লাগছে…।
খাবার টেবিলেও আজকে ইউসুফের সাথে কথা বলি নি। এমনকি ও বাসায় ঢুকে যখন সালাম দিল, আমার উত্তরটা দিতে খুব কষ্ট হয়েছিল। সাধারণত ঝগড়া হলেও সালাম-খাবার এসব নিয়ে আমি এমন করি না। সালাম দিলে উত্তর দিই, খাবার সময় এটা-সেটা এগিয়ে দিই। বলতে গেলে এভাবেই আমার রাগ অর্ধেকটা পড়ে যায়। কিন্তু আজ ইমার কথা পড়ে এত রাগ আর হিংসা হচ্ছে যে, কিছুই করতে মন টানছে না। থাকুক ও নিজের মতো। পুড়ে যাওয়া তরকারি দিয়েই ইউসুফ নিঃশব্দে খেয়ে গেল। কোনো অভিযোগ ও আমার রান্নার কখনোই করে না, আজও করল না। কিন্তু তবু আজ ওর প্রতি কোনো কৃতজ্ঞতাও এলো না আমার। যদিও বুঝতে পারছি, যা ঘটেছে বিয়ের আগেই সবকিছু। কিন্তু তারপরও একটা অবুঝ আক্রোশে আমার মন ক্রুদ্ধ হয়ে আছে। মনে হচ্ছে একটা লম্পট, ধোঁকাবাজের সাথে সংসার করছি।
রাতে শোওয়ার সময় ও আমার রাগ ভাঙাতে এসেছিল,
বউ, তোমার এতো অভিমান কেন?
এখনও কথা বলবে না?
আমি কোনো কথার জবাব দিই নি। কী জবাব দেব? আমার মন যে দাউদাউ করে জ্বলছে! ডায়েরি পুরোটা শেষ না করার আগ পর্যন্ত আমার অন্তরের আগুন বোধ হয় আর নিভবে না। সাড়াশব্দ না পেয়ে একসময় ও ঘুমিয়ে পড়লো। আর আমি বিছানায় ছটফট করে এদিক-ওদিক করতে লাগলাম।

(৩)
পরদিন ইউসুফ বাসা থেকে বের হওয়ার সাথে সাথেই আমি ডায়েরি নিয়ে বসেছি। পুরোটা আজ শেষ করেই ছাড়ব..।
১২ এপ্রিল ২০১২
ছয় মাসে কি একটা মানুষকে চেনা যায়? কিন্তু আমার মনে হয় ছয় মাস কেন, ইমাকে বুঝতে আমার তিন দিনও লাগেনি। এতো কাছাকাছি চলে এসেছি আমরা যে ইমা আমার জন্য সব করতে রাজি, সব ছাড়তে রাজি। মানুষ মানুষকে কতোটা ভালোবাসে, আদৌ ভালোবাসে কিনা জানা যায় তার ত্যাগ দেখে। ইমা এতো বড়োলোকের মেয়ে হয়েও আমার জন্য সেই জীবন ছাড়তে ওর বিন্দুমাত্র আপত্তি নেই। ওর বাবার সাথেও কয়েকবার আমার কথা বলে ফেলেছে।
খুব দুশ্চিন্তা হতো আমার ইমাকে নিয়ে। সামাজিক স্ট্যাটাসের দিক থেকে এত দূরত্ব আমাদের, কীভাবে বিয়ে হবে? কিন্তু ইমা আমাকে আশ্বস্ত করে বলে, সব হয়ে যাবে। ওর বাবার একমাত্র সন্তান ও, বাবা ওর কথা ফেলবেন না। ইমার কথায় আমি ভরসা খুঁজে পাই, কারণ জানি, ইমা বাজে কথা বলার মেয়ে না। ও যা বলবে তা করেই ছাড়বে।
ইমাকে যদি আমি ডাকি এক ডাকে ও আমার বিছানায় আসতে রাজি হবে। শরীর দেখানো মেয়ে ও না, কিন্তু আমার জন্য ও সব করতে পারে সেজন্যই আসবে। আমাকে স্বামী হিসেবেই ও মনে মনে মেনে নিয়েছে। কিন্তু এসব করতে আমার বিবেকে বাধে। সতীত্বের দাম নিশ্চয়ই আছে। আর ইমার দায়িত্ব না নিয়ে ওকে ভোগ করা স্বার্থপরতার শামিল।
তবু আজকের মতোই কত রাত ওকে একটু কাছে পাওয়ার জন্য ছটফট করি! এ কথা কী ইমা বোঝে? নিশ্চয়ই বোঝে।
২১ এপ্রিল ২০১২
গত কয়েকদিন লিখতে পারিনি। ডায়েরি লেখা আরম্ভ করার পর এই প্রথম এতদিন গ্যাপ গেল। প্রচণ্ড জ্বর এসেছিল। শরীর অবসন্ন, দুর্বল হতে হতে বিছানা থেকে নামার মত অবস্থাও ছিল না। হল থেকে বেরোতে পারিনা, তাই ইমার সাথেও দেখা হল না প্রায় দশ দিন! বাড়িতে সময়মত টাকা পাঠানো গেল না। একটা ক্লাসটেস্ট মিস হয়ে গেল।
খারাপের মধ্যে ভালো একটাই, একটা অসাধারণ ছেলের দেখা পেলাম! আমাদেরই ডিপার্টমেন্ট, কিন্তু অন্য সেকশনে পড়ায় আগে ওর সাথে তেমন আলাপ হয় নি। মাঝেমধ্যে পড়া বুঝতে ঘরে আসত, একসাথে কয়েকজনের সাথে আসত বলে আলাদা করে কথা হয় নি। শুধু নামটা জানি--রেহান। পরিচয় বলতে এতটুকুই। কিন্তু আমার শরীর খারাপ শুনে ‘ইউসুফ ভাই, ইউসুফ ভাই’ করে দৌড়ে এসেছে! কিছু মানুষের আন্তরিকতা একদম ভেতর থেকে আসে বোঝা যায়। এই ছেলেরও তেমন। ঠিকমতো ওর নামটাও আমার মনে ছিল না, অথচ কী সেবাটাই না করল আমার।
দিনে-রাতে আমার খোঁজখবর নেওয়া, নিজের পকেটের টাকা খরচ করে ওষুধ-পত্র কেনা, খাবার-দাবার ঠিকমত খাচ্ছি কিনা সেদিকে নজর রাখা। এক ঝুরি ফলও কিনে মাথার কাছে টেবিলটায় রেখে দিয়েছিল, যদি কিছু খেতে ইচ্ছা করে! অথচ রেহানও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে আসা, হাতখরচ নিয়ে টানাটানি। তবু কত করল! আসলে মানুষের মনটাই ব্যাপার। এই ছেলের হাতে টাকা থাকলে আরও করত। যা করেছে সেটাই কজনা করে! সুস্থ হওয়ার পর ওর চেহারায় যে হাসিটা ছিল, একদম অকৃত্রিম! সেদিনই বাইরে নিয়ে আমাকে বিরানি খাওয়াল, জোর করে দুজনের বিল মেটাল। এরপর হাত ধরে বলল, ভাই, আমাদের একটা আড্ডায় আসেন, দ্বীন ইসলামের কথাবার্তা হয়, আপনি আসলে খুব খুশি হব।
ধর্মীয় দিকটা নিয়ে আমি কখনও ভাবার তেমন সুযোগ পাই নি। সে অবসরই হয়নি আমার। কিন্তু রেহানের কথাটা ফেলতে পারলাম না, তাই বললাম যাব।
কিন্তু যাব বলেও বিপাকে পড়েছি। এই ধরণের আড্ডায় কখনও যাই নি, যেতে মোটেও ইচ্ছা হচ্ছে না। এখন আবার অজুহাত খুঁজতে হবে, কেন যাই নি। ভাবছি আগামী কয়েকদিন রেহানকে একটু এড়িয়ে চলতে হবে। কেন যে অনুরোধে ঢেঁকি গিলতে যাই! ভদ্রভাবে বলে দিলেই পারতাম, ভাই এসবে আমার আগ্রহ নেই। এরচেয়ে একটা বিকাল ইমার সাথে কাটানোও অনেক চমৎকার! আহ, কতদিন ইমার মুখটা দেখিনা! পাখির নীড়ের মতো সেই দুটো চোখ…
২২ এপ্রিল ২০১২
ঠিক দশদিন পর আজ ইমার সাথে দেখা। আমার জ্বরে-ভুগে-ওঠা ফ্যাকাসে চেহারার চেয়েও ওর মুখটা বেশি ফ্যাকাসে হয়ে ছিল। গত দশদিন যে ওর নাওয়া-খাওয়া-ঘুম কোনোটাই হয় নি, সেটা ও না বললেও বুঝতে পারছিলাম। এত মায়া লাগে ইমার জন্য! ইশ! আমি কি এত ভালোবাসার যোগ্য?
আমার কাঁধে মাথা রেখে কাঁদো কাঁদো গলায় ইমা আমাকে আজ বললো,
কথা দাও, আমাকে ছেড়ে তুমি কোথাও যাবে না।
- কথা দিলাম।
২৩ এপ্রিল ২০১২
কথা গুছিয়ে লিখতে আজ বেগ পেতে হবে। খুব উদভ্রান্ত হয়ে আছি আজ। অস্থিরতা কাজ করছে।
শনিবার বিকেলে ইমার সাথে দেখা করে এসে রুমে ঢুকেই দেখি রেহান এসে হাজির, সে আমাকে আড্ডায় নিয়ে যেতে এসেছে! আমি তো হতভম্ব! এগুলোকে এতো সিরিয়াসলি নেয় কেউ! ওকে মুখে যাব বললেও যাওয়ার ইচ্ছা আমার মোটেও ছিল না বলাই বাহুল্য। কিন্তু ঘর থেকে কাউকে বের করে তো দিতে পারিনা। অগত্যা যেতে হল।
নবী ইউসুফকে নিয়ে আলোচনা।
নবী ইউসুফের বাবাও নাকি নবী ছিলেন, জানতাম না আগে। ইউসুফ ছোটোবেলাতেই স্বপ্ন দেখলেন, স্বপ্ন শুনে বাবা বুঝলেন ইউসুফ একজন নবী হবেন। এই ছেলেই ছিল সব সন্তানের মধ্যে তাঁর চোখের মণি। ভাইয়ের প্রতি বাবার এই অতিরিক্ত ভালোবাসা অন্য ভাইদের সহ্য হল না। তারা বুদ্ধি আঁটল, ধাক্কা মেরে ফেলে দিল ইউসুফকে অন্ধকার কুয়ার মধ্যে। একাকী ইউসুফকে উদ্ধার করল পথের একদল যাত্রী। এরপর সে বিক্রি হয়ে গেল সুদূর মিসরে এক রাজার কাছে।
গল্পের মতো কাহিনি! আগে কখনও শুনি নি! নবী ইউসুফের সাথে জুলেখা বিবির প্রেমের গান শুনেছিলাম। ওরা বললো, এসব নাকি মিথ্যা কথা। নবীদের কেউ এমন অবৈধ প্রেম করেন নি। এমনকি জুলেখা নামটাও কুরআনে নেই! মন্ত্রী আযিযের স্ত্রী ইউসুফকে নানাভাবে প্রলুব্ধ করে, অবৈধ সম্পর্কের জন্য জোর-জবরদস্তি করতে থাকে। সুন্দরী নারী, মোহনীয় ডাক, কিন্তু নবী ইউসুফ! নিজেকে বাঁচাতে, নিজেকে চরিত্রকে পবিত্র রাখতে, এই অগ্নিপরীক্ষা থেকে দূরে থাকতে কারাগারে যাওয়ার জন্য দু’আ চায়!
এরপর কয়েক বছরের কারাবাস শেষে ফিরে এসে রাজ্যের উঁচু পদে যোগ দেয়। শেষ পর্যন্ত মিল হয় তার পরিবারের সাথে, তার ভাই আর বাবার সাথে। ভাইদেরকে তিনি মাফ করে দেন।
কাহিনি শেষ করেও অনেকক্ষণ পর্যন্ত আলোচনা চলল। আরও কয়েকজন সিনিয়র আর জুনিয়র ছাত্রও এসেছিল। প্রেম করা মারাত্মক গুনাহ--এটা নিয়েই প্রায় চল্লিশ মিনিট মতো কথা বলল। আমি খুব সংকুচিত বোধ করছিলাম। মনে হচ্ছিল যেন আমাকে উদ্দেশ্য করেই এসব বলা! অথচ ওরা কেউই ইমার কথা জানে না, জানার কথা নয়। ক্লাসের ছেলেরা ইমার জন্য আমাকে ঈর্ষা করে, কেউ কেউ তো বলেই বসে, দোস্ত, তোর ভাগ্যটা সেইরকম ভালো! শুনে মনে মনে আমার খুব গর্ব হয়! নিজেকে রাজা-রাজা মনে হয়। এটা সত্যি, ইমাকে পাওয়া মানে সত্যি সত্যিই রাজকন্যা আর রাজত্ব একসাথে পাওয়া। ইমারা প্রচণ্ড বড়োলোক, ওর বাবার জন্য যোগ্যতাসম্পন্ন কোনো ছেলের ভাগ্য রাতারাতি বদলে ফেলা দু’মিনিটের কাজ।
অথচ এই কয়টা ছেলের কথা শুনে মনে হচ্ছে ওরা ইমার কথা জানতে পারলে আমাকে খুব খারাপ ভাববে। একজন একটা হাদীস বললো, পরনারীর গায়ে স্পর্শ করার চাইতে নাকি লোহার পেরেক দিয়ে কপালে ফুটো হয়ে যাওয়া বেশি ভালো! শুনেই আমি কুঁকড়ে-মুকড়ে গেলাম।
মনের মধ্যে একটা প্রশ্ন এসেছিল, সঙ্কোচে সবার সামনে শেষপর্যন্ত আর জিজ্ঞেস করতে পারলাম না, প্রেম করা কি এতই খারাপ?
২৫ এপ্রিল ২০১২
সকালে ওঠার পর অস্থির ভাবটা দূর হয়ে গেল। মনটা হালকা খচখচ করছিল, ক্লাস শেষে ইমার সাথে আলাদা করে দেখা করলাম। ওর হাতে হাত রাখলেই আমার রাজ্যের চিন্তা দূর হয়ে যায়। ইমাকে শোনালাম নবী ইউসুফের কাহিনি, ও আগ্রহ নিয়ে শুনল। এরপর এ কথা-সে কথা করে আমরা দুজনেই অনেক কথা বললাম। খচখচে বোধটা কখন উধাও হয়ে গেল টেরই পেলাম না।

(৪)
- কী হল দরজা খুললে না যে? আওয়াজ শোনো নি?
পড়তে পড়তে ডায়েরির মধ্যে এতো ডুবে গিয়েছিলাম যে দরজার খটখট শব্দ কানে আসে নি। ইউসুফের গলায় চমকে চোখ বড়ো বড়ো করে ওর দিকে তাকালাম!
- তুমি! এখন?
বেলা মাত্র বারোটা বাজে, এমন অসময়ে ইউসুফকে বাসায় আসতে দেখে আমি এতো আশ্চর্য হলাম যে এটাও ভুলে গেছি ওর সাথে আমার কথা বন্ধ! সম্বিৎ ফিরে পেতে খানিকক্ষণ লাগল আমার। এরপর জিজ্ঞেস করলাম,
- এত জলদি কীভাবে আসা হল? চাবি দিয়ে লক খুললে যে? নক করতে পারো নি?
- শরীর খারাপ লাগছিল, তাই আগেভাগেই চলে এলাম। কারেন্ট নেই দেখে কলিং বেল শোনো নি, দরজায় নক করেও কেউ খুললো না, তাই .. কিন্তু তোমার হাতে এটা কি! আরে আমার পুরোনো ডায়েরি! এটা তুমি কোথায় পেলে?
- তুমি যেখানে রেখেছিলে সেখানেই নিশ্চয়ই। আর কতো কাহিনি আছে তোমার জীবনে?
আমার হাতে খোলা ডায়েরি দেখে ইউসুফের মুখ থমথমে গম্ভীর হয়ে গেল। ও অসুস্থ হয়ে বাসায় ফিরেছে সে কথা আমার খেয়াল থাকল না, রাগে অন্ধ হয়ে ছিলাম আগে থেকেই, তার ওপর ওর কাছে ডায়েরিসহ এভাবে ধরা পড়ে যাওয়ায় অনেকটা আত্মরক্ষার জন্যই হয়তো আমি আজেবাজে সব কথা বলে ওকে আক্রমণ করতে থাকলাম। ও চুপ করে সব শুনল। এরপর বলল, তোমার যদি আমাকে নিয়ে সন্দেহ থাকে, তাহলে পড়ো, পুরো ডায়েরিটাই পড়ো। তারপর কথা হবে।
আমি ডায়েরি হাতে গটগট করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলাম। বিছানাপত্র সকাল থেকে অগোছালো হয়ে আছে, তাতে কি! আমি শুধু জানি, আমাকে এই কাহিনির শেষ জানতে হবে।
ড্রয়িং রুমে বসে আবার পড়া শুরু করলাম।
এখন আর লুকিয়ে পড়ার ভয় নেই। কিন্তু পাতার পর পাতা পড়ার ধৈর্য্যও হারিয়ে ফেলেছি! রাগে তখন আমার শরীর কাঁপছে। একসাথে কয়েক পাতা উল্টাচ্ছি, এর শেষ আমার জানাই লাগবে! যত দ্রুত সম্ভব! পড়তে পড়তেই বুঝলাম বড়ো ভুল হয়ে গেছে..
২৯ মে ২০১২
প্রথমদিন যখন রেহানদের আড্ডায় গিয়েছিলাম তেমন ভালো লাগে নি। বিরক্তি, দ্বিধা, সংকোচ, অস্বস্তি সব মিলিয়ে একটা মিশ্র অনুভূতি কাজ করছিল। ইউসুফ আলাইহিস সালামের ঘটনা শুনে মনটা কেমন খচখচ করছিল, কিন্তু কারণটা ধরতে পারছিলাম না।
কারণটা আমি এখন ধরতে পেরেছি। নিজেকে মুসলিম দাবি করে আসা এই আমি এতদিন ইসলাম নিয়ে একটুও চিন্তা করি নি। নবীজি (সা) কে বিশ্বাস করি বলেছি মুখে মুখে, কিন্তু উনার সম্পর্কে তেমন কিছুই জানতাম না, উনার শিক্ষা মেনে চলা তো দূরের কথা! প্রেম নিয়ে আল্লাহর আদেশ আমার কাজের ঠিক বিপরীত। এটাই মানতে কষ্ট হচ্ছিল। কিন্তু রেহানের সাথে আরও আলাপের পর বুঝতে পারছি আমার এতদিনের ধ্যানধারণাগুলোতেই ভুল ছিল। বিয়ের বাইরে প্রেম আসলেই গোলমেলে ব্যাপার। সবচেয়ে বড়ো কথা--আল্লাহ আর রাসূলুল্লাহ যা বলেছেন, তা একজন মুসলিম হিসেবে আমাদের মানতে হবে। মেনে চলার মধ্যেই আমাদের জন্য কল্যাণ নিহিত।
১৩ জুন ২০১২
আজ রেহানের সাথে অনেক রাত পর্যন্ত আলোচনা করলাম। মূলত আখিরাত, জান্নাত-জাহান্নাম এগুলো নিয়েই। আমার খুব ভয়-ভয় করছে। অন্ধকার বা ভূতের ভয় না, এটা একটা অন্যরকম ভয়! জান্নাত হারানোর ভয়, শাস্তি পাবার ভয়।
আখিরাতটা এই জীবনের তুলনায় বিশাল, অনেক বিশাল! সেই আখিরাতে যদি আমি ব্যর্থ হই, তাহলে এই মুহূর্তের জীবনের লাভ-খ্যাতি-টাকাপয়সা-ভালোবাসা কোনো কাজেই আসবে না। ব্যর্থদের দলে যুক্ত হয়ে যাব চিরদিনের জন্য। জাহান্নামের আগুনে পটপট করে আমার হাড্ডি-মাংস-চামড়া পুড়বে, ফুটবে। কিন্তু কেউ এগিয়ে আসবে না। কোথায় থাকবে সেদিন বাবা-মা-ভাইবোন সবাই! কোথায় থাকবে সেদিন ইমা! ইমা কি আমাকে বাঁচাতে পারবে?
নাহ, আল্লাহর বিচারের সামনে সবাই তুচ্ছ।
৩০ জুন ২০১২
ইমার সাথে আপাতত সম্পর্ক না রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এই সিদ্ধান্তে আসতে আমার অনেক সময় লেগেছে। ওকে কিছুতেই বোঝাতে পারছি না কেন আমি এরকম প্রেম করতে চাই না!
ইমা! আমি কিছু বলার আগেই যে আমাকে বুঝে ফেলত, সেই ইমা আমাকে এখন কেন বুঝতে চাইছে না?
ওকে এড়িয়ে চলা আমার পক্ষে সম্ভব না! হে আল্লাহ! তুমিই আমার জন্য সহজ করে দাও!
৪ জুলাই ২০১২
ইমাকে ছাড়া থাকা আমার জন্যেও কী যে কঠিন! বিয়ের কথা এই মুহূর্তে চিন্তা করা মোটেই মানায় না, কিন্তু ইমাকে ছেড়ে থাকাও অসম্ভব। প্রেম করব না-করব না বলেও প্রায়ই কথা হচ্ছে আমাদের। ইমাও মরিয়া হয়ে উঠেছে। আমার সাথে যেন কথা বলেই ছাড়বে! ওকে উপেক্ষা করা আমার জন্য দুঃসাধ্য ব্যাপার। সেদিনও ক্লাসের মাঝে খপ করে আমার হাত ধরেছে, মেসেজের পর মেসেজ, ফোনের পর ফোন তো আছেই। এভাবে চলতে থাকলে আমি নিজেকে কতদিন সামলে রাখতে পারব! বিয়ের পর সংসার কোনো না কোনো একভাবে চলেই যাবে, লাগলে ছোটো কোনো চাকরি করব, কিন্তু বিয়ে করাই এখন নিজেকে এই ফিতনা থেকে বাঁচানোর একমাত্র পথ।
বিয়ের মাধ্যমে মানুষের রিযিক বেড়ে যায়, এটা তো আল্লাহর ওয়াদা। তাহলে আমি ওকে খাওয়ানো-পরানোর ভয় কেন পাচ্ছি? ও বড়োলোকের মেয়ে বলেই কি! কিন্তু ও তো কখনো আমার কাছে অনেক জিনিসের দাবি করে নি। ছোটোখাটো একটা বাসা নিলেই আমাদের চলে যাবে, আর পড়াশোনা নাহয় নিজে নিজেই করব। আর বেশিদিন বাকিও নেই ফাইনাল পরীক্ষার। এর পরেই বিয়েটা সেরে নিলে কেমন হয়?
২৭ জুলাই ২০১২
ইমাকে আজ আমি বিয়ের কথা বলেছি। ও বিয়েতে রাজি! আলহামদুলিল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ!! আমি জানতাম ও রাজি হবেই। আমার জন্য সব করতে পারে আমার ইমা, আমার আদুরে পাখি ইমা। আজ যে আমি কী খুশি লিখে বোঝানো যাবে না। ইচ্ছা করছে দুনিয়ার সবাইকে জড়িয়ে ধরে কোলাকুলি করি। চিৎকার করে জানাই--ইমা আমার! আমরা বিয়ে করছি!
রেহান আমাদের বিয়ের সিদ্ধান্তের কথা শুনে খুব খুশি হয়েছে। আমি নিশ্চিত আমার বাবা-মায়েরও অমত হবে না। ইমার বাবাও আমার কথা জানে, তারও নাকি তেমন অমত নেই আমার ব্যাপারে।
আমার আর ইমার বিয়ে হলে এই ডিপার্টমেন্ট থেকে এটাই হবে প্রথম বিয়ে!
১৮ আগস্ট ২০১২
ইমার সাথে বিয়েটা মনে হয় না হবে। বিয়ের ব্যাপারটা সহজে মেনে নিলেও ইমা কিছুতেই নিজেকে পরিবর্তন করছে না। ওকে আমি নামাজ আর হিজাবটা অন্তত করতে বলেছিলাম, কিছু বই লেকচারও দিয়েছি। কিন্তু ওর মধ্যে কোনো বদল নেই। আগের মতোই হৈ-হুল্লোড়, সবার সাথে আড্ডা। এমনকি ক্লাসের ছেলেদের সাথেও সেই একই রকম কথা-হাসি-তামাশা। ইদানিং এগুলো সহ্য করা খুব কঠিন লাগে। আমি বহু কষ্টে নিজেকে সামলে রাখি, ইমার সাথে কোনো রাগারাগি করি না। ইসলামকে বুঝতে আমারই তো কতদিন লেগেছে! ইমাকেও সময় দেওয়া দরকার। যেন ও ইসলামের অর্থ বুঝতে পারে।
ইমা না বদলালে আমাদের বিয়ে হলেও টেকার কোনো সম্ভাবনা নেই। ছেলেদের সাথে এভাবে গায়ে পড়ে মেশা, সবাই মিলে হ্যাং-আউট করা, পার্টিতে যাওয়া--এগুলো আমি কিছুতেই মেনে নিতে পারব না। এগুলো মেনে নিলে আমার নিজেরও গুনাহ হবে, আল্লাহর কথার অবাধ্য হতে হবে। আর যে মেয়ে এখন পর্যন্ত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে না, সে ভবিষ্যতে আমাদের সন্তানদের কী শিক্ষা দেবে?
মাঝে মাঝে মনে হয়, এভাবেই ইমাকে বিয়ে করে নিই। হয়তো ও আস্তে আস্তে বদলাবে। কিন্তু বিয়ের আগে এত বলার পরেও যাকে বদলাতে পারছি না, বিয়ের পর তাকে আমি কীভাবে বদলাব! হেদায়েতের মালিক তো আল্লাহ! আমাদের কাউকে বদলে ফেলার কোনো ক্ষমতাই নেই।
১১ সেপ্টেম্বর ২০১২
একই ক্লাসে প্রতিদিন আসি, অথচ ইমার সাথে কথা হয় না অনেকদিন! শুধু দূর থেকে দেখি। তবুও একবার চোখ পড়লেই চোখ নামিয়ে নিই। উহ! কী যে কঠিন নিজের নজরকে হেফাজতে রাখা! বিশেষ করে ইমার সাথে! ইমার চোখে চোখ পড়া মানে বড়শিতে গেঁথে যাওয়া মাছ। যার দিকে একবার ইমা ইশারা করে, সে কখনও সেই দৃষ্টি উপেক্ষা করতে পারে না। মোহনীয় ওর দৃষ্টি, মাতাল করে দেওয়া ওর চোখের ডাক!
আমিও অবশ্য ওর সাথে যোগাযোগ করি, তবে তা কালেভদ্রে। মাঝে মাঝেই ওকে ভালো লেখা পেলে মেসেজ করি, ইসলামি বই পাঠাই, কয়েকজন দ্বীনী বোনের সাথে পরিচিত হতেও বলেছিলাম। বোনগুলোকে আমি চিনিনা, রেহান বললো ওরা নাকি ইসলাম মেনে চলে। ওদের সাথে হয়তো ইমার কথা হয়! কে জানে! আজকে ইমার দিকে একবার চোখ পড়েছিল, দেখলাম ও স্কার্ফ পরা। কী যে খুশি লাগছে! ইমা কি তাহলে ইসলামের পথে পা বাড়িয়েছে?
হে আল্লাহ, তুমি ইমাকে ইসলামের জ্ঞান আর হেদায়েত দান করো! আমি এটাই চাই..।
৫ নভেম্বর ২০১২
কিছু সত্য এত ভয়ংকর কেন? মনে হয় যেন না জানলেই ভালো হতো। অনিকের সাথে কথা বলতে গিয়ে ভয়াবহ ব্যাপার জানতে পারলাম। ইমা নাকি আমাকে বিয়ে করার জন্যই এখন স্কার্ফ ধরেছে! অথচ গতকালই ফোন করে অনেক কান্নাকাটি করে আমাকে বললো, ও নাকি বদলে গেছে! ইসলামের পথে পা বাড়িয়েছে!
আসলে ইমা কখনও “না” শুনে অভ্যস্ত না। বড়োলোকের মেয়ে, ছোটোবেলা থেকে যা চেয়েছে তাই পেয়েছে। আমি এখন ওর কাছে একটা চ্যালেঞ্জ! আমাকে ওর পাওয়া চাই। তার জন্য ও সবকিছুই করতে রাজি। ও কেন বুঝতে চাইছে না যে আমি বদলে গেছি! আল্লাহকে খুশি করলেই আমি খুশি হই। ও যদি সত্যি ইসলামের দিকে মনোযোগী হতো, তাহলে আমি নির্দ্বিধায় ওকে বিয়ে করতাম। কিন্তু খেলার ছলে ও ইসলামকে নিয়ে যা করছে, তার জন্য ওর প্রতি আমার সম্মান দিনে দিনে কমে যাচ্ছে। ইসলাম নিয়ে মিথ্যে অভিনয় করার কোনো সার্থকতা নেই। এভাবে ইমা আমাকে কোনোদিনও পাবে না।
২১ নভেম্বর ২০১২
ইমা স্কার্ফ ছেড়ে দিয়েছে। হেদায়েত ব্যাপারটা নিয়ে বেশিদিন অভিনয় করা যায় না। ইদানিং ও আগের চাইতেও অনেক বেশি উগ্র পোশাক পরে আসে। হয়তো আমাকে ভোলানোর জন্য এটাও ওর একটা কৌশল! প্রায়ই অচেনা নাম্বার থেকে ফোন দেয়। মাঝে মাঝে টেক্সট করে বলে খুব জরুরি কথা আছে, কিন্তু ফোন ধরে দেখেছি কথা আর শেষ হয় না, জরুরি কথার অজুহাতে এমন সব কথা হতে থাকে, যা শুধু স্বামী-স্ত্রীর মাঝেই মানানসই। মিথ্যা বলব না, মাঝরাতে এত একাকী লাগে! ওর ফোন পেলে মনে হয়, ধরি। একটু গলার স্বর শুনি। কোনো কথা বলব না।
কিন্তু আমি জানি, একবার পা ফসকালে আমি পিছলে নিচে পড়তেই থাকব, পড়তেই থাকব। আমাকে টেনে তোলার কেউ থাকবে না। ইউসুফ আলাইহিস সালামের কাহিনিটা ইদানিং খুব মনে পড়ে। উনিও ইউসুফ ছিলেন, আর আমিও এক ইউসুফ! কত পার্থক্য আমাদের। উনি নারীর ফিতনা থেকে বাঁচতে কারাগারে চলে গিয়েছিলেন, আর আমি জীবনে কত ভুল করেছি, করেই চলেছি!
তবু যেন উনার জীবনের সাথে একটা সূক্ষ্ম মিল খুঁজে পাই। ইমার জন্য তীব্র টান থাকা সত্ত্বেও ওকে এড়িয়ে চলা, ওর ঝলসানো রুপ, নজরকাড়া চোখ আর অঢেল সম্পদের লোভ থেকে নিজেকে বেঁধে রাখা, বন্ধুবান্ধব সবার চাপাচাপিকে উপেক্ষা করে, ওদের সবরকম খোঁটা সহ্য করেও প্রতিদিন শক্ত থাকার চেষ্টা করা-- এই সবকিছুর জন্য আমি এই মানুষটার কাছ থেকেই প্রেরণা পাই। সায়্যিদিনা ইউসুফ যদি প্রচণ্ড চাপের মুখেও আযিযের স্ত্রী’র আহবান প্রত্যাখ্যান করতে পারেন, আমি সামান্য প্রেমের আহবান উপেক্ষা করতে পারব না?
৩০ নভেম্বর ২০১২
ভাবতেও পারিনি এমন হবে! চরম দুঃস্বপ্নেও ভাবিনি! আজ আমার দুঃখের দিন…
আজ সকাল থেকেই ইমার জন্য মনটা খুব আনচান করছিল। ক্লাসে গিয়ে দেখি ইমাকে অপ্সরীর মতো সুন্দর লাগছে। এত ভয়াবহ সুন্দর তার সাজ যে না তাকিয়ে উপায় নেই! ঠোঁটে কড়া লাল রং, ফর্সা গালে গোলাপি আভা টকটক করছে। কামিজটাও কেমন যেন খুবই আকর্ষণীয়। আমি মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছি। ইমা আমার দিকে তাকিয়ে ইশারা দিল ক্লাসের বাইরে যাবার। কি মনে করে আমিও চট করে বাইরে চলে গেলাম। আজ স্যার আসেন নি, তাই ক্লাস হচ্ছিল না। ইমা বের হয়েই আমাকে টানতে টানতে নিয়ে গেল…
আজ সর্বনাশ হতে পারত। নফসের তাড়নায় আমিও ভুলের পথে পা বাড়িয়েই দিয়েছিলাম, খুব দুর্বল হয়ে গিয়েছিলাম, শয়তানের ওয়াসওয়াসায় ভুলতে বসেছিলাম আমার এতদিনের পরিশ্রম! কিন্তু আল্লাহর অশেষ রহমত, আমি নিজেকে তা থেকে বের করে আনতে পেরেছি। যে ভয় আমার নিজেকে নিয়ে ছিল, আল্লাহ আমাকে সেখান থেকে রক্ষা করেছেন!
আমি নিজেকে গুটিয়ে নিলে ইমা খুব ক্রুদ্ধ হয়ে ওঠে। অনেক কান্নাকাটি করে। ইমা চেয়েছিল আমি যেন ওর রূপের কাছে হার মানি, এরপর বিয়ে করতে বাধ্য হই। নাছোড়বান্দা ইমা। কিন্তু না, আমার পক্ষে ইমাকে এভাবে গ্রহণ করা সম্ভব না। নবী ইউসুফ পেরেছিলেন, আল্লাহ আমাকেও সাহায্য করেছেন। আজ একটা সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হলাম- ইমার সাথে একই ক্লাসে থেকে ফিতনায় জড়ানোর চাইতে বরং পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়াই আমার জন্য উত্তম হবে।
০৭ মার্চ ২০১৩
অনেক কষ্ট করে নিজে নিজে পড়েই পরীক্ষা দিলাম। পরীক্ষার আগের খুব জরুরি সব ক্লাসই মিস দিয়েছি। ইমার কথা ভেবে, নিজের কথা ভেবে নিজেকে দূরে রাখাই শ্রেয় মনে হয়েছিল। আলহামদুলিল্লাহ রেজাল্ট বরাবরের মতোই ভালো এসেছে। আল্লাহর কথা ভেবে কিছু ছাড়লে আল্লাহ তারচাইতেও উত্তম কিছু মানুষকে দেবেনই। গত সপ্তাহে চাকরির জন্য কয়েকটা ইন্টারভিউ দিয়েছি। যে ফলাফল এসেছে, তাতে আশা করি চাকরি আটকাবে না ইনশা আল্লাহ।
কিন্তু ইমার সাথে সুন্দর একটা সংসারের স্বপ্ন ছিল, সেটা বোধ হয় আর হবে না। ইমা আজকাল আরেকটা ছেলের সাথে ঘোরে, কদিনেই বেশ অন্তরঙ্গতা হয়ে গেছে মনে হয়। কষ্ট লাগে, খুব কষ্ট লাগে। আমার ইমা আর আমার নেই! মাঝে মাঝে রাগে অন্ধ হয়ে গিয়ে প্রশ্ন করতে ইচ্ছা করে, তাহলে কেন এতদিন আমার সাথে ছিলে? কেন আমাকে পাওয়ার জন্য এত্তো মরিয়া হয়ে আমার জীবনটা কঠিন করে দিলে? কীভাবে পারলে এত সহজে আরেকজনের সাথে সম্পর্ক করতে?
কিন্তু করা হয় না। বেশি খারাপ লাগলে রেহানের রুমে চলে যাই, গভীর রাত পর্যন্ত কথা হয়। ইমার কথা, দ্বীনের কথা, আখিরাতের কথা। তখন একরকম খুশিও হই। ইমা আমার ছিলই বা কবে! আমার জন্য ইমা না। আমি ইমাকে আল্লাহর জন্য ত্যাগ করেছি, নিশ্চয়ই আল্লাহ এর বিনিময়ে উত্তম কাউকেই আমার জন্য রেখেছেন যে শুধু এই জীবনে না, ওপারের জীবনেও আমার স্ত্রী হবে। আমার জান্নাতী স্ত্রী! আমি মনেপ্রাণে তার জন্যে অপেক্ষা করে আছি..।
“হে আমাদের রব, আপনি আমাদেরকে এমন স্ত্রী ও সন্তানসন্ততি দান করুন যারা আমাদের চোখ জুড়িয়ে দেবে। আর আপনি আমাদেরকে মুত্তাকীদের জন্য আদর্শ বানিয়ে দিন।” [সূরা ফুরক্বান: আয়াত ৭৪]

(৫)
একনাগাড়ে এতটুকু পড়ে আমি উঠে দাঁড়ালাম। চোখ পানিতে ভিজে গেছে। মনে অপরাধবোধ কাজ করছে। ইউসুফ কেন আমাকে এসব কথা বলে নি এখন বুঝতে পারছি। অতীতের গুনাহর কথা জানিয়ে অবিশ্বাস আর সন্দেহ সৃষ্টি করা ছাড়া তো কোনো লাভ নেই। তাছাড়া ও ওই জীবনকে অনেক আগেই পেছনে ফেলে এসেছে। এখন ও শুধু আমাকেই ভালোবাসে।
নিজের হাতে ডায়েরির পাতাগুলো ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করলাম, এরপর আগুন ধরিয়ে দিলাম। অতীতের গুনাহর সাক্ষী রাখার কোনো মানে নেই। কাগজগুলোয় লকলক করে আগুনের শিখারা জ্বলছে-- পুড়ে যাক সব কাগজ, পুড়ে যাক বীভৎস সব স্মৃতি।
ঘরে ঢুকে দেখি ইউসুফ অগোছালো বিছানাতেই ঘুমিয়ে পড়েছে। কী নিষ্পাপ মায়াময় একটা চেহারা! মাথার নিচের বালিশটা ভেজা, আমি কেঁদেছি, সেও কেঁদেছে। কী পরিমাণ সংগ্রামই না করেছে মানুষটা আল্লাহর পথে চলার জন্য! যুবতী নারীর ডাকে সাড়া না দেওয়া একজন পুরুষের পক্ষে প্রায় অসম্ভব ব্যাপার! সেই সাথে বন্ধুবান্ধবের জোরাজুরি, পিয়ার-প্রেশার, অঢেল সম্পদের মোহ ত্যাগ করা! এরপর ভালোবাসার মানুষকে পর হয়ে যেতে দেখা! সেটাও কী সম্ভব! কত রাগ ছিল আমার মনে, কত প্রশ্ন, কত কৌতূহল। ঠিক করলাম সেসব কিছু প্রকাশ করে এই ভাঙা অন্তরটাকে আর বিব্রত করব না। আল্লাহ তা’আলা এই মানুষটার ত্যাগের বিনিময়ে আমাকে স্ত্রী হিসেবে পাঠিয়েছেন, যেন আমি মানুষটার মনের যত্ন নিই। আল্লাহ তা’আলা আমাকে এই সংগ্রামী মানুষটার যোগ্য ভেবেছেন, কী করে তাকে কষ্ট দিই! অনেক মমতায় ঘুমন্ত মানুষটার মাথা বুকে জড়িয়ে ধরলাম।
এত মমতা বোধ হয় শুধু স্বামী-স্ত্রী’র মাঝেই সম্ভব। একমাত্র আল্লাহই পারেন স্বামী-স্ত্রী’ র মাঝে এই গভীর ভালোবাসা ঢেলে দিতে..
.
.
.
বি. দ্র. - এটি আমার ও আমার স্বামীর জীবনের কাহিনি নয়। বিভিন্ন সত্য ঘটনা আর অভিজ্ঞতার আলোকে গল্প লিখি। পড়ার জন্য সবাইকে অনেক ধন্যবাদ

One

অনেক ধরনের চিন্তা মাথায় ঘুরপাক খায়। খেয়ে দেয়ে আবার ক্লান্তও হয়ে যায়। যার কিছু হয়তো ভাল, আবার কিছু হয়তো কালো। তেমনি আজ একটা বিষয় মাথায় আসলো।...